1. redwan.iub@gmail.com : admin2021 :
  2. admin@parwana.net : Parwana Net : Parwana Net
  3. editor@parwana.net : Parwana Net : Parwana Net
Logo
উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজা (রা.)
উম্মু উবাইদা
  • ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

(পূর্ব প্রকাশের পর)

প্রিয় খাদীজা (রা.)! আপনি ছিলেন প্রথম ঈমান আনয়নকারী। এ এক অভূতপূর্ব সম্মান! তবে এ সম্মান খুব সহজে অর্জিত হয়নি। যখনই রাসূল e কষ্টকর কিছু শুনতেন, যখনই কেউ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতো তখন তিনি আপনার কাছে আসতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সত্যায়ন করতে, তাঁর হৃদয়ে প্রেরণা যোগাতে, তাঁর দায়িত্বের বোঝা হালকা করতে এবং তাঁকে আত্মবিশ্বাস যোগাতে আল্লাহ আপনাকে মনোনীত করেছিলেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আশ্বস্ত করতে একদিন আপনি তাকে বলেছিলেন যখন জিবরাঈল আগমন করেন তখন আপনাকে জানাতে। যখন জিবরাঈল আসেন তখন আল মুদ্দাসসির সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে ওঠেন- “হে খাদীজা! জিবরাঈল এসেছেন।” আপনি তাঁকে আপনার ডানে বসে জিবরাঈলকে দেখা যায় কি না পরীক্ষা করতে বলেন। আল আমীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা করেন এবং বলেন- ‘হ্যা।’ আপনি তখন তাকে আপনার বামে এবং সামনে বসে জিবরাঈল (আ.)-কে দেখা যায় কি না পরীক্ষা করতে বলেন এবং প্রতিবারই তিনি জিবরাঈল (আ.)-কে দেখতে পান। অতঃপর আপনি আপনার ওড়না সরিয়ে দেন এবং আপনার বক্ষ কিছুটা উন্মুক্ত হয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বলেন জিবরাঈল (আ.) চলে গেছেন। তখন আপনি বলেন- ‘অভিনন্দন! আপনার কাছে আগমনকারী শয়তান নয় বরং কোন ফিরিশতা।’ প্রিয় খাদীজা (রা.)! যখন একাধারে তিন বছর ওহী আসা বন্ধ ছিলো এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিদারুণ কষ্টে দিন কাটাচ্ছিলেন তখন আপনি তাঁর সাথে ছিলেন। অতঃপর জিবরাঈল (আ.) আগমন করেন এবং বলেন- ‘হে মুহাম্মাদ! নিঃসন্দেহে আপনি সত্যের উপর আছেন।’ এ বার্তা আস-সাদিক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হৃদয়কে প্রশান্ত করে একই ঘটনা আবার ঘটার পূর্ব পর্যন্ত।

প্রিয় খাদীজা (রা.)! যখন আমি হেরা গুহার দিকে তাকাই তখন এটা ভেবে অভিভূত হয়ে যাই যে ৫৫ বছর বয়স্ক একজন নারী হয়েও কিভাবে আপনি রাসূল  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য খাবার এবং পানীয় নিয়ে এই উঁচু পাহাড়ে আরোহণ করতেন! আল্লাহ তাআলা আপনাকে সম্মানিত করেন এবং আল মুযযাম্মিল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট জিবরাঈল (আ.) কে এ বলে প্রেরণ করেন, ‘খাদীজা আপনার নিকট আসছেন। তিনি আপনার জন্য খাবার নিয়ে আসছেন। যখন তিনি আসবেন তখন তার প্রতিপালক এবং আমার পক্ষ থেকে সালাম পৌঁছে দিবেন। তাকে জান্নাতে একটি মুক্তা-মহলের সুসংবাদ দিন যেখানে কোন কোলাহল কিংবা ক্লান্তি থাকবে না।’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনার সম্পর্কে বলেন, সর্বোত্তম নারী খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ, সর্বোত্তম নারী মারইয়াম বিনতু ইমরান, সর্বোত্তম নারী ফিরআউনের স্ত্রী আসিয়া এবং সর্বোত্তম নারী ফাতিমা বিনতু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। (তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ সময়ের সর্বোত্তম ছিলেন)

প্রিয় খাদীজা (রা.)! কী অনন্য ভালোবাসার চাদরে আপনারা আবৃত ছিলেন! আপনার ওফাতের বহু বছর পরেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনার প্রেমময় স্মৃতি স্মরণ করতেন। আয়িশা (রা.) বলেন, ‘আমি খাদীজা (রা.) থেকে বেশি ঈর্ষা আর কাউকে করতাম না, কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাদীজা (রা.) এর কথা খুব বেশি স্মরণ করতেন।’ একদিন আয়িশা (রা.) ঈর্ষা থেকে বলেন ফেলেন- আল্লাহ কি আপনাকে তার থেকেও উত্তম একজনকে দিয়ে তার শূন্যতা পূরণ করেননি? নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্টতই রেগে যান এবং জিজ্ঞেস করেন- তুমি কেমন করে এভাবে বলতে পারলে? আল্লাহর শপথ! আল্লাহ আমাকে তার থেকে উত্তম কাউকে দেননি। যখন সবাই আমাকে অবিশ্বাস করতো তখন সে আমাকে বিশ্বাস করেছে, যখন আমার নিজের লোকেরা আমাকে সমাজচ্যুত করেছিলো তখন সে আমাকে আশ্রয় দিয়েছে, যখন লোকেরা আমাকে অর্থ সংকটে ফেলেছে সে তার সম্পদে আমাকে অংশীদার করেছে এবং আল্লাহ তার মাধ্যমে আমাকে সন্তান দান করেছেন। সেদিন আয়িশা (রা.) প্রতিজ্ঞা করেছিলেন আর কখনো আপনার সম্পর্কে নেতিবাচক কথা বলবেন না।

আপনার স্মরণে আপনার বিশ্বস্ত স্বামী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের জবাই করা পশুর গোশত আপনার বান্ধবীদের পাঠাতেন। তিনি এমন করতেন কারণ তারা ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয়তমার প্রিয় মানুষ। আপনার ব্যবহৃত হার দেখে আপনার স্মরণে আপনার প্রিয়তম স্বামী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নয়নদ্বয় অশ্রুসিক্ত হয়। যে হার আপনার কন্যা যাইনাব (রা.) তার স্বামীর মুক্তিপণ হিসেবে পাঠিয়েছিলেন, যিনি (স্বামী) তখন অমুসলিম ছিলেন এবং বদর যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর কাছে বন্দি হন। আপনার স্মরণে আপনার বিশ্বস্ত স্বামী পরিতাপ করেছিলেন- হে আল্লাহ! এ তো হালা… যখন আপনার বোন হালা বিনতে খুয়াইলিদ (রা.) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গৃহে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করেন এবং তার কণ্ঠ অনেকটা আপনার কণ্ঠের মতো শুনায়। প্রিয় খাদীজা (রা.)! আপনি সেই ভাগ্যবান নারী যার সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত ভালোবেসে বলেন- আমি তার ভালোবাসায় লালিত হয়েছি। এই একটি উক্তিই আপনাদের ভালোবাসার কাহিনী বর্ণনা করার জন্য যথেষ্ট।

প্রিয় খাদীজা (রা.)! আপনার সব কিছু ছিলো এবং আপনি তা দ্বীনের জন্য বিলিয়ে দিয়েছেন। ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময় আপনি ছিলেন। আপনি তখনো ছিলেন যখন আল মুযযাম্মিল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফা পাহাড়ের পাদদেশে সবাইকে সমবেত করে বলেছিলেন- হে লোকেরা! যদি আমি বলি তোমাদের আক্রমণ করার জন্য এই পর্বতের বিপরীত দিকে একটি সেনাদল অপেক্ষা করছে, আমাকে তোমরা বিশ্বাস করবে? তারা যখন তাঁকে প্রত্যাখ্যান ও উপহাস করেছিলো তখনো আপনি তাঁর সাথে ছিলেন। যখন মুসলিমদের বয়কট করা হয় এবং শিআবে আবী তালিবে অন্তরীণ করা হয় তখনো আপনি ছিলেন। যখন খাওয়ার জন্য কেবল পাতাই ছিলো সেখানে, তখনো আপনি ছিলেন। যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রিয় চাচার ইন্তিকাল হয় তখন আপনি তার পাশে ছিলেন। এর মাত্র তিন দিন পরেই আপনার প্রতিপালক আপনাকে তাঁর সান্নিধ্যে ফিরিয়ে নেন।

আপনি যখন মৃত্যুশয্যায় তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনার গৃহে প্রবেশ করেন এবং আপনাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন- তুমি আমার জন্য অনেক বেশি কষ্ট স্বীকার করেছো। কী প্রশংসনীয় তোমার আত্মত্যাগ! হে খাদীজা! আল্লাহ কষ্টের মধ্যে অনেক ভালোও রেখেছেন। তুমি কি জানোনা আল্লাহ জান্নাতে মারইয়াম বিনতু ইমরান (আ.), মূসা (আ.) এর বোন কুলসুম এবং ফিরআউনের স্ত্রী আসিয়াহ (আ.) এর সামনে আমাকে তোমার সাথে বিয়ে দিয়েছেন। আপনি বলেন- সত্যি হে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম? নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দেন- হ্যাঁ। আপনার মৃত্যুশয্যায়ও আপনি আপনার স্বামীকে উৎসাহ দিচ্ছিলেন এবং তাঁর বিবাহের খুশিতে আনন্দিত হয়ে তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছিলেন একটি পুরনো আরবী প্রবাদ দ্বারা- আপনি মিলন এবং সন্তানে আশীর্বাদপুষ্ট হোন।

প্রিয় খাদীজা (রা.), আমাদের সবার পক্ষ থেকে আল্লাহ যেন আপনাকে উত্তম প্রতিদান দেন এবং আমরা যেন জান্নাতে একত্রিত হতে পারি…

ফেইসবুকে আমরা...