1. redwan.iub@gmail.com : admin2021 :
  2. admin@parwana.net : Parwana Net : Parwana Net
  3. editor@parwana.net : Parwana Net : Parwana Net
Logo
জেরুযালেম : ইতিহাসের উত্থান-পতনের সাক্ষী যে পবিত্র শহর
মারজান আহমদ চৌধুরী
  • ১৭ অক্টোবর, ২০২৩

ইয়াহুদীধর্ম, খ্রিস্টধর্ম এবং ইসলাম– তিনটি ইবরাহীমি ধর্মের পবিত্র এক শহরের নাম জেরুযালেম। হাজার বছরের ঐতিহাসিক কাল-পরিক্রমায় শহরটি কখনো জেরুযালেম, কখনো আল কুদস, কখনো ইয়েরুশালায়িম, কখনো অ্যায়েলিয়া প্রভৃতি নামে পরিচিত ছিল। প্রতিটি নাম জেরুযালেম শহরের মাহাত্ম্য ও বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্যের স্বাক্ষর বহন করে। জেরুযালেমে রয়েছে ইয়াহুদীদের পবিত্র স্থান হাইকাল সুলাইমান, যা বর্তমানে টেম্পল মাউন্ট কম্পাউন্ড নামে খ্যাত। এই টেম্পল মাউন্টের অন্তর্ভুক্ত ওয়েলিং ওয়াল বা কান্নার দেয়াল ইয়াহুদীদের পবিত্র জায়গা। এখানে রয়েছে খ্রিস্টানদের অন্যতম পবিত্র স্থান চার্চ অব দ্য হলি সেপালকার, যেখানে যিশু খ্রিষ্টকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল বলে খ্রিস্টানরা বিশ্বাস করে। এর পার্শ্ববর্তী বেথেলহাম গির্জায় যিশু খ্রিষ্ট তথা নবী ঈসা (আ.)-এর জন্ম হয়েছিল বলেও খ্রিস্টান ধর্মে বিশ্বাস করা হয়। আবার এই জেরুযালেমের বুকেই তাওহীদ ও নবুওয়াতের গৌরবোজ্জ্বল স্মারক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে পবিত্র মাসজিদুল আকসা, যা দীর্ঘদিন মুসলিমদের কিবলাহ ছিল। মক্কা মুকাররামাহ এবং মদীনা তায়্যিবার পর জেরুযালেম তথা আল কুদস মুসলমানদের নিকট সবচেয়ে পবিত্র স্থান, যার আশেপাশে আল্লাহ অবারিত বরকত দান করেছেন। এই শহর নবী ইবরাহীম, ইসহাক, ইয়াকুব, ইউসুফ, মূসা, হারূন, দাউদ, সুলাইমান, যাকারিয়া, ইয়াহইয়া, ঈসা আলাইহিমুস সালাম প্রমুখ অসংখ্য নবী-রাসূলের স্মৃতি বহন করে চলেছে। সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী সায়্যিদুনা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিরাজ রজনীতে মক্কা মুকাররামাহ থেকে জান্নাতী বাহন বুরাকে চড়ে জেরুযালেমে অবস্থিত মাসজিদুল আকসায় গমন করেছিলেন। মাসজিদুল আকসায় সমস্ত নবীদের জামাআতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইমামতী করেছিলেন এবং পরে সেখান থেকে উর্দ্ধাকাশে আল্লাহর সান্নিধ্যে গমন করেছিলেন। মিরাজের রাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে পাথরে তাঁর বাহন বুরাককে বেঁধে রেখেছিলেন, সেই পাথরকে কেন্দ্র করে পরে সেখানে কুব্বাতুস সাখরা বা ডোম অব রক নামে একটি নান্দনিক স্থাপনা তৈরি করা হয়। অনেকেই এই স্থাপনাকে মাসজিদুল আকসা ভেবে ভুল করেন।

জেরুযালেম ডেড সি বা মৃত সাগরের পশ্চিম তীরে অবস্থিত ৪৮ বর্গমাইলের একটি শহর। বিভিন্ন সময় শহরটি ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম ও সভ্যতার অধিকারে ছিল। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার সূত্র অনুযায়ী, জেরুযালেম এ পর্যন্ত ২৩ বার অবরুদ্ধ হয়েছে, ৫২ বার আক্রমণের শিকার হয়েছে, ৪৪ বার দখল ও পুনর্দখল হয়েছে এবং দুবার ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। তিনটি ইবরাহীমি ধর্মের আবেগ ও চেতনার মোহনায় অবস্থিত এই শহর দুটি ভাগে বিভক্ত। মূল শহরটি পুরনো জেরুযালেম এবং বর্ধিত অংশ নতুন জেরুযালেম নামে পরিচিত। ধর্মীয় দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহ পুরনো জেরুযালেমে অবস্থিত, যা মাত্র ০.৩৫ বর্গমাইলের একটি প্রাচীরঘেরা এলাকা। প্রথাগতভাবে পুরনো জেরুযালেম মুসলিম মহল্লা, খ্রিস্টান মহল্লা, ইয়াহুদী মহল্লা ও আর্মেনীয় মহল্লা নামক চারটি ভাগে বিভক্ত।

জেরুযালেম শহর এতটা মাহাত্ম্যপূর্ণ হওয়ার কারণ হচ্ছে শহরটির কতিপয় স্থাপত্য ও ইতিহাসের নানা বাঁকে এ শহরের বুকে নবী-রাসূলগণের বসবাস। মুসলিম জাতির পিতা নবী ইবরাহীম খলীলুল্লাহ (আ.) ব্যবিলন থেকে হিজরত করে কিনান এসেছিলেন। কিনান বর্তমান ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের পূর্বনাম ছিল। পবিত্র কুরআনে এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত হয়, যেখানে ইবরাহীম (আ.) তাঁর জাতিকে উদ্দেশ্য করে বলছেন,

إِنِّي ذَاهِبٌ إِلَى رَبِّي سَيَهْدِين

-আমি আমার পালনকর্তার দিকে চললাম। তিনি আমাকে পথপ্রদর্শন করবেন। (সূরা সাফফাত, আয়াত-৯৯)

ইবরাহীম (আ.) এর পুত্র নবী ইসহাক (আ.) এবং নাতি ইয়াকুব (আ.) এর নিবাসও ছিল এই ভূখণ্ডে। ইয়াকুব (আ.) এর অপর নাম ছিল ইসরাঈল। তাই তাঁর বংশধরকে বনী ইসরাঈল নামে সম্বোধিত করা হয়। তাফসীর ইবন কাসীরে বর্ণিত আছে, ইয়াকুব (আ.) একদা একটি স্থানে শয়নরত অবস্থায় স্বপ্নে ফিরিশতাদের আনাগোনা অবলোকন করেন। জাগ্রত হয়ে তিনি উক্ত স্থানে একটি ইবাদতখানা নির্মাণ করার মনোবাসনা করেন এবং পাথর দিয়ে স্থানটি চিহ্নিত করে দেন। এটিই সেই স্থান, যেখানে বর্তমান মাসজিদুল আকসা অবস্থিত। হাদীসের বর্ণনামতে, মাসজিদুল আকসা নির্মিত হয়েছিল কাবা শরীফ নির্মিত হওয়ার চল্লিশ বছর পর। কালের পরিক্রমায় এর ভিত্তিমূল অজ্ঞাত হয়ে যাওয়ার কারণে আল্লাহ তাআলা ইয়াকুব (আ.)-কে এর ভিত্তিস্থান স্বপ্নের মাধ্যমে জানিয়ে দেন। তবে মাসজিদুল আকসার মূল নির্মাণ সংঘটিত হয় ইয়াকুব (আ.) এর ইন্তিকালের প্রায় হাজার বছর পর। ইয়াকুব (আ.) কিনানে বসবাস করতে থাকেন এবং তাঁর পুত্র ইউসুফ (আ.) বিভিন্ন পরিস্থিতির শিকার হয়ে শেষপর্যন্ত মিশরে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হন। কিনান তথা ফিলিস্তিনে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে ইয়াকুব (আ.) সপরিবারে মিশরে হিজরত করেন এবং বনী ইসরাঈলের ঘাটি কিনান থেকে মিশরে স্থানান্তরিত হয়।

ফিলিস্তিন থেকে দুর্ভিক্ষপীড়িত ইয়াকুব (আ.) সন্তান-সন্ততি নিয়ে মিশরে চলে গিয়েছিলেন। ইতিহাস এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি করে। প্রায় তিনশ বছর পর ইয়াকুব (আ.) এর বংশধর ও তৎকালীন সময়ের রাসূল মূসা (আ.) বনী ইসরাঈলকে ফিরআউন ও তার দলবলের অনিষ্ট থেকে মুক্ত করে মিশর হতে ফিলিস্তিনে আগমন করেন। ততদিনে দুর্ধর্ষ আমালিকা সম্প্রদায় ফিলিস্তিনে আসন গেড়ে বসেছিল। মূসা (আ.) বনী ইসরাঈলকে সাথে নিয়ে আমালিকা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে উদ্যত হলে তাঁর কউম যুদ্ধে অনিহা প্রকাশ করে। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, মূসা (আ.) বলছেন,

يَا قَوْمِ ادْخُلُوا الْأَرْضَ الْمُقَدَّسَةَ الَّتِي كَتَبَ اللَّهُ لَكُمْ وَلَا تَرْتَدُّوا عَلَىٰ أَدْبَارِكُمْ فَتَنقَلِبُوا خَاسِرِينَ قَالُوا يَا مُوسَىٰ إِنَّ فِيهَا قَوْمًا جَبَّارِينَ وَإِنَّا لَن نَّدْخُلَهَا حَتَّىٰ يَخْرُجُوا مِنْهَا فَإِن يَخْرُجُوا مِنْهَا فَإِنَّا دَاخِلُونَ

-হে আমার সম্প্রদায়! পবিত্র ভুমিতে প্রবেশ করো, যা আল্লাহ তোমাদের জন্যে নির্ধারিত করে দিয়েছেন এবং পেছন দিকে প্রত্যাবর্তন করো না। অন্যথায় তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাবে। তারা বলল, হে মূসা! সেখানে একটি প্রবল পরাক্রান্ত জাতি রয়েছে। আমরা কখনও সেখানে যাব না, যে পর্যন্ত না তারা সেখান থেকে বের হয়ে যায়। তারা যদি সেখান থেকে বের হয়ে যায় তবে নিশ্চিতই আমরা প্রবেশ করব। (সূরা মায়িদাহ, আয়াত ২১-২২)

বনী ইসরাঈল যুদ্ধ করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করায় আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি দিয়েছিলেন। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে,

قَالُوا يَا مُوسَىٰ إِنَّا لَن نَّدْخُلَهَا أَبَدًا مَّا دَامُوا فِيهَا فَاذْهَبْ أَنتَ وَرَبُّكَ فَقَاتِلَا إِنَّا هَاهُنَا قَاعِدُونَ قَالَ رَبِّ إِنِّي لَا أَمْلِكُ إِلَّا نَفْسِي وَأَخِي فَافْرُقْ بَيْنَنَا وَبَيْنَ الْقَوْمِ الْفَاسِقِينَ قَالَ فَإِنَّهَا مُحَرَّمَةٌ عَلَيْهِمْ أَرْبَعِينَ سَنَةً يَتِيهُونَ فِي الْأَرْضِ فَلَا تَأْسَ عَلَى الْقَوْمِ الْفَاسِقِينَ

-তারা বলল, হে মূসা! আমরা কখনও সেখানে যাব না, যতক্ষণ তারা সেখানে থাকবে। অতএব, আপনি ও আপনার পালনকর্তাই যান এবং উভয়ে যুদ্ধ করে নিন। আমরা এখানেই বসলাম। মূসা বললেন, হে আমার পালনকর্তা, আমি শুধু নিজের ওপর ও নিজের ভাইয়ের ওপর ক্ষমতা রাখি। অতএব আপনি আমাদের মধ্যে এবং এই অবাধ্য সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ করুন। (আল্লাহ) বললেন, এই ভূমি চল্লিশ বছর পর্যন্ত তাদের জন্যে হারাম করা হলো। তারা ভূপৃষ্ঠে উদ্ভ্রান্ত হয়ে ফিরবে। অতএব আপনি অবাধ্য সম্প্রদায়ের জন্যে দুঃখ করবেন না। (সূরা মায়িদাহ, আয়াত ২৪-২৬)

এরপর বনী ইসরাঈল তীহ নামক উপত্যকায় চল্লিশ বছর উদ্ভ্রান্ত জীবনযাপন করার পর আল্লাহ তাদের প্রতি অনুগ্রহ করলেন। মূসা (আ.) এর খলীফা নবী ইউশা ইবন নূন (আ.) এর নেতৃত্বে বনী ইসরাঈল জাতি আমালিকা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বিজয় লাভ করল এবং ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে শান্তিতে বসবাস করতে থাকলো। একপর্যায়ে তারা আবারও আল্লাহর অবাধ্য হলে আল্লাহ তাদের ওপর জালুতের সম্প্রদায়কে চাপিয়ে দেন। অতঃপর আসে নবী শামুয়েল (আ.) এর যুগ। বনী ইসরাঈল ওই নবীর কাছে আকুতি করে বলেছিল, আপনি আল্লাহর কাছে দুআ করুন যেন তিনি আমাদেরকে একজন সেনাপতি দেন, যার নেতৃত্বে আমরা যুদ্ধ করব। শামুয়েল (আ.) দুআ করলেন এবং ফলস্বরূপ আল্লাহ তালুতকে বনী ইসরাঈলের আমীর নিযুক্ত করে দিলেন। চিরায়ত অভ্যাস অনুযায়ী প্রথমে অনিহা প্রকাশ করলেও শেষপর্যন্ত বনী ইসরাঈল সেনাপতি তালুতের নেতৃত্বে জালুতের বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করল। সে যুদ্ধেই অভিষেক হয়েছিল বনী ইসরাঈলের তরুণ তুর্কি নবী দাউদ (আ.) এর। দাউদ (আ.) নিজ হাতে জালুতকে হত্যা করলেন। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে,

فَهَزَمُوهُم بِإِذْنِ اللَّهِ وَقَتَلَ دَاوُودُ جَالُوتَ وَآتَاهُ اللَّهُ الْمُلْكَ وَالْحِكْمَةَ

-তারপর ঈমানদাররা আল্লাহর হুকুমে জালুতের বাহিনীকে পরাজিত করে দিল এবং দাউদ জালুতকে হত্যা করলেন। আর আল্লাহ দাউদকে দান করলেন রাজ্য ও অভিজ্ঞতা। (সূরা বাকারা, আয়াত- ২৫১)

বাদশাহ তালুতের হাত ধরে জেরুযালেমে প্রথমবার পূর্ণাঙ্গ ইসলামী খিলাফাহ কায়িম হয়েছিল। তাঁর ইন্তিকালের পর ৪০ বছর করে নবী দাউদ (আ.) এবং তাঁর পুত্র নবী সুলাইমান (আ.) জেরুযালেমের শাসনকার্য পরিচালনা করেছিলেন। সুলাইমান (আ.) এর পর তাঁর পুত্র রাহবাআম বনী ইসরাঈলের নেতৃত্ব দেন। এরপর বনী ইসরাঈল আবার বিভক্ত হয়ে যায়। এরপর জেরুযালেম তথা সেখানকার অধিবাসী বনী ইসরাঈল ব্যাবিলনের সম্রাট নেবুচাদনেজারের ভয়াবহ হামলার শিকার হয়। ৫৮৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সংঘটিত সেই হামলায় সুলাইমান (আ.) এর নির্মিত আসল মসজিদটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। লক্ষ লক্ষ ইয়াহুদী নিহত ও বন্দী হয়। পরে বনী ইসরাঈলের সুদিন ফিরে আসলে বাদশা হ্যারড পুনরায় সেখানে একটি ইবাদতগাহ নির্মাণ করে।

এরপর জেরুযালেম ধন্য হয় নবী যাকারিয়া (আ.), ইয়াহইয়া (আ.) ও ঈসা (আ.) এর হাত ধরে। ঈসা (আ.)-এর মা সায়্যিদা মারইয়াম বিনতু ইমরানকে তাঁর মা বাইতুল মাকদিসের খাদিমাহ নিযুক্ত করেছিলেন। মসজিদের পার্শ্ববর্তী হুজরায় আল্লাহর হুকুমে মারইয়াম (আ.) গর্ভবতী হন এবং পুত্র ঈসা (আ.)-কে জন্ম দেন।

বাইবেলের সুত্রমতে, যীশু খ্রিষ্ট জন্মগ্রহণ করেন জেরুযালেমের বেথেলহামের একটি আস্তাবলে এবং তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয় জেরুযালেমের চার্চ অব দ্য হলি সেপালকারে। তবে ইসলামী আকীদা অনুযায়ী, না ঈসা (আ.) ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন, না তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। বরং আল্লাহ তাআলা তাঁকে জীবিত অবস্থায় আসমানে উঠিয়ে নিয়েছেন। কিয়ামতের পূর্বে উম্মাতে মুহাম্মাদীর নেতৃত্ব দান ও দাজ্জালকে হত্যা করার জন্য তিনি পুনরায় পৃথিবীতে আগমন করবেন। তাঁর হাত ধরে সারা বিশ্বব্যাপী আল-খিলাফাতু আলা মিনহাজিন নুবুওয়্যাহ তথা নববী আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত খিলাফাহ কায়িম হবে এবং এরপর তিনি যথানিয়মে ইন্তিকাল করবেন।

৭০ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন রোমান সেনাপতি টাইটাস জেরুযালেমে হামলা করে এবং ইয়াহুদীদের ইবাদতগাহ আবার ধ্বংস করে দেয়। ওই ইবাদতগাহের একটি দেয়াল সুরক্ষিত ছিল, যেখানে আজও ইয়াহুদীরা মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে প্রার্থনা করে। তবে সুলাইমান (আ.) এর নির্মিত আসল মসজিদের কোনো অস্তিত্ব এখন নেই। সেটি ব্যাবিলনীয়দের হামলার আগেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।

ঈসা (আ.)-কে পার্থিব জগত থেকে উঠিয়ে নেওয়ার তিন শতাব্দী পর রোমান সম্রাট কন্সটেন্টাইন খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন এবং জেরুযালেমকে খ্রিস্টানদের পবিত্র ভূমি হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেন। এরপর থেকে প্রায় সাড়ে তিনশ বছর জেরুযালেম খ্রিস্টানদের দখলে ছিল।

ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এর খিলাফতকালে ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে আবূ উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রা.) এর বাহিনী সিরিয়া বিজয় করে জেরুযালেমের দিকে গমন করে। মিশর থেকে আমর ইবনুল আস (রা.) এর বাহিনী এবং বিশেষ সাহায্যকারী হিসেবে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রা.) এর বাহিনী সম্মিলিতভাবে জেরুযালেম অবরোধ করে। জেরুযালেমের অধিবাসী খ্রিস্টানরা ছিল একেশ্বরবাদী। পক্ষান্তরে, রোমান সাম্রাজ্য ছিল ত্রিত্ববাদে বিশ্বাসী। রোমানদের সাথে জেরুযালেমের খ্রিস্টানদের বিরোধ ছিল বিধায় খ্রিস্টানরা মুসলিম বাহিনীকে বাধা দেয়নি। জেরুযালেমে তখন কতিপয় ইয়াহুদীর বসবাসও ছিল। তবে তারা ছিল সংখ্যালঘু এবং নির্যাতিত। জেরুযালেমের শাসনকর্তা পেট্টিয়ার্ক সোফ্রোনিয়াস মুসলিম বাহিনীকে শর্ত দেন, যদি খলীফা নিজে এসে চুক্তিপত্র সাক্ষর করেন, তবেই জেরুযালেম মুসলিমদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে। খলীফা উমর (রা.) একজন খাদিম সঙ্গে নিয়ে উটের পিঠে সওয়ার হয়ে জেরুযালেম গমন করলেন। খলীফার সাদাসিধে পোশাক ও চলাচল দেখে সোফ্রোনিয়াস বিস্মৃত হয়ে যান। এরপর উমর (রা.)-কে পবিত্র সমাধির গির্জাসহ পুরো শহর ঘুরিয়ে দেখানো হয়। নামাযের সময় হলে সোফ্রোনিয়াস তাঁকে গির্জার ভেতর নামায আদায় করার আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু উমর (রা.) তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, “যদি আমি এখানে নামায আদায় করি, তাহলে পরবর্তীতে মুসলিমরা এই অজুহাত দেখিয়ে গির্জাকে মসজিদে রূপান্তরিত করবে– যা খ্রিস্টান সমাজকে তাদের একটি পবিত্র স্থান থেকে বঞ্চিত করবে।” উমর (রা.) গির্জার বাইরে নামায আদায় করেছিলেন, যেখানে পরবর্তীতে একটি মসজিদ নির্মিত হয়। ইয়াহুদীদের প্রতি বিদ্বেষবশত খ্রিস্টানরা টেম্পল মাউন্টকে আবর্জনার স্তুপ বানিয়ে রেখেছিল। উমর (রা.) তা পরিষ্কার করার উদ্যোগ নেন। উমর (রা.) সোফ্রোনিয়াসের সাথে একটি চুক্তি করেন, যা একইসাথে ইসলামের বড়ত্ব ও বিনয়ের অপূর্ব চিহ্ন বহন করে। উমর (রা.) জেরুযালেমে খ্রিস্টানদেরকে বসবাস করার অনুমতি দেন এবং সর্ববিদ ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করেন। সেইসাথে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত ইয়াহুদীদেরকেও এই শহরে এসে ইবাদত ও যিয়ারতের অনুমতি প্রদান করেন। ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে মুসলিমদের হাতে বিজিত জেরুযালেম ৪৬২ বছর পর আবার খ্রিস্টানদের দখলে চলে যায়। তবে খ্রিস্টান ক্রুসেডাররা উমর (রা.) এর ন্যায় মহানুভবতার পরিচয় দেয়নি। বরং জেরুযালেমের রাস্তায় ৯০ হাজার মুসলিম, ইয়াহুদী ও ভিন্ন মতাবলম্বী খ্রিস্টানদের রক্তের নদী বইয়ে ১০৯৯ খ্রিস্টাব্দে জেরুযালেম কব্জা করে ইউরোপের ধর্মান্ধ ক্রুসেডাররা। দীর্ঘ ৮৮ বছর পর ১১৮৭ খ্রিস্টাব্দে আরেক কালজয়ী সংগ্রামের মধ্যদিয়ে জেরুযালেমকে পুনরায় মুসলমানদের হস্তগত করেন ইসলামের বীর সেনানী সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ুবী। সালাহুদ্দীন আইয়ুবী খ্রিস্টানদের সাথে সেই বদান্যতার ব্যবহারই করেছিলেন, যা তিনি তাঁর পূর্বসূরি উমর (রা.) এর আদর্শ থেকে শিখেছিলেন। এরপর জেরুযালেমের শাসনভার উসমানী তথা অটোমান সাম্রাজ্যের হাতে ন্যস্ত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমানদের পরাজয়ের পর ব্রিটেন জেরুযালেমকে জবরদখল করে নেয়। এরপর থেকে শুরু হয় জেরুযালেমের আধুনিক ইতিহাস। তবে আজও জেরুযালেম শান্ত নয়। বিশ্ব মোড়লদের একচোখা নীতি, ইয়াহুদীদের চিরায়ত হিংসাত্মক তৎপরতা, আরব বিশ্বের দুর্বলতা ও ভূরাজনীতির মারপ্যাঁচে পড়ে প্রতিনিয়ত রক্তাক্ত হয় নবীদের স্মৃতি বিজড়িত পবিত্র এই শহর। তবুও, মানব ইতিহাসে সম্ভবত অন্য কোনো শহর এত ভিন্ন ভিন্ন জাতি ও মানুষের কাছে একত্রে এতটা আবেগের জায়গা হয়ে ওঠেনি, যতটা হয়েছে জেরুযালেম। কালের পরিক্রমায় জেরুযালেমের গুরুত্ব কমেনি, কমবেও না। বরং ভালোভাবেই অনুমান করা যায় যে, ভবিষ্যতের ঘটনা পরিক্রমায় জেরুযালেমের গুরুত্ব আরো বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

ফেইসবুকে আমরা...