১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্তির পর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ পুনরায় স্বাধীনতা অর্জন করলেও এর সামাজিক মনস্তত্ত্ব এবং রাজনৈতিক কাঠামো এখনো উত্তর উপনিবেশবাদী কাঠামোর মধ্যেই আবর্তিত হচ্ছে। প্রায় শত বছর পূর্বে উপনিবেশবাদের বাহ্যিক দফারফা হলেও দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসন শাসিত অঞ্চলের মানুষের মানস্পটে যে অবধারিত পরিবর্তন এবং ক্ষেত্রেবিশেষে যে পরোক্ষ আনুগত্যের জন্ম দিয়েছে তা-ই উত্তর উপনিবেশবাদের মূল চালিকা শক্তি। দক্ষিণ এশিয়ার সাধারণ জনগণের শারীরিক কাঠামো থেকে সামাজিক কাঠামো পর্যন্ত সর্বত্র ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের শোষনের দগদগে স্মৃতি সুস্পষ্ট হলেও এতদঞ্চলের শিক্ষিতজন তো বটেই, এমনকি প্রান্তিক জনতার বিপুল অংশের চিন্তায় এই বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে যে, ব্রিটিশ উপনিবেশ অত্যাচারী ছিলো ঠিক, কিন্তু তাদের শাসন এদেশের মানুষের উপকারও করেছে অনেক, তাদের শাসন এদেশকে সভ্যতা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে এগিয়ে যেতে সহায়তাও করেছে ঢের। উত্তর উপনিবেশবাদী সমাজের ব্যাপক অংশের কাছে উপনিবেশবাদের প্রতি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কৃতজ্ঞতা এতো বেশি যে, তারা নিজেদের থেকে শাসক রাষ্ট্রকে মহত্তর ভাবতে অভ্যস্ত তো হয়ই, একই সাথে এই অঞ্চল শাসন করতে উপনিবেশিক শক্তি যাদের সাহায্য নিয়েছে, যাদেরকে সহযোগিতা করে সমাজের অগ্রগামী অংশ হিসেবে “ব্র্যান্ডিং” করা হয়েছে তাদেরকেও সাধারণ জনতা নিজেদের থেকে মহত্তর ভাবার ভ্রমজালে আবদ্ধ থাকে। ব্রিটিশদের দ্বারা দক্ষিণ এশিয় সমাজের উপর আরোপিত এই অগ্রগামী গোষ্ঠী ছিলেন ব্রাহ্মণ্যবাদী বর্ণ হিন্দুরা, যাদেরকে প্রভুজ্ঞান করা, যাদের তথাকথিত করুণার কথা প্রান্তিকজনকে স্মরণ করিয়া দেওয়া আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের চালকরা নিজেদের জন্য অত্যাবশ্যক করে নিয়েছেন। এটিই উত্তর উপনিবেশবাদী ঘূর্ণাবর্ত।
যে বিষয়গুলোকে সামনে রেখে বাংলার উত্তর উপনিবেশবাদী কাঠামো ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী শক্তি ও তাদের সহযোগী শক্তি ব্রাহ্মণ্যবাদী বর্ণ হিন্দুদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ছড়ানোর চেষ্টা করে তার মধ্যে অন্যতম হলো শিক্ষাবিষয়ক আলাপ। বাংলাদেশে চলমান যেকোন ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনার সূচনাবিন্দু হিসেবে লেখক ও গবেষকরা কলকাতা আলিয়া মাদরাসা, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, হিন্দু কলেজ এবং দেওবন্দ মাদরাসা এই চারটিকেই সাধারণত গ্রহণ করেন। ফলে বর্তমানে প্রচলিত সকল শিক্ষা ব্যবস্থা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময় থেকেই শুরু হয়েছে এরকম একটি পরোক্ষ ঐকমত্যের সুর সর্বত্র পরিলক্ষিত হয়। এই বিভ্রান্তিকর ঐকমত্যের সুরের ফলে এই জাতির উপর যে বিপজ্জনক বিশ্বাস আরোপিত হয়েছে তা হলো- ব্রিটিশরা যাই করুক না কেন, বাংলা তথা দক্ষিণ এশিয়ায় সকল ধরণের তথাকথিত আধুনিক শিক্ষার বুনিয়াদ বা ভিত্তি ব্রিটিশরাই স্থাপন করেছে; ব্রিটিশদের আগমন না হলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা হয়তো সেকেলেই থেকে যেতো। আরো বিপজ্জনক বিশ্বাস হলো বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা যতই ত্রুটিপূর্ণ হোক না কেন, মুসলমানরা এর থেকে উন্নততর স্বতন্ত্র শিক্ষাপদ্ধতির সূচনা করতে পারেনি বলেই ব্রিটিশদের দ্বারা প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতি এবং ব্রিটিশদের প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতির প্রতিক্রিয়ায় প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থাই আজ এই জনপদের শিক্ষা ব্যবস্থার সর্বাংশ জুড়ে বিরাজমান। এসব বিভ্রান্তিকর ও অমূলক বিশ্বাস এই জাতির মনস্তত্ত্বে স্থায়ীভাবে স্থান করে নিয়েছে মূলত প্রাক ঔপনিবেশিক কাল তথা ব্রিটিশদের আগমনের পূর্বে বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিহাস চর্চায় ব্যাপক শূন্যতার কারণে। যেহেতু বর্তমানে প্রচলিত প্রায় সকল প্রকার শিক্ষা পদ্ধতির সূচনা কোন না কোনভাবে ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই, তাই এর পূর্বে তথা ত্রয়োদশ শতক থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত মুসলমানদের শাসনামলে বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থা যে ঈর্ষণীয় রকমের সফল ছিলো এবং দুনিয়ার যেকোন প্রান্তের তুলনায় ক্ষেত্রবিশেষে অগ্রগামী ছিলো, এই সত্য আজকাল উচ্চারণ করলেও বহু মুসলমানের কাছে এখনও এগুলা অত্যুক্তি এবং অতীত ইতিহাস নিয়ে রোমান্টিসিজম বলে প্রতীয়মান হয়।
বাংলায় মুসলমানদের শাসনামলে শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে অল্পবিস্তর যা-ই আলোচনা হয় তার মূল বক্তব্য থাকে এরকম যে, মুসলিম শাসনামলে শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিলো মসজিদ এবং সূফীদের খানকাহ। আপাতদৃষ্টিতে এই কথার মধ্যে কোন ভুল নেই। কিন্তু এই জাতির উত্তর উপনিবেশবাদী মনন যে মসজিদ ও খানকাহ ভিত্তিক শিক্ষাপদ্ধতি বলতে কেবলই মক্তব ও ধর্মীয় শিক্ষাকে বুঝে, মুসলমানী আমলের মসজিদ ও খানকাহভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা যে এর থেকে ভিন্নতর ছিলো এ বিষয়ে প্রায় তেমন আলোচনাই পরিলক্ষিত হয় না। মুসলমানদের শাসনকালে শিক্ষাব্যবস্থা মসজিদকেন্দ্রিক ছিলো এই আলাপের ফলে অবচেতনভাবে আরো একটি চিন্তা অনেকের মনে প্রোথিত হয়েছে যে, হয়তো সেসময় স্বতন্ত্র কোন বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাংলায় গড়ে ওঠেনি, যা নিতান্তই ভুল ধারণা। বস্তুত, খিলজীর বাংলা বিজয়ের পর থেকে ব্রিটিশদের আগমন পর্যন্ত সময়কালে বাংলার প্রাথমিক শিক্ষা তথা বুনিয়াদী শিক্ষার কেন্দ্র ছিলো মসজিদ এবং আউলিয়ায়ে কিরামের খানকাহ। এর পাশাপাশি বাংলার নানা প্রান্তে বড় বড় মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যেগুলোর ক্যারিকুলাম বর্তমান মাদরাসা শিক্ষার মতো এককভাবে ইসলাম শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে স্বর্ণযুগের বাগদাদ, কূফার শিক্ষা ব্যবস্থার মতো তাফসীর, হাদীস, ফিকহের পাশাপাশি দর্শন, রসায়ন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত, তর্কশাস্ত্র, চিকিৎসাবিজ্ঞান ইত্যাদি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। মুসলমানদের প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতির মূলোৎপাটন করে ব্রিটিশরা ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের মাধ্যমে যে নবতর শিক্ষার সূচনা করেছিল তা যে কোনোভাবেই পূর্বের ব্যবস্থা থেকে উন্নততর ছিলো না, বরং বহুলাংশে মুসলমানদেরকে মূল ধারা থেকে ছুড়ে ফেলার মানসে এক ধরণের ভাষা ও জ্ঞানতাত্ত্বিক ক্রুসেড ছিলো, তা বর্তমান সময় আলোচনার দাবি রাখে।
আলোচনার শুরুতেই উল্লিখিত হয়েছিল- উত্তর ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্বের একটি বিপজ্জনক দিক হলো এই মনস্তত্ত্ব যারা লালন করেন তারা ঔপনিবেশিক শাসকদেরকে নিজেদের থেকে মহত্তর তো মনে করেনই, উপরন্তু একই জনপদে বসবাসকারী কিন্তু ঔপনিবেশিক প্রভুদের সহায়ক শক্তিকেও তারা নিজেদের থেকে শ্রেষ্ঠতর ভাবার বিভ্রান্তি থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করতে পারেন না। বাংলার শিক্ষাব্যবস্থায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের সহযোগী ব্রাহ্মণ্যবাদী বর্ণ হিন্দুদের প্রতি এমনই একটি ধারণা আজও আমাদের সমাজের নানা বর্গের মানুষের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে বলে স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। বাংলাদেশে শতাব্দী প্রাচীন যেসব স্কুল এবং কলেজ রয়েছে এর অনেকগুলোর প্রতিষ্ঠার সাথে ব্রিটিশদের পাশাপাশি অনেক হিন্দু জমিদার শ্রেণির নামও বিপুলভাবে উচ্চারিত হয়। পুরনো কলেজ ও উচ্চবিদ্যালয়ের নামের মধ্যে সেসব হিন্দু জমিদার ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের নাম এখনো মওজুদ রয়েছে। জগন্নাথ কলেজ, এমসি কলেজ, ব্রজমোহন কলেজ, আনন্দমোহন কলেজ ইত্যাদি বহু নাম! এইসব নামকে স্মরণ করিয়ে আজকাল বহু ব্রাহ্মণ্যবাদের অনেক সাংস্কৃতিক প্রজাকে বাংলার মুসলমানকে “খোটা” দিতে দেখা যায় যে, “বাংলার আনাচেকানাচে শিক্ষাবিস্তার হিন্দুরাই করেছে, হিন্দু জমিদাররা না থাকলে তোমরা আজো চাষাভুষা থাকতা”। ব্রিটিশদের সহযোগী কলকাতার বর্ণ হিন্দুদের সাংস্কৃতিক প্রজা এসব আরোপিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণির খোটা শুনে বাংলার মুসলমানের মনেও এক রকমের হীনমন্যতার জন্ম হওয়া অস্বাভাবিক নয়। সত্যিই তো চারপাশের বিদ্যালয়সমূহে কত শত হিন্দুজনের নাম, তারা ছাড়া কোথায় থাকতো মুসলিম চাষাভুষার ছেলেরা?
এই চিন্তা ততক্ষণ পর্যন্ত বাংলার মুসলমানের মনে জগদ্দল পাথরের মত চেপে থাকবে যতক্ষণ না সে জানবে যে ব্রিটিশরা এই তথাকথিত আধুনিক শিক্ষাধারার সূচনাকালে মুসলিম শাসকদের যে শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করেছিল তা কোন অংশেই বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে কম উন্নত ছিলো না। বাংলার মুসলমানের পূর্বপুরুষরা ব্রিটিশ আর বর্ণ হিন্দুদের “দয়ায়” শিক্ষিত হয়েছে এই ভাবনা ততক্ষণ এতদঞ্চলের মুসলমানের মন থেকে মুছবে না যতক্ষণ না সে বিশ্বাস করবে যে, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ আর হিন্দু কলেজের লিগ্যাসে এই জনপদে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সোনারগাঁতে শাইখ শরফুদ্দীন আবূ তাওয়ামার বিশ্ববিখ্যাত দরসগাহ কিংবা গৌড়ের বিখ্যাত দরাসবাড়ি মাদরাসাসহ বাঘা, লক্ষ্ণৌতি, মহিসন্তোষের দরসগাসমূহের লিগ্যাসির ধ্বংসাবশেষের উপরে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দ্বারা বাংলার দেওয়ানী হস্তগত করার পাশাপাশি, মীর জাফর কর্তৃক লাখ লাখ মুসলিম সেনাদের চাকুরিচ্যুত করার ফলে ব্রিটিশ শাসনের শুরুতেই ইসলামী শিক্ষালয়সমূহ যে অর্থনৈতিক সংকটে পতিত হয়েছিল তা প্রকটতর হয়ে ওঠে ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে অসংখ্য মুসলিম জমিদারের জমিদারি হারানোর মাধ্যমে। এরপরে ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড লাখেরাজ বা নিষ্কর জমি বাজেয়াপ্ত করার মাধ্যমে ইংরেজরা মুসলমানী যুগের শিক্ষাব্যবস্থা চিরতরে নির্মূলে বন্দোবস্ত করে, যার শেষ হয় ১৮৩৫ সালে শিক্ষাব্যবস্থায় ফারসীর পরিবর্তে ইংরেজি চালু করার মাধ্যমে। একই সময়ে চালু করা ইংরেজদের প্রতিষ্ঠানসহ এবং এর কয়েক দশক পরে হিন্দু জমিদারদের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহ এদেশের মানুষকে পূর্বের শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প ইংরেজদের পছন্দসই ব্যবস্থা দিয়েছে মাত্র, এই ব্যবস্থা না থাকলে বাংলার মানুষ তথা বাংলার মুসলমান চাষাভুষা থাকতো এই কথার ন্যূনতম কোন ঐতিহাসিক কোন ভিত্তি নেই। এ বিষয়ে ব্রিটিশ ঐতিহাসিক উইলিয়াম হান্টার তার ঞযব ওহফরধহ গঁংধষসধহং গ্রন্থে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার স্বরাষ্ট্র বিভাগের সচিব ই.সি. বেইলি-কে উদ্ধৃত করেন। বেইলি বাংলার মুসলমানের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে বলেন- “তাদের শিক্ষাব্যবস্থা উচ্চমাত্রার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশিক্ষণ ও মননশীলতা অর্জনে সক্ষম ছিলো, যে ব্যবস্থা আমরা লুপ্ত করে দিয়েছি।… ভারতে প্রচলিত অন্য যেকোন শিক্ষাব্যবস্থার তুলনায় এটি বহুগুণ শ্রেষ্ঠতর ছিলো। এই শিক্ষাব্যবস্থা তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক এবং বস্তুগত শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত করেছিল”। মি. বেইলির এই বক্তব্য থেকে বুঝা যায় ব্রিটিশদের চালু করা ক্যারিকুলামের উপর ভিত্তি করে বর্ণ হিন্দু জমিদাররা যে কয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাংলায় গড়ে তুলেছিলেন এগুলো না থাকলেও বাংলার মুসলমান চাষাভুষা থাকতো না, বরং বাংলার মুসলমান আগে থেকেই নিজেদের উন্নততর শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে এতদঞ্চলের অন্যদের থেকে (অর্থাৎ হিন্দুদের থেকেও) শ্রেষ্ঠতর ছিলো।
ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসকদের বর্ণ হিন্দু সহযোগীদের বাংলাদেশি প্রজারা প্রায়ই যে ব্রিটিশরা না আসলে আর হিন্দু জমিদাররা না থাকলে বাংলার মুসলমানদের চাষাভুষা থাকতো বলে খোটা দেন এর অন্য একটা চমৎকার উৎস সম্ভবত রিচার্ড এম. ইটনের ঞযব জরংব ড়ভ ওংষধস ধহফ ঃযব ইবহমধষ ঋৎড়হঃরবৎ, ১২০৪ু১৭৬০ গ্রন্থটি। ইটন এই বইয়ে বাংলায় ইসলাম প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অত্যন্ত চমৎকার একটি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন যা নানাভাবে প্রশংসিত। কিন্তু বাংলায় সূফীরা কেবল কৃষকদের কৃষিকাজকে সহজ করে ইসলাম প্রচার করেছেন এবং কেবল বুনিয়াদী ইসলাম শিক্ষা দিয়েছেন এটি সূফীদের নানা আঙিকের ইসলাম প্রচারের একটি ধরণ হলেও এটিকেই বাংলায় ইসলাম প্রচারের সর্বাংশ ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। সূফীরা বাংলায় কৃষি জমি আবাদে সেচের ব্যবস্থা করেছেন, সুপেয় পানির ব্যবস্থা করেছেন, আরব বণিকরা এদেশের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে আর্থ-সামাজিক সম্পর্ক গভীর করেছেন, আবার গৌড় গোবিন্দ কিংবা লক্ষণ সেনদের বিরুদ্ধে শাহজালাল আর বখতিয়ার খিলজিরা তলোয়ার নিয়ে এসেছেন। সূফীদের কল্যাণমূলক কার্যক্রম, আরব বণিকদের অর্থনৈতিক কার্যক্রম আর মুসলিম বীরদের বিজয়াভিজানে বিজিত এই বাংলা তথা ভারতে মুসলমানরা কখনোই কেবলই “চাষাভুষা” ছিলো না, ছিলো এই জনপদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মূল চালক।
[বাংলার মুসলমানের শিক্ষাব্যবস্থার গৌরবময় অতীত, ব্রিটিশ উপনিবেশের আরোপিত ক্যারিকুলামের সাথে দ্বন্দ্ব এবং শেষ পর্যন্ত তাদের আরোপিত ব্যবস্থাই বর্তমানের মূলধারা হয়ে ওঠার এই ঐতিহাসিক ক্রমধারা বিশ্লেষণের মাঝে লুকিয়ে আছে পৌত্তলিক ও মুশরিকদের সাথে মুসলমানদের শত বছরের সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও মূল্যবোধের লড়াইয়ের সুদীর্ঘ যাত্রার ইতিহাস। শিক্ষাব্যবস্থার ক্রমবিবর্তনের বিশ্লেষণ নিয়ে ধারাবাহিক এই আলোচনা চলমান থাকবে।]

