ক. হেবা পরিচিতি
‘হেবা’ (هبة) একটি আরবী শব্দ, যার সাধারণ অর্থ হলো দান করা, উপহার দেওয়া বা বিনা বিনিময়ে নিজের কোনো বস্তুর স্বত্ব অন্যকে হস্তান্তর করা। ইসলামী শরীআহ অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি জীবিত থাকা অবস্থায় কোনো প্রকার প্রতিদান বা বিনিময় গ্রহণ ব্যতিরেকে স্বীয় সন্তুষ্টচিত্তে ও সুস্থ মস্তিষ্কে কোনো ব্যক্তির অনুকূলে সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর করলে তাকে হেবা বলে।
হেবার ৩টি মৌলিক রুকন (শর্ত):
একটি হেবা শরীআতসম্মত ও বৈধ হতে ৩টি শর্ত পূরণ করতে হয়,
১. ইজাব (প্রস্তাব): দাতা কর্তৃক সম্পত্তি দানের স্পষ্ট ঘোষণা বা প্রস্তাব।
২. কবুল (গ্রহণ): গ্রহীতা (বা তার পক্ষে অভিভাবক) কর্তৃক সেই দান গ্রহণ।
৩. দখল হস্তান্তর: দাতা কর্তৃক গ্রহীতাকে সম্পত্তির বাস্তব দখল বুঝিয়ে দেওয়া।
খ. সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধনী ২০২৬:
৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশে “Transfer of Property (Amendment) Act, 2026” (২০২৬ সালের ১০৫নং আইন) গেজেটে প্রকাশিত হয়, যা মূল Transfer of Property Act, 1882-এ নতুন দুটি ধারা ১২২এ ও ১২২বি সংযোজন করে। এই আইনের মূল বিধান অনুযায়ী-
• দাতা তার স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি অন্যের নামে হস্তান্তর করেও নিজের জীবনকাল পর্যন্ত সেই সম্পত্তির ব্যবহার ও ভোগাধিকার (usufructuary right) নিজের কাছে সংরক্ষণ করতে পারবেন।
• এই ব্যবস্থা কেবল নির্দিষ্ট সম্পর্কের মধ্যে প্রযোজ্য। পিতা-মাতা ও সন্তান, দাদা-দাদি/নানা-নানি ও নাতি-নাতনি, এবং স্বামী-স্ত্রী। স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে নিবন্ধিত দলীল বাধ্যতামূলক।
• নিবন্ধনের পর এই দান সাধারণভাবে অপরিবর্তনযোগ্য (irrevocable), তবে পারস্পরিক সম্মতি বা জেলা জজের অনুমোদনে পরিবর্তনযোগ্য।
• দাতার জীবদ্দশায় গ্রহীতা মারা গেলে সম্পত্তি গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে বর্তায়, তবে দাতার ভোগাধিকার অক্ষুণ্ণ থাকে।
আইনটির ঘোষিত উদ্দেশ্য
আইন প্রণেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী এই আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো বৃদ্ধ পিতা-মাতার সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অনেক বাবা-মা সন্তানকে সম্পত্তি দিয়ে দেওয়ার পর সন্তানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটলে নিজেরাই আবাসনহীন বা অসহায় হয়ে পড়েন। সংসদে বিল উত্থাপনকালে আইনমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন, এই আইন হেবা, ওসীয়ত বা অন্য কোনো প্রচলিত হস্তান্তর পদ্ধতিকে প্রভাবিত করবে না, বরং এটি একটি স্বজাতীয় (sui generis) বিকল্প ব্যবস্থা।
গ. নতুন সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ও ইসলামী দৃষ্টিকোণ
একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের জন্য ইসলামী বিধানই হচ্ছে শিরোধার্য। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমাদেরকে ইসলামের নির্দেশনা মেনে চলতে হয়। ইসলাম হচ্ছে একমাত্র পরিপূর্ণ জীবনবিধান, যেখানে মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট এবং সর্বোত্তম নির্দেশনা বিদ্যমান। যে নির্দেশনা বা শরীআ আইনে হাজার বছর স্বতন্ত্রভাবে সীমাবদ্ধহীন থেকে পরিপূর্ণতার সাথে বিশ্ব পরিচলানার বাস্তব উদাহরণ রয়েছে এবং এখনও সে আইন পরিপূর্ণ এবং ভবিষ্যতে স্বমহিমায় এর শ্রেষ্ঠত্ব বজায় থাকবে। এ কারণে নতুন সম্পত্তি হস্তান্তর সংশোধনী আইন আমাদের জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকায় মুসলিমদের জন্য এ আইনটি খেয়ালের বাইরে রাখা অবকাশ নেই। ফলে নতুন এ আইন শরঈ দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে। এ আইনের উল্লিখিত উদ্দেশ্যকে আমরা সাধুবাদ জানাই, তবে ইসলামী শরীআয় এ আইনকে বৈধতা হচ্ছে কি না, মুসলমানদের জন্য তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা প্রথমে দেখি এই আইনটি শরীআর কোনো বিধানের সাথে কতটুকু মিল বা অমিল রয়েছে।
নতুন সম্পত্তি হস্তান্তর সংশোধনী আইন ও ইসলামী শরীআর বিধান ‘হেবা’ ও ‘ওসীয়ত’র সাথে সামঞ্জস্যতা:
• নতুন আইন ও ফিকহী হেবা (هبة)-এর মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সাদৃশ্য লক্ষণীয়,
সম্পর্কভিত্তিক কাঠামো
উভয় ক্ষেত্রেই নিকটাত্মীয়দের বিশেষত পিতা-মাতা ও সন্তানের মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তরের বিষয়টি এখানে মূল। ফিকহী হেবায়ও পিতা কর্তৃক সন্তানকে দান একটি সাধারণ ও গুরুত্বপূর্ণ রূপ।
বিনা বিনিময়ে হস্তান্তর
উভয় ব্যবস্থাতেই কোনো আর্থিক প্রতিদান (ইওয়াদ, عوض) ছাড়াই সম্পত্তি হস্তান্তরিত হয়। উভয়ই মূলত দানভিত্তিক লেনদেন, বিক্রয় নয়।
প্রত্যাহারযোগ্যতার সীমাবদ্ধতা
নতুন আইনে নিবন্ধনের পর হস্তান্তর “সাধারণভাবে অপরিবর্তনযোগ্য”- এই নীতি শরীআর সেই মূলনীতির সাথে আংশিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ যে, কবযা (قبض) পরবর্তী হেবা বিশেষত মাহরাম আত্মীয়দের (ذوو الأرحام المحارم) মধ্যে সাধারণত রুজূ (رجوع, প্রত্যাহার) যোগ্য নয়।
নাবালক সন্তানের ক্ষেত্রে কাঠামোগত সাদৃশ্য
শরীআহ নীতি অনুযায়ী পিতা কর্তৃক নাবালক (সগীর, صغير) সন্তানকে হেবায় পিতাই কবযা-গ্রহীতা (কাবিদ, قابض) হিসেবে গণ্য হন- এই ধারণার সাথে নতুন আইনের কাঠামোরও একটি পরোক্ষ মিল রয়েছে, কারণ উভয় ক্ষেত্রেই দাতা সম্পত্তির ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখেন।
সংশোধিত আইন ও হেবার অসামঞ্জস্যতা
নিম্নে এ দুয়ের মাঝে কতিপয় পার্থক্য দুলে ধরা হলো।
মালিকানা ও কবযার বিচ্ছিন্নতা
ইসলামী আইনশাস্ত্রের অন্যতম গ্রন্থ আল হিদায়াতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, কবযা বা দখল বুঝিয়ে দেওয়া ব্যতীত হেবা কার্যকর হয় না। কবযার পূর্বে দাতা হেবা ফেরত নিতে পারেন। এটি প্রমাণ করে কবযাই হেবাকে লাযিম (لازم, বাধ্যতামূলক) করে তোলে, নিছক ইজাব-কবূল (প্রস্তাব-গ্রহণ) নয়। নতুন আইনে ঠিক এই জায়গাতেই মৌলিক সংঘাত। আইনি মালিকানা তাৎক্ষণিকভাবে গ্রহীতার কাছে হস্তান্তরিত হয়, অথচ দাতা তাখলিয়া তথা আজীবন সম্পত্তি স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। ফাতওয়ায়ে শামীতে ইমাম ইবন আবিদীন (র.) কবযা হুকমী তথা আইনত মালিকানায়ও এই তাখলিয়াকে অপরিহার্য শর্ত বলেছেন। দাতা ব্যবহার-নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলে কবযা হুকমীও প্রতিষ্ঠিত হয় না। সে হিসেবে নতুন আইনে আমৃত্যু মালিকানা ধরে রাখায় এটি হেবার বিধানে পড়বে না।
উদ্দেশ্যগত অমিল: তামলীক বনাম সুরক্ষা
ইমাম কাসানীর ‘বাদায়িউস সানাঈ’তে হেবার সংজ্ঞা ‘তামলীকুল আইন বিলা ইওয়াদ (تمليك العين بلا عوض) অর্থাৎ হেবা হলো বস্তুর পূর্ণ মালিকানা বিনিময় ছাড়া হস্তান্তর করা। যার নৈতিক ভিত্তি পারস্পরিক ভালোবাসা ও আন্তরিকতা সৃষ্টি। নতুন আইনের প্রাথমিক লক্ষ্য ভিন্ন, যেখানে দাতার নিরাপত্তাই উদ্দেশ্য। ফলে একই দলীলে দুটি ভিন্ন প্রকৃতির উদ্দেশ্য (পূর্ণ তামলীক ও আজীবন সুরক্ষা) মিশ্রিত হয়ে পড়েছে, যা শরীআতের হেবা-সংজ্ঞার সাথে কাঠামোগতভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
উত্তরাধিকার বিধানের সংঘাত: ফারাইযের সাথে সাংঘর্ষিকতা
নতুন আইনে গ্রহীতা পূর্বে মারা গেলে সম্পত্তি গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে বর্তায়। কিন্তু শরীআতের নীতি অনুযায়ী কবযার পূর্বে দাতার (বা এখানে প্রায়-কবযাহীন অবস্থায়) মৃত্যু বা সম্পত্তির চূড়ান্ত অবস্থান নির্ধারণে অসম্পূর্ণ হেবা মূল মালিকের ফারাইযের (فرائض, ইসলামী উত্তরাধিকার বণ্টন) আওতায় ফিরে আসার কথা। যেহেতু মূল হেবাই কবযার ঘাটতিতে সম্পূর্ণতা পায়নি বলে প্রশ্নবিদ্ধ, তাই এর ভিত্তিতে গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে সম্পত্তি বর্তানো ফারায়েযী হিসাবের সাথে সাংঘর্ষিক, বিশেষত যখন দাতার অন্য ওয়ারিশদের হক এই হিসেবে প্রভাবিত হয়।
এই মৌলিক পার্থক্যের কারণে সংশোধিত এই আইনকে শরীআর হেবা বিধানের অনুকূলে বলা যায় না।
ওসীয়তের বিধানে অগ্রহণযোগ্যতা
নতুন সংশোধনী আইনের মাধ্যমে হস্তান্তরিত সম্পত্তিকে ইসলামী শরীআতের ‘ওসীয়ত’ (وصية) হিসেবেও গণ্য করার বা ওসীয়তের আইনি সুবিধা দেওয়ারও সুযোগ নেই। নিচে শরঈ দলীলের আলোকে কারণগুলো তুলে ধরা হলো,
ওয়ারিশের অনুকূলে ওসীয়ত বাতিল
নতুন আইনে সম্পত্তি হস্তান্তরের সুযোগ রাখা হয়েছে কেবল নিকটাত্মীয়দের। যারা শরীআত অনুযায়ী দাতার সরাসরি ফারায়েযভুক্ত বা প্রাথমিক ওয়ারিশ। অথচ রাসূল সুনির্দিষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন,
إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَعْطَى كُلَّ ذِي حَقٍّ حَقَّهُ، فَلاَ وَصِيَّةَ لِوَارِثٍ
-নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা প্রতিটি হকদারের পাওনা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সুতরাং কোনো ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারীর অনুকূলে কোনো ওসীয়ত করা জায়িয নেই। (জামে তিরমিযী, হাদীস-২১২১)
যেহেতু ওয়ারিশদের জন্য ওসীয়ত করা শরীআতে মূলগতভাবেই নিষিদ্ধ, তাই এই আইনকে ওসীয়তের কাঠামোর ওপর দাঁড় করানো যাবে না।
ওসীয়তের জন্য ওয়ারিশদের সর্বসম্মত সম্মতির শর্ত
শরীআয় সর্বসম্মত ইসলামী নীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার অপরাপর সকল ওয়ারিশ যদি পরম সন্তুষ্টচিত্তে ও স্বেচ্ছায় সম্মতি জ্ঞাপন করে, তবেই কেবল কোনো ওয়ারিশের পক্ষে করা ওসীয়ত কার্যকর হতে পারে। হাদীসে আছে, রাসূল বলেন,
لاَ تَجُوزُ وَصِيَّةٌ لِوَارِثٍ إِلاَّ أَنْ يَشَاءَ الْوَرَثَةُ
-কোনো ওয়ারিশের জন্য ওসীয়ত গ্রহণযোগ্য নয়; তবে অপরাপর সকল ওয়ারিশ যদি তা (স্বচ্ছন্দে) মঞ্জুর করে বা সম্মত হয়, তবে ভিন্ন কথা। (তাবারানী, হাদীস-২৪১০)
কিন্তু নতুন আইনের অধীনে দলীলটি দাতার জীবিত অবস্থাতেই চূড়ান্ত ও রেজিস্ট্রিকৃত হয়ে যায়, যেখানে দাতার মৃত্যুর পর অন্যান্য ওয়ারিশদের মতামতের তোয়াক্কা না করেই তা গ্রহীতার স্বত্বে সাব্যস্ত হয়, যা ওসীয়তের মূল শরঈ নীতিমালার সম্পূর্ণ বিরোধী।
হস্তান্তরের সময়কাল ও প্রকৃতির মৌলিক বৈপরিত্য: ওসীয়ত হলো শর্তাধীন একটি প্রক্রিয়া, যা ওসীয়তকারীর মৃত্যুর পরেই কেবল কার্যকর হয় এবং মৃত্যুর পূর্বে ওসীয়তকারী যেকোনো সময় তা বাতিল (রুজূ) করতে পারেন। পক্ষান্তরে, নতুন আইনে জীবিত থাকতেই রেজিস্ট্রি দলীলের মাধ্যমে সম্পত্তির ‘আইনি মালিকানা’ তাৎক্ষণিকভাবে গ্রহীতার কাছে চলে যায় এবং তা অনির্দেশ্যভাবে অপরিবর্তনযোগ্য হয়ে পড়ে। ফলে জীবিত অবস্থার এই তাৎক্ষণিক আইনি হস্তান্তরের প্রকৃতি ওসীয়তের সংজ্ঞার সাথে কোনোভাবেই মেলে না।
তাই আমরা নতুন সংশোধিত আইনকে স্বতন্ত্র আইন হিসেবে উল্লেখ করা এই আইনকে শরীআর ওসীয়তের মানদণ্ডেও উত্তীর্ণ বলতে পারি না। অর্থাৎ সংশোধিত আইনটি শরীআতের বিধানের সাথে মিলাতে গেলে হেবা বা ওসীয়তের সাথে প্রসঙ্গ আসে, অথচ এ দুয়ের কোনোটর নীতির সাথেই আইনটি মানানসই নয়।
ঘ. পিতামাতার নিরাপত্তায় শরঈ বিকল্প
ইসলাম পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। আল্লাহ এ জীবনবিধান প্রদান করেছেন মানবজীবনের প্রতিটি দিক উত্তমরূপে পরিচালনার জন্য। এ জীবন বিধান সকল মানুষের সর্বাঙ্গীর কল্যাণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। সে হিসেবে মা-বাবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইসলামের নির্দেশনার অনুসরণ করাই সর্বোত্তম পন্থা। নিম্নে মা বাবার নিরাপত্তা প্রদানের উদ্দেশ্যে প্রণিত সম্পত্তি হস্তান্তরের সংশোধনী আইনে শরীআর সাথে সাংঘর্ষিক অবস্থানে না গিয়ে শরীআহ সমর্থিত বিকল্প দুটি পন্থা তুলে ধরা হলো-
মা বাবার জন্য পৃথক ভরণপোষণ আইন
সম্পত্তি হস্তান্তর থেকে সম্পূর্ণ পৃথক একটি আইন, যা সন্তানের ওপর পিতামাতার ভরণপোষণ ও বাসস্থানের স্বাধীন আইনি দায়বদ্ধতা আরোপ করবে, সম্পত্তি হেবা করা হোক বা না হোক- তা ছাড়াই স্বতন্ত্র আইন করা যাবে। পিতামাতার দেখভাল করা সন্তানদের দায়িত্ব। এটি কুরআন-হাদীসে সুপ্রতিষ্ঠিত নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠতে পারে। এতি শরীআহ সমর্থন করবে এবং মা বাবার নিরাপত্তা নিশ্চিত ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখবে।
উপকার গ্রহণের অনুমতিকে আইনি রূপ দেওয়া
পিতামাতার বা যে কেউ চাইলে তার সম্পদ থেকে অন্য কাউকে উপকার গ্রহণের অনুমতি প্রদান করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে মালিকানা ব্যক্তির কাছেই থাকব, আর উপকার গ্রহীতার কেবল উপকার (মানফায়া) গ্রহণের অনুমতি থাকবে। এখানে আরও সুবিধা হচ্ছে, ব্যক্তি চাইলে যে কোনো সময় এ অনুমতি ফিরিয়ে নিতে পারেন। মা বাবার নিরাপত্তার দিক খেয়াল করলে শরীআহসম্মত উপকার গ্রহণকে আইনি রূপ দিতে দেওয়া যায়, তখন মালিকানা তাদের কাছেই থাকবে আবার তাদের সাথে অন্যায় করলে বা চাইলে যেকোনো সময় উপকার গ্রহণের এই সুযোগকে প্রত্যাহার করতে পারবেন।
ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধান, যেখানে মানবজীবনের যাবতীয় প্রয়োজন ও সমস্যার সুষম সমাধান বিদ্যমান। সেই হিসেবে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বৃদ্ধ বাবা-মায়ের নিরাপত্তা ও আবাসন সুনিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে গৃহীত এ মানবিক উদ্যোগ ও লক্ষ্যকে আমরা অবশ্যই সাধুবাদ জানাই। তবে উদ্দেশ্য মহৎ হলেও এর জন্য নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়াটি শরীআতের মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক। দেশের ৯০ ভাগেরও বেশি জনগণ মুসলিম এবং তারা তাদের দৈনন্দিন ও সম্পত্তি সংক্রান্ত লেনদেনে শরীআহর বিধান পালনে অত্যন্ত অনুরাগী। তাই এই আইনটিকে শরীআহর মানদণ্ডে উত্তীর্ণ করতে সর্ব মহলের গ্রহণযোগ্য আলিম ও শরীআহ বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। উলামায়ে কিরামের কাছ থেকে শরীআ দৃষ্টিকোণ গ্রহণ করা এদেশের জনগণের জীবনদর্শনের জন্য খুব প্রাসঙ্গিক। কারণ মানুষ ইসলামের নির্দেশনামতই নিজেদের জীবনকে সাজাতে চায়। তাই নতুন সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধনী শরীআর আলোকে সাজানো এবং মা বাবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রস্তাবিত দিক বিবেচনার প্রয়োজন। পাশাপাশি ভবিষ্যতে প্রত্যেকটি আইনকে আরও বেশি কার্যকর ও জনগণের ধর্মীয় অনুভূতি অক্ষুণ্ণ রাখতে উলামায়ে কিরামের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
উৎস:
*ফাতওয়ায়ে শামী
*ফাতওয়ায়ে আলমগীরী
*আল-হিদায়া
*বাদাইয়ুস সানাঈ

