ইমামুত তরীকত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (র.) প্রথমে সূফীতত্ত্বের চার তরীকায় অর্থাৎ- চিশতিয়া, কাদেরিয়া, নকশবন্দিয়া ও মুজাদ্দিদিয়ায় দীক্ষা দিয়ে পরে তাঁর মুরিদদের মুহাম্মদিয়া তরীকায় দীক্ষা দিতেন। সূফী বা আধ্যাত্মিক চিন্তাধারায় এ তরীকার কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু ছিল সমাজ সংস্কার ও জিহাদ। মুহাম্মদী তরীকায় আধ্যাত্মিক জীবন ও মারিফাতের সাথে শরীঅঅোতের আইন-কানুন প্রবর্তনের প্রতি অধিক মনোযোগ দেয়া হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, তরীকায়ে মুহাম্মদিয়া ছিল সূফী সমাজের উদাসীনতা ও ধর্মীয় আচার-আচরণের প্রতি অবজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ স্বরূপ। পীর পূজা, কবর পূজা, হজ্জ পালনে বাঁধাদান, বিধবা বিবাহে আপত্তি, শিআদের ভ্রান্ত মতবাদ ও অন্যান্য কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ইমামুল হিন্দ শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী (র.)-এর ক্ষোভও প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তাঁর পুত্র ও খলীফা সিরাজুল হিন্দ ইমাম শাহ আব্দুল আযীয দেহলভী (র.) এর তারগীব-ই-মুহাম্মদিয়া বা তরীকায়ে মুহাম্মদিয়ায়। তাঁরই নির্দেশে সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (র.) সংস্কার ও জিহাদ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। এ মুহাম্মদী তরীকার সাথে অন্যান্য তরীকার কোন মৌলিক পার্থক্য নেই। তবুও সশস্ত্র সংগ্রামের কর্মসূচি থাকায় এ তরীকায় আধ্যাত্মিক দর্শনের সাথে রয়েছে রাজনীতির প্রত্যক্ষ যোগাযোগ। বাংলা-আসামের শ্রেষ্ঠতম আলিম ও ওলী-আল্লাহ মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরী (র.) সাহেবের মতে, এ মুহাম্মদী তরীকার দ্বারা অন্যান্য চার তরীকার বিরোধিতা করা হয়নি। পূর্বোক্ত চার তরীকার সমন্বয়ে আধ্যাত্মিক ও পার্থিব উন্নতির পথ প্রদর্শিত হয়েছে এ তরীকায়। তার মতে সাইয়্যিদ সাহেব এ তরীকাকে দুই ভাগে ভাগ করেন- রাহে বিরায়েত বা আধ্যাত্মিক পথ ও রাহে নবুয়ত বা নবী প্রদর্শিত পথ মিলেই তরীকায়ে মুহাম্মদিয়া। কারো মতে তরীকায়ে মুহাম্মদিয়া বলতে ধর্মীয় সংস্কার, সমাজ সংস্কার ও সশস্ত্র সংগ্রাম বা জিহাদ আন্দোলন বুঝায়। এ আন্দোলনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের জন্যে সে সব আচার ও নীতির প্রবর্তন করা, যা হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সময় প্রচলিত ছিল। সাইয়্যিদ আহমদ (র.) বলেছেন, আমার তরীকা আমার পিতৃকূলের, নবীদের শ্রেষ্ঠ নবীর তরীকা (হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর তরীকা বা পথ)। আমি একদিন পেট পুরে আহার করি ও আল্লাহর প্রশংসা করি এবং অন্যদিন উপবাসে থেকে ধৈর্য ধারণ করি।
সমকালীন উপমহাদেশের এমন কোন সিলসিলা বা দরবেশ পরম্পরা নেই যার বরেণ্য ব্যক্তিগণ সাইয়্যিদ সাহেবকে নিজের ঊর্ধ্বে স্থান দেননি এবং তাঁর নিকট থেকে উপকৃত হননি। তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও সর্বজন মান্য হওয়া এবং তাঁর তরীকার মহত্ব ও ফদীলত, তাঁর প্রতি ভালবাসা ও আস্থা রাখা সম্পর্কে সে যামানার সকল আলিম ও শাইখ একবাক্যে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। সাইয়্যিদ সাহেবের হাতে বাইআত করার ভিতরে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সন্তুষ্টি নিহিত রয়েছে বলে বিশ্বাস করতেন। তাঁর প্রতি ভালোবাসা রাখা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের বিশেষ আলামত বলে বিবেচিত হত। মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরী সাহেব লিখেছেন তাঁর (সাইয়্যিদ সাহেবের) তরীকায় যে অগণিত বরকত ও আভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য রয়েছে তা বলাই বাহুল্য। বাহ্যিকভাবেও এতে একটি আশ্চর্যজনক বরকত পরিলক্ষিত হয়। তা হলো, কোন লোক তাঁর তরীকায় বাইআত হওয়ার ইচ্ছা করলে পূর্বাহ্নেই প্রতিমাপূজা, শিরক, বিদআত, নাচ-গান ও ঢোল-তামাশা পরিত্যাগ করার উপর দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে তবে বাইয়াত হয়। সুতরাং, সাইয়্যিদ সাহেবের দীক্ষা গ্রহণ করা এদেশে সত্যিকার অর্থেই ইসলাম গ্রহণের পরিচয় বাহক। এক সফরে রামপুর অবস্থানকালে তরীকায়ে মুহাম্মদিয়া সম্পর্কে সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী সাহেবকে প্রশ্ন করা হয়। তিনি উত্তরে বলেন, তরীকায়ে মুহাম্মদিয়ার তাৎপর্য এই প্রত্যেক মানুষের প্রতিটি কাজ যেন একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্যে হয়। যেমন- পাপ হতে বিরত থাকার জন্যে বিয়ে করা, শরীআতসিদ্ধ নিয়মে অন্ন সংস্থানের জন্যে বৈধ সম্পদ সংগ্রহ করে নিজেকে ও পরিবারবর্গকে পরমুখাপেক্ষী হতে না দেয়া, রাতের শেষে তাহাজ্জুদ নামায ও ইবাদত করার উদ্দেশ্যে প্রথম দিকে নিদ্রা যাওয়া, এভাবে জীবনের প্রতিটি কাজে একমাত্র খুদার সন্তুষ্টি লাভকেই মূল উদ্দেশ্য মনে করা তরীকায়ে মুহাম্মদিয়ার সার। মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরী (র.) বলেন, হযরত পীর সাহেব তাঁর তরীকার নাম মুহাম্মদিয়া এ কারণে রেখেছিলেন যে, কোন কোন ওলী-আল্লাহ কোন কোন নবীদের পদানুসরণ করে চলে থাকেন, যা নযর বরকদম স্বরূপ। মুর্শিদে বরহক হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর হুবহু পদানুসরণ করে চলতেন বলে তাঁর তরীকার নাম তরীকায়ে মুহাম্মদিয়া রেখেছিলেন। কলকাতায় মৌলভী গোলাম সোবহান মরহুম হযরত মুর্শিদে বরহককে প্রশ্ন করেছিলেন- আপনি আপনার তরীকার নাম মুহাম্মদিয়া কেন রেখেছেন? তিনি উত্তর দেন, উহা ‘নযর বরকদম’ এর ব্যাখ্যা স্বরূপ। এ উত্তরের বর্ণনা সাইয়্যিদ মুহাম্মদ জাহের সাহেব লিখেছেন। তিনি মুর্শিদে বরহক এর নিকটতম আত্মীয় এবং খলীফাদের মধ্যে ছিলেন। ঐ সময় তিনিও হযরত সাইয়্যিদ সাহেবের সঙ্গে ছিলেন। বর্ণনা নিম্নরূপ-তিনি বলেন, এরূপ বুঝে লও যে, কোন এক শহরের একজন বাদশাহ তার প্রত্যেক কর্ম ও ব্যবসায়ের আগ্রহ আছে। এজন্যে ঐ শহরের যত ব্যবসায়ী আছে প্রত্যেকে নিজ নিজ ব্যবসায় ও কারিগরির দ্বারা বাদশাহকে সন্তুষ্ট করে এবং তারা বাদশাহের নৈকট্যও লাভ করে। কারিগরদের মধ্যে কেউ কেউ এমন আছে যে, কেউ একটি কারিগরি জানে, কেউ দুটি কারিগরি জানে, আবার কেউ হয়তো তিনটি কারিগরি জানে, এভাবে যতই উপরে যাক প্রত্যেকেই নিজ নিজ কারিগরির তুলনায় বাদশাহের আকর্ষণ লাভ করেছে। আর যত কারিগরিই হোক না কেন প্রত্যেকটিই বাদশাহর নিকট গ্রহণীয়। মনে করুন, ঐ সকল লোকদের মধ্যে এমন লোকও আছেন, যিনি সর্ব প্রকারের কাজ ও কারিগরিতে দক্ষ এবং তিনি বাদশাহর নিকটতম। আরো মনে করুন, তাদের মধ্যে এমন লোকও আছেন, যিনি মুনশীগিরিতে অদ্বিতীয় এবং তির ব্যবহারে খুবই পটু, অশ্বারোহণে বেশ দক্ষ, এবং কুস্তিগীর পাহলোয়ান। এমন অদ্বিতীয় সৈনিক যেন তিনি যুদ্ধের মাঠে শত্রুদের সম্মুখ হতে পলায়ন করার কথা জানেন না, মিস্ত্রি ও কামারের কাজও খুব উত্তম জানেন, এভাবে যত কারিগরি আছে প্রত্যেকটির মধ্যে তাঁর বিশেষ আগ্রহ এবং দক্ষতা আছে। ঐ ব্যক্তি সর্বক্ষণ বাদশাহর দরবারে উপস্থিত থাকে। কারণ বাদশাহর যখন যে কাজের দরকার, তার দ্বারা ঐ কাজ করিয়ে নেন। এখন একথা জানা দরকার যে, পূর্ববর্তী যত বুযুর্গ লোক যারা তরীকার মালিক যেমন- হযরত খাজা মঈনউদ্দীন চিশতী (র.), হযরত খাজা বাহাউদ্দীন নকশবন্দী (র.) প্রমুখ প্রত্যেকেই আমাদের পেশওয়া (অগ্রগামী) ছিলেন এবং ঐ সকল বুযুর্গদের তরীকার মধ্যে আমি বাইআত গ্রহণ করে থাকি। আমি এ দাবি করি না যে, আমি তাঁদের চাইতে উত্তম। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আমাকে ঐ সকল বুযুর্গদের তরীকার মধ্যে ক্ষমতা দান করেছেন এবং আমি আল্লাহ তাআলার যিকর ও ইবাদতে যেরূপ মগ্ন থাকি এবং আত্মশুদ্ধি ও চরিত্র শুদ্ধির প্রতি যতটুকু দৃষ্টি রেখে থাকি, যেরূপ শক্তি আল্লাহ তাআলা হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে বিশেষভাবে দান করেছিলেন, তা হতে এ ফকীরকে সামান্য পরিমাণে কিছু দেয়া হয়েছে। আর সে শক্তিগুলো হলো-জিহাদের কাজ, হুদূদ ও কিসাসের আদেশ জারি, শিরক ও বিদআতগুলোর ধ্বংস করা ইত্যাদি। আল্লাহর রহমতে আমি ঐ কাজগুলোর সমাধান করার ক্ষমতা আমার মধ্যে বিদ্যমান দেখতে পাই। আল্লাহ তাআলা আমাকে শক্তি দান করেছেন এর দ্বারা আমি বাসনা এবং সে বাসনা দ্বারা আশা করি যেন ঘোড়ায় আরোহণ করে কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করি এবং যুদ্ধের অস্ত্র, তরবারি, নেজা, বর্শা, তির, কামান, বন্দুক ও পিস্তল বেঁধে এবং ঢাল নিজের শরীরে পরিধান করে আল্লাহ তাআলার কালিমা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহকে প্রচার করার জন্যে ঐ সকল কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করি। ঐ প্রকার প্রদত্ত শক্তির দ্বারা পরিখা খনন নিজ হাতে করতে পারি, কুড়াল হাতে করে কাঠ চিড়তে পারি, হুদূদ ও কিসাস (শরীআত অনুযায়ী শাস্তি) জারি করতে পারি। অতএব, এ খাছ নিআমতের আকাঙ্ক্ষায় আমি আমার তরীকার নাম মুহাম্মদীয়া রেখেছি। কারণ, হযরত মুহাম্মদ (সা.) ঐ সকল কাজগুলো আপন পাক জাতের দ্বারা সম্পন্ন করেছেন। জৌনপুরী সাহেব বলেছেন, যেহেতু তরীকায়ে মুহাম্মদিয়া এক কথায় হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর হুবহু অনুসরণকারী, কাজেই যাবতীয় কামালত এ তরীকার মধ্যে একত্রিত হয়ে রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ধর্ম ও মাযহাবের উপর দৃঢ় থাকার কথা যা সুরায়ে হাশরের নিম্ন আয়াতের উপর আমল করলে হাসিল হয়, এর নামই তরীকায়ে মুহাম্মদিয়া। “রাসূল তোমাদের জন্যে যে সকল আদেশ আনয়ন করেছেন তা গ্রহণ কর আর যা নিষেধ করেছেন তা হতে বিরত থাক”। (আল-কুরআন)।
তিনি বলেছেন, আসল কথা এই যে, তরীকায়ে মুহাম্মদিয়াতে প্রবেশ করলে অন্বেষণকারী সকল তরীকাতেই প্রবেশ করে। অপরদিকে তরীকায়ে মুহাম্মদিয়াকে অস্বীকার করলে সমস্ত তরীকাই অস্বীকার করা হয়। কেননা তরীকায়ে মুহাম্মদিয়া সমস্ত তরীকার সার। এ শরীআত অনুসরণ করার অর্থ সমস্ত শরীআতের অনুসরণ করা। তিনি আরও বলেছেন, তরীকারে মুহাম্মদিয়া শেষ যামানার লোকদের জন্যে কিমিয়া স্বরূপ। এ তরীকার অসাধারণ শক্তি এই যে, পীর ভাইদের মধ্যে পরস্পর ভালবাসা জন্মিয়ে দেয়। এ তরীকায়ে মুহাম্মদিয়ার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও প্রধান স্তম্ভ হল মাকামে উবুদিয়াত অর্থাৎ প্রকৃত বান্দায় পরিণত হওয়া। তিনি বলেছেন, পঞ্চম তরীকা- তরীকায়ে মুহাম্মদিয়ার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও প্রধান স্তম্ভ হল মাকামে উবুদিয়াত অর্থাৎ প্রকৃত বান্দায় পরিণত হওয়া। তিনি বলেছেন, পঞ্চম তরীকা- তরীকায়ে মুহাম্মদিয়া কোথা হতে আসলো, একথা বলা অজ্ঞতার পরিচায়ক। পূর্ব হতেই বহু তরীকা প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে। এ চার তরীকা ব্যতীত ‘চারি পীর চৌদ্দ খান্দান’ একথা যারা বলে তাদের কথা সম্পূর্ণ ভুল। প্রকৃতপক্ষে এসব কথা প্রত্যেকে নিজ নিজ জ্ঞানানুযায়ী বলে থাকে। পীরের খান্দান বহু আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত হতে থাকবে। তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের বিপরীত বিশ্বাস করবে, সে ব্যক্তিই তারীকায়ে মুহাম্মদিয়ার বিরোধী। তাঁর বর্ণনামতে- তরীকায়ে মুহাম্মদিয়ায় প্রবেশ করলে তার ফল এই হয় যে, সর্বসাধারণ স্ত্রী-পুরুষ কেবল তাওবাহ করার জন্যে এ তরীকায় প্রবেশ করলে বাইআত করার সঙ্গে সঙ্গেই তার মধ্যে এক প্রকারের আন্তরিক পবিত্রতা তৎক্ষণাৎ লাভ হয়। যে ব্যক্তি ছুলুক ইল্লাল্লাহ (আল্লাহর নৈকট্য লাভ) এই নিয়তে এ তরীকায় প্রবেশ করে সে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার মেহেরবাণীতে ৮-১০ দিনের মধ্যেই নিজ উদ্দেশ্য অথবা উদ্দেশ্য লাভের কাছাকাছি উপস্থিত হতে পারবে, যিকর ও মুরাকাবার মিষ্টতাও উত্তমরূপে বুঝতে পারবে।
হযরত মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (ছাহেব কিবলাহ ফুলতলী র.) বলেন, চার তরীকার প্রত্যেকটির নাম বিশেষ বিশেষ তরীকার বুযুর্গানদের নামে নামকরণ হয়েছে। যেমন, হযরত বড় পীরসাহেব (র.) যে তরীকার তারবিয়ত দিতেন এর নাম কাদিরিয়া তরীকা। হযরত খাজা আজমিরী (র.)-এর তরবিয়ত পদ্ধতির নাম চিশতিয়া তরীকা। হযরত খাজা বাহাউদ্দীন নকশবন্দী (র.)-এর তরবিয়ত প্রদানকৃত তরীকার নাম নকশবন্দিয়া তরীকা। হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী শাইখ আহমদ সিরহিন্দী (র.) যে তরীকার তালিম দিতেন এর নাম মুজাদ্দেদিয়া তরীকা। তেমনিভাবে আমিরুল মুমিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী (র.) যে তরীকার তারবিয়ত দিতেন এর নাম তরীকায়ে মুহাম্মদিয়া। তাঁর নিজের নামানুসারে তরীকায়ে আহমদিয়া না হয়ে তরীকায়ে মুহাম্মদিয়া হওয়াই এ তরীকার বৈশিষ্ট্য। হযরত বেরেলভী (র.)-এর পূর্বেকার তরীকতের ইমামগণের সময়ে মানুষের জাহিরী আমল তুলনামূলক উত্তম ছিল। ইমামগণ শুধু মানুষকে বাতিনী ইলম ও আমলের তালিম দিতেন। হযরত বেরেলভী (র.) প্রত্যক্ষ করেন যে, তাঁর সময়ে মানুষের জাহিরী আমল আখলাক অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে। শিরক, বিদআত ও নানা ফিরকার জটিলতায় উপমহাদেশে এক অস্বস্তিকর পরিবেশ বিরাজিত ছিল। পার্শ্ববর্তী ধর্মীয়দের অনেক আচার-অনুষ্ঠানই মুসলমানগণ মেনে চলতেন। তিনি জাহিরী আমল তথা জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলামী আদব আখলাক শিক্ষা দিতেন এবং সাথে সাথে ইলমে বাতিনেরও শিক্ষা দিতেন। যেহেতু রাসূলুল্লাহ (স.) এভাবে জাহিরী ও বাতিনী আমলের তরবিয়ত দিতেন, তাই হযরত বেরেলভী (র.) তাঁর তরীকার নাম রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নামানুসারে তরীকায়ে মুহাম্মদিয়া নামকরণ করেন। এক প্রশ্নের জবাবে হযরত ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) বলেন, তরীকায়ে মুহাম্মদিয়া সম্পর্কে হযরত সাইয়্যিদ আহমদ (র.) কে প্রশ্ন করলে, তিনি যে উত্তর দেন সে উত্তর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, তাসাউফের প্রত্যেক তরীকারই উদ্দেশ্য ছিল জাহিরী শরীআত মাফিক নিজের অন্তরকে রিয়াজত-মেহনত এবং ধ্যান দ্বারা সংশোধন করা। সাইয়্যিদ আহমদ (র.) যখন জিহাদের প্রস্তুতি নেন, তিনি প্রত্যক্ষ করেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে যেভাবে কুফরী স্থানের মধ্যে ইসলামকে বিস্তার করা দরকার ছিল সেভাবে ভারতের অন্ধকার ভূমিতে ইসলামের পুণর্জাগরণের ব্যবস্থা জিহাদ দ্বারা করতে হবে। কাজেই তরীকায়ে মুহাম্মদিয়া তাঁর তরীকার নাম রাখেন। তাঁর কাছে তরীকার শোগল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি উত্তর দেন, এ তরীকার শোগল হবে (আয়াত শরীফের অনুবাদ)- ‘আপনি বলুন, আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের উদ্দেশ্যে’। অর্থাৎ একজন মুসলমান তাঁর জীবনের প্রত্যেক মুহূর্তের কাজ আল্লাহর গোলামীর উদ্দেশ্যে করতে থাকবে এবং ‘আমরা শুধু তোমারই ইবাদত করি, শুধু তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি’। (আল-কুরআন) তা তার জীবনের সব কাজে বাস্তবায়িত করতে থাকবে। অর্থাৎ তরীকায়ে মুহাম্মদিয়ার দ্বারা একজন লোক নিজকে নিজে খালিসভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের মতের উপর বিলীন করে দিবে। এ উদ্দেশ্য জেনে ভারতবর্ষের সত্য-খাঁটি উলামাগণ ও ধর্মপ্রিয় মুসলমানগণ এ তরীকাকে পছন্দ করেন এবং তালিকাভুক্ত হন, কেউ আপত্তি করেন না। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি প্রশ্ন করি যে, সাইয়্যিদ আহমদ সাহেবের সময়ের উলামা এবং মুসলমানগণ ও তাঁর পার্শ্ববর্তী যুগের উলামা মুসলমানগণ সাইয়্যিদ আহমদ সাহেব সম্পর্কে ভাল জ্ঞাত ছিলেন, না দেড় দু’শ বছর পরের লোক তাঁর সম্পর্কে ভাল জ্ঞাত?
সাইয়্যিদ সাহেবের বিরুদ্ধে অমূলক অপবাদ
ইংরেজ রাজশক্তি ও তাদের মিত্রদের এ ধারনা বদ্ধমূল হয়, যদি সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (র.)-এর আন্দোলনকে ভারতবর্ষের উপর শক্তি সঞ্চয় করতে দেয়া হয় তাহলে রাষ্ট্রের সমূহ বিপদ ঘটবে। যেহেতু ইতোপূর্বে আরবে মুহাম্মদ ইবন আবদুল ওয়াহহাব নজদীর ধর্মের নামে সীমালঙ্ঘন ও অশুভ তৎপরতা বিশ্ব মুসলিমের ঘৃণার উদ্রেক করেছে এবং অবশেষে ওয়হ্হাবী আন্দোলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে তাই ভারতীয় মুসলমানদের এ আন্দোলনকে ব্যর্থ ও লোক চক্ষে হেয় প্রতিপন্ন করার হীন মনোবৃত্তিতে শাসক ইংরেজরা এ সংস্কার ও আযাদী আন্দোলনকে ওয়াহাবী আখ্যা দিয়েছে। তারা এ প্রয়াসে কিছু সংখ্যক বিদআতী ও ফাসাদ সৃষ্টিকারীকে হাতিয়ার হিসেবে প্রচারণা কার্যে ব্যবহারও করেছে। ঐ সকল ইংরেজ মদদপুষ্ট হীনমনোবৃত্তির লোকেরা মুজাহিদদের নামে অযথা কুৎসা রটনা ও মিথ্যা ভাষণ দিয়েছে এবং তাদের আন্দোলনকে ওয়াহাবী নামাঙ্কিত করার অপচেষ্টা করেছে। মূলত, শাহ ওয়ালীউল্লাহ (র.), শাহ আবদুল আযীয (র.) ও সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ (র.) তাঁদের কারো মুহাম্মদ ইবন আবদুল ওয়াহ্হাব নজদী বা তার অনুগামীদের সাথে কোন সম্বন্ধ ছিলন। তাঁরা (উক্ত বুযুর্গগণ) ওয়াহাবী ছিলেন না বা তাঁদের সংস্কার আন্দোলন ওয়াহাবী আন্দোলন ছিল না। তাঁরা সবাই ছিলেন তরীকতের বুযুর্গ। মাওলানা উবাইদুল্লাহ সিন্ধী বলেন, ‘তাসাউফের বাইআতকে শাহ ওয়ালীউল্লাহ রাজনৈতিক আন্দোলনের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।’ তাই তাঁর বিপ্লব ও রাজনীতি ধর্ম বিবর্জিত ছিল না। আসলে ইসলাম রাজনীতি বিবর্জিত নয়। তাঁর পুত্র শাহ আবদুল আযীযও তাঁর মতবাদে দীক্ষা নিয়েছিলেন। তাঁরা মুসলমানদের ইমাম বা নেতা ছিলেন। এ বিষয়ে সত্যেন সেন বলেন, ‘মূলত, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিদেশি ও বিধর্মীদের শাসন অসহনীয় বলে তাদের কাছে মনে হয়েছিল। কিন্তু যে কোন ধর্মই হোক, ধর্মীয় জীবন বৈষয়িক জীবন থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে পারে না।’ সাইয়্যিদ আহমদ (র.) ছিলেন তাঁদেরই অনুসারী ও ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ। কালের দীর্ঘ পরিক্রমায় যারাই যখন বিজয়ী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, তখনই ইতিহাসকে তারা নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে লিপিবদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। এমনিভাবে ইংরেজ সরকারের বেতনভুক রাজকর্মচারী হান্টার সাহেবও তার লিখিত ‘দি ইন্ডিয়ান মুসলিম’ গ্রন্থে বিভিন্ন স্থানে হযরত সাইয়্যিদ আহমদ (র.) সম্পর্কে অশোভন উক্তি করেছেন। শেষ পর্যন্ত তিনি উক্ত গ্রন্থের এক জায়গায় লিখেছেন- একটা আধুনিক নেশন এর অভাব সংকট সমাধানের উপযোগী করে কুরআন লিখিত হয়নি। তা লিখিত হয়েছিল একটা স্থানীয় যুদ্ধ প্রিয় আরব গোত্রের উৎপীড়িত আক্রমণকারী ও বিজয়ী সম্প্রদায়ের ক্রমিক ভাগ্য পরিবর্তনের ভূমিকার উপযোগী করে। ঐশী মহাগ্রন্থ সম্বন্ধে যিনি ধৃষ্ঠতা দেখাতে পেরেছেন, সে পণ্ডিত মূর্খ ব্যক্তিটি যামানার একজন মুজাদ্দিদ ও তাঁর আন্দোলনকে উপলব্ধি করতে পারেননি। অর্থের লোভে প্রভুর মনোরঞ্জনে ছত্রছায়ায় যে ইতিহাস তিনি লিখেছিলেন তা যে প্রকৃত ইতিহাস ছিল না, ইংরেজ ও তাদের সহযোগীদের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে রচিত অসত্য ইতিহাস, তা ধরা পড়েছে কালের অমোঘ নিয়মেই। উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী (র.) অমর হয়ে আছেন।
সাইয়িদ আহমদ বেরেলভী (র.) যখন ভারতে সংস্কার আন্দোলনের প্রবর্তন করেন তখনও তিনি আরব দেশে যাননি। তাঁর দল অনেকটা দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত হবার পর তিনি তাঁর মুর্শিদ শাহ আবদুল আযীয সাহেবের নির্দেশে হজ্জ ও যিয়ারত উপলক্ষ্যে মক্কা শরীফ ও মদীনা শরীফে গমন করেন এবং তথায় সঙ্গী-সাথিসহ কিছুকাল অবস্থান করেন। বাদশাহ আকবর হজ্জ যাত্রীদের উপর বিধি নিষেধ আরোপ করায় তখন থেকে হজ্জ পালনে বিতর্ক চলে আসছিল। সাইয়্যিদ সাহেব এক বিরাট কাফেলা নিয়ে হজ্জ সমাধা করেন। হজ্জ যাত্রাকালে উপমহাদেশের তাঁর দীর্ঘ সফরের উদ্দেশ্য ছিল যেন সবাই জেনে নিতে পারে হজ্জ করা ফরয। এক্ষেত্রে শৈথিল্য প্রদর্শন চলে না। এ সফরে যে দিক দিয়ে তিনি চলতেন সেখানকার হাজার হাজার লোক তাঁর সহযাত্রী হয়ে যেত। এতে করে ব্যাপকভাবে মানুষের অন্তরে হজ্জের আগ্রহ সৃষ্টি হয় এবং সাংগঠনিক অভিজ্ঞতাও লাভ করেন। তিনি যে সংস্কার আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন এর রূপরেখা প্রণয়নকারী হচ্ছেন তাঁর তরীকার ঊর্ধ্বতন বুযুর্গ ইমামুল হিন্দ শাহ ওয়ালীউল্লাহ (র.)। পরবর্তিতে এ আন্দোলনই উপমহাদেশে আযাদী আন্দোলনে রূপ নেয়। ঐতিহাসিক রমেশ চন্দ্র মজুমদার লিখেছেন- ইহা ছিল বৃটিশ রাজত্বে মুসলমানদের প্রথম মুক্তি সংগ্রাম। উল্লেখ্য, শাহ আবদুল আযীয (রহ.) পূর্বেই সাইয়্যিদ সাহেবকে জিহাদ আন্দোলনের নেতা মনোনীত করেন এবং উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে তাঁর শিষ্যদের কাছে এ মর্মে পত্র দেন যে, তাঁরা যেন সাইয়্যিদ সাহেবের নির্দেশে চলেন। তাই, আরবে তিনি ওয়াহাবী নেতাদের দ্বারা প্রভাবান্বিত হবার কোন যুক্তি নেই।
পীর-ফকিরী, কবর-মাযার যিয়ারতের বিরুদ্ধাচরণ করা ওয়াহাবীদের প্রধান নীতি। ওয়াহাবী আন্দোলনের সময় অধিকৃত অঞ্চলের সমস্ত মাযারসমূহ ধ্বংস করা হয়েছিল। এমনকি তারা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর রওদা শরীফের পর্যন্ত ক্ষতি সাধন করে। ওয়াহাবী মতবাদ গ্রহণে জোরপূর্বক সকলকে বাধ্য করত। মুহাম্মদ ইবন আবদুল ওয়াহিাব দলীল প্রমাণ ছাড়াই নির্দোষকে কতল করার অনুমতি দিতেন। তিনি বলতেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো দুআ চায় বা নবী, বাদশাহ কিংবা কোন আলিমের মধ্যস্থতায় দুআ প্রার্থনা করে, সে মুশরিক; চাই সে আন্তরিকভাবে প্রার্থনা করুক অথবা তা অস্বীকার করুক, চাই সে এ ধরনের বিশ্বাস পোষণ করুক অথবা না করুক। ওলী-আউলিয়াদের মাধ্যমে দুআ করাও তিনি কুফরী বলে সাব্যস্ত করেছিলেন। এতে যারা সন্দেহ পোষণ করবে, তারাও তার মতে কাফির বলে গণ্য হবে। এ সব বিষয়ে যারা তার সঙ্গে একমত ছিলেন না, তাদের সঙ্গে জিহাদ করা তিনি জরুরি মনে করতেন এবং সম্ভব হলে তাদেরকে কতল করা সঙ্গত বলে জ্ঞান করতেন। তাদের ধন-সম্পদ লুট করা বৈধ মনে করতেন। অথচ সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ (র.) বা তাঁর অনুসারীরা কখনো কবর-মাযার যিয়ারতের বিরোধীতা করেননি। তিনি যেখানে যেতেন তাঁর মুরীদ হওয়ার জন্যে দলে দলে লোক ভিড় জমাতেন এবং মুরীদ হওয়াকে সৌভাগ্য মনে করতেন। দশ-বারো হাজার লোক একেকবার তাঁর হাতে বাইআত করতেন। হিন্দু, যোগী, বৌদ্ধ ও শিআদের বিরাট সংখ্যক লোক তাঁর অমিয় বাণী শুনে খাঁটি মুসলমানে পরিণত হয়েছেন। তাঁর দর্শনলাভে মানুষের অন্তর তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হত। ফলে তারা তাঁর মুরীদ হতে বাধ্য হতেন। শুধু তাঁর হজ্জ সফরকালে এক লক্ষ লোক তাঁর নিকট বাইআত করার সৌভাগ্য লাভ করেন। এঁদের ভিতর বিপুল সংখ্যক আলিম ছিলেন। তাঁর খলীফাদের ধারা পরম্পরায় যত মানুষ বাইআত প্রাপ্ত হন, সে হিসেবে তাঁর মুরিদের সংখ্যা অসংখ্য, অগণিত। এমতাবস্থায়, বিদআতী ও কলহপ্রিয় লোকগণ তাঁর তরীকা হতে মানুষকে ফিরিয়ে রাখতে ও নানাভাবে ধোঁকা দিতে তাঁর প্রতি মিথ্যা অপবাদ দেয়ার অপচেষ্টা করছে মাত্র। চার মাযহাবের যে কোন একটির অনুসারী হওয়া সুন্নী মুসলমানের জন্যে অতীব প্রয়োজনীয়। সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ (র.) ও তাঁর অনুসারীরা মাযহাবপন্থী। সাইয়্যিদ সাহেব হানাফী মাযহাবের অনুবর্তি হিসেবে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনধারা অনুকরণ করতেন। অপরাপর ইমামগণের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে তিনি নিজেকে হানাফী হওয়ার দরুন গর্ব প্রকাশ করতেন। জৌনপুরী সাহেব বলেছেন, মুর্শিদে বরহক (সাইয়্যিদ সাহেব) খিলাফতনামায় তকলীদ করার আদেশ করেছেন এবং তিনি নিজেও ইমাম আযম (র.)-এর মুকাল্লিদ ছিলেন। তাঁর সভায় যখনই হাদীসের কোন কিতাব পাঠ করা হত এবং ইমাম শাফিঈ (র.)-এর মাযহাব অনুযায়ী যখন কোন হাদীস পাওয়া যেত তখনই তিনি বলতেন, এ মাসআলার বিষয় আমাদের ইমাম আযম (র.) যে হাদীসের দ্বারা প্রমাণ গ্রহণ করেছেন তা-ও পাঠ করো। তিনি তাঁর মুরিদগণকে মুজাদ্দিদে আলফেসানী শাইখ আহমদ সিরহিন্দী (র.)-এর লেখাগুলোর উপর আমল করার বিশেষ আদেশ ও অসীয়ত করতেন। ফুকাহাদের তকলীদ করার জন্যেও জোর তাকীদ দিতেন। ওয়াহাবীরা গাইর মুকাল্লদ অর্থাৎ মাযহাব মানে না।
সাইয়্যিদ আহমদ (র.) ও তাঁর সংস্কার আন্দোলন সম্পর্কে এবং তাঁকে হেয় প্রতিপন্ন করার বহু অপচেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু এ সত্য সকলেই স্বীকার করেছেন, তিনি হিন্দুস্তানে প্রচলিত চার তরীকার ফকীরীতে বিশ্বাসী ছিলেন। যেখানে যেতেন দলে দলে লোক তাঁর মুরীদ হতেন। বহু মশহুর আলিম তাঁর মুরীদ ছিলেন। সুতরাং, এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া অত্যন্ত সহজ যে, যামানার বহু মশহুর আলিম যার মুরিদ পর্যন্ত হয়েছেন তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাস ও কার্যকলাপ যাবতীয় সন্দেহের ঊর্ধ্বে। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, আমার পরে বারোজন ইমাম আসবেন। প্রত্যেকে কুরাইশ বংশের হবেন। তাতে মুহাদ্দিসীনগণ ব্যাখ্যা করেছেন প্রত্যেক শতাব্দীতে একজন ইমাম বের হবেন। তন্মধ্যে দ্বাদশ ইমাম হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (র.) বলে সে যুগের উলামাগণ স্বীকার করে নিয়েছেন। উল্লেখ্য, সাইয়্যিদ সাহেবের নসবনামা তাঁর পিতা সাইয়্যিদ মুহাম্মদ ইরফান হতে হযরত ইমাম হাসান (রা.) বিন আমিরুল মুমিনীন ইমামুল আউলিয়া সাইয়্যিদুনা হযরত আলী (রা.) পর্যন্ত পৌঁছেছে। হযরত মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরী (র.) তাঁর লিখিত একাধিক কিতাবে তাঁর পীর ও মুর্শিদ হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী (র.)-এর জীবন ও কর্ম এবং ওয়াহাবীদের সম্বন্ধে আলোচনা ও বিরুদ্ধে সমালোচনা লিখেছেন। তাঁর বর্ণনামতে সাইয়্যিদ সাহেব ছিলেন তেরশ’ শতকের একজন মুজাদ্দিদ। তিনি বলেন- যে কেউ হযরত সাইয়্যিদ সাহেবের কাফেলা দেখেছে, তথাকার জুমুআসহ পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের গুরুত্ব, শরীআতের ক্ষুদ্র-বৃহৎ সকল প্রকার বিধি-বিধানের যথাযথ বাস্তবায়ন ও দ্বীন-ধর্মে তাদের অবিচলতা এবং তাদের বিনয়-নম্রতা, মুরাকাবা ও তাওয়াজ্জুহের প্রভাব লক্ষ্য করেছে, এমনকি তাদের তৃণ ও জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ এবং বোঝা বহন করার অবস্থা অবলোকন করেছে, সে একথা পরিষ্কারভাবে জানতে পেরেছে যে, সকল কাজ-কর্মে কাফেলার পীর-মুরীদ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত ও আমির-ফকীরের মধ্যে কোন ভেদাভেদ নেই। একমতে এক পথেই ছিল তাদের যাত্রা। জিহাদী হিম্মত, শক্তি-সাহসিকতা ও দৃঢ়তায় কেউ কারো চেয়ে কম ছিলেন না। ঐ ব্যক্তি অনুমান করতে সক্ষম হবে যে, সাইয়্যিদ সাহেব কত উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন মহান বুযুর্গ ছিলেন। তার সামনে দিবালোকের ন্যায় উজ্জল হয়ে যাবে যে, এমন পাকাপোক্ত মুসলমানদের প্রতি হিংসা পোষণকারী মুনাফিক আর কাফির বৈ কিছুই হতে পারে না। যামানার অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলিম, ওলীয়ে কামিল হযরত মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (ছাহেব কিবলাহ ফুলতলী র.) বলেন, ‘যদি মুহাম্মদিয়া নাম হলেই মুহাম্মদ ইবন আবদুল ওয়াহাব নজদী বুঝায় তবে মুসলমানদের নামের আগে মুহাম্মদ লিখলেই তাকে ওয়াহাবী বলা শুদ্ধ হবে এবং কারো নামের শেষে আহমদ লিখলেই তাকে মির্জা গোলাম আহমদ এর উম্মত বলা যাবে! আসলে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নামানুসারে সাইয়্যিদ সাহেব তাঁর তরীকার নাম দিয়েছিলেন তরীকায়ে মুহাম্মদিয়া। কেননা হযরত মুহাম্মদ (সা.)-ই হলেন সকল মত, মাযহাব ও তরীকার কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর তরীকাই মৌলিক তরীকা। আমাদের বাংলাদেশের হাজীগঞ্জের (সাবেক থানা) ওয়ারোক বাজার হাইস্কুল প্রাঙ্গণে ১২ পৌষ মুতাবিক ২৮ ডিসেম্বর ১৯৭৪ইং এক সুন্নী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে পরের দিন ১৩ পৌষ, ২৯ ডিসেম্বর আলোচনায় সকলেই একমত হন- হযরত সাইয়্যিদ আহমদ বেরেলভী (র.) সুন্নী আকিদার একজন শুদ্ধপন্থী বুযুর্গ ছিলেন। (দ্রষ্টব্য: মাহবূবে খোদাকে ভাই বলিল কাহারা? প্রণেতা: মাওলানা শেখ মোঃ আবদুল করিম, ২য় প্রকাশ (বর্ধিত আকারে), ১৯৭৮ইং পৃষ্ঠা ১৫, ১৬, ১৭ ও ১৮।)
সাইয়্যিদ সাহেব যামানার মুজাদ্দিদ ছিলেন
হযরত মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরী (র.)-এর মতে ধর্মীয় ব্যাপারে যখন নানা প্রকারের অবিচার আরম্ভ হয়, তখন আল্লাহ তাআলা ধর্মকে শক্ত ও মজবুত করার জন্যে এমন এক ব্যক্তি প্রেরণ করে থাকেন, যার মধ্যে অলৌকিক সাহায্য ও শক্তি বর্তমান থাকে। অতএব, এ যুগের মুজাদ্দিদ ও সাহেবে তরীকা হলেন আমিরুল মুমিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ সাহেব। তিনি ধর্মকে নব জীবন দান করেছেন। জনাব সাইয়্যিদ সাহেবের মুজাদ্দিদ হবার বিষয় জৌনপুরী সাহেব বলেন- হযরত আবূ হুরাইরা (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা প্রতি একশো বছরের মাথায় উম্মতের জন্যে একজন লোক প্রেরণ করেন যিনি দ্বীনকে সংস্কার ও পুনর্জীবন দান করেন।’ এ উম্মতের হিদায়াতের জন্যে আল্লাহ কুতবুল আফতাব, আমিরুল মুমিনীন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ সাহেবকে তের’শো শতাব্দীর মুজাদ্দিদরূপে প্রেরণ করেছিলেন। তিনি ধর্মকে নবজীবন দান করেছেন। খোদার যিকর ও মুরাকাবা এত সহজবোধ্য এবং মুশাহাদার হাকীকত এত সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, এমন নিআমত বহু বৎসর হতে লাভ করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু এ হযরতের তরীকার দ্বারা দশ-পনের দিনের মধ্যে লাভ হয়ে থাকে।
সাইয়্যিদ সাহেব ‘মুজাদ্দিদে যমানা’ হবার প্রমাণস্বরূপ তিনি কতকগুলো উদাহরণ উল্লেখ করেছেন- হযরত আমিরুল মুমিনীন সাইয়্যিদ আহমদ সাহেব তের’শো শতাব্দীর (১২০১ হিজরী) প্রথমে জন্মগ্রহণ করেন এবং ধর্মকে নবজীবন দান করেন। আর এ বিষয় পরবর্তী আলিমগণ ও আরিফগণ ভাল করেই জানেন। এমনকি তা লোকজনের নিকট বর্ণনাও করে থাকেন। এখানে কয়েকটি আলামত উল্লেখ করা একান্ত প্রয়োজন, যাতে বিশিষ্ট ও সাধারণ সকলেই অবগত হতে পারেন। সাধারণ লোকের অবগতির জন্যে যথেষ্ট যে, হযরত মুর্শিদে বরহক এদেশ হতে শিরক, কুফরী চাল-চলন, কাফিরদের পর্ব ইত্যাদিতে যোগদান এবং বিদআত, ফিছুক-ফুজুরী হতে পবিত্র করেছেন। তাতে পরিষ্কারভাবেই পরিদৃষ্ট হয় যে, হযরত সাইয়্যিদ সাহেবের সময় হতে আযান, নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি শরীঅোতের কাজগুলো ভালোভাবে প্রচলিত হয়। জুমুআর নামায, জামাআত এবং নামাযীর সংখ্যাও বেড়ে যায়। গ্রামে-গ্রামে শহরে-শহরে পুরাতন মসজিদগুলো আবাদ হয় এবং নতুন মসজিদও প্রস্তুত হয়। সন্তান জন্মগ্রহণ করলে আকীকা প্রদান ও বিয়ের সময় যিয়াফত খাওয়ার নিয়ম প্রচলিত হয়। নাচ, গান, আতশবাজি, মাথায় মুকুট পরা, গান-বাদ্য ইত্যাদি ধর্ম বিবর্জিত নিয়ম-পদ্ধতি এবং কাফিরদের সমতুল্য হওয়াকে সম্পূর্ণ বর্জন করে। কিন্তু তাঁর (সাইয়্যিদ সাহেবের) প্রকাশ হওয়ার পূর্বে দেশের অবস্থা এতই শোচনীয় ছিল যে, এ ফকির যখন পাঁচ বার আযানের প্রচলন করেন তখন কোন কোন অশিক্ষিত মুসলমান বলত যে, ভোরে ও সন্ধ্যায় আযান শ্রবণ করেছি কিন্তু দিনের আযান তো কখনো শুনিনি। নতুন নতুন কথা বের হয়েছে। আর মসজিদগুলোর এমন অবস্থা ছিল যে, লোকেরা তথায় নাচ করত, হিন্দুদের বরযাত্রী দল একত্রিত হত এবং মদ্যপান করা হত। দেশের অবস্থা এতই শোচনীয় ছিল যে, কোন কোন হাফিজ, কারী, মৌলভী এবং দরবেশ নামধারী লোক তাজিয়া প্রস্তুত করত। আর কতকগুলো বুযুর্গ নামধারী লোক তাজিয়া দর্শনে অস্থির হয়ে ক্রন্দন করত ও তা দেখে সম্মানার্থে দণ্ডায়মান হত। জনাব সাইয়্যিদ সাহেবের তরীকার দ্বারা লোকেরা ধর্ম পথ লাভ করেছে। সকল লোক শিরক, বিদআত, ঢোল, বাদ্য, নাচ, আতশবাজি, বিবাহকালে মুকুট পরিধান করা, ব্রাহ্মণপূজা, হুরী, বসন্ত, দেওয়ালি ইত্যাদিতে আমোদ-প্রমোদ করা এবং হিন্দুদের যাবতীয় চালচলন একেবারেই ছেড়ে দিয়েছে।

