বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে “গরু খাওয়া মুসলমান” বলে একটি কথা প্রায় প্রবাদের মতো প্রচলিত আছে। সাধারণত যারা দ্বীনের হুকুম-আহকাম পালনে কিছুটা শিথিলতা থাকলেও নিজের মুসলমান পরিচয় ধারণ করে তাদের ক্ষেত্রে তুচ্ছার্থে কথাটি ব্যবহৃত হয়। তুচ্ছার্থে ব্যবহৃত হলেও এই শব্দগুচ্ছের বহুল প্রয়োগ থেকে আমরা বাংলা তথা ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিআর বা নিদর্শনের ইঙ্গিত পাই। “গরু খাওয়া মুসলমান” বলতে আমরা তাদেরকে বুঝি যারা পরিপূর্ণ দ্বীনদার না হলেও অন্তত এই ভূখণ্ডে যারা মুসলমানদের প্রধান প্রতিপক্ষ তথা হিন্দুদের জীবনাচরণের সাথে একটি মৌলিক বিরোধের ক্ষেত্রে মুসলমানদের সাথে একীভূত থাকে অর্থাৎ গরু আল্লাহর নামে কুরবানী দেয় এবং গরুর গোশত খায়। অর্থাৎ গরুর গোশত খাওয়া এই উপমহাদেশে মুসলমানদের অন্যতম প্রধান শিআর বা নিদর্শনে পরিণত হয়েছে, যার উপর ভিত্তি করে কাউকে একই ভূখণ্ডে অবস্থানরত অন্য একটি গোষ্ঠী তথা হিন্দুদের থেকে আলাদা করা যায়।
বৈদিক শাস্ত্রানুসারে “গো-মাংস” ভক্ষণে কোনো বিধিনিষেধ না থাকলেও এতদঞ্চলে মুসলমানদের সাথে পৌত্তলিকদের বিরোধের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গই যে ছিল গরু যবাই এবং গরুর গোশত খাওয়া, এ বিষয়ে অন্তত এক হাজার বছরের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। বাংলায় সূফী দরবেশরা হিন্দু রাজাদের সাথে যেসব যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন তার বিপুল অংশজুড়ে ছিল গরু যবাইয়ের অপরাধে নিরীহ মুসলমানদের উপর হিন্দুত্ববাদীদের অত্যাচার। হিন্দুত্ববাদী গৌড় গোবিন্দের বিরুদ্ধে হজরত শাহজালাল (র.)-এর জিহাদের মূল অনুঘটক যে গরু যবাই ছিল তা গাজী বুরহান উদ্দীনের শহীদ সন্তানের ইতিহাস থেকে অনুধাবন করা যায়। বগুড়ায় পরশুরামের বিরুদ্ধে শাহ সুলতান বলখী (র.)-এর জিহাদের অন্যতম কারণও গরু যবাই। বাবা আদম শহীদকে বল্লাল সেন শহীদ করেছিল গরু যবাই করার কারণেই। গরু যবাই করার স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করার মানসে বাবা আদম শহীদ বল্লাল সেনের বিরুদ্ধে জিহাদ করে শহীদ হওয়ার প্রায় হাজার বছর পার হয়েছে। হাজারো সূফী দরবেশ এবং মুজাহিদদের জিহাদ, যুহদ এবং রক্তের নযরানায় পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে গরু কুরবানীর সিলসিলা চলমান রয়েছে এই উপমহাদেশে। কিন্তু গোরক্ষার নামে মুসলমানদের উপর নিপীড়ন কখনোই পুরোপুরি লুপ্ত না হয়ে উপমহাদেশের আনাচেকানাচে এটি মুসলিম নিপীড়নের অন্যতম অনুসঙ্গ হিসেবে কাজ করছে যুগ যুগ ধরে। গত এক যুগে তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদের বেপর্দা আত্মপ্রকাশের ফলে দেশটির মুসলমানদের উপর উগ্র হিন্দুদের নিপীড়নের একটি মোক্ষম অস্ত্র হয়ে উঠেছে তথাকথিত এই গোরক্ষা। বিজেপি শাসিত অঞ্চলগুলোতে গরু যবাই করতে নিষেধাজ্ঞা, অন্য পশু কুরবানী দিলেও অযথা হয়রানি, এমনকি পিটিয়ে হত্যা—এগুলো বেশ কয়েক বছর ধরেই খবরের শিরোনাম হচ্ছে নিয়মিত। এ বছর পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সরকার প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এ রাজ্য থেকে যেসব মুসলিম নিপীড়নের সংবাদ এসেছে, তা নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ১৯৫০ সালের একটি আইনকে নতুন করে কার্যকর করে বিজেপি সরকার যেভাবে মুসলমানদের ঈদ উৎসবকে কার্যত নিষিদ্ধ করেছে, এটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার তিনটি তথাকথিত জনপ্রিয় প্রপঞ্চ—গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা আর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে অকার্যকর ধারণা হিসেবে প্রমাণ করেছে। কেবল যে হিন্দু শাসিত অঞ্চলেই গোরক্ষার নামে মুসলমানের ঈদ, কুরবানী আর গরুর গোশত খাওয়ার স্বাধীনতায় বাধা দেওয়া হয়, বিষয়টি আদতে এতটা সরল নয়। বরং হিন্দু পরিচয় ধারণ করা প্রায় সকলের মাঝেই যে একধরনের হিন্দুত্ববাদ রয়েছে এবং তারা যেকোনো সুযোগে মুসলমানদের ধর্মীয় কাজে বাধা সৃষ্টিতে তৎপর থাকে, তা আমরা মুসলমানের জনপদ বাংলাদেশের নানা অঞ্চলে এখনো গরু কুরবানীকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট গোলযোগ থেকে ধারণা পেতে পারি।
পশ্চিমবঙ্গের শুভেন্দু অধিকারী অথবা আসামের হেমন্ত বিশ্ব শর্মার মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য জিঘাংসা দর্শনে অনেকে একটি ভুল ধারণা লালন করেন যে এরা হিন্দুদের মধ্যে সবচেয়ে উগ্র, হিন্দুদের বড় অংশ এতটা উগ্র নয় এবং বিজেপির মুসলিম-বিদ্বেষী প্রজেক্টের কারণেই এরা এত উগ্র ভাব করে। এই সকল ধারণাই যে মৌলিকভাবে ভুল তার ঐতিহাসিক এবং রাজনৈতিক দলীল স্পষ্টভাবে উত্থাপন করা যায়। হেমন্ত বিশ্ব শর্মা পূর্বে তথাকথিত অসাম্প্রদায়িক কংগ্রেসের রাজনীতিতে এবং শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। হুট করে তারা এমন উগ্র হিন্দুত্ববাদী বনে গিয়েছেন ব্যাপারটা এমন নয়। বরং বেশিরভাগ হিন্দুদের মাঝে যে ভয়াবহ মুসলিম-বিদ্বেষ প্রোথিত থাকে তাদের মাঝেও সেটা ছিল এবং বর্তমান সময়কে তারা সে বিদ্বেষ প্রকাশ করে লাভবান হওয়ার সবচেয়ে মোক্ষম সময় হিসেবে ধারণা করেছে এবং বিজেপিতে যোগ দিয়েছে। দীর্ঘ সময় কংগ্রেসের তথাকথিত অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি করে হুট করে হেমন্ত বা শুভেন্দুরা যে বিজেপিতে যোগ দিয়ে হিন্দুত্ববাদী বনে যায় এ থেকে স্পষ্ট হয় কংগ্রেসের অসাম্প্রদায়িকতা কোনো মৌলিক মূল্যবোধ নয় বরং একটি পর্দা মাত্র। অসাম্প্রদায়িকতাকে মৌলিক মূল্যবোধ হিসেবে ধারণ করলে দলের এমন সিনিয়র নেতা হঠাৎ করে তীব্র সাম্প্রদায়িক হওয়ার কথা না৷ বস্তুত ভারতে ক্রিয়াশীল সকল রামপন্থি, বামপন্থি ও মধ্যপন্থি রাজনৈতিক দলই যে একই হিন্দুত্ববাদী আদর্শের অনুসারী তা ঐতিহাসিক এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায় স্পষ্ট হয়। প্রায় সকল দলই যে ভারতে একটি হিন্দু রাজ্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে এবং এ লক্ষ্যে মুসলমান নাগরিকদের “ঊনমানুষ” হিসেবে গণ্য করতেও যে তাদের বাধে না তা সবচেয়ে “অসাম্প্রদায়িক” কংগ্রেসের রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে বোঝা যায়; ভারতের সর্বজনগ্রহণযোগ্য হিন্দু চিন্তক ও রাজনীতিবিদদের জীবন থেকেও বোঝা যায়।
ভারতে তো বটেই এমনকি বাংলাদেশেও ভারতীয় সাংস্কৃতিক ফ্যাসিজমের ধারকরা কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অসাম্প্রদায়িকতার অবতার হিসেবে দেখানোর প্রাণান্তকর চেষ্টা করেন সব সময়। যেন রবীন্দ্রনাথই ভারত উপমহাদেশের সকল শ্রেণিকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির রাহ দেখিয়েছিলেন। অথচ সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ এবং জমিদার রবীন্দ্রনাথ কেউই হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে ছিলেন না। রবীন্দ্রনাথ তার শিবাজী উৎসব কবিতায় “এক ধর্ম রাজ্য” প্রতিষ্ঠার শপথ করেছেন, কথা ও কাহিনী কাব্যে যবন (তুচ্ছার্থে মুসলিম) নিপাত করার সংকল্প করেছেন, সাহিত্যের যত্রতত্র যথেচ্ছ ম্লেচ্ছ, যবন ইত্যাদি বলে মুসলমানদের অপমান করেছেন, বঙ্কিমচন্দ্রের চরম মুসলিম-বিদ্বেষী উপন্যাস আনন্দমঠ-এর বন্দে মাতরম গানে সুরারোপ করেছেন। বন্দে মাতরম গান রচনার প্রেক্ষাপট যে চরম মুসলিম-বিদ্বেষে দুষ্ট এবং শিরকমিশ্রিত হওয়ায় এ গান গাওয়া যে কোনো মুসলমানের পক্ষেই সম্ভব না তা রবীন্দ্রনাথ অনুধাবন করতে ব্যর্থ হওয়ার কথা না। তবুও তিনি এ গান প্রথম কংগ্রেসের অধিবেশনে গাইলেন এবং গানটিকে কংগ্রেসের অঘোষিত দলীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণকেও সমর্থন করলেন। অথচ কংগ্রেস প্রতিষ্ঠাকাল থেকে দাবি করত তারা ভারতের সকল মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। এ থেকে বোঝা যায় রবীন্দ্রনাথ কিংবা কংগ্রেসের কাছে মুসলমানদের অস্তিত্ব গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় ছিল না। ভাষার প্রশ্নেও রবীন্দ্রনাথ বাংলাভাষী মুসলমানের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি। উর্দু-ফারসী শব্দ ব্যবহার আর রক্ত শব্দের পরিবর্তে খুন শব্দ ব্যবহারের কারণে কাজী নজরুল ইসলামকে তিনি যেমন নিন্দা করেছেন একইভাবে বাংলাভাষী মুসলমানের যদি বাংলায় ভাব প্রকাশে অসুবিধা হয় তবে (উর্দু-ফারসী বাংলায় যুক্ত করে বাংলা ভাষাকে বিনাশ না করে) তারা যেন উর্দু ভাষাতেই কথা বলে, এমন ছোটলোকসদৃশ খোঁচাও তিনি দিয়েছেন। অথচ ভাষা বহতা নদীর মতো। ভাষা ব্যবহারকারীর দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনে শব্দের যোজন-বিয়োজন ঘটবেই। এটাই ভাষার অমোঘ নিয়ম। কিন্তু হিন্দুর ভাষা সংস্কৃত থেকে উৎসারিত বাংলার প্রমিতায়নে রবীন্দ্রনাথ এতটাই মগ্ন ছিলেন যে, একটি বিপুল সংখ্যক বাংলাভাষীকে এই ভাষা ব্যবহার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা বলতেও লজ্জাবোধ করেননি। এই ছিল আমাদের কবিগুরুর ভাষিক উদারতা! অন্যদিকে জমিদার রবীন্দ্রনাথের জমিদারিতে সিংহভাগ জনগণই মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও নিজের জমিদারিতে গো-হত্যা নিষিদ্ধ করতে তার বাধেনি৷ মুসলমান প্রজারও যে ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার আছে এই বোধ রবীন্দ্রনাথ অথবা তার পরিবারের মধ্যে জাগ্রত হয়নি। হিন্দু রাজ্য প্রতিষ্ঠা, মুসলমানকে হত্যার সংকল্প, মুসলমানদের যথেচ্ছ তাচ্ছিল্য, বাংলা ভাষা থেকেও মুসলমানদের খারিজ করার হুমকি, নিজ জমিদারিতে জোর করে গো-হত্যা বন্ধের চেষ্টা; রবীন্দ্রজীবনে ছড়িয়ে থাকা এসব কিছুকে একত্রিত করলে তার যে রূপ ফুটে ওঠে তার সাথে অধুনা হিন্দুত্ববাদী যোগী আদিত্যনাথ, অমিত শাহ, শুভেন্দুদের খুব একটা পার্থক্য করা দুষ্কর। ছোট পার্থক্য আছে বৈকি! তা হলো বিজেপির হিন্দুত্ববাদীদের মুসলিম-বিদ্বেষ বুঝতে সচেতনভাবে তাদের কার্যক্রম খেয়াল করা লাগে তা না, বরং তাদের প্রতিটা কার্যকলাপেই এই বিদ্বেষ প্রকটভাবে ফুটে ওঠে। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের হিন্দুত্ববাদ তথা মুসলিম-বিদ্বেষ বুঝতে তাকে পড়তে হয় সচেতনভাবে, গভীরভাবে। অবশ্য রবীন্দ্রনাথের শব্দে শব্দে হিন্দুত্ববাদী হওয়ার প্রয়োজন হয় না। তিনি তো গুরু। গুরু যখন প্রচ্ছন্নভাবে নিজের মুসলিম-বিদ্বেষ জানান দেন তখন শিষ্যরা সারা ভারতে রামরাজত্ব কায়িমের অভিলাষে মুসলিম নিধনযজ্ঞ চালানোর লাইসেন্স পায় বৈকি! এজন্য তার প্রকাশ্য নির্দেশের প্রয়োজন হয় না। রবীন্দ্রনাথ এমনই বিশাল চরিত্র!
রবীন্দ্রনাথের মতোই আরও একজন বিখ্যাত গো-রক্ষক বা গোপাল ছিলেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। গান্ধী তার সকল আন্দোলন-সংগ্রামে গো-রক্ষকদের সাথে পাওয়ার সর্বোচ্ছ চেষ্টা করেছেন, তাদেরকে “গোপাল” উপাধি দিয়েছেন। ১৯২৪ সালে কংগ্রেসের বার্ষিক সম্মেলনে গান্ধী বলেছিলেন-“আমি স্বরাজ থেকে গো-রক্ষাকে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করি না। বরং কিছু দিক দিয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি।” ফলত তার আন্দোলন ব্রিটিশ উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন হলেও আন্দোলনের সকল স্তরেই ছিল গো-রক্ষার ওয়াদা। কিন্তু গো-রক্ষার সহজ অর্থ যে মুসলমানদের পীড়ন করা, ব্রিটিশ বাবুরা গরু খেলে যে হিন্দু এলিটরাও চুপ করে থাকতে বাধ্য হয় আর মুসলমানরা খেলে খড়্গহস্ত হয় এই বাস্তবতা গান্ধীই বিভিন্ন বক্তব্য-লেখালেখিতে স্বীকার করেছেন। তারপরও তিনি গো-রক্ষাকে তার আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য বানিয়ে, তথাকথিত গো-রক্ষকদের নানা উপাধিতে ভূষিত করে আদতে মুসলিম-বিদ্বেষকেই উসকে দিয়েছেন বহুবার। ভারতের সমকালীন রাজনীতির প্রধানতম চরিত্র যখন গো-রক্ষার গুরুত্ব নিয়ে বারবার আলাপ করেন তখন স্বাভাবিকভাবেই তা উগ্র হিন্দুদের হাতে মুসলিম নিপীড়নের একটি মোক্ষম অস্ত্র তুলে দেয়। যার ফলাফল আমরা পাই ১৯৩৭-এর প্রাদেশিক নির্বাচনের পর কংগ্রেস শাসিত অঞ্চলগুলোতে।
বর্তমান বিজেপি শাসিত ভারতে মুসলমানদের উপর স্টেট-স্পন্সরড নিপীড়নের মধ্যে কংগ্রেসকে অনেকের কাছেই মুসলমানদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে মনে হয়। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকা কালেও দলটির তৃণমূল কর্মী আর বিজেপি-আরএসএসের গো-রক্ষকদের মধ্যে ফারাক থাকে খুবই অল্প। বরং গো-হত্যা রোধের নামে মুসলিম নির্যাতনে উভয় দলের তৃণমূলের বোঝাপড়াটা চমৎকার। ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই ভারতের সকল মানুষের প্রতিনিধিত্বের দাবি করলেও মুসলমানদের রাজনৈতিকভাবে যথাযথ সম্মান দিতে ব্যর্থ হওয়া, হিন্দুত্ববাদী গান বন্দে মাতরমকে ধারণ করা, গো-রক্ষার নামে মুসলিম নিপীড়নের পক্ষে নীরব বৈধতা উৎপাদন করা ইত্যাদি কারণে প্রতিষ্ঠার অল্প কিছুকাল পর থেকেই মুসলমানরা কংগ্রেসের উপর আস্থা হারানো শুরু করেন। ফলে ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের মাধ্যমে শুরু হয় মুসলমানদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক যাত্রা। তথাপিও মুসলমানদের একটি সেক্যুলার অংশ এবং দেওবন্দ ঘরানার জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ কংগ্রেসের সাথে সদ্ভাব বজায় রেখেই চলছিল। ব্রিটিশ ভারতে মুসলমানদের একটি অংশ সব সময়ই কংগ্রেসের সাথে যুক্ত থাকলেও কংগ্রেস তাদের দলীয় রাজনৈতিক এজেন্ডা থেকে কখনোই গো-রক্ষা বাদ দেয়নি। গান্ধী, রবীন্দ্রনাথসহ ভারতের গুরুত্বপূর্ণ “ভদ্রলোক”দের অনবরত গো-রক্ষার পক্ষে সাফাই গাওয়া, গোরক্ষকদের প্রশংসা করা এবং কংগ্রেসের সকল রাজনৈতিক এজেন্ডায় গো-হত্যা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা অসংখ্য হিন্দুদের মধ্যে সুযোগ পেলেই মুসলিমদের নির্যাতন করার একধরনের বাসনার জন্ম দিয়েছিল। এরই চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনের পরে। প্রাদেশিক নির্বাচনে বেশিরভাগ প্রদেশে কংগ্রেস এককভাবে অথবা যৌথভাবে ক্ষমতায় যায়। ক্ষমতায় আরোহনের পর থেকেই কংগ্রেস-শাসিত প্রায় সকল রাজ্যে গো-রক্ষার নামে মুসলমানদের উপর অকথ্য নির্যাতন নেমে আসে। কংগ্রেস-শাসিত রাজ্যসমূহে মুসলমানদের উপর হিন্দুত্ববাদীদের সাম্প্রদায়িক হামলার বিস্তৃতি উঠে আসে ১৯৩৮ সালে মুসলিম লীগ কর্তৃক প্রকাশিত পীরপুর রিপোর্টে। ১৯৩৭ সালে কংগ্রেস ক্ষমতায় গিয়ে মুসলমানদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়া এবং হিন্দুত্ববাদীদের নগ্নরূপ প্রকাশ হওয়ার ফলশ্রুতিতেই উপমহাদেশে মুসলমানদের জন্য পৃথক দেশের দাবি জোরালো হয় এবং ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবে দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রস্তাব করা হয়।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা অনিবার্য করে তুলেছিলেন তথাকথিত অসাম্প্রদায়িক শিক্ষিত হিন্দু ভদ্রসমাজ। উপমহাদেশের মুসলমান নেতারা উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের ব্যাপারে সব সময়ই সচেতন ছিলেন, কেবল তাদের থেকে নিরাপত্তার জন্যই পাকিস্তানের প্রয়োজন হয়েছিল তা না। বরং হিন্দু সেক্যুলার ভদ্রলোকদের মধ্যে যে প্রচ্ছন্ন মুসলিম-বিদ্বেষ অত্যন্ত গভীরভাবে প্রোথিত আছে নানা ঘটনাপ্রবাহের মাধ্যমে এ সত্য মুসলিম নেতৃবৃন্দের কাছে পরিষ্কার হয়ে ওঠায় তারা আর হিন্দুদের সাথে সহাবস্থানের স্বপ্ন দেখার সাহস করেননি। ফলে জন্ম হয় মুসলমানের আবাসভূমি পাকিস্তানের। মুসলমানদের আবাসভূমি হিসেবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলেও এর প্রতিষ্ঠাতা কায়েদে আযম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ উপমহাদেশের সকল মুসলমানকে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেননি। কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার বাধার পাশাপাশি মুসলমানদের একটি অংশ তখনো অখণ্ড ভারতের খোয়াবে মশগুল থাকায় জিন্নাহর “বার্গেইনিং ক্যাপাসিটি” ছিল খুবই সীমিত। এই সীমিত পরিসরে যতটুকুই অর্জন করা গেছে ততটুকুই আজ মুসলমানদের নিরাপদ আবাস, আর বাকিটাজুড়ে গোরক্ষকদের নগ্ন আস্ফালন। যে দেওবন্দ তথাকথিত অখণ্ড ভারতের জন্য শেষদিন পর্যন্ত কংগ্রেসের সাথে একযোগে কাজ করেছে সে দেওবন্দে হিন্দু মন্দির আবিষ্কারের ঘোষণা দিচ্ছে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা। এই হলো অখণ্ড ভারতের সত্যিকার রূপ, এই হলো হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির আশায় পাকিস্তানকে প্রত্যাখ্যান করা মুসলমানদের প্রতি ভারতের প্রতিদান।
ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দুত্ববাদের দু’টি রূপ বহুকাল আগে থেকেই বিকশিত হচ্ছে। একটি রূপ হলো বঙ্কিম, সাভারকার, শ্যামাপ্রসাদ, বাল কেশব ঠাকরেদের প্রকাশ্য উগ্র হিন্দুত্ববাদী ধারা আর অন্যরূপটি রবীন্দ্রনাথ, গান্ধী, নেহরুদের প্রচ্ছন্ন হিন্দুত্ববাদী ধারা। উভয় ধারার লক্ষ্য একই—একটি হিন্দু স্বরাজ প্রতিষ্ঠা, কেবল পদ্ধতিতেই ফারাক। যেহেতু লক্ষ্য এক, এজন্যই আজকাল বহু কংগ্রেস আর তৃণমূল কংগ্রেসের নেতাদের আমরা হঠাৎ করে উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিজেপি হয়ে উঠতে দেখি। রবীন্দ্রনাথ, গান্ধী, নেহরু কিংবা কংগ্রেসের হিন্দুত্ববাদী এবং মুসলিম-বিদ্বেষী মননের এই দিকটাতে গুরুত্ব না দিয়ে তাদেরকে অন্যায্যভাবে অসাম্প্রদায়িকতার আইকনে রূপায়ণ ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দুত্ববাদী চেতনারই বাস্তবায়ন। তীব্র সাম্প্রদায়িক লেখক বঙ্কিমচন্দ্র কিংবা শরৎচন্দ্র, তীব্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতিবিদ শ্যামাপ্রসাদ কিংবা বাল ঠাকরে যখন তাদের লেখনিতে বা কার্যক্রমে তীব্র মুসলিম-বিদ্বেষ ফুটিয়ে তোলেন তখন নেহরু, গান্ধী, রবীন্দ্রনাথরা আদতে মুসলমানের রক্ষক হয়ে দাঁড়ান না, বরং গো-মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন। যুগে যুগে ভারতীয় উপমহাদেশে অসাম্প্রদায়িকতার নামে হিন্দুত্ববাদীদের ন্যারেটিভে এভাবেই প্রতারণার শিকার হন মুসলমানরা। এজন্যই আমরা এখনো দেখি বিজেপি ভারতের মুসলমানদের ঈদ কেড়ে নিলেও, ইযযত-হুরমত কেড়ে নিলেও কোথাও কোনো সাড়াশব্দ নেই, প্রতিবাদ নেই; যেন এটাই হওয়ার কথা ছিল, যেন মুসলমানের এটাই প্রাপ্য ছিল! বরং বাংলাদেশেও শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় এক শ্রেণির কথিত “অসাম্প্রদায়িক” মুসলমানকে দেখা গেছে হিন্দুদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে গরুর বদলে ছাগল কুরবানী দিতে। এই তথাকথিত অসাম্প্রদায়িকদের কাজই যেকোনো কিছুতে মুসলমানদের আপসকামী হতে প্ররোচিত করা, যেন তাদের উপর নির্যাতন চালানোর পথ সহজতর হয়।
ভারতের মুসলমানদের ঊনমানুষে পরিণত করার সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও তথাকথিত খাদিমুল হারামাইনের সাথে গুজরাটের কসাইয়ের সম্পর্কে কোনো ভাটা পড়ছে না। আরববিশ্বসহ সমগ্র মুসলিম বিশ্ব ভারতের সাথে ট্রিলিয়ন ডলার বাণিজ্য করলেও কেউ ভারতের মযলুম মুসলমানের পক্ষে কোনো শব্দ উচ্চারণ করছে না। উলটো ভারতে মুসলমানদের যে গরু যবাইয়ের জন্য নির্যাতিত হতে হয় সে গরুগুলোরই ক্রেতা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোনো না কোনো মুসলিম রাষ্ট্র। বাংলাদেশের মুসলামানও ভারত থেকে চোরাচালানে আসা গরু কম দামে কিনে কুরবানী দিতে তৎপর। আবার ভারত থেকে গরু চোরাচালানে জড়িত থাকেন অনেক বেসরকারি মাদরাসা সংশ্লিষ্টরা। যেন ভারতের গো-রক্ষকদের দ্বারা নিপীড়িত মুসলমানের প্রতি আমাদের কোন দায় নাই! এমন মুসলমান আমরা! মুসলিম বিশ্বে গরুর গোশত রপ্তানি করে হিন্দুত্ববাদীরা বিলিয়ন ডলার উপার্জন করছে। এই গোশত খাওয়ার মাধ্যমে মুসলমানরা প্রকারান্তরে ভারতের মুসলমানদের নির্যাতনকে আরো প্রকট করে তুলছে। তথাপি নিজ দেশে মুসলমানদের গো-রক্ষার নামে নিপীড়ন আবার অন্য মুসলিম বিশ্বে রপ্তানি; এই ব্যাপারটি ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায় বিলেতি বাবুদের গো-মাংস ভক্ষণের সাথে তুলনীয়। সে সময় তথাকথিত গো-রক্ষকরা যেমন মুসলমান গরু যবাই দিলে বীরবিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়ত, আবার বিলেতি বাবু গরু যবাই করলে নমঃ নমঃ পড়ত; এখনো নিজ দেশে গরু যবাইয়ের অজুহাতে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা মুসলমান নির্যাতন বৈধ করতে চায় আবার একই গরু কোনো আরব শেখের প্লেটে পরম যত্নে পরিবেশন করে। এটাই হিন্দুত্ববাদীদের অসারতা, দ্বৈততা। বস্তুত অভিশপ্ত জড়-উপাসক পৌত্তলিকরা আদিকাল থেকেই শক্তের ভক্ত, নরমের যম।

