Logo
আল কুদস পুনরুদ্ধার : এক ঐতিহাসিক অভিযাত্রা
কাজী আবরার দস্তগীর
  • ৭ অক্টোবর, ২০২৬

আল-কুদস শহরের ইতিহাস প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরনো। প্রাসঙ্গিকতার স্বার্থে আমরা আরম্ভ করছি ৬২১ খ্রিস্টাব্দ থেকে। পবিত্র নগরী আল-কুদসকে কেন্দ্র করে সংগঠিত হয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এক মুজিযা আল ইসরা এবং মিরাজ, এসম্পর্কে কুরআনুল কারীমে বর্ণিত হয়েছে-

سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا ۚ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ

৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দ মুতাবিক ১৬ হিজরী সনে উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আল-কুদস শহরে প্রবেশ করেন। তৎকালীন অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের প্রধান ধর্মযাজক পেট্রিয়ার্ক সফ্রোনিয়াস উমর (রা.)-এর কাছে জেরুসালেম শহরের চাবি হস্তান্তর করেন। এরপর উমর (রা.) ঈসায়ীদের সাথে একটি চুক্তি করেন, যা العهدة العمرية বা উমারী চুক্তি হিসেবে ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। উমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সময়কালে আল কুদস নগরী মুসলমানদের শাসনাধীন চলে আসার পর থেকে উমাইয়া এবং আব্বাসী খিলাফত আমলেও তা যথাযথভাবে মুসলিম শাসকদের অধীনে সংরক্ষিত থাকে।

১০৯৫ (৪৮৮ হিজরী) সালে পোপ দ্বিতীয় আরবান ফ্রান্সে ক্রুসেড যুদ্ধের আহ্বান করে, পিটার নামক এক ক্যাথলিক ধর্মযাজক ইউরোপজুড়ে পোপ দ্বিতীয় আরবানের আহ্বান ছড়িয়ে দিলে সাধারণ খ্রিস্টান মানুষদের মধ্যে এক অসাধারণ বিপ্লব তৈরি করতে সক্ষম হয়, যার প্রভাব পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় ক্যাথলিক শাসক এবং অভিজাত শ্রেণির মধ্যেও পড়ে। এমনকি ১০৯৯ সালের মধ্যেই ক্রুসেডাররা আল-কুদস শহর দখল করে। পরবর্তী সময়ে সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ূবী (র.) ১১৮৭ সালে ক্রুসেডারদের থেকে বাইতুল মাকদিস পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হন। সালাহউদ্দীন আইয়ূবী (র.)-এর ওফাতের কিছুকাল পরে সিসিলিল রাজা ফ্রেডরিকের সময়কালে ক্রুসেডাররা জেরুসালেমকে পুনরায় দখল করে এবং দখলের ১১ বছর পর সুলতান নাজমউদ্দীন সালিহ আইয়ূব ১২৪৪ খ্রিস্টাব্দ মুতাবিক ৬৪২ হিজরী সালে তা পুনরুদ্ধার করেন। এরপর থেকে আল-কুদস শহর বিভিন্ন সময়কালে ধারাবাহিকভাবে আইয়ূবী, মামলুক এবং উসমানী মুসলিম শাসকগণের অধীনে সংরক্ষিত ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে ইংরেজরা ১৯১৭ সালে আল-কুদস শহর দখল করে, যা ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এরপর ১৯৪৮ সালের মে মাসে দখলদার ইসরাঈল রাষ্ট্রের ঘোষণা করা হয়। (দীর্ঘসূত্রতার জন্য এসময়ের পরবর্তীকালীন ইতিহাস পরিত্যাগ করা হলো)

এই প্রবন্ধ লেখার সময় আমি আল-কুদসকে সকল কিছুর মধ্যখানে রেখে চিন্তা-ভাবনা করেছি। (এজন্য কোনো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জীবনের ততটুকুই আনা হয়েছে যতটুকু আল-কুদসের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত) তাই আমরা এখন দেখব কীভাবে ক্রুসেডাররা উমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর আমানত মুসলিম উম্মার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিল।

আগেই বলেছি ক্রুসেড যুদ্ধ শুরু করে পোপ দ্বিতীয় আরবান এবং পবিত্র ভূমি জেরুসালেম দখলের এই আহ্বানে সবার প্রথম যারা সাড়া দেয় তারা হলো ইউরোপের সাধারণ ক্যাথলিক জনগোষ্ঠী, পরবর্তীতে তাদের সাথে ইউরোপের ক্যাথলিক শাসক এবং অভিজাত শ্রেণি যুক্ত হয়। ক্রুসেডারদের এই অভিযানে দুঃখজনকভাবে সহযোগী ভূমিকা পালন করে তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের উলামা, শাসক এবং সাধারণ জনগোষ্ঠীর গাফিলতি! সে সময় সমগ্র মুসলিম বিশ্ব যেন এক অদ্ভুত গাফিলতিতে ডুবেছিল। ঐ সময়কার চিত্র লিখে সময় নষ্ট করতে চাই না, পাঠকমহল আজকের মুসলিম বিশ্বের দিকে তাকালেই তা সহজে উপলব্ধি করতে পারবেন।

৪৯২ হিজরী মুতাবিক ১০৯৯ সালে ক্রুসেডররা যখন বাইতুল মাকদিস দখল করলো তখন হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাযালী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির বয়স ৪২ বছর। তিনি সামসময়িক মুসলিম বিশ্বের অবস্থা উপলব্ধি করতে পেরে দীর্ঘমেয়াদী দুইটি কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করেন। প্রথম পদ্ধতি হলো: নিজের নফসকে ইসলাহ করা, কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন-

إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ

-নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে। (সূরা রাআদ, আয়াত: ১১)

দ্বিতীয় পদ্ধতি হলো: নিজেকে ইসলাহ করার পর অন্যকে ইসলাহ করার জন্য তরবিয়ত দেওয়া, এসম্পর্কে কুরআনে পাকে বর্ণিত হয়েছে-

وَاتَّقُوا فِتْنَةً لَا تُصِيبَنَّ الَّذِينَ ظَلَمُوا مِنكُمْ خَاصَّةً ۖ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ

-তোমরা এমন ফিতনা (বিপর্যয়) থেকে বেঁচে থাকো, যা তোমাদের মধ্যে যারা যুলম করেছে, শুধু তাদের ওপরই আপতিত হবে না; আর জেনে রাখো, নিশ্চয়ই আল্লাহ শাস্তিদানে অত্যন্ত কঠোর। (সূরা আনফাল, আয়াত: ২৫)

وَمَا كَانَ رَبُّكَ لِيُهْلِكَ الْقُرَىٰ بِظُلْمٍ وَأَهْلُهَا مُصْلِحُونَ

-আর আপনার প্রতিপালক এমন নন যে, তিনি জনপদসমূহকে অন্যায়ভাবে ধ্বংস করবেন, যখন তার অধিবাসীরা সংশোধনকারী (সৎকর্মশীল)। (সূরা হূদ, আয়াত: ১১৭)

এই উভয় প্রকার ইসলাহ করার জন্য ইমাম গাযালী রাহমতুল্লাহি আলাইহি ইলমী বিপ্লবকে সামনে রেখেছেন। তিনি উন্মার জন্য লিখেছেন  “ইয়াহইয়াউ উলূমিদ্দীন”।

হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাযালী (র.) ৫০৫ হিজরীতে ওফাতের পূর্বে মুসলিম উম্মাহর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তরবিয়ত করে তার জীবনের বড় একটা অংশ অতিবাহিত করেছেন বাগদাদের নিযামুল মুলক-এর প্রতিষ্ঠিত মাদরাসায়ে নিযামিয়ায়। শাইখ আব্দুল কাদির জিলানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি 488 হিজরীতে যখন বাগদাদে আগমন করেন, সে সময় শাইখ আব্দুল কাদির জিলানী ছিলেন যুবক। তার বয়স ছিল ১৮ বছর। শাইখ জিলানী (র.) বাগদাদ আগমনের পর থেকে ইমাম গাযালীর ওফাতের আগ পর্যন্ত তিনি তার সুহবতকে নিজের জন্য আবশ্যক করে নেন। শাইখ আব্দুল কাদির জিলানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ইমাম গাযালীর পদাঙ্ক অনুসরণ করে ইসলাহী কাজ করতে থাকেন। এমনকি সুলতান নূরুদ্দীন জঙ্গী (র.) এবং তার অধিকাংশ আমির, মুশির এবং সামরিক ব্যক্তিত্ব এই দুই ইমামের তরবিয়তে প্রভাবিত ছিলেন।  আব্দুল কাদির জিলানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি মানুষকে তরবিয়ত দেওয়ার পাশাপাশি ৫৪৪ থেকে ৫৪৫ হিজরী সনের মধ্যে উম্মাগর জন্য লিখেন-“আল ফাতাহ আর রব্বানী”।

সুলতান নূরুদ্দীন জঙ্গীরাহমাতুল্লাহি আলাইহি হলেন সুলতান ইমাদ উদ্দীন-এর সুযোগ্য সন্তান। ক্রুসেডারদের থেকে বাইতুল মাকদিস উদ্ধার করার চেষ্টা আরম্ভ হয় ইমাদ উদ্দীন জঙ্গির পূর্বে ইরাকের মসুল নগরী থেকে। এই সামরিক অভিযান আরম্ভ করেন মাওদুদ। অতঃপর মসুলের সুলতান আল বুরসুকী, তিনি ছিলেন একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক। সুলতান আল বুরসুকীই প্রথম মসুল এবং আলেপ্পোর বিস্তৃত এলাকাকে একত্রিত করেন। সুলতান আল-বুরসুকী এবং মাউদুদ উভয় অভিযানে বের হয়েছিলেন আলেপ্পোর কাজী আল-খাশশাবের আহ্বানে। মাওদুদ, সুলতান আল-বুরসুকী এবং কাযী আল-খাশশাব এবং পরবর্তীতে সুলতান ইমাদউদ্দীন তারা সকলেই ধারাবাহিকভাবে হাশাশিনদের হাতে গুপ্ত হত্যার শিকার হয়ে শাহাদাতবরণ করেন। সুলতান আল-বুরসুকীর শাহাদাতের পর মসুলের কাযীর পরামর্শে আল-বুরসুকীর ছেলের পরিবর্তে ইমাদউদ্দীন জঙ্গী রাহমাতুল্লাহি আলাইহিকে মসুল এবং আলেপ্পোর বিস্তৃত এলাকার সুলতান হিসেবে গ্রহণ করা হয়। ইমাদউদ্দীন শক্ত হাতে নিজের এলাকায় ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেন এবং তিনিই সর্বপ্রথম ব্যক্তি যিনি ক্রুসেডারদের দখলকৃত নগরী এডেসা বিজয় করেন। ইমাদউদ্দীন জঙ্গী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির শাহাদাতের পর তার ছেলে নূরউদ্দীন জঙ্গী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি সালতানাতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ইবন আসির তার ইতিহাসের বইয়ে নূরউদ্দীন জঙ্গী সম্পর্কে লিখেছেন, খুলাফায়ে রাশিদীন এবং উমর ইবন আব্দুল আযীয (র.)-এর পর সবচেয়ে ন্যায়পরায়ণ শাসক ছিলেন নূরউদ্দীন মাহমুদ জঙ্গী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি। তিনি ছিলেন হানাফী মাযহাবের একজন ফকীহ এবং একজন মুহাদ্দিস। “কিতাবুল জিহাদ” নামে একটি হাদীসের বইও তিনি লিখেছিলেন। সুলতান ইমাদউদ্দীনের  শাহাদাতের পর ক্রুসেডাররা আর্মেনীয় খ্রিস্টানদের সহযোগিতায় এডেসা পুনরায় দখল করে, নূরউদ্দীন রাহমাতুল্লাহি আলাইহি সুলতান হওয়ার সাথে সাথেই এডেসা বা আল-রূহা নগরী ক্রুসেডারদের থেকে পুনরুদ্ধার করেন। তিনি তার সালতানাতে অনেক দরসগাহ এবং কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। সুলতান নূরউদ্দীন নিজের জন্য রাষ্ট্রের সর্বনিম্ন ভাতা নির্ধারণ করেন । বর্ণিত আছে, তার কাছে একবার বর্ণনা করা হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কীভাবে তলোয়ার ব্যবহার করতেন। দেখা গেলো পরের দিন সুলতান নির্দেশনা জারি করেন যেন সকল আমির-উমরা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিবর্গ যেন হাদীসের বর্ণনানুযায়ী তলোয়ার ব্যবহার করেন।

সুলতান ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু। তিনি তার সালতানাতে সব রকমের যুলমের মূলোৎপাটন করে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেন। এমনকি তার কাছে একবার সালতানাতের ট্যাক্স বা কর সম্পর্কে অভিযোগ করা হলো যে এটা যুলম, এটা আল্লাহর শরীআহ বহির্ভূত। তিনি এই অভিযোগের ভিত্তিতে জঙ্গি সালতানাতের সকল রাষ্ট্রীয় কর মওকুফ করে দিলেন। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন দারুল আদল; যেখানে প্রতি সোমবারে তিনি নিজে বসতেন এবং সাধারণ মানুষ তার সাথে দেখা করে তার গভর্নরদের সম্পর্কে অভিযোগ দিতে পারতো। তিনি ছিলেন একজন দ্বীনদার ব্যক্তিত্ব। প্রতি সোম এবং বৃহস্পতিবারে রোযা রাখতেন।

নূরউদ্দীন জঙ্গি এক পর্যায়ে দিমাশকের উলামা এবং জনসাধারণের সমর্থন লাভ করেন যার ফলে তিনি বিনা রক্তপাতে দিমাশককে নিজের সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত করেন এবং তিনিই প্রথম সমগ্র শাম অঞ্চলকে এক করতে সক্ষম হন। সসুলতানের শাসনামলে মিশর ছিল ফাতিমী খিলাফতের অধীনে এবং সে সময়কার মিশরের রাজনৈতিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত অস্থিতিশীল। অবস্থা উপলব্ধি করে সে সময় সুলতান তার নির্ভরযোগ্য সামরিক ব্যক্তিত্ব শেরকুহ-কে মিশর অভিযানে প্রেরণ করেন । শেরকুহ-এর নেতৃত্বে মোট তিনবার মিশরে অভিযান পরিচালিত হয় এবং এই তিন অভিযানেই শেরকুহর সঙ্গী ছিলেন ফকীহ ঈসা আল-হিকারী এবং তার নিজ ভাতিজা ইউসুফ। তৃতীয় অভিযানে শেরকুহ কাইরো বিজয় করতে সক্ষম হন এবং মিশরের উযীর হিসেবে দুই মাস দায়িত্ব পালন করার পর ইন্তিকাল করেন। শেরকুহর ওফাতের পর তার ভাতিজা ইউসুফকে মিশরের উযীর হিসেবে নির্বাচন করা হয়। এই ইউসুফই হলেন ইতিহাস বিখ্যাত সালাহউদ্দীন আইয়ূবী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি। উযীর হওয়ার পর তাকে ফকীহ ঈসা আল-হিকারী সার্বিকভাবে সহযোগিতা এবং সমর্থন করেন।

সালাহউদ্দীন আইয়ূবী (র.) একজন  ন্যায়পরায়ণ এবং দয়ালু শাসক হিসেবে মিশরে নূরউদ্দীন জঙ্গী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির প্রতিনিধিত্ব করতে থাকেন। তিনি মিশরে বিভিন্ন দরসগাহ এবং কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন যা ছিল নূরউদ্দীন জঙ্গী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির শাসন ব্যবস্থার অনুরূপ। ৫৬৭ হিজরী সালের এক জুমুআবারে সালাহউদ্দীন আইয়ূবী সুলতান নূরউদ্দীন-এর নির্দেশনায় ফাতিমী খিলাফতের বিলুপ্তি ঘোষনা করে আব্বাসী খিলাফতের নামে খুতবা পাঠের নির্দেশনা দেন। এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি সকল প্রকারের রাষ্ট্রীয় কর মওকুফ করেন এবং মিশরকে সার্বিকভাবে পুনর্গঠন করেন। তিনি দারুদ-দিয়াফা নামক সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে হজ যাত্রীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে মেহমানদারী করা হতো। সালাহউদ্দীন আইয়ূবীর মিশর শাসনামলে তিনি বিভিন্ন মানুষের দ্বারা সহযোগিতা লাভ করেন, তাদের মধ্য থেকে কতকের নাম উল্লেখ করা হলো- শাইখ আব্দুল কাদির জিলানী (র.)-এর ছাত্র ইবন নাজাহ, মিশরের বিখ্যাত কাযী আল-ফাদিল,ফকীহ ঈসা আল-হিকারী, তার ভাই মালিক আল-আদিল, তার ভাতিজা তকীউদ্দীন, তার নৌবাহিনীর কমান্ডার হুসামউদ্দীন লু’লু এবং তার প্রকৌশলী বাহাউদ্দীন কারাকুশ যিনি ইস্কান্দারিয়াসহ বিভিন্ন শহরকে বিভিন্ন দুর্গ এবং স্থাপনার মাধ্যমে ক্রুসেডারদের জন্য দুর্ভেদ্য নগরীতে পরিণত করেন।

মিশর বিজয়ের পর সুলতান নূরউদ্দীন আল-কুদস বিজয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং আল-আকসা মসজিদে স্থাপনের জন্য একটি মিম্বর তৈরি করেন। কিন্তু ৫৬৯ হিজরী সালে এই  ন্যায়পরায়ন সুলতান নূরউদ্দীন জঙ্গি ইন্তিকাল করেন। তার ওফাতের কিছু সময় পর সালাহউদ্দীন রাহমাতুল্লাহি আলাইহি দিমাশকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সুলতান সালাহউদ্দীন দিমাশকের দায়িত্ব গ্রহণের কিছুকাল পর আর্নল্ড ইতিহাসে প্রথমবারের মতো লোহিত সাগর ব্যবহার করে মদীনা শরীফ আক্রমণ করার চেষ্টা করলে সালাহউদ্দীন তার নৌ বাহিনীর কমান্ডার হুসামউদ্দিন লু’লু কে আর্নল্ডের পিছনে প্রেরণ করেন। হুসাম উদ্দিন লু’লু এবং আর্নল্ডের মধ্যে মদীনা শরীফ থেকে প্রায় একশত মাইল দূরে রাবেগ নামক স্থানে একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যেখানে হুসাম উদ্দিন লু’লু বিজয় লাভ করে এবং আর্নল্ড এবং তার কিছু সঙ্গী-সাথি ব্যতীত তার সম্পূর্ণ বাহিনী ধ্বংস হয়ে যায়। আর্নল্ড তার দুর্গ কার্খে ফিরে পুনরায় আরেক ন্যাক্কারজনক কাজ করে, সে হজের কাফেলার উপর আক্রমণ করে তাদের বন্দি করে। সে সময় মুসলমান এবং ক্রুসেডারদের মধ্যে চুক্তি ছিল যে হজের কাফেলার উপর ক্রুসেডাররা কেনো প্রকার আক্রমণ করবে না।

সুলতান সালাহউদ্দীনের কাছে এ খবর পৌঁছলে তিনি মুসলিম এবং ক্রুসেডারদের মধ্যে যত চুক্তি ছিল সবকিছুর বিলুপ্তি ঘোষনা করেন। এবং শপথ করেন আর্নল্ড যদি তার হস্তগত হয় তাহলে তিনি নিজ হাতে তাকে হত্যা করবেন। সুলতান ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে কার্খ, সাফুরিয়া, তাবারিয়া দুর্গ সমূহে অভিযান প্রেরণ করেন (এই অভিযানগুলোতে সুলতানের সামরিক দক্ষতা লক্ষ্য করা যায়, দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে সুলতানের সামরিক বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে আমরা এখানে আলোচনা করব না)।

৫৮৩ হিজরী সালে মুসলিম বাহিনী এবং ক্রুসেডারদের মধ্যে তাবারিয়ার পাশে হিত্তিন নামক গ্রামে ঐতিহাসিক হিত্তিনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে সুলতানের ভাতিজা তকীউদ্দীনের নেতৃত্বে ক্রুসেডারদের ট্রু ক্রস মুসলমানদের হস্তগত হয় জেরুসালেমের রাজা রেমন্ড এবং আর্নল্ডসহ ক্রুসেডারদের সকল বড় বড় নেতা মুসলমানদের কাছে বন্দি হয়।  সুলতান আর্নল্ডকে নিজ হাতে হত্যা করে তার ওয়াদা পূরণ করেন। হিত্তিন যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সুলতান ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী ক্রুসেডারদের দখলকৃত সকল শহরে এক যুগে অভিযান প্রেরণ করে আসকালান, ইয়াফা, হাইফা এবং আক্কাসহ ভূমধ্য সাগরের তীরবর্তী প্রায় সকল দখলকৃত শহর এবং দুর্গ তিনি পুনরুদ্ধার  করেন।

অবশেষে ৫৮৩ হিজরী সালেই সুলতানের মুসলিম বাহিনী দুই সপ্তাহের জন্য বাইতুল মাকদিস অবরুদ্ধ করেন। মুসলিম বাহিনী নগর প্রাচীরের একাংশ ভূপাতিত করতে সক্ষম হলে ক্রুসেডাররা এক চুক্তির মাধ্যমে আল কুদস নগরী সুলতান সালাউদ্দীনের কাছে হস্তান্তর করতে রাযী হয়। মুসলমানরা প্রায় ৮৮ বছর পর উমর (রা.)-এর আমানত পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়। ১১৮৭ সালের ২ অক্টোবর মুতাবিক ৫৮৩ হিজরী সালের শবে মেরাজের তারিখ ২৭ রজব শুক্রবার রাতে সালাউদ্দীন আইয়ূবী (রা.) আল কুদস নগরীতে প্রবেশ করেন। আল কুদস বিজয়ের পর সুলতান নূরউদ্দীন রাহমাতুল্লাহি আলাইহির তৈরিকৃত মিম্বর আল আকসা মসজিদে স্থাপন করা হয় এবং বাইতুল মাকদিসের কাযী মহিউদ্দীন আল যাকী আল আকসা মসজিদে প্রথম খুতবা প্রদান করেন। সুলতান আল কুদস বিজয়ের পর আল আকসা মসজিদ এবং নগরী সংস্কার করেন। আল কুদস বিজয় কোনো একক ব্যক্তিগত কর্মফল ছিল না বরং নিযামুল মুলক, ইমাম গাযালী, শাইখ আব্দুল কাদির জিলানী, ইমাদউদ্দীন, নূরউদ্দীন এবং সালাহউদ্দীন রাহিমাহুমুল্লাহর প্রজন্মের সামগ্রিক প্রচেষ্টার ফল, যা আল্লাহ তাআলা তার একনিষ্ঠ বান্দাদের দান করেন।

ফেইসবুকে আমরা...