1. redwan.iub@gmail.com : admin2021 :
  2. admin@parwana.net : Parwana Net : Parwana Net
  3. editor@parwana.net : Parwana Net : Parwana Net
Logo
ট্রান্সজেন্ডার ফিতনা : সংক্ষিপ্ত বিবরণ
মারজান আহমদ চৌধুরী
  • ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪

ইংরেজিতে দুটি শব্দ আছে Sex ও Gender, বাংলা ভাষায় দুটিকে আলাদা করে বুঝানোর মতো ভিন্ন শব্দ নেই বিধায় দুটিকেই লিঙ্গ বলা হয়। এক সময় এগুলো একই অর্থে ব্যবহৃত হলেও এখন ভিন্ন অর্থে হয়। তাই বাংলা ভাষায় Sex-কে বলা হয় জৈবিক লিঙ্গ এবং Gender-কে বলা হয় সামাজিক লিঙ্গ। আর এখানেই সাধারণ মানুষ ধোকায় পড়ে যায়।

মায়ের গর্ভে থাকাকালীন সময়ে ক্রমোজমের পার্থক্যের দরুণ মানুষের লিঙ্গ নির্ধারিত হয়। প্রতিটি মানুষের মধ্যে এক জোড়া সেক্স ক্রমোজম থাকে। সেই ক্রমোজম XY (এক্সওয়াই) হলে ভ্রুণটি পুরুষ হয় এবং XX (এক্সএক্স) হলে নারী হয়। ইসলামের বিধান হচ্ছে, স্রষ্টা যাকে যে লিঙ্গ (sex) দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, তার লিঙ্গ-পরিচয় হবে সেই লিঙ্গ অনুসারে৷ পুংলিঙ্গ নিয়ে জন্মগ্রহণ করলে পুরুষ, স্ত্রীলিঙ্গ হলে নারী। এটি কেবল ইসলামের বিধান এমন নয়; বরং মানবতার দীর্ঘ ইতিহাসে এই বিষয়ে কোনো বিতর্ক সৃষ্টি হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই পুরুষলিঙ্গ নিয়ে জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তির অভিব্যক্তি– চালচলন, কথাবার্তা ও পোশাক হবে পুরুষালি এবং স্ত্রীলিঙ্গ নিয়ে জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তির অভিব্যক্তি– চালচলন, কথাবার্তা ও পোশাক হবে মেয়েলি তথা নারীর মতো। এর মধ্যে মিশ্রণের সুযোগ নেই। পুরুষ ও নারীর অভিব্যক্তির মধ্যে মিশ্রণ ঘটানো ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ e লা‘নত করেছেন সেই পুরুষের ওপর, যে নারীর বেশভূষা ধারণ করে ও সেই নারীর ওপর, যে পুরুষের বেশভূষা ধারণ করে (সহীহ বুখারী, হাদীস-৫৮৮৫)। আবার পুরুষের শারীরিক আকর্ষণ হবে বিপরীত লিঙ্গ তথা নারীর প্রতি এবং নারীর আকর্ষণ হবে তার বিপরীত লিঙ্গ তথা পুরুষের প্রতি। এটিই স্বাভাবিক এবং এর মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তা পৃথিবীতে মানবজাতিকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। পুরুষ হয়ে পুরুষের প্রতি যৌন আকর্ষণ বা পুরুষ পুরুষের সাথে যৌনাচারে লিপ্ত হওয়া একটি মানব-স্বভাববিরুদ্ধ কাজ। একইভাবে নারী হয়ে নারীর প্রতি যৌন আকর্ষণ বা নারী নারীর সাথে যৌনাচারে লিপ্ত হওয়া একটি মানব-স্বভাববিরুদ্ধ কাজ। এটিকে সমকামিতা বলা হয়। সমকামিতা ইসলামে গুরুতর অপরাধ। পবিত্র কুরআনে এটিকে ফাহিশাহ ও ফিসক বলা হয়েছে। রাসূল e নির্দেশ দিয়েছেন, সমকামিতায় লিপ্ত উভয় ব্যক্তিকে হত্যা করা হোক। (আবু দাঊদ, হাদীস-৪৪৬২)

কিন্তু আজকের যুগে এসে হাজার বছরের এই মানব-স্বভাব ও চারিত্রিক শিষ্টাচারকে একদল মানুষ হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। তারা বলছে, জন্মের সময় ব্যক্তি যে লিঙ্গ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, সেটি কেবল তার Sex বা জৈবিক লিঙ্গ। এটি তার লিঙ্গ-পরিচয় নয়। লিঙ্গ-পরিচয় নাকি ‘সমাজ’ ঠিক করে দেয়! এর নাম Gender বা সামাজিক লিঙ্গ। তাই চাইলে এই পরিচয় পরিবর্তন করা যায়। পুংলিঙ্গ নিয়ে জন্মগ্রহণ করেও কেউ নিজেকে নারী, আবার স্ত্রীলিঙ্গ নিয়ে জন্মগ্রহণ করেও নিজেকে পুরুষ পরিচয় দিতে পারে। পুরুষ বা নারী হওয়া ইচ্ছার ওপর; লিঙ্গের ওপর নয়। ব্যক্তির চালচলন, কথাবার্তা ও পোষাক পুরুষ নাকি নারীর মতো হবে, সেটিও তার ইচ্ছা। ব্যক্তি কি বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষিত হবে, নাকি সমলিঙ্গের প্রতি, নাকি উভয়ের প্রতি, সেটিও তার ইচ্ছা। চাইলে জৈবিক লিঙ্গ পরিবর্তন করে কেউ পুরুষ থেকে নারী অথবা নারী থেকে পুরুষ হতে পারবে। এটি নাকি মানবাধিকার!

তৃতীয় আরেকটি লিঙ্গ আছে, যা পুরুষ ও নারী থেকে ভিন্ন। সারা বিশ্বে মাত্র ১.৭ শতাংশ মানুষ জন্মগতভাবে জেন্ডার ডিফোর্মিটি বা লিঙ্গ সমস্যা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, যাদেরকে Intersex বা হিজড়া বলা হয়। হিজড়াদের সেক্স ক্রোমোজমে বিভিন্ন প্রকার ত্রুটি থাকে। এদের কয়েকটা ধরণ আছে। সাধারণত, এদের জেনেটিক সেক্সের সাথে শারীরিক গঠনের মিল থাকে না। এরা এভাবেই জন্মগ্রহণ করে। তবে এদের মধ্যেও খুব কম, মাত্র ১ শতাংশ বা তারও কম সংখ্যক লোক আছে, যাদের জেন্ডার ডিফোর্মিটি স্পষ্ট। বাকিদের সমস্যা এত ছোট যে, গভীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ব্যতীত তা বুঝাই যায় না। এদের ব্যাপারে ইসলামের সংক্ষিপ্ত, তবে স্পষ্ট বিধান আছে। এদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করা মোটেও উচিত নয়।

তবে রাস্তাঘাটে যে বিপুল পরিমাণ হিজড়া আমরা দেখি, বেশিরভাগই লিঙ্গ সমস্যা নিয়ে জন্মায়নি। এরা অপারেশনের মাধ্যমে লিঙ্গ পরিবর্তন করে। এদেরকে Transgender বা রূপান্তরিত লিঙ্গ বলা হয়। এদের সেক্স ক্রোমোজমে কোন ত্রুটি থাকে না। বরং এরা সুস্থ-স্বাভাবিক পরিপূর্ণ ছেলে বা মেয়ে হয়ে জন্মায়। বড় হতে হতে কোনো এক সময় এদের মনে হয় তারা যে লিঙ্গপরিচয় নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে, মানসিকভাবে তারা এর বিপরীত লিঙ্গপরিচয় ধারণ করে। তখন তারা নিজেদেরকে ট্রান্স হিসেবে পরিচয় দেয়। অর্থাৎ পুরুষ হলে সে নিজেকে নারী, আবার নারী হলে নিজেকে পুরুষ মনে করে। এখানে শারীরিক গঠন বা কাঠামোর কোনো দখল নেই, বরং পুরোটাই তার মানসিক চাহিদা। একটা ছেলে মনে মনে নিজেকে মেয়ে ভাবতে পারে। তখন তার পরিচয় ট্রান্সওইম্যান। একইভাবে, একজন মেয়ে মনে মনে নিজেকে ছেলে ভাবতে পারে। তখন তার পরিচয় ট্রান্সম্যান। সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত সেক্সকে বলা হচ্ছে জৈবিক লিঙ্গ আর ব্যক্তি মনে মনে নিজেকে যা ভাবে সেটাকে বলা হচ্ছে সামাজিক লিঙ্গ বা জেন্ডার। একজন ছেলে মনে মনে নিজেকে মেয়ে ভেবে লিঙ্গ পরিবর্তন অপারেশন করাচ্ছে, আবার একজন মেয়ে নিজেকে ছেলে ভেবে লিঙ্গ পরিবর্তন অপারেশন করাচ্ছে। মেয়েরা ছেলে হওয়ার জন্য ক্রমাগত নিজেদের শরীরে টেস্টস্টেরন হরমোন নিচ্ছে, আবার ছেলেরা নিচ্ছে এস্ট্রোজেন হরমোন, যেন তাদের শরীর কাঠামোতে পরিবর্তন আসে। তথাকথিত ‘আধুনিক’ মতানুযায়ী, ট্রান্সজেন্ডার একটি বৈধ লিঙ্গ! এখানেই শেষ নয়। আজকাল নতুন নতুন লিঙ্গ-পরিচয় বের হচ্ছে। LGBTQ+ নামে তাদের আন্দোলন আছে। এল (L) দ্বারা নারী সমকামী, জি (G) দ্বারা পুরুষ সমকামী, বি (B) দ্বারা উভকামী, টি (T) দ্বারা লিঙ্গ পরিবর্তনকারী, এবং কিউ (Q) দ্বারা বুঝানো হয় যারা এখনও ঠিক করতে পারেনি, পুরুষ নাকি নারী হবে। এরপর প্লাস (+) মানে আরও আছে। একদিন গুণে দেখি আরও প্রায় আড়াইশ লিঙ্গ-পরিচয় বের করে ফেলেছে! মনে পড়ে, ইবলিস চ্যালেঞ্জ করে বলেছিল-

وَلَآمُرَنَّهُمْ فَلَيُغَيِّرُنَّ خَلْقَ اللَّهِ

-আমি অবশ্যই তাদেরকে আদেশ করব, ফলে তারা আল্লাহর সৃষ্টিকে বিকৃত করবে। (সূরা নিসা, ১১৯)

আশঙ্কাজনকভাবে এই অবিচার ইউরোপ আমেরিকা ও ভারত পার হয়ে এখন মুসলিম দেশগুলোতেও প্রবিষ্ট হয়েছে। পাকিস্তান ২০১৮ সালে ট্রান্সজেন্ডার আইন করেছে, যেখানে নারী ও পুরুষকে ইচ্ছামত লিঙ্গ-পরিচয় বেছে নেয়া ও লিঙ্গ পরিবর্তন করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। যদিও এই আইন এখনও বাস্তবতার মুখ দেখেনি, তবুও ভেবে দেখুন, এরপর বাংলাদেশ এর শিকার হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশে বিদেশী মদদপুষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান মানুষকে ধোঁকা দিয়ে ট্রান্সজেন্ডারকে বৈধ ও স্বাভাবিকীকরণের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য তারা হিজড়াদের অধিকারের কথা বলে তলে তলে ট্রান্সজেন্ডারের প্রচারণা করছে। মানুষ ভাবে, ট্রান্সজেন্ডার মানে হিজড়া। অথচ হিজড়া একটি জেনেটিক এবমরমালিটি, আর ট্রান্সজেন্ডার একটি মানসিক সমস্যা। দুটির অর্থ ও পরিচয় আলাদা। কিন্তু সাধারণ মানুষ এসব জটিল বিষয় বুঝে না বিধায় তারা সেই সুযোগ নিচ্ছে। আমাদের দেশে সপ্তম শ্রেণিতে জৈবিক ও সামাজিক নামে দুটি আলাদা লিঙ্গ-পরিচয় পড়ানো হচ্ছে। তাতে ছোটকালেই যেন শিখে যায়, জৈবিক লিঙ্গ যাই হোক, আমি নারী নাকি পুরুষ হব, সেটি আমার ইচ্ছা। কোন পোশাক পরব, কীভাবে চলব, কী অভিব্যক্তি হবে, বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষিত হব, সমলিঙ্গের প্রতি, নাকি উভয়ের প্রতি, সবই আমার ইচ্ছা। ভেবে দেখুন, এই ফিতনা আমাদের সমাজকে কতটুকু বিশৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে যাচ্ছে। তাই আজ আমাদের সবার জন্য আবশ্যক হচ্ছে এই স্বভাববিরুদ্ধ ও ইসলামবিরোধী ফিতনার বিরুদ্ধে সজাগ হওয়া, প্রতিবাদ করা এবং এই ফিতনা থেকে আমাদের দেশ, সমাজ ও পরিবারকে রক্ষা করা। নয়তো দেরি হয়ে যাবে এবং আমাদেরকে পস্তাতে হবে।

ফেইসবুকে আমরা...