Logo
মুসলিম উম্মাহ’র বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের নতুন ক্রুসেড
মারজান আহমদ চৌধুরী
  • ২২ জুন, ২০২৬

ক্রুসেড শব্দের সংজ্ঞা নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও ইতিহাসে ক্রুসেড বলতে মূলত ১০৯৫ থেকে ১২৯১ সাল পর্যন্ত চলমান কয়েকটি যুদ্ধকে বুঝানো হয়। জেরুযালেমের অধিকার নেয়ার জন্য ইউরোপীয় খ্রিস্টানদের সম্মিলিত শক্তি ওই সময়ের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ’র বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি যুদ্ধ পরিচালনা করেছিল। ১০৯৯ সালে খ্রিস্টানদের হাতে প্রায় এক লক্ষ মুসলমানের শাহাদত ও জেরুযালেম দখল করা ক্রুসেড ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তবে ১১৮৭ সালে খ্রিস্টানদের হাত থেকে জেরুযালেম পুনরুদ্ধার করে সেই ইতিহাসকে পাল্টে দিয়েছিলেন ইসলামের বীর সেনানী সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ুবী। এরপরও বহুবার ক্রুসেডাররা মুসলিম বিশ্বে হামলা চালিয়েছে। ১২৯১ সালে ক্রুসেড যুদ্ধ শেষ হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও সত্য এর থেকে ভিন্ন। ক্রুসেড শেষ হয়নি; রঙ পাল্টেছে মাত্র।

গত শতাব্দীর শেষদিকে, ৯০’র দশকে প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের মাধ্যমে পশ্চিমারা মুসলিম উম্মাহ’র বিরুদ্ধে এক নতুন ক্রুসেড শুরু করেছে। আফগানিস্তানে তালেবানের ইসলামী ইমারাত ও ইরাকের ক্রমাগত শক্তিসঞ্চারে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পশ্চিমা বিশ্ব ২০০১ সাল থেকে পূর্ণশক্তি নিয়ে মুসলিম উম্মাহ’র বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। অনেকে এই বলে আপত্তি করতে পারেন যে, পশ্চিমারা এসব যুদ্ধকে ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ বলেনি। বরং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বলে আসছে। তাহলে লেখক কেন ক্রুসেড বলছেন? জবাব হচ্ছে, স্বয়ং জর্জ ডব্লিউ বুশের মুখ থেকে ক্রুসেড শব্দটি উচ্চারিত হয়েছিল। টুইন টাওয়ার হামলার পাঁচদিন পর, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০০১ তারিখে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভাষণে বুশ বলেছিলেন, “এই ক্রুসেড সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, এই যুদ্ধ কিছুদিন চলমান থাকবে।” তার পরবর্তী কর্মকাণ্ড স্বাক্ষী দিয়েছে যে, তিনি বুঝেশুনেই ক্রুসেড শব্দ ব্যবহার করেছেন এবং তার তথাকথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ মূলত মুসলিম নিধন ও খ্রিস্টান বিশ্বব্যবস্থা বিনির্মাণের একটি উদ্যোগ ছিল। Paul Vallely তার গবেষণা The Fifth Crusade -এ যা লিখেছেন তার সারকথা হচ্ছে, বুশ ও তার প্রশাসন এবং ইয়াহুদী কর্তৃপক্ষ সুচিন্তিতভাবে একটি কথিত ভালো ও খারাপের যুদ্ধে জড়িয়েছে। তাদের মতে, তারা ভালো (Good) এবং মুসলিমরা খারাপ (Evil)। কিছু ফাঁস হওয়া চিঠি থেকে জানা যায়, তাদের পরিকল্পনা ছিল প্রথমে ইরাক ধ্বংস করা। এর মাধ্যমে একটি প্রক্রিয়া শুরু হবে যাতে এক এক করে সিরিয়া, লেবানন, লিবিয়া, সৌদি আরব ও ইরানকে অস্থির করা যাবে, অথবা ওসব রাষ্ট্রের সরকারকে উৎখাত করা যাবে। একইসাথে ইসরায়েল পশ্চিম তীর ও গাজাকে সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করে ফিলিস্তিনকে খতম করবে। আমেরিকার নিও-কন খ্রিস্টান ও ইসরায়েলের যায়নিস্ট ইয়াহুদীরা সম্মিলিতভাবে এই পরিকল্পনা সম্পন্ন করেছে।

বর্তমান সময়ে সারাবিশ্বে একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা বিনির্মাণের কাজ চলছে, যা শুরু হয়েছিল ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে। সাধারণ মানুষকে ভুলিয়ে রাখার জন্য প্রকৃত উদ্দেশ্যকে গোপন রেখে এটিকে New World Order নামে ডাকা হয়। এই বিশ্বব্যবস্থার সারথি হলো খ্রিস্টান ও ইয়াহুদীরা। বর্তমান খ্রিস্টান বিশ্বে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে সবচেয়ে শক্তিশালী গোষ্ঠী হচ্ছে নিও-কন। এই নিও-কনরা প্রোটেস্টেন্ট ও ইভ্যাঞ্জেলিক ফিরকার অনুসারী। অনেকেই জানেন না যে, ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদের মধ্যে অনেক ফিরকা রয়েছে। সিনিয়র বুশ, জর্জ ডব্লিউ বুশ, ডিক চেনি, ডোনাল্ড রামসফেল্ড, ডোনাল্ড ট্রাম্প সবাই নিও-কন ধারায় উদ্বুদ্ধ ছিল। ধর্মীয়ভাবে ততটা ধার্মিক না হলেও সাংস্কৃতিকভাবে তারা বিশ্বব্যাপী একটি খ্রিস্টান সাম্রাজ্য কায়িমের স্বপ্ন দেখে। অনেকটা ইয়াহুদী যায়নিস্টদের মতো, যারা ধার্মিক নয়, কেবল সাংস্কৃতিকভাবে ইয়াহুদী। যেভাবে যায়নিস্টদের দ্বারা ইয়াহুদী রাষ্ট্র ইসরায়েল কায়িম হয়েছিল, নিও-কনরাও বিশ্বব্যাপী একটি খ্রিস্টান সাম্রাজ্য কায়িম করতে চায়। ইয়াহুদী যায়নিস্টদের (যারা নিজেদেরকে সাংস্কৃতিকভাবে ইয়াহুদী মনে করে) মতো নিও-কনদের মধ্যেও খ্রিস্টান যায়নিজম (যারা নিজেদেরকে White Anglo-Saxon Protestant বলে) নামক মতবাদ তৈরি হয়েছে। এখানে ইয়াহুদী ও খ্রিস্টান বিশ্বব্যবস্থা দ্বারা উদ্দেশ্য এই নয় যে, ওই নতুন বিশ্বব্যবস্থা ইয়াহুদী বা খ্রিস্টান ধর্মের আদর্শ অনুযায়ী বিশ্ব চলবে। বেশিরভাগ ইয়াহুদী ও খ্রিস্টান তাওরাত ও ইঞ্জিলকে জীবনবিধান হিসেবে মানেই না। তাদের কাছে খ্রিস্টান ও ইয়াহুদী শব্দগুলো কেবল সাংস্কৃতিক পরিচয়। নতুন বিশ্বব্যবস্থা হচ্ছে সারা বিশ্বকে একটি বিশ্বগ্রাম (Global Village) বানিয়ে কিছু এলিট শ্রেণির লোক পরোক্ষভাবে এর ক্ষমতা হাতে নেবে এবং বাকিরা তাদের দাস হয়ে খেটে যাবে। এই বিশ্বব্যবস্থার রাজনৈতিক আদর্শ সেক্যুলারিজম, যা তথাকথিত গণতন্ত্রের পিঠে ভর করে চলবে। অর্থনৈতিক দর্শন হবে পুঁজিবাদ, আর সমাজব্যবস্থা হবে অবাধ খোলামেলা। লৈঙ্গিক পার্থক্য, যৌনতা, পারিবারিক ও ধর্মীয় নৈতিকতার কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম এই সমাজে থাকবে না। বিভিন্ন রাষ্ট্র পরষ্পরের সাথে যুদ্ধে জড়াবে, যাতে পশ্চিমা অস্ত্রশিল্প চাঙ্গা থাকে। খাদ্য হবে প্যাকেটজাত, যাতে ক্ষেতখামার ছেড়ে সবাইকে পশ্চিমা খাদ্য প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর ওপর ভরসা করতে হয়। ফ্যাশন বা সৌন্দর্যের মাপকাঠি নির্ধারণ করবে ওই এলিট শ্রেণি, যাতে সেই মাপকাঠিতে উতরানোর জন্য সবাই উঠেপড়ে লাগে এবং পশ্চিমা ফ্যাশন ও প্রসাধনী শিল্প চাঙ্গা থাকে। সাধারণ মানুষ দাসের মতো খাটবে, আর পুঁজিবাদের হাতিয়ার তথা ব্যাংক, বীমা, শেয়ার বাজার ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে পৃথিবীর সমস্ত সম্পদের মূল অংশ গিয়ে জমা পড়বে ওই এলিট শ্রেণির হাতে। বিশ্বের ৫০-৬০% সম্পদের মালিক হবে ৫% মানুষ। বাকি সম্পদ নিয়ে পুরো মানবজাতি লড়াই করবে। এই নতুন বিশ্বব্যবস্থার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পদ্ধতি নিয়ে ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানরা একমত হলেও ধর্মীয়ক্ষেত্রে তাদের চাহিদা ভিন্ন ভিন্ন। ধার্মিক খ্রিস্টানরা এই বিশ্বব্যবস্থা থেকে যা চায়, ধার্মিক ইয়াহুদীরা এর থেকে ভিন্ন কিছু চায়। তবে যেহেতু এই বিশ্বব্যবস্থা বিনির্মাণের দায়িত্ব ধার্মিকদের হাতে নয়, বরং যায়নিস্ট ও নিও-কন প্রমুখ সেক্যুলারদের হাতে, তাই ধর্মীয় চাওয়া-পাওয়া এখানে মুখ্য নয়।

এই বিশ্বব্যবস্থা বিনির্মাণে পশ্চিমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু মুসলিম উম্মাহ। ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত স্যামুয়েল হান্টিংটনের The Clash of Civilizations -এ দেখানো হয়েছিল যে, অচিরেই পৃথিবীতে সভ্যতার সংঘাত হবে এবং পশ্চিমা সভ্যতার (খ্রিস্টান ও ইয়াহুদী) জন্য সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে মুসলিম সভ্যতা ও চৈনিক সভ্যতা। তবে চীন থেকেও মুসলিম উম্মাহ এ ক্ষেত্রে তাদের প্রধান বাধা। কারণ মুসলিম উম্মাহ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। বিশাল একটি অঞ্চল মুসলমানদের পায়ের নিচে আছে, যেখানে প্রচুর খনিজ সম্পদ রয়েছে।
নিও-কন ও যায়নিস্টদের নতুন বিশ্বব্যবস্থার পথে তাৎক্ষণিক বাধা ছিল আফগানিস্তানের ইসলামী ইমারাত, দিকে দিকে গড়ে ওঠে ইসলামী পুনর্জাগরণের ঢেউ, পাকিস্তান, ইরাক, সিরিয়া ও ইরানের শক্তিবর্ধন এবং খনিজ তেলের ওপর মুসলিম উম্মাহ’র মালিকানা। ওদিকে ইউরোপ আবার নিও-কন ও যায়নিস্টদের পরিকল্পনায় রাজি ছিল না। তাই ইউরোপের নেতৃবৃন্দ ও আমেরিকার জনগণকে রাজি করানোর জন্য ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার হামলার নাটক সাজানো হয়। এর পর থেকে পশ্চিমারা এক হয়ে War On Terrorism বা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নামক এক খোঁড়া যুক্তি দিয়ে তাদের প্রধান শত্রু মুসলিম উম্মাহ’র বিরুদ্ধে নতুন ক্রুসেড পরিচালনা করার বৈধতা অর্জন করেছে।

আমেরিকা-ইউরোপ-ইসরায়েল এই ত্রয়ী ছাড়াও রাশিয়া, চীন ও ভারত সমসাময়িক বিশ্বরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০০১ এর পর আমেরিকা রাশিয়াকে নতুন বিশ্বব্যবস্থা বিনির্মাণের যাত্রায় সঙ্গী করতে চেয়েছিল। Paul Vallely বলেছেন, “বুশ পুতিনের সাথে সাক্ষাত করে তাকে ইশ্বরের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন।” কিন্তু রাশিয়া যেহেতু নিজেই বিশ্ব নেতৃত্ব চায়, তাই তারা আমেরিকার সাথে একই স্বপ্নের সারথি হতে রাজি নয়। চীনও বিশ্বজুড়ে নিজেদের অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য কায়িম করতে চায় এবং এক্ষেত্রে তাদের প্রধান বাধা পশ্চিমা বিশ্ব। তাই চীন কট্টর ইসলাম বিরোধী হলেও পশ্চিমাদের ক্যাম্পে যেতে রাজি নয়। কিন্তু ভারত অন্তত বর্তমান সময়ে পশ্চিমাদের ক্যাম্পে আছে। বিজেপি নেতৃত্বাধীন হিন্দুত্ববাদীরা দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে অখণ্ড হিন্দুরাজ্য কায়িম করার স্বপ্ন দেখছে৷ এতে তাদের সামনে প্রধান বাধা মুসলমানরা। ভারতেই বিশ কোটির ওপরে মুসলমান। আবার পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাই ভারত শত্রু বলতেই মুসলমানদেরকে দেখে। ওদিকে স্যামুয়েল হান্টিংটনের Clash of Civilizations থিওরি অনুযায়ী, ভারত পশ্চিমাদের জন্য এবং পশ্চিমারা ভারতের জন্য বিপজ্জনক নয়। তাই মুসলমানদের বিরুদ্ধে ভারত আজ পশ্চিমাদের সাথেই আছে।
এ তো গেল সশস্ত্র ক্রুসেডের কথা। কিন্তু ক্রুসেড এখানে শেষ নয়। সশস্ত্র ক্রুসেডের পাশাপাশি পশ্চিমারা মুসলিম উম্মাহ’র বিরুদ্ধে, আরও স্পষ্ট করে বললে ইসলামী পুনর্জাগরণের বিরুদ্ধে আরেকটি যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে– বুদ্ধিবৃত্তিক ক্রুসেড। সশস্ত্র ক্রুসেড সহজে বুঝা গেলেও বুদ্ধিবৃত্তিক ক্রুসেডকে ততটা সহজে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। তাই বেশিরভাগ মুসলমান এ ব্যাপারে অনবগত। বুদ্ধিবৃত্তিক ক্রুসেডের চারটি উদাহরণ দিচ্ছি, যেন এর ভয়াবহতা বুঝা যায়।
২০০৩ সালে আমেরিকান গ্লোবাল পলিসি থিংকট্যাঙ্ক RAND Corporation একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। রিপোর্টের বিষয় ছিল, কীভাবে এবং কার সহায়তায় আমেরিকার বৈশ্বিক পলিসির (New World Order) সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এক ‘নতুন ইসলাম’ বানানো যায়। রিপোর্টে সেই নতুন ইসলামের নাম দেওয়া হয় Civil Democratic Islam, যাকে ‘মডারেট ইসলাম’ নামেও ডাকা হয়। ২০০৭ ও ২০১৩ সালে আরও দুটি ফলোআপ রিপোর্ট আসে, যাতে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে সরকারকে পরামর্শ দেওয়া হয়। ২০০৩ সালের রিপোর্টে RAND বর্তমান মুসলিম উম্মাহকে প্রধানত চারভাগে ভাগ করে–ফান্ডামেন্টালিস্ট, ট্রেডিশনালিস্ট, মডার্নিস্ট ও সেক্যুলারিস্ট। প্রত্যেকটি ভাগের নিচে আরও কয়েকটি ভাগ রয়েছে। RAND এর ভাষায়, ফান্ডামেন্টালিস্ট বা মৌলবাদী হচ্ছে তারা, যারা আমেরিকার নতুন বিশ্বব্যবস্থা, ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র, পুঁজিবাদ ও পশ্চিমা জীবনধারাকে অস্বীকার করে। তারা ইসলামকে একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা (দ্বীন) মনে করে এবং শরীআহকে ব্যক্তিজীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে কায়িম করতে চায়। ট্রেডিশনালিস্ট বা প্রথাবাদী (ঐতিহ্যবাদী) হচ্ছে তারা, যারা ইসলামের প্রাচীন চিন্তাধারাকে লালন করে এবং পশ্চিমা আধুনিকতাকে অস্বীকার করে। এরাও শরীআহ কায়িম করার পক্ষে, তবে এ ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব কোনো চেষ্টা নেই। মডার্নিস্ট বা আধুনিকতাবাদী (সংস্কারবাদী) হচ্ছে তারা, যারা ইসলামী শরীআহ ও হাদীসকে আংশিক অস্বীকার করে এবং সেকেলে বলে। তারা পশ্চিমা সংস্কৃতির সাথে মিলিয়ে শরীআহকে পরিবর্তন করতে চায় এবং ইসলামকে আধুনিক বানাতে চায়। সেক্যুলারিস্ট বা ধর্মনিরপেক্ষ হচ্ছে তারা, যারা শরীআহ কায়িম করার বিরুদ্ধে। এরা ইসলামকে ব্যক্তিগত ‘বিষয়’ মনে করে এবং ব্যক্তিজীবনের বাইরে শরীআহ’র যে কোনো ভুমিকাকে ঘৃণা করে। তবে পশ্চিমা সেক্যুলার ও ইসলামী সেক্যুলারের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
বি.দ্রঃ মূল রিপোর্টের ভাষা ইচ্ছাকৃতভাবে এমন দ্ব্যর্থবোধক রাখা হয়েছে যে, অনভ্যস্ত পাঠকের জন্য এসব পরিভাষা বুঝা কঠিন। তাই আমি শাব্দিক অনুবাদ না করে এর উদ্দিষ্ট অর্থ তুলে ধরেছি।

RAND যখন ফান্ডামেন্টালিস্ট বা মৌলবাদী বলে, তখন তারা তালেবান, হামাস, হিজবুত তাহরীর, ইসলামিক সেলভেশন ফ্রন্ট, আল কায়েদা, আইএস সবাইকে এক মাপকাঠিতে মাপে। অথচ এদের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। এদের মধ্যে কেউ আছে, যারা পশ্চিমা বা ইয়াহুদী সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে যেমন, হামাস। কেউ আছে, যারা নিজেদের দেশকে রক্ষার পাশাপাশি নিজ দেশে গঠনমূলক উপায়ে ইসলামী শরীআহ কায়িম করার চেষ্টায় রত যেমন, তালেবান। আবার কেউ আছে, যাদেরকে খোদ পশ্চিমারা অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে প্রস্তুত করে যথেচ্ছা ব্যবহার করেছে এবং কাজ শেষ হওয়ার পর ইসলামের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে যেমন, আইএস। অথচ রিপোর্ট পড়লে মনে হবে এরা সবাই একই ধারার।
এরপর RAND মুসলমানদের ব্যাপারে আমেরিকার করণীয় সুপারিশ করেছে। বলেছে ফান্ডামেন্টালিস্টরা আমাদের শত্রু। তাই এদেরকে পুরোপুরি খতম করতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। ট্রেডিশনালিস্ট অর্থাৎ প্রথাগত ইমাম, খতীব, আলিম ও সূফী, এরাও ভেতরে ভেতরে ফান্ডামেন্টালিস্ট। প্রায় সময় ফান্ডামেন্টালিস্ট ও ট্রেডিশনালিস্টদের মধ্যে পার্থক্য করা মুশকিল হয়। দেখা যায়, ট্রেডিশনালিস্টদের ছায়ার তলে ফান্ডামেন্টালিস্টরা কাজ করছে। কেবল ট্রেডিশনালিস্টদের কথা যদি ধরা হয়, তবে এদের পক্ষ থেকে সরাসরি বিপদের আশঙ্কা কম। কারণ সাধারণ মুসলমানের কাছে এদের ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা আছে। এই গ্রহণযোগ্যতা হারানোর ভয়ে এরা জিহাদ ও মৌলবাদের পথে যাবে না। RAND এর মতে, সালাফীদের একটি অংশ এবং উপমহাদেশের মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা থেকেই মূলত ট্রেডিশনালিস্ট ও ফান্ডামেন্টালিস্টদের উৎপত্তি হয়। তাই মাদরাসা শিক্ষাকে ‘আধুনিকায়ন ও ধর্মনিরপেক্ষ’ করার বিকল্প নেই।
২০০৭ সালের রিপোর্টে RAND পরামর্শ দেয়, মুসলমানদের মধ্যে কাদেরকে আমেরিকা নিজেদের সহযোগী হিসেবে কাজে লাগাতে পারে। এরা হলো-
১. পশ্চিমা মডার্নিস্ট স্কলার, যারা শরীআহকে পরিবর্তন করে আধুনিক বানানোর চেষ্টা করছে।
২. সেক্যুলারিস্ট মুসলিম, যারা ধর্মকে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে শরীআহ থেকে পুরোপুরি আলাদা রাখতে চায়।
৩. লিবারেল মুসলিম, যারা ইসলাম ও পশ্চিমা জীবনব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য করে না, বরং একসাথে মিলিয়ে চলতে চায়।
৪. মডারেট ট্রেডিশনালিস্ট। ট্রেডিশনালিস্টরা সাধারণত প্রাচীন মাযহাবসমূহের অনুসারী হয়ে থাকে। মাযহাব তখন গড়ে উঠেছিল, যখন ইসলামী খিলাফাহ বহাল ছিল। তাই এসব মাযহাবে ইসলাম কায়িম করার চেয়ে শরীআহ পালন করার আলোচনাই মূখ্য। তাই ট্রেডিশনালিস্টদের মধ্যে শরীআহ শিক্ষা এবং একে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টাই বেশি। তবে ট্রেডিশনালিস্টদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে, নয়তো এরা ফান্ডামেন্টালিস্টদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে জিহাদ ও মৌলবাদের পথ ধরতে পারে।
বি.দ্রঃ ট্রেডিশনালিস্টদেরকে ‘মডারেট ইসলাম’ শিক্ষা দেওয়ার জন্য আমেরিকা, কানাডা, জার্মানি প্রমুখ রাষ্ট্র প্রচুর অর্থ খরচ করছে। বাংলাদেশের কাওমী অঙ্গনে Move Foundation নামক সংস্থা বর্তমানে এসব প্রশিক্ষণের কাজ করছে।
৫. মডারেট সূফী। ট্রেডিশনালিস্টরা যেভাবে মাযহাবের অনুসারী, সূফীরাও বিভিন্ন তরীকার অনুসারী। সূফী তরীকায় আত্মিক উন্নয়নই মূখ্য বিষয়। তাছাড়া মৌলবাদীদের বেশিরভাগই যেহেতু সালাফী ধারা থেকে আগত, তাই সূফীদের সাথে মৌলবাদের দ্বন্দ্ব রয়েছে। সালাফী বিরোধী হওয়ার কারণে সূফীরা আমেরিকার পক্ষেই থাকার কথা। অতএব এই দ্বন্দ্বকে কাজে লাগাতে হবে। তবে ইতিহাসে সূফীদের পক্ষ থেকেও মৌলবাদী কর্মকাণ্ড দেখা গেছে।
RAND এর কাছে মডার্নিস্ট তারা, যারা শরীআহ ও হাদীসকে আংশিকভাবে অস্বীকার করে এবং সম্পূর্ণভাবে পাল্টাতে চায়। আর মডারেট তারা, যারা শরীআহ, হাদীস বা ব্যক্তিজীবনে দ্বীন পালনের বিষয়টি অস্বীকার করে না। তারা ইসলামকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে এবং শরীআহ’র ব্যাপার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের কথা বলে। মডার্নিস্টরা নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ও সমকামিতাকে বৈধতা দেয়। মডারেটরা এসবকে নৈতিকভাবে খারাপ মনে করলেও পলিটিক্যালি ‘কারেক্ট’ মনে করে। এই দুই দলই কাফিরের সংজ্ঞা, আল ওয়ালা ওয়াল বারা এর আকীদা ও ইসলামী শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে উম্মাতের প্রচলিত রায়কে (ইজমা) অস্বীকার করে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে সেক্যুলারিজমকে সমর্থন করে। তাই মডার্নিস্ট স্কলার, মডারেট ট্রেডিশনালিস্ট ও মডারেট সূফী, যারা পশ্চিমা আধুনিকতাকে গ্রহণ করে, তাদেরকে ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে বেশি বেশি সুযোগ করে দিতে হবে।
RAND দাবী করেছে, পশ্চিমা বিশ্বের জন্য সবচেয়ে বড় পাওয়া হচ্ছে, মুসলিম বিশ্বে সেক্যুলাররা ধীরে ধীরে ক্ষমতার কেন্দ্রে যাচ্ছে। উল্লেখ্য যে, এই রিপোর্ট ২০০৩ সালের। আজ ২০২২ সালের শেষদিকে এসে নিঃসংকোচে বলা যায়, RAND এর ভাবনা সফল। সেক্যুলাররা আজ বেশিরভাগ মুসলিম রাষ্ট্রের ঘাড়ে চেপে বসেছে এবং পশ্চিমাদের নতুন বিশ্বব্যবস্থা বিনির্মাণের পক্ষে দাস হয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছে।
২০১৩ সালের রিপোর্টে মৌলবাদ বিরোধী অনলাইন প্রচারণায় অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার জন্য মার্কিন সরকারকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই তিনটি রিপোর্টে যা লেখা হয়েছে, এবং বর্তমান মুসলিম বিশ্ব যেভাবে চলছে, তাতে বুদ্ধিমানদের না বুঝার কোনো কারণ নেই যে, পশ্চিমা বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ’র বিরুদ্ধে সশস্ত্র ক্রুসেডের সাথে সাথে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ক্রুসেডও চালিয়ে যাচ্ছে এবং এতে তারা যথেষ্ট সফল। যেভাবে তারা এই উম্মাহকে ভাগ করতে চেয়েছিল, আমরা ঠিক সেভাবে ভাগ হয়েছি এবং তাদের জন্য নতুন দাজ্জালি বিশ্বব্যবস্থাকে পাকাপোক্ত করার পথ সুগম করছি।

বুদ্ধিবৃত্তিক ক্রুসেডের আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে, পশ্চিমা চিন্তা-দাসদেরকে মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বে বসানো। তাকিয়ে দেখুন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন প্রমুখ রাষ্ট্রের দিকে। আজ কী না হচ্ছে ওসব দেশে! মূলধারার আলিম-উলামাকে নির্যাতন, ইসলামকে মডারেট বানানোর ঘোষণা, মদ, জুয়া ও নাচগানের আড্ডাকে অনুমোদন, মন্দির নির্মাণ, হোলি ও হ্যালোউইন উদযাপন, ইয়াহুদী যায়নিস্টদের সাথে প্রকাশ্য আতাত, ইয়ামানে হামলা করে নিরপরাধ মুসলমানদেরকে হত্যা, সিরিয়া, লিবিয়াসহ অন্যান্য মুসলিম দেশে হামলায় পশ্চিমাদের সহযোগিতা প্রদান– কয়টি গুনবেন আপনি? পশ্চিমাদের চেয়ে এগিয়ে গিয়ে পশ্চিমের এই দাসরা আজ ইসলামী পুনর্জাগরণকে উগ্রবাদ, কট্টরপন্থা, সন্ত্রাস ইত্যাদি নাম দিয়ে রুখে দিচ্ছে। Foreign Policy Magazine এর মতো বিশ্বখ্যাত গবেষণা পত্রিকা দাবি করেছে, আরবের শাসকগোষ্ঠী আজ পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ইসলামোফোবিক (ইসলাম বিদ্বেষী)।
বুদ্ধিবৃত্তিক ক্রুসেডের আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে ইন্টারফেইথ (وحدة الاديان) বা সর্বধর্মীয় সম্প্রীতি নামক ফিতনা। যা কিছু দ্বীনি গাইরাত এই উম্মাহ’র মধ্যে বাকি ছিল এই কুফরী ফিতনা, তাও ধুয়েমুছে সাফ করে দিচ্ছে। ইসলামকে ‘ডি-রেডিক্যালাইজেশন’ বা অ-মৌলবাদী বানানোর জন্য জোরেসোরে চলছে ইন্টারফেইথ কার্যক্রম। আরব আমিরাত ও জর্ডান প্রমুখ দেশে বসছে সর্বধর্মীয় কনফারেন্স, যাতে শেখানো হচ্ছে, কীভাবে সব ধর্মকে একত্রিত করতে হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, উপমহাদেশে এই হাওয়া লেগেছে দেওবন্দের ঘাড়ে। জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের দুই গ্রুপের দুই সভাপতি (যারা সম্পর্কে চাচা-ভাতিজা) আরশাদ মাদানী ও মাহমূদ মাদানী আজ ইন্টারফেইথের ফেরিওয়ালা সেজে হিন্দু ও পশ্চিমাদের বাহবা কুড়াচ্ছেন। বাংলাদেশের কাওমী ও আহলে হাদীস অঙ্গনেও এর হাওয়া লেগেছে। ফরিদ উদ্দীন মাসউদ ও মানজুরে ইলাহীর মতো কাওমী ও আহলে হাদীস আলিমরা এই কুফরী পণ্য ফেরি করে বেড়াচ্ছেন। গুগল বা ইউটিউবে খুঁজলেই এসব কথার প্রমাণ পাবেন। ভয়াবহ বিষয় হচ্ছে, আহলে হাদীসের কাধে ভর করে বাংলাদেশে যায়নিজম বা ইয়াহুদীবাদ অনুপ্রবেশের সম্ভাবনা রয়েছে। উল্লেখ্য যে, উপমহাদেশের আহলে হাদীস ফিরকা চলছে সৌদির তেলের টাকায়। সৌদি শাসকগোষ্ঠী ও তাদের ভাড়াটে মাদখালি আলিমরা যখন যায়নিজমের দিকে ঝুঁকছেন, তখন প্রবল সম্ভাবনা আছে যে, উপমহাদেশের মাদখালিরাও যায়নিজমকে এই অঞ্চলে অনুপ্রবেশ করানোর চেষ্টা চালাবে। ইতোমধ্যেই পাকিস্তানী বংশদ্ভূত সালাফী স্কলার নূর দাহরী নিজেকে ‘মুসলিম যায়নিস্ট’ দাবি করে ইসরায়েলের নাগরিকত্ব লাভ করেছে এবং ITCT নামক ইউকেভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করে ইসলামী পুনর্জাগরণের বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছে। গবেষণার সার্থে বাংলাদেশের আহলে হাদীস বক্তাদের কিছু বক্তব্য শুনেছিলাম। বুঝতে বাকি নেই যে, এরা প্রত্যক্ষভাবে ইন্টারফেইথ ও পরোক্ষভাবে যায়নিজমের ফিতনায় প্রবেশ করেছে এবং ভবিষ্যতে এই দেশে যে কোনো ইসলামী জাগরণে সবচেয়ে বড় বাধা হবে এই গোষ্ঠী। এক সময় যে মাদখালিজম কেবল আহলে হাদীসের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তা এখন উপমহাদেশের অন্যান্য মাসলাকেও প্রভাব বিস্তার করেছে। মাদখালিজমের মূলমন্ত্র হচ্ছে, শাসক যত যালিমই হোক এবং ইসলামের বিরুদ্ধে যা কিছু করুক, যতক্ষণ পর্যন্ত ব্যক্তিগত ‘ধর্মকর্ম’ করার সুযোগ আছে, ততক্ষণ শাসকের বিরুদ্ধে টু শব্দ করা যাবে না। পশ্চিমাদের জন্য এরচেয়ে বড় উপহার আর কী হতে পারে? এক সেক্যুলার শাসককে মুসলিম রাষ্ট্রের ক্ষমতায় বসিয়ে দিলেই তাদের কার্যসিদ্ধি হয়ে যাচ্ছে।
বুদ্ধিবৃত্তিক ক্রুসেডের আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে, ইসলামী পুনর্জাগরণের স্বপ্ন থেকে তরুণদেরকে বিমুখ করার জন্য অহেতুক বিনোদনে ব্যস্ত রাখা। হলিউড-বলিউডে একেকটি সিনেমা রিলিজ হয়, আর মুসলিম তরুণরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে! ক্রিকেট ও ফুটবল বিশ্বকাপের কথা তো বলারই অপেক্ষা রাখে না। বিশ্বকাপ নিয়ে কী উন্মাদনা এই উম্মাতের মধ্যে! এদেরকে দেখে কে ভাববে, এদেরই ভাইবোন আজ যালিমের হাতে বন্দী হয়ে সাহায্য চাইছে? কে ভাববে, এদের কিবলাহ আজ বেদ্বীনের বুলডোজারে পিষ্ট? টিকটকসহ অন্যান্য সোশ্যাল সাইটে গিয়ে মুসলিম তরুণদের অবস্থা দেখুন। কোন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার পেছনে ছুটছে এরা? যখন আল্লাহর সাথে কৃত সেই ভুলে যাওয়া অঙ্গীকারকে নবায়ন করার কথা ছিল, যখন বিশ্বজুড়ে ইসলামী পুনর্জাগরণের ঝাণ্ডা উড়ানোর কথা ছিল, যখন যালিমের হাত থেকে মযলুমকে বাঁচানোর দৃঢ় শপথ নেয়ার কথা ছিল, তখন আমরা কী নিয়ে ব্যস্ত আছি? আজ যদি রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর উম্মাহকে এই হালতে দেখতেন, তিনি বড় কষ্ট পেতেন।
এতসব আঘাত ও ষড়যন্ত্রের পরও আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই উম্মাহ অবশ্যই ঘুরে দাঁড়াবে। কারণ এই উম্মাহ’র ভাগ্যে বিশ্ববিজয় লেখা হয়েছে। আমাদের নবী সা.-কে আল্লাহ একটি মহান দায়িত্ব দিয়ে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছিলেন। আল্লাহ বলেন-
هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَىٰ وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ
“তিনিই তাঁর রাসূলকে প্রেরণ করেছেন হিদায়াত ও সত্য দ্বীন সহকারে, যেন রাসূল এই দ্বীনকে অন্য সব দ্বীনের ওপর বিজয়ী করেন।” (সুরা ফাতহ, ২৮)
২৩ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং হাজারো কুরবানীর বিনিময়ে রাসূলুল্লাহ সা. জাযীরাতুল আরব পর্যন্ত ইসলামের বিজয়নিশান নিজ হাতেই উড়িয়েছেন। এরপর সাহাবায়ে কিরাম এই পতাকা নিয়ে বেরিয়েছেন এবং অর্ধশতাব্দী পার হওয়ার আগেই অর্ধ পৃথিবীজুড়ে ইসলামের বিজয়নিশান উড়েছে। রাসূল সা. এর পর ৩০ বছর খিলাফাহ বহাল ছিল। এরপর রাজতন্ত্র এসেছে। মুসলিম শাসকদের মধ্যে ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলেও মুসলমানদের বিশ্ববিজয়ী অভিযান, উম্মাহ’র ঐক্য, বল ও তেজ তখনও ছিল। গত শতাব্দীর প্রথমদিকে, ১৯২২-২৪ সালের মধ্যে উসমানী সালতানাতের পতনের পর এই উম্মাহ দিশাহীন হয়ে পড়েছে। তবে তখন থেকেই বিশ্বের আনাচে-কানাচে দ্বিতীয়বার ইসলামী পুনর্জাগরণের স্বপ্ন নিয়ে উম্মাহ’র জানবাজ সেনানীরা কাজ করে যাচ্ছেন, যাদের একেকটি তাকবীর বাতিলের অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে দেয়। সম্প্রতি আফগানিস্তানে এই পুনর্জাগরণের সোনালী ফসল আমরা নিজ চোখে দেখেছি। এই জাগরণ অব্যাহত থাকবে ইমাম মাহদী ও ঈসা (আ.) এর আগমন পর্যন্ত, যাদের হাতে আল্লাহ পুরো পৃথিবীতে ইসলামকে কায়িম করাবেন এবং রাসূলুল্লাহ সা. এর দায়িত্ব সমাপ্ত হবে। রাসূলুল্লাহ সা. সুসংবাদ দিয়ে বলেছেন-
إِنَّ اللَّهَ زَوَى لِيَ الأَرْضَ فَرَأَيْتُ مَشَارِقَهَا وَمَغَارِبَهَا وَإِنَّ أُمَّتِي سَيَبْلُغُ مُلْكُهَا مَا زُوِيَ لِي مِنْهَا
“আল্লাহ আমার জন্য পৃথিবীকে সংকোচিত করে দিয়েছেন। আমি এর পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত দেখেছি। আমার উম্মাতের কর্তৃত্ব ততটুকু জায়গা পর্যন্ত পৌঁছে যাবে, যতটুকু আমাকে সংকোচিত করে দেখানো হয়েছে।” (সহীহ মুসলিম, ২৮৮৯)
সমস্যা হচ্ছে, ইসলামী পুনর্জাগরণের উত্তাপ এখনও বেশিরভাগ মুসলমানকে স্পর্শ করতে পারেনি। বেশিরভাগই পশ্চিমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ক্রুসেডের শিকার হয়ে আছে। তেতো হলেও সত্য যে, উলামা, মাশাইখ, সূফী, মুবাল্লিগ, ইমাম ও খতীবদের বড় অংশ আজ নিজেদের ক্ষুদ্র ও খণ্ডিত ক্ষেত্রকে পুরো ‘ইসলাম’ মনে করে আত্মতুষ্টি নিয়ে পড়ে আছেন। ইকবাল যথার্থ বলেছেন, “ইয়ে নাদান গিরগায়ে সাজদে মে, জব ওয়াক্তে কিয়াম আয়া।”
আজ প্রয়োজন নিজেদের ক্ষুদ্র চিন্তা ঝেড়ে ফেলে নববী মানহাজকে (রাসূল সা. এর দ্বীন কায়িমের পদ্ধতি) বুকে ধারণ করা এবং আল্লাহর জন্য শির উঁচু করে দাঁড়ানো। ইসলাম তো বিজয়ী হবে, কিন্তু আমরা যদি আজ না জাগি, তাহলে কাফেলা ছুটে যাবে।
তথ্যসূত্রঃ
১. Ford, P. (19 Sep. 2001), The Christian Science Monitor.
২. Vallely, P. (2004) The Fifth Crusade: George Bush and the Christianisation of the War in Iraq, Re-imaging Security, The British Council.
৩. Kramer, M. (1991). Islam in the New World Order, Middle East Contemporary Survey, Westview Press.
৪. Benard, C. (2003), Civil Democratic Islam: Partners, Resources, and Strategies, RAND Corporation.
৫. Rabasa, A. & Benard, C (2007), Building Moderate Muslim Networks, RAND Corporation.
৬. Salem, O. & Hassan, H. (29 Mar. 2019), Foreign Policy.

 

ফেইসবুকে আমরা...