1. redwan.iub@gmail.com : admin2021 :
  2. admin@parwana.net : Parwana Net : Parwana Net
  3. editor@parwana.net : Parwana Net : Parwana Net
Logo
ইজমা-কিয়াস ও ইজতিহাদ
মোস্তফা মনজুর
  • ৩ জুলাই, ২০২১

বর্তমান সময়ে কিছু লোক ইজমা ও কিয়াসকে অস্বীকার করেন। বলেন যে, কুরআন-হাদীস থাকতে এগুলোর দরকার কি? এরকম কথা শুনলে শরীআতের ন্যূনতম জ্ঞান আছে এমন লোকের রাগ হওয়ার কথা, কিন্তু আমার হাসি পায়। এদের মতো নির্বোধ সম্ভবত আর কেউ নেই। এটা আমার কথা নয়, ইবনে তাইমিয়া (র.) এর কথা। দ্বীনের উসূল ও তারিখ সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান থাকলে এমন কথা বলা যায় না।
এটা অনেকেরই বক্তব্য এতে কোনো সন্দেহ নেই। বিশেষ করে, ইসলামের দিকে নতুন করে আকৃষ্ট হওয়া বিরাট একদল তরুণের বক্তব্য এটা। আমি এতে তাদের দোষ দিচ্ছি না। বরং দোষ তো তাঁদের যারা এই ব্যাখ্যা সেসব তরুণদের কাছে উপস্থাপন করেছেন। অতএব, আজকের লেখার উদ্দেশ্য কেবল সেসব লা-মাযহাবী যারা ইজমা-কিয়াস, ইজতিহাদ অস্বীকার করেন। যারা স্বীকার করেন তাঁরা নন।
ক. আপনারা অনেকেই কুরআনিয়্যুন বা কুরআনবাদী সম্প্রদায়ের নাম শুনেছেন। (হয়তো আহলে কুরআন নামে তাদের চেনেন, আমি এ নামে তাদের অভিহিত করি না, কারণ আহলুল কুরআন আমাদের সালাফ ও খালাফ উলামাদের কুরআন ও তাফসীর গবেষক সম্প্রদায়ের অভিধা)। এরা শুধু কুরআনকেই মানতে চায়, হাদীসকে নয়। সোজা কথায় এরা হাদীসকে অস্বীকার করে। নির্দ্বিধায় এদেরকে গোমরাহ বলা যেতে পারে, এমনকি লা-মাযহাবীগণও বলেন।
অথচ প্রায় একই ধরনের কাজ লা-মাযহাবীগণও করে যাচ্ছেন। তারা ইজমা, কিয়াস ও ইজতিহাদকে অস্বীকার করছেন। অথচ নিজেরা তা প্রয়োগও করছেন। ইজতিহাদ, ইজমা-কিয়াস তো কুরআন-সুন্নাহর ন্যায় টেক্সট নয়। এগুলো হচ্ছে একটা প্রসেস। যার মাধ্যমে কুরআন-সুন্নাহকে ব্যাখ্যা করা হয়, তারপর বিভিন্ন বিধানে তা প্রয়োগ করা হয়।
খ. ইজমা অস্বীকার করার প্রসিদ্ধ দলীল হচ্ছে ২০ রাকাআত তারাবীর জামাআতকে অস্বীকার করা। সাহাবাগণের যে মুবারক জামাআত তা চালু করেছিলেন, সেটা শরঈ দলীল ইজমা হিসেবে। অথচ লা-মাযহাবীগণ কেবল হাদীসের ভিত্তিতে এটা অস্বীকার করেন। অথচ সাহাবাগণ হাদীসের উপলক্ষ্য ছিলেন, হাদীস তাঁরাই ভালো জানতেন, হাদীসের প্রয়োগে তাঁরাই ছিলেন অগ্রগামী। তাঁদের প্রদত্ত হাদীসের বিকল্প ব্যাখ্যাও আছে, প্রয়োগ ক্ষেত্রের ভিন্নতাও প্রমাণিত।
এমনকি হযরত আয়িশা (রা.) এর যে হাদীস নিয়ে তারা ৮ রাকাআতের জন্য লড়াই শুরু করেছেন, সে-ই হযরত আয়িশা (রা.) এর জীবিতাবস্থাতেই ২০ রাকাআতের জামাআত চালু হয়। অথচ তিনি কোনো প্রতিবাদ করেননি। হযরত আয়িশা (রা.) কি হাত, কথা আর অন্তর দিয়ে ঘৃণা করার হাদীস জানতেন না? কোনো সাহাবীই কি জানতেন না? তাই কি? বিদআত (তাঁদের ভাষায়) চালু হয়ে গেল, অথচ তারা নির্বিকার! এমন হওয়াও কি সম্ভব?
কতই না আশ্চর্যের বিষয়! হাদীসকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে হাদীসের শিক্ষারই বিপরীত করা সম্ভবত লা-মাযহাবীদের দ্বারাই সম্ভব। তাদের একটা মাসআলার ব্যাপারে বলি। ইমাম যখন জোরে সূরা ফাতিহা পড়েন তখন তারা কোন সময় কিরাত পড়েন এ মাসআলার সমাধান কি? ইমামের সাথে সাথে, নাকি দু’কিরাতের মধ্যে? হাদীসে কিছু কি আছে? নাকি কুরআনে আছে? প্রিয় পাঠক কোথাও নেই।
এবার তারা নিজেদের বিচার বুদ্ধি প্রয়োগ করে সূরা ফাতিহা পড়ে নেন। এতেও তাঁদের দ্বিমত আছে। কেন এই দ্বিমত? কারণ ইজতিহাদের পার্থক্য। তারা নিজেরা প্রয়োগ করছেন অথচ ইজতিহাদই অস্বীকার করছেন। ব্যাপারটা কেমন হয়ে গেল না?
গ. হয়তো অনেকে বলবেন, আমরা ইজতিহাদ অস্বীকার করছি না। তাহলে প্রশ্ন, আপনারা ইজতিহাদ করে কি করবেন? নতুন করে কুরআন-হাদীস বানাবেন? (নাউযুবিল্লাহ) বরং ইজতিহাদ করে তো কুরআন-সুন্নাহ ব্যাখ্যাই করবেন। তাহলে তো সেই ইজমা আর কিয়াসই হলো। ইস্তিহসান, ইস্তিদলাল, মাকাসিদ এসবের দিকে আর নাই-বা গেলাম।
ধরে নিন, রক্তদানের মাসআলার কথা। এর সমাধান কি কুরআন-হাদীসে আছে? লা-মাযহাবীগণ বড়জোর বলবেন, আছে তবে তা স্পষ্ট নয়। বরং কুরাআন-সুন্নাহর মূলনীতি অনুসারে আমরা এর ফায়সালা করব। তো এ মাসআলায় কোন মূলনীতির প্রয়োগ হবে এটাই বলে দেয় ইজতিহাদ ও কিয়াস।
যেমন, এ মাসআলায় ফাতওয়া হচ্ছে, জায়িয তবে তা বিক্রি করা যাবে না। এটা বের করা হয়েছে মায়ের দুধের উপর কিয়াস করে। এখন কোনো লা-মাযহাবী ভাই কি কিয়াস বাদ দিয়ে এর কোনো সমাধান দিতে পারেন? আমি অপেক্ষায় রইলাম।
ঘ. হয়তো বলবেন, ইজমা-কিয়াস, ইজতিহাদ অস্বীকার করলে কী হলো? এটা খুব বড় কোনো ব্যাপার নয়? এমন ভেবে থাকলে আপনার উচিত শয়তানের হাত থেকে, সেক্যুলার চিন্তা-চেতনা থেকে নিজের চিকিৎসা করা। কেননা ইজমা-কিয়াস, ইজতিহাদ সবই কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। এতে কোনো সন্দেহ নেই। আর এগুলো দ্বীনের গ্রহণযোগ্যতা ও সাবলীলতা যেমন বাড়ায়, তেমনই নানা মাসআলার দ্বীনী সমাধানের পথ খুলে দেয়। সর্বোপরি শরীআত প্রণেতার উদ্দেশ্যের আলোকে কুরাআন-সুন্নাহ বুঝার ব্যাপারে এগুলোই সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম।
মনে রাখবেন, ইজমা-কিয়াস অস্বীকার করে আপনি ইসলামকে টিকিয়ে রাখতে পারবেন না। লা-মাযহাবীগণ তো কেবল গুটিকতেক মাসআলা নিয়েই ব্যস্ত। দুনিয়ার আর কোনো কিছুতেই তাদের মাথাব্যথা নেই। সেক্যুলার, সন্দেহবাদী, অন্য ধর্মের আগ্রাসন কিছুই নয়। ইজমা-কিয়াস বাদ দিয়ে কত সময় আপনি ইসলামকে ব্যাখ্যা করতে পারবেন?
তাছাড়া ইজমা-কিয়াস, ইজতিহাদ অস্বীকার করে আপনি প্রকারান্তরে বহু হাদীসকেই অস্বীকার করছেন। যেসব হাদীসে সাহাবাদের অনুসরণ, তাঁদের ইজতিহাদের কথা এসেছে সেগুলোর কোনো জবাব কি দিতে পারবেন?
কিংবা কিয়ামত পর্যন্ত ইসলামী শরীআহ জারী থাকার যে দাবি আমরা-আপনারা করি তার কি কোনো হিসাব মিলাতে পারবেন? বর্তমান সময়ের যেসব মাসআলা আসছে সেগুলোর ফাতওয়া কি কুরাআন-সুন্নাহ অনুসারে ইজমা-কিয়াস, ইজতিহাদ বাদ দিয়েই দিতে পারবেন? বড় কথা, তারা কি একজন সালাফেরও উক্তি দেখাতে পারবেন যেখানে ইজমা-কিয়াস ও ইজতিহাদ অস্বীকার করার কথা বলা হয়েছে? নিশ্চিতভাবেই পারবেন না। জানি না তাঁদের নিকট ইসলামের সংজ্ঞা কী। আমার মনে হয়, ইসলামের সংজ্ঞায়নেই তাঁদের সাথে আমাদের পার্থক্য। ইসলাম কেবল গুটিকতেক মাসআলারই নাম, আর কিছু তাঁদের কল্পনাতেও সম্ভবত আসে না।
ঙ. একটা ভুল ধারণা আমাদের মধ্যে আছে। অনেকে বলেন, আমরা তো যারা ইজমা-কিয়াস অস্বীকার করে তাদের থেকে ফাতওয়া নিই না। এটাও নিতান্ত দুর্বল কথা। কেননা এখানে ব্যক্তি উদ্দেশ্য নয়। লা-মাযহাবীগণ যদি ইজমা-কিয়াস অস্বীকার করেন তাহলে ইসলামকে বিজয়ী করা তো দূরের কথা, দাঁড়ই করাতে পারবেন না।
এমন ব্যক্তির দ্বীনের বুঝই তো অসম্পূর্ণ। তাঁর থেকে ফাতওয়া নেওয়া বা না নেওয়ায় কিছুই আসে যায় না। বরং তার নিকট থেকে কোনো কথাই নেওয়া উচিত নয়। কারণ সে ইসলামকেই বুঝতে পারেনি, সালাফদের ব্যাখ্যা অনুসরণ করেনি। বরং সে তো কেবল নিজের বুদ্ধিতে নিজের মতো করে ইসলামকে মানছে; যা ইসলামের পথ নয়।
বস্তুত এটাও এক প্রকারের আভিধানিক ইজতিহাদ; এতে ভুল হলে সাওয়াবের আশা নেই। বরং ঠিক হলেও গুনাহ হওয়ার সম্ভাবনা। কারণ ইজতিহাদের যোগ্যতা ব্যতিরেকে এমন করা নিষিদ্ধ। একটি হাদীস উল্লেখ করছি, “যে ব্যক্তি কুরআন সম্পর্কে জেনে বলল, সে যেন জাহান্নামে নিজের স্থানকে নির্দিষ্ট করে নেয়।” (তিরমিযী, বাবু মা জাআ ফিল্লাযি ইয়ুফাসসিরুল কুরআনা বিরাইহি)
এমন লা-মাযহাবীদের স্ববিরোধিতা আশ্চর্যজনক। ইজমা-কিয়াস অস্বীকার প্রকারান্তরে সাহাবাদের জ্ঞানের ও তাকওয়ার ব্যাপারেই প্রশ্ন তোলা। তাঁদের ব্যাখ্যার উপর নিজের ব্যাখ্যাকে প্রাধান্য দেওয়া। অথচ তারাই দাবি করেন যে, তারা কেবল সাহাবা নয়, সালাফদের পর্যন্ত অনুসরণ করেন। কি সুন্দর স্ববিরোধিতা!
কুরআনিয়্যুনগণ যেমন যে কারণে বিপজ্জনক, এমন (ইজমা-কিয়াস অস্বীকারকারী) লা-মাযহাবীগণও একই কারণে বিপজ্জনক। এদের নিকট থেকে পরহেয করা নিজেদের ঈমান-আমল বাঁচানোর জন্যই আবশ্যক। আল্লাহু আ’লাম।

ফেইসবুকে আমরা...