1. redwan.iub@gmail.com : admin2021 :
  2. admin@parwana.net : Parwana Net : Parwana Net
  3. editor@parwana.net : Parwana Net : Parwana Net
Logo
ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.): যার কীর্তি, যার স্মৃতি চির ভাস্বর
কবি মাওলানা রূহুল আমীন খান
  • ১৭ জানুয়ারী, ২০২১

‘ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.)’ এতটুকু পরিচিতিই যথেষ্ট। এই মুবারক অভিধাটি শ্রবণ মাত্র, উচ্চারণ মাত্র মানস-নেত্রে, মনের মুকুরে ভেসে ওঠে যে জ্যোতির্ময় অবয়বÑসুন্নতী লেবাসে ভূষিত, সবুজ পাগড়ি পরিহিত, প্রভাব বিস্তারী গৌরকান্তি, বলিষ্ঠ, সুঠাম অবয়ব বিশিষ্ট, অন্তর্ভেদী দৃষ্টি সম্পন্ন অনন্য ব্যক্তিত্ব, বীরত্বব্যঞ্জক কালজয়ী নূরানী মহাপুরুষ-সত্তা- তাঁর জীবন ও কর্ম তো এক মহাপারাবার। বেলাভূমিতে দাঁড়িয়ে তার সামান্যমাত্র অবলোকন করা যায় তাতে পাড়ি জমানো যায় না, তাঁকে পুরোপুরি উপলব্ধিও করা যায় না।
তাঁর সুযোগ্য নাতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মাওলানা আহমাদ হাসান চৌধুরী সম্পাদিত ২০১৪ সালে প্রকাশিত এক স্মারকগ্রন্থে দেশ-বিদেশের বহু খ্যাতনামা উলামা-মাশায়িখ, গবেষক, লেখক, চিন্তাবিদ, কবি-সাহিত্যিক তাঁর জীবন ও অবদানের এক একটি দিক তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন। তাঁদের কেউ তাঁকে বলেছেন, ‘A Great Scholar’; কেউবা ‘A Spiritual Master; ‘The Sun of Asia’; ‘এক পবিত্র আলোকবর্তিকা’; ‘শরীআত, তরীকত ও মা’রিফাতের আফতাব’; ‘আদর্শ মর্দেমুমিন’; ‘আখলাকে নববীর অনুপম দৃষ্টান্ত’; ‘অতুলনীয় গুণসম্পণ্ন মহান বুযুর্গ’; ‘অনন্য আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব’; ‘ফুলতলীর ফুল্ল কুসুম’; ‘ক্ষণজন্মা দূরদ্রষ্টা সত্যসন্ধ মহান ব্যক্তিত্ব’; ‘সর্বগুণের আঁকর প্রথিতযশা ইনসানে কামিল’; ‘এশিয়ার শ্রেষ্ঠতম বুযুর্গ’; ‘বিংশ শতাব্দীর বিস্ময়কর প্রতিভা’; ‘ভারতবর্ষেও যার খিদমতের ধারা বহমান’; ‘সুন্নতে নববীর পূর্ণ অনুসারী’ ‘ইলমে কিরাতের বিস্তারে যার ভূমিকা ঐতিহাসিক’; ‘দ্বীনী আন্দোলনের অকুতোভয় সিপাহসালার’; ‘মাদরাসার স্বাতন্ত্র্য রক্ষার আন্দোলনের নির্ভীক সিপাহসালার’; ‘যামানার শ্রেষ্ঠ বুযুর্গ’; ‘ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের সিপাহসালার’; ‘মানবহিতৈষী বুযুর্গ’; ‘মানুষের মানচিত্রে ফুলতলীর ফুল’; ‘তাঁর বয়ান ছিল হৃদয়গ্রাহী’; ‘শতাব্দীর সেরা ব্যক্তিত্ব’; ‘সৃষ্টির প্রতি যার ছিল ভালোবাসা সীমাহীন’; ‘লক্ষ লক্ষ মানুষের রূহানী পিতা’; ‘ আল কুরআনের অনন্য খাদিম’; ‘এক জীবনের আকাশে কে কবে জ্বালিয়েছেন এতো নক্ষত্র’; ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ডে পড়ানো হয় যার জীবনী’; ‘চোখের পলক পড়ে না’; ‘মরণজয়ী পীরে কামিল’; ‘সূর্য যেমন আলো ছড়ায়’; ‘বাংলার দ্যুতি’; ‘বাংলার রূমী’; ‘শামসুল উলামা’; ‘আলোর দিশারী’; ‘যামানার মজাদ্দিদ’; ‘নায়েবে নবী’; ‘মানবতার প্রতীক’; ‘মহাকালের পথিক’; ‘সুবাসী আগর’; -ইত্যাদি।
আগেই বলেছি সে এক অনন্ত পারাবার। এতে পাড়ি জমানো এক অসাধ্য ব্যাপার। তবু বিভিন্ন সময়ে সীমাহীন অক্ষমতা সত্ত্বেও তাঁর রূহানী ফয়েযে ধন্য হওয়ার আকাক্সক্ষায় চেষ্টা করেছি তাঁকে উপলব্ধি করার। একদা লিখেছিলাম :

রাসূল দেখিনি বটে, তাঁরই এক মূর্তমান ছবি
নবী তুমি ছিলে নাকো, ছিলে তাঁর প্রতিনিধি
হে নায়েবে নবী।’
লিখেছিলাম :
তালীম ও তিলাওয়াতে কুরআনে যিনি রঈসুল কুররা
ইলমে জাহেরে যিনি শামসুল উলামা
ইলমে বাতেনে যিনি ছাহেবে কাশফ ও কারামত মুর্শিদে কামিল ও মুকাম্মিল
ভাষণ ও বাগ্মীতায় যিনি খতীবে আযম
শিরক, বিদাত, বাতিল, গোমরাহী দূরীকরণে যিনি মহান সংস্কারকÑমুজাদ্দিদ
অন্যায়, অবিচার, জুলম অত্যাচারের বিরুদ্ধে যিনি নির্ভীক মুজাহিদ, বীর সিপাহসালার
আতিথেয়তা, বদন্যতা, দানশীলতায় যিনি যুগের হাতেম তায়ী
আধ্যাত্মিক শের শায়েরীতে যিনি বাংলার রূমী
হুব্বে রাসুল, ইশকে রাসূলে যিনি বাংলার ওয়ায়েসুল করনী
ইয়াতীম, অনাথ, দুস্থ, দুর্গত, অসহায়ের যিনি পরম সুহৃদ, মহান অভিভাবক
জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষের কল্যাণকামিতায়, সেবায় যিনি উৎসর্গিত প্রাণ
জ্ঞান, মনীষা, প্রজ্ঞা, পাণ্ডিত্যে এক বিস্ময়কর প্রতিভা
শরাফাত, সৌজন্য, উদারতা, মহানুভবতায় যিনি অনুপম

অগণীত জনতার হৃদয় রাজ্যের যিনি মুকুটহীন সম্রাট। তিনি ছিলেন ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ আল্লামা আবদুল লতীফ চৌধুরী (র.)।
ইসলাহে নফসের জন্য তিনি যেমন আজীবন চেষ্টা সাধনা করেছেন তেমনি গুরুত্বের সাথে ইসলাহে কওম ও হুকুমতের জন্যও চালিয়েছেন বিরামহীন জেদ্দ-জেহাদ।
সত্যিই তিনি-
শরীআতের হাদী, তরীকতের বাদশা
হাকীকতের খনি, মারিফত-শাহানশা
যুগের মুজাদ্দিদ, মুরাদে আউলিয়া
আশিকে ইলাহী, আশিকে মুস্তফা।।

তিলাওয়াতে কুরআন তথা ইলমে কিরাতের সনদ যেমন তাঁর রাসূলে মকবূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত অবিচ্ছিন্নভাবে পৌঁছেছে, তেমনি ইলমে হাদীস ও ইলমে তাসাউফের সনদও তাঁর রাসূলুল্লাহ (সা.) পর্যন্ত পৌঁছেছে। আর এ তিনের সমন্বয়েই হলো দ্বীন। তাই তিনি দ্বীনের সত্যিকার রাহবার।
দ্বীনের এ তিন বিভাগের খিদমত আঞ্জাম তিনি শুধু ব্যক্তিগতভাবেই দেননি এজন্য তিনি উপযুক্ত কর্মীবাহিনী গড়ে তুলেছেন, সংগঠন কায়িম করেছেন, দুর্বার আন্দোলন সৃষ্টি করেছেন, বিভিন্ন দেশে ও মহাদেশে তা ছড়িয়ে দিয়েছেন। সর্বত্র সেসব সংগঠনের শতশত শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী চলছে সত্যিকার দ্বীন কায়িমের সুমহান খিদমত।
সত্যিই নানা বিস্ময়কর ও বৈচিত্রে ভরপুর ছাহেব কিবলাহর জীবনালেখ্য। আমরা যেমন তাঁকে দেখতে পাই বিজন পার্বত্যÑঅরণ্যে গভীর ধ্যানমগ্ন সাধক রূপে, তেমনি দেখতে পাই ইসলামী আন্দোলন ও সংগ্রামের ময়দানে অকুতোভয় মুজাহিদ, অগ্রপথিক বীর সিপাহসালার রূপে। তাঁর এই দ্বিতীয় রূপটির কাহিনী সুদীর্ঘ। আমরা এখানে তার দুএকটি খণ্ড চিত্র তুলে ধরার প্রয়াস পাচ্ছি। ইসলামী শিক্ষার খিদমতে তাঁর যেমন অপরিসীম অবদান রয়েছে, মুআল্লিম হিসাবে, মুহাদ্দিস হিসেবে, প্রিন্সিপাল হিসেবে, নিম্ন পর্যায় থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের বহু মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা ও অভিভাবক হিসেবে, তেমনি অবদান রয়েছে এর মান উন্নয়নে এবং এ শিক্ষার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের পদক্ষেপের মোকাবিলায় জীবনবাজি রেখে সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়া ও নেতৃত্বদানের ক্ষেত্রে। এমন ঘটনা বহু আমরা তার মধ্য থেকে এখানে কয়েকটি তুলে ধরছি।
১. তিনি ১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত করিমগঞ্জের বদরপুর সিনিয়র মাদরাসায় শিক্ষকতা করেন। সেখানে তাঁর ছাত্র, ভক্ত, অনুরক্ত মুরীদ-মোতাকিদদের সংখ্যা বহু। ১৯৫১ সালে আসাম সরকার মুসলিম অ্যাডুকেশন বোর্ড বন্ধ করে দেয়। ছাহেব কিবলাহ সংবাদ পেয়ে এর বিরুদ্ধে সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়েন। এ সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে সে অঞ্চলে করতে থাকেন একের পর এক প্রতিবাদ সভা। আসাম সরকার এ আন্দোলন স্তব্ধ করার জন্য তার বিরুদ্ধে জারী করে গ্রেফতারি পরোয়ানা। তাতেও তিনি নিবৃত্ত না হয়ে গ্রেফতারি এড়িয়ে অব্যাহত রাখেন সভা-সমাবেশ। ক্ষেপে গিয়ে সরকার তাকে দেখামাত্র গুলির অর্ডার জারী করে। এ অবস্থাতেও তিনি এক প্রতিবাদ সভায় উপস্থিত হয়ে হাতির পিঠে চড়ে জনতার উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দিয়ে পুলিশের চোখকে ফাঁকি দিয়ে জঙ্গলে আত্মগোপন করেন। গভীর অরণ্যে বহু লোমহর্ষক পরিস্থিতি ও কঠিন বিপদের মোকাবিলা করে অবশেষ উপস্থিত হন বদরপুরে এবং সেখান থেকে নিজ বাড়িতে।
২. পাকিস্তান আমলে ইসলামী অ্যাডভাইজারি কাউন্সিলের ডাইরেক্টর ড. ফজলুর রহমান প্রদত্ত ইসলামের অপব্যাখ্যার প্রতিবাদে দেশের উভয় অঞ্চলে ব্যাপক জন-অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। সিলেটে ছাহেব কিবলাহর নেতৃত্বে আহ্বান করা হয় এক বিক্ষোভ সমাবেশের। সিলেট নিবাসী পাক সরকারের জনৈক মন্ত্রী ছাহেব কিবলাহকে সমাবেশ না করার অনুরোধ করেন। ছাহেব কিবলাহ তাতে অসম্মতি জানালে মন্ত্রী মহোদয় ধমকের সুরে বলেন, বিক্ষোভ সমাবেশ স্থগিত করুন, অন্যথা সমাবেশের উপর পুলিশ গুলি বর্ষণ করবে। ছাহেব কিবলাহ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, সমাবেশ অবশ্যই হবে। আপনারা পুলিশকে গুলির অর্ডার দিলে, ইনশাআল্লাহ আমিও ইসলামী ফৌজ নিয়ে তার যথার্থ মোকাবিলা করব। মন্ত্রী থ’ হয়ে গেলেন। যথাসময়ে ছাহেব কিবলাহর নেতৃত্বে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই অত্যন্ত সফলভাবে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
৩. বাংলাদেশ আমলে এক সরকার কতিপয় অজুহাতে তিন শতাধিক মাদরাসা বন্ধ করে দেয়। চলে আরও অনেক মাদরাসা বন্ধের পায়তারা। এর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীন রাজধানীর বায়তুল মোকাররামের দক্ষিণ চত্বরে সারাদেশের মাদরাসা শিক্ষকদের এক প্রতিবাদ সমাবেশ আহ্বান করে। যথা সময়ে হাজার হাজার মাদরাসা শিক্ষক জমায়েত হন বায়তুল মোকাররাম-সম্মুখ চত্তরে। জমিয়াতের অন্যতম পৃষ্টপোষক হিসেবে ছাহেব কিবলাহও যোগদান করেন সমাবেশে। সিদ্ধান্ত হয় প্রতিবাদ মিছিল নিয়ে যাওয়া হবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এবং পেশ করা হবে স্মারকলিপি। বিপুল সংখ্যক সশস্ত্র পুলিশ সম্মুখের রাস্তা ঘিরে রেখেছে। নিরীহ মাদরাসা শিক্ষকগণ সামনে এগুতে ভয় পাচ্ছেন। শুরু হয়ে হয়েও হচ্ছে না মিছিল যাত্রা। সামনে এসে দাঁড়ালেন ছাহেব কিবলাহ। মাথায় সেই সবুজ পাগড়ি, হাতে লাঠি, তেজদীপ্ত চেহারা, বললেন- চলো। এ মিছিলে সবার আগে থাকব আমি। যদি গুলি হয়, প্রথমে লাগবে আমার বুকে। আমি শহীদ হবো। সামনে আগাও। যেন এক বিদ্যুৎ প্রবাহ ছড়িয়ে গেল। মিছিল এগিয়ে চলল প্রধানমন্ত্রীর দফতর অভিমুখে।
৪. প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের আমলে মাদরাসা শিক্ষকদের বৃহত্তর সংগঠন বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীনকে ধ্বংসের পাঁয়তারা চলে। তা প্রতিহত করার জন্য সভাপতি মুহতারাম মাওলানা এমএ মান্নান বিজয় সরণিতে আহ্বান করলেন মাদরাসা শিক্ষকদের জাতীয় সম্মেলন। প্রেসিডেন্ট এরশাদ সম্মতি দিলেন সম্মলনে প্রধান অতিথি হিসাবে যোগদান করতে। বিশেষ অতিথি ছারছীনার পীর ছাহেব কিবলাহ ও ফুলতলীর ছাহেব কিবলাহ। লক্ষাধিক মাদরাসা শিক্ষকদের সেই জাতীয় সমাবেশে মহামন্য প্রেসিডেন্টের ডানে ও বামে বসলেন দুই যুগশ্রেষ্ঠ আল্লাহর ওলী। ছাহেব কিবলাহ তাঁর ভাষণের এক পর্যায়ে বললেন : ‘প্রেসিডেন্ট সাহেব! জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের উপর হাত দিবেন না, ওটা আমাদের সংগঠন। কেউ ওটা ভাঙ্গার চেষ্টা করলে তার পরিণতি শুভ হবে না।’
৫. ২০০৫ সনে মাদরাসা শিক্ষাধারার ফাজিল, কামিল স্তর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ন্যস্ত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো। আশঙ্কা সৃষ্টি হলো এতে মাদরাসা শিক্ষা তার স্বকীয়তা হারিয়ে এক সময়কার নিউস্কীম মাদরাসার পরিণতি বরণ করার। সারাদেশে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় উঠল। ছাহেব কিবলাহর প্রতিবাদ কার্যক্রম শুধু সিলেটেই সীমাবদ্ধ থাকল না। তিনি এর প্রতিবাদে সিলেট-ঢাকা লং মার্চ করার ঘোষণা দিলেন। তিনি ছয় শতাধিক গাড়ির এক বিরাট বহর নিয়ে যথা সময়ে পৌঁছলেন ঢাকার বায়তুল মোকাররাম মসজিদের উত্তর গেটে। শাপলা চত্বর থেকে সচিবালয়ের পশ্চিমপ্রান্ত পর্যন্ত জনসমুদ্রে পরিণত হলো। ছাহেব কিবলাহ (র.) হায়দরী হুঙ্কারে বললেন : বাতিল কর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে মাদরাসাসমূহকে ন্যস্ত করার সিদ্ধান্ত। কায়িম করো ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়। আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ন্যস্ত করা হোক ফাযিল, কামিল স্তর। অন্যথায় কেবল সিলেট থেকে নয়, সকল বিভাগ ও জেলা থেকে লংমার্চ হবে ঢাকা অভিমুখে। প্রতিক্রিয়া হল সরকারি মহলে, ছাহেব কিবলাহকে আহ্বান জানানো হলো ঢাকায় এসে একান্তে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনা করার। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন করলেন প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব আবুল হারিস চৌধুরী। সিদ্ধান্ত হলো, ছোট ছাহেব জনাব মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরী এবং আমি যাব ছাহেব কিবলাহর সাথে। বৈঠক হলো প্রধানমন্ত্রীর সাথে। ছাহেব কিবলাহ উপদেশমূলক অনেক কথা বলার পর বললেন, মাদরাসাগুলো সরকার কায়িম করেনি, কায়িম করেছেন পীর-মাশায়েখগণ তাদের অনুসারী অনুগামী দ্বীনদার মুসলমানদের সহায়তা নিয়ে। এগুলোকে স্কুল, কলেজে পরিণত করবেন না। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এগুলোকে ন্যস্ত করার সিদ্ধান্ত বাতিল করুন। ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে মাদরাসাগুলোকে তার অধীনে ন্যস্ত করুন। এ শিক্ষার উন্নয়নের বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। ছাহেব কিবলাহ সতর্ক করে দিয়ে বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিধানের খেলাফ করলে তাঁরা অসস্তুষ্ট হন। গযব নেমে আসে।
‘স্বৈরাচারী শাসকের সামনে হককথা বলা হচ্ছে সর্বোত্তম জিহাদ’। এ জিহাদ চালিয়ে গেছেন তিনি আজীবন, আমরণ। সহীহ আকিদা, আমল, প্রচার ও প্রতিষ্ঠা এবং বাতিল আকিদা ও আমল উৎখাত করার জিহাদে তিনি নিজ জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। এ পথে শহীদ হওয়ার তামান্না ব্যক্ত করেছেন। নিয়ত সংগ্রাম করেছেন, কঠিনতর বিপদের সম্মুখীন হয়েছেন। জীবন বিপন্ন হওয়ার মুখোমুখি হয়েছেন। তবু সত্য-ন্যায়ের ঝান্ডাকে বুলন্দ রেখেছেন, কখনো অবনত হতে দেননি।
ছাহেব কিবলাহ দ্বীনী খিদমত সুষ্ঠুভাবে আঞ্জাম দেওয়ার লক্ষ্যে দেশে ও বিদেশে বহু প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন কায়িম করে গেছেন। তন্মধ্যে দারুল কিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্ট, লতিফিয়া এতীমখানা, হযরত শাহজালাল দারুচ্ছুন্নাহ ইয়াকুবিয়া কামিল মাদরাসা, লতিফিয়া কমপ্লেক্স, বাংলাদেশ আনজুমানে মাদারিছে আরাবিয়া, বাংলাদেশ আনজুমানে আল ইসলাহ, লতিফিয়া কারী সোসাইটি, বাংলাদেশ আনজুমানে তালামীযে ইসলামিয়া, ইয়াকুবিয়া হিফযুল করআন বোর্ড, দারুল হাদীস লতিফিয়া ইউকে, আনজুমানে আল ইসলাহ ইউকে, লতিফিয়া উলামা সোসাইটি ইউকে, লতিফিয়া কারী সোসাইটি ইউকে, আল ইসলাহ ইয়ুথ ফোরাম, কিরাত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, আল-মজিদিয়া ইভিনিং মাদরাসা ও লতিফিয়া গার্লস স্কুলের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া তাঁর পৃষ্টপোষকতায় দেশে-বিদেশে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনেক।
ছাহেব কিবলাহ (র.) অনেক দ্বীনী গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন। তন্মধ্যে আততানভীর আলাত-তাফসীর, মুন্তাখাবুস সিয়র, আনওয়ারুছ সালিকীন, আল খুতবাতুল ইয়াকুবিয়া, নালায়ে কলন্দর, শাজারায়ে তায়্যিবাহ, নেক আমল, আল-কাওলুছ ছাদীদ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তিনি তালামীযে ইসলামিয়া নামে যে ছাত্র সংগঠন কায়িম করেছেন মাদরাসা, স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি পর্যায়ে তার ব্যাপক প্রসার ঘটছে।
তিনি ইলমে কিরাতের জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘দারুল কিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্ট’ নামে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। সদ্য প্রাপ্ত তথ্যমতে বিভিন্ন দেশ ও মহাদেশে রয়েছে তার প্রায় তিন হাজার শাখা। যার মধ্যে বাংলাদেশে ২২৩২টি, ইউকেতে ৫৪টি। এ ছাড়া ভারত, স্পেন, কুয়েত, ফ্রান্স ও আমেরিকার বিভিন্ন স্টেটে রয়েছে আরও অনেক শাখা। দারুল কিরাতের রয়েছে ৬টি শ্রেণি। ২০১৯ সালের হিসেব অনুযায়ী এর সর্বমোট ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা ৪,৭৩,৫৪৭ জন। শিক্ষক সংখ্যা ১৩,৬১২ জন। শাখাকেন্দ্রসমূহের সাথে জড়িত রয়েছেন ২৪,৩৩২ জন নিবেদিত প্রাণ সদস্য।
ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) আর্ত-মানবতার সেবায় নিবেদিত ছিলেন আজীবন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত বড় ছাহেব কিবলাহ এবং তাঁর অন্যান্য আওলাদও তাঁদের ভক্ত অনুসারীদের নিয়ে এ খিদমত সমগুরুত্বের সাথে অব্যাহত রেখেছেন। সম্প্রতি তাঁরা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সেবা ও খিদমতে এক অনন্য দৃষ্টান্ত কায়িম করেছেন। এসব অত্যাচারিত, নিগৃহীত, নিপীড়িত উদ্বাস্তদের অব্যাহতভাবে খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা দিয়ে যেমন মানবতার মহৎ নজীর স্থাপন করা হয়েছে তেমনি সেখানে ৫০টি শাখা কেন্দ্র স্থাপন করে ১২০ জন ক্বারী সাহেবানের মাধ্যমে চালানো হচ্ছে পবিত্র কুরআনের তালীম ও প্রাথমিক দ্বীনী শিক্ষা কার্যক্রম।
সিলেটসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায়, যুক্তরাজ্যের লন্ডন, ম্যানচেস্টার, বার্মিংহাম, ব্রিস্টল, ওয়েলসের কার্ডিফ ও স্কটল্যান্ডের বিভিন্ন শহরে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক, ম্যানহাটন, জামাইকা ও নিউজার্সি, মিশিগান, ওয়াশিংটন ডিসিসহ বিভিন্ন স্টেটের বিভিন্ন শহরে দারুল কিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্ট এর কর্মীদের তথা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) এর ভক্ত, অনরাগী, অনুসারীদের যে স্বতঃস্ফূর্ত দ্বীনী খিদমত ও মানবতার সেবা আমি স্বচক্ষে দেখেছি এক কথায় তা নজিরবিহীন।
ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) সম্পর্কে কিছু আলোচনা করতে গেলেই আল্লামা আলতাফ হুসাইন হালীর মুসাদ্দাসের কায়েকটি চরণ আমার মনে পড়ে যায় এবং প্রায়ই তা আবৃত্তি করে তৃপ্তি পাই। যার তরজমা হচ্ছে,

“উল্টে দিতে যুগ-জমানা চাই না অনেক জন
এক মানুষই আনতে পারে জাতির জাগরণ।
এক মানুষই বিপদ কালে বাঁচায় কাফেলায়
ক্ষুদ্র ডিঙ্গা বাঁচায় জাহাজ অসীম দরিয়ায়।
এমনি করে চলছে হেথায় রাত্রি দিন ও মান
একটা বাতি জ্বালতে পারে হাজার বাতির প্রাণ।”

ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) এর প্রচেষ্টা ও তত্ত্বাবধানে দেশে-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিভিন্ন স্তরের বহু মাদরাসা, মক্তব, মসজিদ, খানকা, ইয়াতীমখানা ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। দেশ-দেশান্তরে সম্প্রসারিত হয়ে চলছে এর সংখ্যা ও খিদমত। তাঁর প্রণীত গ্রন্থাবলি দ্বারা ইলমে দ্বীনের আলো, মানবতার আহ্বান ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বময়। সৃষ্টি হচ্ছে এক আধ্যাত্মিক জাগরণ। ইন্তিকালের পরেও তার রূহানী ফয়েজ ও তাওজ্জুহতে ধন্য হচ্ছে বহু জন। তাঁর অমর অবদান নিয়ে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে চলছে গবেষণা। আমরা মনে করি, রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও তাঁর মূল্যায়ন হওয়া আবশ্যক। গুণীজনে কদরদানে উদার সরকার এ দিকে নজর দিবে -এ আমাদের প্রত্যাশা।
তাঁর কাশফ ও কারামতের ঘটনা অসংখ্য। মরেও যারা অমর হয়ে থাকেন ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ হচ্ছেন তাঁদেরই একজন। ইন্তিকালের পরেও রূহানী শক্তিবলে যারা পথ নির্দেশ করতে পারেন, ছাহেব কিবলাহ হলেন তেমনি এক আধ্যাত্মিক ক্ষমতা সম্পন্ন মহাপুরুষ। এরূপ ঘটনা আছে বহু। সে সব তুলে ধরা এ নিবন্ধের লক্ষ্য নয়। তবু, আমার নিজ সম্পর্কিত একটি ছোট ঘটনা উল্লেখ করার ইচ্ছে দমিয়ে রাখতে পারছি না। আমি তখন ইউকে সফরে। অবস্থান করছি ইস্ট লন্ডনের একটি বাড়িতে। ফজরের নামাজান্তে মুসল্লায়ই বসে আছি। হঠাৎ এসময় হাজির হলেন ছাহেব কিবলাহর স্বনামধন্য নাতি, লন্ডনস্থ দারুল হাদীস লতিফিয়ার সুযোগ্য প্রিন্সিপাল মাওলানা মুহাম্মদ হাসান চৌধুরী। এত ভোরে তাঁর আগমনে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম আগমনের হেতু। তিনি বললেন, বহুদিন ধরেই দাদাছাব স্বপ্নে দর্শন দিচ্ছিলেন না। কিন্তু আজ রাতে তাঁকে দু’দুবার দেখলাম। প্রথমবার দেখলাম, তিনি তাশরীফ এনেছেন। আমাকে বলছেন : রূহুল আমীন ছাব তো কদিন হয় লন্ডনে এসেছেন। তার খবর নিয়েছ কি? তাকে দাওয়াত দিয়েছ? আপ্যায়ন করেছ? আমি হন্তদন্ত হয়ে বিছানায় উঠে বসলাম। আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। আবার দেখলাম হুবহু ঐ একই স্বপ্ন। আর ঘুমুতে পারিনি। ফজর নামাজ আদায় করেই এখানে আপনার কাছে চলে এলাম। স্বপ্নের বিবরণ শুনে আমি কেঁদে ফেললাম। আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানালাম, দুনিয়াতে যেমন তিনি এ অধমকে ভুলেননি, হাশরের ভয়াল দিনেও তেমনি যেন ভুলে না যান।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক ইনকিলাব

ফেইসবুকে আমরা...