Logo
মক্কা চুক্তির ভূরাজনীতি: ‘মুসলিম ন্যাটো’ ও বাংলাদেশের সম্ভাবনা
মারজান আহমদ চৌধুরী
  • ২ অক্টোবর, ২০২৬

গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কা মুকাররমায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান একটি ত্রিপক্ষীয় যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে, যা Makkah Agreement for Joint Defence নামে পরিচিত। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান এবং পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ মক্কায় অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। তিন দেশের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক সম্পর্ক, ইসলামী সংহতি, অভিন্ন কৌশলগত স্বার্থ ও পূর্ববর্তী প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে এই চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। চুক্তির মূল বিধান হলো, তিন দেশের যে কোনো একটির বিরুদ্ধে সংঘটিত সশস্ত্র হামলাকে তিনটি দেশের বিরুদ্ধেই হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে (রয়টার্স, ১৩ আগস্ট)। ৩১ আগস্ট ইস্তাম্বুলে সৌদি, তুরস্ক ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানেরা প্রথম বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠকে তিন দেশ মক্কা চুক্তির অধীনে সহযোগিতাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, সৌদি আরবে একটি স্থায়ী সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা, যৌথ প্রযুক্তি উন্নয়ন, সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পারস্পরিক প্রতিরক্ষা-সমন্বয় জোরদারের কথা বলা হয়।

কিছু আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ ও গণমাধ্যমে মক্কা চুক্তিকে ‘Muslim NATO’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এর কারণ হলো চুক্তির মূল collective-defence clause, অর্থাৎ, স্বাক্ষরকারী তিন দেশের যেকোনো একটির বিরুদ্ধে সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের বিরুদ্ধেই হামলা হিসেবে বিবেচনা করার নীতি। এই নীতিটি বিশ্বের বৃহত্তম সামরিক জোট ন্যাটোর Article 5-এর সঙ্গে তুলনীয়। ন্যাটো (North Atlantic Treaty Organization) ১৯৪৯ সালের ৪ এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত একটি সামরিক ও রাজনৈতিক জোট, যার সদস্যরাষ্ট্রগুলো পারস্পরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। ন্যাটোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধান হচ্ছে Article 5, যেখানে বলা হয়েছে, কোনো একটি সদস্যরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকায় সশস্ত্র হামলাকে সব সদস্যের বিরুদ্ধে হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ২০০১ সালে টুইন টাওয়ারে হামলার পর ন্যাটো প্রথমবারের মতো Article 5 এর কার্যকারিতা আহ্বান করে। এর ভিত্তিতে সদস্যরাষ্ট্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং আফগানিস্তান মার্কিন আগ্রাসনে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা প্রদান করেছিল। মক্কা চুক্তিকে ‘মুসলিম ন্যাটো’ বলার আরেকটি কারণ হচ্ছে চুক্তিবদ্ধ তিন দেশের সম্মিলিত সামরিক সক্ষমতা। তুরস্কের হাতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সেনাবাহিনী ও নিজস্ব সামরিক সরঞ্জাম নির্মাণের সক্ষমতা রয়েছে। পাকিস্তান পারমাণবিক অস্ত্রধারী এবং সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদক ও মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শক্তি। তিন দেশ মিলিয়ে প্রায় ১৪ লাখ সক্রিয় সামরিক সদস্য, ৩,৪০০ বিমান, ৬,০০০ ট্যাংক এবং ৩৪০টির বেশি নৌযান রয়েছে (আল জাযিরা, ১১ আগস্ট)। এসব বৈশিষ্ট্যের কারণে তিনটি শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্রের এই চুক্তিকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘মুসলিম ন্যাটো’ বলছে।

মক্কা চুক্তি কি আসলেই মুসলিম ন্যাটো? আমার কাছে এর জবাব হচ্ছে, না। প্রথমত, ন্যাটোকে শুধু সামরিক জোট মনে করলে এর মতাদর্শিক-রাজনৈতিক দিকটি বাদ পড়ে যায়। ন্যাটো স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গঠিত আমেরিকা ও ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর একটি নিরাপত্তা বলয়, যার লক্ষ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রসার রুখে দেওয়া। মূলত ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর ন্যাটোকে তৈরি করা হয়েছিল ইউরোপের মাটিতে আমেরিকার স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমেরিকার বৈশ্বিক প্রভাব বজায় রাখতে। সোভিয়েতের পতনের পর ন্যাটো মহাসচিব উইলি ক্লেইস একটি জার্মান পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ‘ইসলামী মৌলবাদ’কে ন্যাটোর সবচেয়ে বড় হুমকি বলে আখ্যায়িত করেছিলেন (শিকাগো ট্রিবিউন, ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৫)। আজ ন্যাটোতে মুসলিম দেশ মাত্র দুটিঃ তুরস্ক ও আলবেনিয়া। তুরস্ক ১৯৫২ সালে ন্যাটোর সদস্য হয়, যখন দেশটি ছিল পুরোপুরি পাশ্চাত্যমুখী। এছাড়া সোভিয়েতকে ভূমধ্যসাগরে আসা থেকে বিরত রাখতে তুরস্ককে সাথে রাখা পশ্চিমাদের প্রয়োজন ছিল। আর বিশ্বরাজনীতিতে আলবেনিয়ার গুরুত্ব নিতান্তই কম। মোদ্দাকথা হলো, ন্যাটো একটি আমেরিকা-চালিত সামরিক জোট, যার অলিখিত লক্ষ্য হচ্ছে বিশ্বরাজনীতিতে পশ্চিম গোলার্ধের স্বার্থ সুরক্ষা ও প্রভাব বহাল রাখা। পক্ষান্তরে, মক্কা চুক্তিকে মোটেও আদর্শিক বা ‘ইসলামী’ জোট ভাবার সুযোগ নেই। একজন সৌদি অফিসিয়াল ইতোমধ্যে বিষয়টি টুইট করে জানিয়েছেন। এমনকি এই জোট ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তিন দেশের প্রতিরক্ষা জোটও নয়। তাই কেবল ন্যাটো-স্টাইলের একটি অনুচ্ছেদ জুড়ে দিলেই কেউ ন্যাটো হয়ে যায় না।

তাইলে প্রশ্ন আসে, সৌদি, তুরস্ক ও পাকিস্তানের এই চুক্তি করার প্রয়োজন পড়ল কেন? এর জবাবও তিন দেশের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন, যা একটু বিস্তারিত আলাপের দাবি রাখে। প্রথমে আসি সৌদি প্রসঙ্গে। সৌদি যুবরাজ বিন সালমান তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। চাপ বহুমুখী। প্রথম চাপ আসছে আমেরিকা-ইসরায়েলের পক্ষ থেকে। আমেরিকা অবিরত সৌদিকে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক নরমালাইজ করার চাপ দিয়ে যাচ্ছে। বিন সালমান তাতে সানন্দে রাযী ছিলেন। কিন্তু বাগড়া বেধেছে হামাসের তুফানে আকসা ও ইসরায়েল কর্তৃক গাযায় গণহত্যা। এ অবস্থায় অন্তত দেখানোর মতো কোনো বিনিময় ব্যতীত সৌদি যদি ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক নরমালাইজ করে, তাহলে তারা মুসলিম বিশ্বের আস্থা হারিয়ে ফেলবে। বিন সালমান চাইছিলেন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি আদায়ের বিনিময়ে তিনি ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক নরমালাইজ করবেন এবং মুসলিম বিশ্বে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার মহানায়ক হিসেবে আবির্ভূত হবেন। কিন্তু ইসরায়েল বা আমেরিকা এই প্রস্তাবে পাত্তা দেয়নি। এজন্য সৌদি একপ্রকার থমকে আছে। দ্বিতীয় চাপ আসছে UAE তথা সংযুক্ত আরব আমিরাতের পক্ষ থেকে। সৌদি-আমিরাত সম্পর্কে সাম্প্রতিক টানাপোড়েন বেশ গভীর। প্রথমে দুই দেশ ইয়ামেনে হুথিদের ওপর একযোগে হামলা চালালেও পরে তাদের ইয়ামেন-নীতি পৃথক হয়ে যায়। সৌদি ইয়ামেনকে অখণ্ড রাখতে PLC সরকারকে সমর্থন জানায়। বিপরীতে আমিরাত দক্ষিণ ইয়ামানের STC-কে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে, যারা ইয়ামেনকে দ্বিখণ্ডিত করতে চায়। তবে ইয়ামেন-ইস্যু ছাড়িয়ে সৌদি-আমিরাতের মূল দ্বন্দ্ব হচ্ছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে কে আমেরিকার সবচেয়ে আপন হবে, তা নিয়ে। কারণ আমেরিকাই তাদের নিরাপত্তা, অঢেল সম্পদ ও রাজতন্ত্র রক্ষার ‘জামিনদার’। আপন দু’দেশই হতে চায়। তবে আমিরাতের কোনো পিছুটান নেই। মুসলিম উম্মাহ’র কাছে বিন যায়েদের কোনো জবাবদিহি নেই। নিজের স্বার্থ রক্ষার জন্য সুদানে RSF ও ইয়ামেনে STC-এর মতো শক্তিগুলোকে সামরিক সহায়তা দিতে বিন যায়েদ পিছপা হননি, যাদের কারণে সুদান ও ইয়ামেনে হাজারো মুসলমানের প্রাণ ঝরে গেছে। গাযায় চলমান গণহত্যার সময়ও আমিরাত ইসরায়েলকে সর্বোপরি সহযোগিতা করে যাচ্ছে। এমন নয় যে সৌদি বা আমিরাত ইসরায়েলকে পছন্দ করে। মূল কারণ হচ্ছে, ইসরায়েল হলো হোয়াইট হাউজ ও মার্কিন কংগ্রেসে ঢুকার প্রবেশপথ। আর, আমেরিকার রাজনীতি নিয়ে যাদের বিন্দুমাত্র ধারণা আছে তারা জানেন, ওয়াশিংটন ডিসির রাজনীতিতে AIPAC এর মতো ইসরায়েল-লবি কতটা প্রভাবশালী। তাই ইসরায়েল সন্তুষ্ট হলে আমেরিকাও সন্তুষ্ট। নিঃসন্দেহে আমিরাত এই দৌড়ে সৌদি থেকে এগিয়ে গেছে। তৃতীয় চাপ নিজের অর্থনীতির। পশ্চিমা বিনিয়োগকারীদের ভরসায় বিন সালমান সৌদিতে যেসব উচ্চাভিলাষী মেগাপ্রজেক্ট হাতে নিয়েছিলেন, বিনিয়োগের অভাবে প্রায় সবগুলোই থমকে গেছে। AGBI এর তথ্যানুযায়ী, সাম্প্রতিক যুদ্ধে সৌদি অর্থনীতি ৪.৮% সঙ্কুচিত হয়েছে। অবস্থা এমন যে, সৌদিকে এখন প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের ঋণ নিতে হচ্ছে (ব্লুমবার্গ, ৩১ আগস্ট)। চতুর্থ চাপ তৈরি হয়েছে আমেরিকা-ইসরায়েল কর্তৃক ইরানের ওপর আগ্রাসনের প্রেক্ষিতে। সাথে যুক্ত হয়েছে সৌদি-হুথি পালটাপালটি আক্রমণ। বিষয়টি খোলাসা করি। ইরান মধ্যপ্রাচ্যের সুন্নী রাষ্ট্রগুলোর জন্য হুমকি, এতে সন্দেহ নেই। সিরিয়া ও ইরাকে ইরান হাজার হাজার সুন্নী হত্যা করেছে। তাই ইরানের বিরুদ্ধে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা সৌদি প্রতিরক্ষানীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেই সাথে রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখা ও তেল বিক্রির গতি ধরে রাখার জন্যও সৌদির নিরাপত্তা প্রয়োজন। এই পর্যায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সৌদি কেন; দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই সৌদির প্রয়োজন এমন একটি ছাতা, যা তাকে সার্বক্ষণিক সর্বোচ্চ সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা করবে। এই প্রেক্ষিতে ১৯৭৪ সালে আমেরিকার সাথে সৌদির পেট্রো-ডলার চুক্তি হয়। খুব সরলভাবে বললে, এই চুক্তির ফলে সৌদি আন্তর্জাতিক বাজারে তার তেল ডলারের বিনিময়ে বিক্রি করতে এবং আমেরিকা সৌদির নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে সম্মত হয়। শুধু সৌদি নয়; উপসাগরীয় প্রতিটি আরব দেশ নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল। প্রসঙ্গত বলে রাখি, এই ‘নিরাপত্তা’ ব্যাপারটিও বেশ তর্কসাপেক্ষ। যেমন, ইসরায়েল কোনো আরব দেশে হামলা করলে আমেরিকা কখনও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ওই দেশকে নিরাপত্তা দেবে না। এই ‘নিরাপত্তা’ এজন্য, যেন ছোট ছোট ধনী আরব রাষ্ট্রগুলো একে অপরের ওপর হামলা না করে। তাই বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকান সেনারা মূলত ‘আর্মি’ নয়; পুলিশের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। কিন্তু বাগড়া বেধেছে এবারের ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ। আমেরিকা-ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোতে অনবরত হামলা চালিয়েছে। এসময় আরবরা আমেরিকার কাছ থেকে যে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা আশা করছিল, আমেরিকা তার সিকিভাগও দেয়নি। যেন ট্রাম্পের মনোভাব হচ্ছে, আমরা ঘরের খেয়ে ইসরায়েলের মোষ তাড়াতে পারি, কিন্তু আরবদের মোষ তাড়াব কোন দুঃখে? অথচ সৌদি এতদিন ধরে আমেরিকার কাছে ন্যাটো-স্টাইলের একটি নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চেয়ে আসছে। আমেরিকা তা করেনি। এখন সৌদি আবার হুথিদের সাথে লড়াইয়ে জড়িয়েছে। ২০২২ সালে হুথিদের সাথে সৌদির যুদ্ধবিরতি হয়েছিল। কিছুদিন আগে সানা বিমানবন্দরে সৌদি হামলার জবাবে এখন হুথিরা সৌদির দক্ষিণাঞ্চলে হামলা চালাচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালীর নিরাপত্তাও নড়ে গেছে। এই সমস্ত চাপের পরিপ্রেক্ষিতে বিন সালমানের সবচেয়ে বড় কষ্টের জায়গা হচ্ছে আমেরিকা। বিপদের সময় আমেরিকা পাশে দাঁড়ায়নি। তবে কষ্ট থাকলেও ট্রাম্পকে চোখ রাঙানোর ক্ষমতা বিন সালমানের নেই। মোটাদাগে এই হচ্ছে সৌদির বর্তমান পরিস্থিতির একটি চিত্র।

এবার আসি তুরস্ক প্রসঙ্গে। প্রথমত, গ্রিস ও সাইপ্রাসকে সাথে নিয়ে ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় ইসরায়েল নিজের বলয় শক্ত করছে, বিশেষত যেসব এলাকায় সাগরের নিচে বড় গ্যাসের মজুদ আছে। দ্বিতীয়ত, ঐতিহাসিকভাবে লোহিত সাগরে অটোমানদের নৌ-উপস্থিতি ছিল, যা আজ নেই। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক সামি হামদির মতে, এরদোয়ান চাচ্ছেন, লোহিত সাগরে নিজের নৌবাহিনী নিয়ে যাবেন। এমতাবস্থায় সৌদিকে নিরাপত্তা দেওয়ার প্রয়োজনে তিনি লোহিত সাগরে তুরস্কের নৌসেনা মোতায়েন করতে পারবেন। অর্থাৎ, তুরস্ক তার সামরিক সক্ষমতাকে সৌদির ভৌগোলিক সুবিধার সাথে মিলিয়ে ব্যবহার করতে চাচ্ছে। সামির মতে, এরকম একটি জোট করার প্রস্তাব সম্ভবত তুরস্ক দিয়ে আসছিল। বিন সালমান তাতে রাযী হননি, যেহেতু তিনি সৌদির ‘ইসলামী পরিচয়’ ঝেড়ে ফেলতে উৎসাহী ছিলেন। আজ বাধ্য হয়েই তিনি রাযী হয়েছেন। সেইসাথে চুক্তি স্বাক্ষরের স্থান হিসেবে তিনি রাজধানী রিয়াদের পরিবর্তে মক্কা শরীফকে বেছে নিয়েছেন, যাতে মক্কার দ্বীনী গুরুত্বকে কাজে লাগানো যায়। ছবিতে দেখা গেছে, আল-সাফা প্যালেসে বিন সালমান, এরদোয়ান ও শাহবাজ দাঁড়িয়ে আছেন। ঠিক পেছনে হারামের উঁচু মিনারাত দেখা যাচ্ছে। প্রতীকী (Symbolism) দিক থেকে দেখলে, এটি নিঃসন্দেহে একটি বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল ছিল।

এবার আসি পাকিস্তান প্রসঙ্গে। গতবছর ভারতীয় হামলার (অপারেশন সিঁদুর) শক্ত জবাব দিয়ে এবং চলতি বছর ইরান-আমেরিকার মধ্যস্ততা করে বিশ্বমঞ্চে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিয়ে যাওয়া পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন এখন অর্থ। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পাক ইকোনমিকে খারাপভাবে আঘাত করেছে। তবে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, পাকিস্তানের চাবিকাঠি কেবল সরকারের হাতে নয়। পাক ক্ষমতার মূল কলকাঠি সেনাবাহিনী, বা স্পষ্ট করে বললে সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের হাতে। আসিম হয়তো একসময় নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করবেন, যেভাবে মিসরের জেনারেল সিসি করেছেন। তবে পাকিস্তানের চলমান অর্থনৈতিক দৈন্যদশার মধ্যে তিনি নিজের কাঁধে দেশের পুরো দায়িত্ব নেবেন বলে মনে হয় না। তাই মক্কা চুক্তির ফলে যদি সৌদি ও তুরস্কের দ্বারা পাকিস্তানে অন্তত সামরিক সহায়তা আসে, তাইলে পাকিস্তানেরও লাভ; জেনারেল আসিমেরও লাভ। মোটকথা হচ্ছে, সৌদির অর্থ ও ভৌগোলিক সুবিধা আছে; প্রযুক্তি ও জনদক্ষতা নেই। তুরস্কের প্রযুক্তি ও জনদক্ষতা আছে; তবে কিছু ক্ষেত্রে ভৌগোলিক সুবিধা প্রয়োজন। অপরদিকে পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা আছে; প্রয়োজন অর্থ। এবার যার যা নেই, তা পূরণ করার চেষ্টা করছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আমেরিকা এই জোটকে কীভাবে নিচ্ছে? ট্রাম্প ইতোমধ্যেই মক্কা চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তার বার্তা পড়ে বুঝা যায়, তিনি এটিকে ইরানের বিরুদ্ধে জোট মনে করছেন এবং তিনি উৎফুল্ল যে, সৌদির নিরাপত্তার ভার আমেরিকার কাঁধ থেকে কিছুটা নেমেছে! এছাড়া এরদোয়ান, শাহবাজ ও আসিমের সাথে ট্রাম্পের সম্পর্ক বেশ উষ্ণ। তাই ট্রাম্প হয়তো এদেরকে সন্দেহ করার মতো কিছু পাননি।

আরেকটি কারণে আমি মক্কা চুক্তিকে ‘মুসলিম ন্যাটো’ মনে করি না। তা হচ্ছে, কেউ পরিষ্কার করে বলছে না যে, এই জোট কার বিরুদ্ধে গঠন করা হয়েছে। না এটি ইরানের বিরুদ্ধে, না ইসরায়েলের, না ভারতের, না অন্য কারও। পাক ও তুর্কি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটিকে কেবল ‘প্রতিরক্ষা কাঠামো’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এরকম অস্পষ্ট লক্ষ্যের একটি জোটকে কীভাবে ন্যাটোর সাথে তুলনা করা যায়? তাই আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশ্লেষক ড. ওযের উনলুহিসারচিক্লি এটিকে “ন্যাটোর সাথে তুলনীয় পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি নয়, বরং কৌশলগত সমন্বয়ের কাঠামো” বলে বর্ণনা করেছেন। তাইলে এই জোট কি একেবারে অর্থহীন? না, সেটি মোটেও বলছি না। উদ্দেশ্য ভালো হলে এই জোট এবং পরবর্তীতে স্বাক্ষরকারী অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোকে সাথে নিয়ে মুসলিম বিশ্বের বহু সমস্যা সমাধান করা সম্ভব বলে আমি মনে করি।

মক্কা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার এই জোটে যোগদানের ব্যাপারে আলাপ উঠেছে। বাংলাদেশ নিজের আগ্রহের কথা জানালেও মালয়েশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। যদিও মক্কা চুক্তি কোনো আদর্শিক মুসলিম জোট কিংবা ন্যাটো-স্টাইলের নিরাপত্তা বলয় নয়; এমনকি এর ভবিষ্যত সাফল্য নিয়েও সন্দিহান হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে; তবুও আমি মনে করি বাংলাদেশকে এই জোটে যোগদান করার ব্যাপারটি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত। প্রথমে বাংলাদেশকে খুব সতর্ক থাকা প্রয়োজন যে, এই জোট যেন মধ্যপ্রাচ্যের সুন্নী-শীআ দ্বন্দ্বের নতুন সংযোজন না হয়। কারণ বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনেক বিশ্লেষক এটিকে ‘ইরান-বিরোধী প্রতিরোধ’ হিসেবে দেখছেন। এমনটি হলে, বাংলাদেশকে নিজেকে সরিয়ে রাখা আবশ্যক। মধ্যপ্রাচ্যের স্বার্থবাদী ভূরাজনৈতিক লড়াইয়ে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ করার কোনো মানে নেই। এই সতর্কতা উচ্চারণ করার পর বলছি, আমি মনে করি, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া প্রমুখ রাষ্ট্রগুলো মক্কা চুক্তিতে স্বাক্ষর করলে এই জোটের প্রকৃত কার্যকারিতা প্রসারিত হবে। দুটি উদাহরণ দিচ্ছি। উদাহরণগুলোকে অধিক সরলীকরণ মনে হতে পারে; তবে এখানে এরচেয়ে গভীরে যাওয়ার সুযোগও নেই। প্রথমত, বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নাগরিকত্ব ও প্রত্যাবাসনের প্রশ্ন এখনও অমীমাংসিত। মিয়ানমার সরকার কিছু ব্যক্তিকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে যাচাই করলেও প্রত্যাবাসনের শর্ত এখনও সমাধান হয়নি। রাখাইন রাজ্যে মায়ানমার আর্মি স্থানীয় আরাকান আর্মির সাথে লড়াই করছে। তাদের মধ্যকার আলোচনায়ও বাংলাদেশ সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। এখানে বলে রাখা উচিত, রাখাইন রাজ্যে চীনের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক স্বার্থ জড়িত আছে। মালাক্কা প্রণালীকে পাশ কাটিয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি আমদানি করতে চীন বঙ্গোপসাগর থেকে মায়ানমার হয়ে পাইপলাইন স্থাপন করছে। যদিও মক্কা চুক্তির এখন পর্যন্ত নিজস্ব কোনো কূটনৈতিক ম্যাকানিজম নেই বা রোহিঙ্গা ইস্যু তাদের ম্যান্ডেটের মধ্যে নেই, তবে বাংলাদেশ চাইলে জোটের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর প্রভাবকে ব্যবহার করে এই নতুন প্লাটফর্মটিকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে একটি ‘সম্পূরক কূটনৈতিক চ্যানেল’ হিসেবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারে। আমার মতে, এটি হবে বাংলাদেশের সেরা সুযোগ। দ্বিতীয়ত, জোটের অন্যতম সদস্য তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি নিয়ে সহযোগিতার আলোচনা এগিয়েছে। আবার মক্কা চুক্তির আওতায় সৌদি, তুরস্ক ও পাকিস্তান প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা ও যৌথ প্রযুক্তি উৎপাদনের বিষয়ে সম্মত হয়েছে। ফলে বাংলাদেশ যদি তুরস্কের মাধ্যমে এই বৃহত্তর প্রতিরক্ষা-শিল্প সহযোগিতার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়, তাহলে তা বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে। সরকার নিশ্চয়ই বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে ভাবছে। এই লেখাটি কেবল পাঠকের জন্য, যারা মুসলিম বিশ্বের তিনটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের একত্রে এগিয়ে আসা দেখে উৎসাহ বোধ করছেন। শেষকথা এটিই যে, মক্কা চুক্তি এখনই ন্যাটো সমতূল্য নয়। তবে তার মানে এই নয় যে, এর কোনো গুরুত্ব নেই। বরং চাইলে এই জোট নিজেদের নিরাপত্তার পাশাপাশি অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রকে সাথে নিয়ে মুসলিম বিশ্বের বেশ কিছু সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা রাখে।

ফেইসবুকে আমরা...