Logo
ইরান যুদ্ধের আদি-অন্ত
মুহাম্মাদ বিন নূর
  • ৩১ মার্চ, ২০২৬

ইরান বিধ্বস্ত, প্রায় বিধ্বস্ত বিশ্ব অর্থনীতি। শতাব্দীর ভয়াবহতম অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। উপসাগরীয় অঞ্চলের সব সুনাম প্রায় শেষ, অবৈধ রাষ্ট্র ইসরায়েলও যে খুব শান্তিতে আছে, তা বলার সুযোগ নেই। সবকিছুর পিছনে দায়ী ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলী আগ্রাসন, দ্বিতীয়বারের মতো সব ধরনের কূটনৈতিক রেওয়াজ ভঙ্গ করে আলোচনার টেবিলে বসে গত ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখ যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ইরানের বিপক্ষে।

গত এক মাসের এই যুদ্ধ এতোটাই ঘটনাবহুল যে প্রায় প্রতিটি ঘটনা নিয়েই বিশাল বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ লেখা দরকার, ফলে এই প্রবন্ধে ঠিক কতটুকু আলোচনা করা দরকার তা নির্ধারণ করা বেশ মুশকিলের বিষয় বটে। মাসিক পরওয়ানার নিয়মিত পাঠকদের মনে থাকার কথা, ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় ইরানে মার্কিন আগ্রাসন এবং এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান কর্তৃক উপসাগরীয় রাষ্ট্রসমূহে আক্রমণের আশঙ্কার বিষয়ে খানিকটা আলোকপাত করেছিলাম। ফেব্রুয়ারি মাস শেষ হওয়ার আগেই ট্রাম্প-নেতানিয়াহু জুটি আমাদের সে আশঙ্কাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে।

যুদ্ধের প্রাত্যহিক বিবরণ সচেতন পাঠকমহলের অজানা থাকার কথা নয়, তাই আমরা এই নিবন্ধে বরং আরেকটু বৃহৎ পরিসরে যুদ্ধের গতিপথ বোঝার চেষ্টা করবো। বাহ্যত এ যুদ্ধ মূলত ইরান বনাম মার্কিন-ইসরায়েলী যুদ্ধ হলেও সুক্ষ্ম বিচারে এ যুদ্ধে অনেকগুলো পক্ষ সক্রিয়, এবং তাদের প্রত্যেকের ভিন্ন ভিন্ন চিন্তা এবং লক্ষ্য রয়েছে। এই যুদ্ধের প্রথম পক্ষ ইসরায়েল, যে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু নিজেই বলেছেন, তিনি প্রায় চার দশক থেকে ইরানে আক্রমণ করার স্বপ্ন দেখে আসছেন, এবং বহু মার্কিন প্রেসিডেন্টকে রাযী করানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন, এই প্রথম  প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে রাযী করাতে সক্ষম হয়েছেন। ইসরায়েলের চোখে মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিটি শক্তিশালী রাষ্ট্রই তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ, ইরানের মতো পশ্চিমাবিরোধী-জায়োনবাদের শত্রু আঞ্চলিক পরাশক্তি তো বটেই। তাদের লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি রাষ্ট্র যেন ব্যর্থ ও দূর্বল রাষ্ট্রে পরিণত হয়, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া প্রভৃতি দেশে তাদের সে লক্ষ্য ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে তারা অদূর ভবিষ্যতে নীল ও ফোরাত নদীর মধ্যবর্তী পুরো অঞ্চল জুড়ে বৃহত্তর ইসরায়েল কায়েম করতে চায়, যার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের পুরো মানচিত্র বদলে ফেলতে হবে। আর সেক্ষেত্রে সবার আগে দরকার এই অঞ্চলের প্রতিটি রাষ্ট্রকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করা। ইরানের পর তারা তুর্কির দিকে নযর দেবে, একমাত্র পারমণবিক শক্তিধর মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানকেও তারা হিসাবে রাখছে। আরব দেশগুলো আমেরিকার ঘনিষ্ট মিত্র হওয়ায় এখনই কিছু করা যাচ্ছে না, কিন্তু বাকি রাষ্ট্রগুলোকে খতম করতে পারলে ইসরায়েল এসকল রাষ্ট্রকেও ছাড়বে না, এরই মধ্যে কাতার সম্পর্কে জায়োনবাদীদের বিবৃতি থেকে সে ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে। অবশ্য আরব দেশগুলোর ক্ষেত্রে ইসরায়েলের সুবিধার জায়গা হলো, এসকল রাষ্ট্র সামরিক দিক থেকে শতভাগ পশ্চিমা নির্ভর, তাই এ সকল  দেশের কাগুহে সামরিক শক্তি ইসরায়েলের মাথাব্যথার কারণ তো হবেই না, উপরন্তু যে কোন সময় পশ্চিমা মদদ সরে গেলে এসকল রাষ্ট্র ইসরায়েলের সহজ শিকারে পরিণত হতে সময়ও লাগবে না, ইরানের মতো এতো ঝামেলাও পোহাতে হবে না। সব মিলিয়ে ইসরায়েলের আপাতত একমাত্র লক্ষ্য হলো ইরানকে একটা গৃহযুদ্ধে জর্জরিত ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করা, পারমণাবিক অস্ত্রের সম্ভাবনা বা অন্য সব অভিযোগ নিছক অজুহাত মাত্র।

ইসরায়েলের পর এবার যুক্তরাষ্ট্রের দিকে নযর দেওয়া যাক। যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে তাদের জন্য ‘আসন্ন হুমকি’ হিসেবে ধরে নিয়ে যুদ্ধ শুরু করলেও বলাই বাহুল্য, এসব নিছক অজুহাত মাত্র। ইরানের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যে বিন্দুমাত্র কোন হুমকি ছিল না, তা খোদ মার্কিন গোয়েন্দা বিভাগও নিশ্চিত করেছে। গোয়েন্দা বিভাগের নিকট এটাও নিশ্চিত ছিল যে, ইরান কোনভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে এগুচ্ছে না। তদুপরি যুদ্ধ শুরুর দিনও ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, তার মধ্যস্থতায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি হতে যাচ্ছে, এবং তারা চুক্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছেন। যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরানে হামলার ঘটনার সবচেয়ে ভালো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রীর বয়ানে। যুদ্ধ শুরুর পরপর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছিলেন- আমাদের নিকট তথ্য ছিল যে ইসরায়েল ইরানে আক্রমণ করতে যাচ্ছে, আর ইসরায়েল ইরানে আক্রমণ করলে ইরান আমাদের উপর আক্রমণ করার সম্ভাবনা ছিল, তাই আমরাই প্রথম আক্রমণ করি। সহজ ভাষায় বললে, বিশ্বের শীর্ষ পরাশক্তি এই যুদ্ধে আসলে ইসরায়েলের ‍পিছু পিছু, ইসরায়েলের সিদ্ধান্তে যোগদান করেছে! ফলে এই যুদ্ধে ইসরায়েল আসলে কী চায়, তা যতটা সহজে বলা সম্ভব, যুক্তরাষ্ট্র কী চায়, তা বলা ততটা সহজ নয়। খোদ ট্রাম্প কিংবা হেগসেথও (মার্কিন যুদ্ধমন্ত্রী) আসলে এই বিষয়ে খুব স্পষ্ট ধারণা রাখেন বলে মনে হয় না।

এমনিতে ট্রাম্পকে এই যুদ্ধে জড়াতে নেতানিয়াহু ও যুক্তরাষ্ট্রের ভিতরের জায়নবাদী এবং সামরিক শিল্পপতিদের তদবীরবাজরা বুঝিয়েছিল যে, এ যুদ্ধ খুব সহজেই শেষ হয়ে যাবে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করলেই বর্তমান ইরানী শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, ভেনেজুয়েলার মতো ইরানেও অনুগত শাসক বসিয়ে সেখানকার তেল-গ্যাস দখল করা যাবে, ইত্যাদি ইত্যাদি। এদ্দিনে ট্রাম্প নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন যে এর কোনটাই সত্যি নয়। কিন্তু এখন যে ঠিক কোন লক্ষ্যে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে, তা নিয়ে ট্রাম্পের কোন ধারণাই নেই। উল্টো যুদ্ধ শুরুর পূর্ব পর্যন্ত যে হরমুজ প্রণালি সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল, সেই হরমুজ প্রণালিকে আবার সবার জন্য উন্মুক্ত করাই এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিকট যুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ট্রাম্প দ্রুত যুদ্ধ সমাপ্ত করতে আগ্রহী, কিন্তু ইরানের নিকট পরাজয় স্বীকার না করে যুদ্ধ সমাপ্ত করার কোন পথ এই মুহূর্তে তার হাতে নেই। ফলে তাকে এখন পাগলের প্রলাপ বকে যেতে হচ্ছে, গণমাধ্যমে এসে ইরানের সাথে কল্পিত সংলাপের বর্ণনা দিতে হচ্ছে, ইরানীরা তো বলেই দিয়েছে যে ট্রাম্প আসলে তার নিজের সাথেই সংলাপ করছেন। সর্বোপরি যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রভাবে ট্রাম্প রীতিমতো দিশেহারা। এবার যুদ্ধ শুরু হলে ইরান উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর উপর হামলা করবে এবং প্রয়োজনে হরমুজ বন্ধ করে দেবে, সর্বজনবিদিত এই বিষয়গুলোও নাকি ট্রাম্প যুদ্ধ শুরুর আগে বুঝতে পারেননি! ফলে এখন জ্বালানি সংকট মুকাবিলায় রাশিয়ার উপর অবরোধ শিথিল করতে তো হয়েছেই, এমনকি খোদ ইরানের জ্বালানির উপরও অবরোধ কিছুটা শিথিল করতে হচ্ছে! দিশেহারা ট্রাম্প একেকবার একেক বক্তৃতা দিচ্ছেন, একবার তো বলেই ফেললেন, যুদ্ধ শেষে আমি আর আয়াতুল্লাহ মিলে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করবো! যে হরমুজ প্রণালি সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল, যুদ্ধের মাধ্যমে সেই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের দখল আয়াতুল্লাহর হাতে তুলে দেওয়ার কথাও ভাবছেন ট্রাম্প।

ট্রাম্প যুদ্ধ শুরুর আগে আরব মিত্রদের কথা শুনা দূরে থাক, এমনকি তার ইউরোপীয় মিত্রদের সাথেও পরামর্শ করেননি। এখন হরমুজ প্রণালিসহ সর্বত্র বিপদে পড়ে যখন মিত্রদের সাহায্য প্রয়োজন হচ্ছে, তখন প্রায় কেউই তার ডাকে সাড়া দিচ্ছে না। স্পেনের মতো কঠোর সমালোচনা না করলেও, যুক্তরাষ্ট্রের কোন মিত্রই আসলে ট্রাম্পের এ যুদ্ধের সঙ্গী হতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ট্রাম্প এই ইস্যুতে স্বভাবসুলভ উন্মত্ত মন্তব্য করেই যাচ্ছেন। তবে এর ফলে এই যুদ্ধের পর ন্যাটোকে নিয়ে ট্রাম্পের আপত্তির জেরে পুরো ন্যাটোতেই ভাঙনের সুর ধরা পড়ে কি-না, তা দেখার জন্য তুর্কিতে অনুষ্ঠিতব্য ন্যাটোর পরবর্তী সম্মেলনের অপেক্ষা করতে হবে।

এই যুদ্ধের সবচেয়ে অসহায় পক্ষ সম্ভবত উপসাগরীয় আরবদেশসমূহ। তাৎক্ষণিক ক্ষয়-ক্ষতির বিচারে হয়তো ইরানই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ, তবু ইরানকে অসহায় বলার সুযোগ নেই, কারণ দেশটি তার নিজস্ব শক্তির উপর দাঁড়িয়ে এই যুদ্ধ মুকাবিলা করে যাচ্ছে। কিন্তু উপসাগরীয় দেশগুলোকে সম্পূর্ণ মার্কিন সহায়তার উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। উপসাগরীয় এসকল দেশের যে প্রকৃত অর্থে সার্বভৌমত্ব বলে কিছু নেই, এই যুদ্ধে তা যেন আর স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যুদ্ধের শুরুতে প্রায় সব কয়টি উপসাগরীয় দেশ এ যুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিল। সৌদির বিন সালমান যুদ্ধের উসকানি দিয়েছেন বলে কিছু প্রতিবেদন প্রকাশ হলেও বাস্তবে তা না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ গত বছরের ১২দিনের যুদ্ধে ইরানী মিসাইল ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানার পর উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর এতোটুকু উপলব্ধি অন্তত হয়েছিল যে, মার্কিন-ইসরায়েলী যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও যদি দূরবর্তী ইসরায়েলকে ইরানের মিসাইল থেকে পুরোপুরি রক্ষা করতে না পারে, তাহলে তুলনামূলক নিকটবর্তী উপসাগরীয় রাষ্ট্রসমূহকে রক্ষা করার মতো কোন প্রযুক্তি আসলে কারো হাতেই নেই। আর আমিরাত-কাতার-সৌদির মতো উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর মূল শক্তিই হলো তাদের দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, এই নিরাপত্তার উপর ভরসা করে সারা দুনিয়ার ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গ এসব দেশে এসে আস্তানা গাড়ছে, ব্যবসা করছে, তেলের বাইরে মূলত এসবের উপরই তাদের উন্নয়ন নির্ভরশীল। ইরানের মিসাইল তাদের নিরাপদ ভূমিতে একবার আগুন ধরিয়ে ফেলতে সক্ষম হলেই তাদের এই সুনাম ধ্বংস হয়ে যাবে, ধ্বংস হয়ে যাবে এই সুনামের উপর ভর করে উন্নয়নের স্বপ্ন। বাস্তবে এ যুদ্ধে তাই ঘটছে। পশ্চিমা কোম্পানিগুলো উপসাগরীয় আরব দেশে থেকে লেজ গুটাচ্ছে, রিয়েল এস্টেটের মূল্য হ্রাস পাচ্ছে, তাদের প্রধান আয়ের উৎস জ্বালানি রফতানি প্রায় বন্ধ, বিকল্প আয়ের উৎস পর্যটন পুরোপুরি বন্ধ। সে যাই হোক, শুরুতে তাদের সমর্থন না থাকলেও, এবং যুদ্ধ শুরুর পর তারা এ যুদ্ধে তাদের মাটিতে থাকা কোন ঘাঁটি কিংবা আকাশসীমা যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহারের অনুমতি দিচ্ছে না বলে দাবি করলেও, বাস্তবে তাদের মাটিতে থাকা ঘাঁটি ও আকাশসীমা যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হওয়ার অভিযোগ এবং অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। অন্তত সংযুক্ত আরব আমিরাত কুয়েত, বাহরাইন ও সৌদি আরবের ঘাঁটি কিংবা আকাশসীমা যে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে, তা মোটামুটি প্রমাণিত। ফলে ইরানও এসকল রাষ্ট্রে মুহুর্মুহু ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালিয়েছে। কিন্তু সরাসরি ইরানের উপর পালটা হামলা করতে গেলে ইরানের হামলার তীব্রতা আরো বৃদ্ধি পাবে, অথচ মার্কিন-ইসরায়েলী হামলায় জর্জরিত ইরানের উপর তারা আসলে খুব একটা অতিরিক্ত ক্ষতি করার সক্ষমতা রাখেন না, দিন শেষে অস্ত্রের উৎস তো একই, এসকল বিবেচনায় এখন অবধি কোন উপসাগরীয় রাষ্ট্রই প্রত্যক্ষভাবে ইরানের উপর হামলায় যোগ দেওয়ার সাহস করেনি।

শুরুতে উপসাগরীয় রাষ্ট্রসমূহের খুব একটা সমর্থন না থাকলেও যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এসকল রাষ্ট্রের অবস্থানের মধ্যে কিছুটা হলেও ফাটল ধরেছে বলে মনে হয়। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তো ইকনমিস্ট পত্রিকায় কলাম লেখে পুরো পরিস্থিতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে পুরোপুরি দায়ী করেছেন, এবং এই যুদ্ধ শুরুর পিছনে ইরানের কোন দায় নেই, তাদের উপর অবৈধ যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। কাতার শুরুর দিকে ইরানের ‍বিরুদ্ধে খুব শক্ত কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করে, এমনকি এক পর্যায়ে কাতারের গ্যাস ক্ষেত্রে হামলার প্রতিবাদে কাতারে নিযুক্ত ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা অ্যাটাচকে অবাঞ্চিত ঘোষণাও করে। কিন্তু তারপর কাতারও ইরানের সাথে এক ধরনের সমঝোতায় আসে বলে মনে কূটনৈতিক পাড়ায় জোর গুঞ্জন রয়েছে। শুরু থেকেই অন্যান্য উপসাগরীয় দেশসমূহের তুলনায় কাতার ও ওমানের উপর হামলার তীব্রতা অনেক কম ছিল, উপরন্তু ঈদুল ফিতরের দিন থেকে বলতে গেলে কাতারে কোন উল্লেখযোগ্য মিসাইল আক্রমণই হয়নি, যা থেকে ইরান-কাতার গোপন সমঝোতার কিছুটা ইঙ্গিত বহন করছে বলেই মনে হয়। এমনিতে ওমান এবং কাতার শুরু থেকেই যুদ্ধ থামানোর বিষয়েই বেশি আগ্রহী। তবে বিভিন্ন সূত্রের খবর, সৌদি ও আরব আমিরাত শুরুর দিকে যুদ্ধ না চাইলেও যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তাদের চাওয়া হচ্ছে ইরানের সামরিক সক্ষমতা একেবারে ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত যেন যুদ্ধ না থামে। এমনকি আরব আমিরাতের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাগণ যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি স্থলযুদ্ধে অবতীর্ণ হলে সে যুদ্ধে শরীক হওয়ার কিংবা হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার অভিযান পরিচালনার অভিপ্রায়ও ব্যক্ত করছেন।

ইসরায়েল ও আমেরিকা এ যুদ্ধ শুরু করলেও এই মুহূর্তে যুদ্ধের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ যে পক্ষটির হাতে, সেটি ইরান। ইরান কখনোই এ যুদ্ধ চায়নি, এমনকি সে জন্য সবসময় সংলাপের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ছাড় দিয়ে হলেও তারা সব সময় পশ্চিমাদের সাথে সমঝোতার চেষ্ট করেছে, এ কথা যেমন সত্যি; তেমনি না চাইলেও এই যুদ্ধ আজ হোক কাল হোক, হবেই; এ বিষয়টিও ইরানের পরিকল্পনার মধ্যেই ছিল। ফলে নেতানিয়াহু যেমন চার দশক ধরে ইরানের বিরুদ্ধে এই সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন, প্রায় একই সময়কাল ধরে ইরানও এই যুদ্ধের জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুত করছিল। একই সাথে চূড়ান্ত যুদ্ধের স্বার্থে তারা এর আগে বহু বিচ্ছিন্ন মার্কিন-ইসরায়েলী আগ্রাসনে যথাযথ জবাব না দিয়েই নিজেদের সর্বোচ্চ শক্তি সঞ্চয় করেছে এতোদিন ধরে। সে কারণেই কাসেম সোলাইমানীর মতো জেনারেলের মৃত্যু কিংবা ইরানের মাটিতে ইসমাঈল হানিয়ার শাহাদত থেকে শুরু করে অসংখ্য বিজ্ঞানী হত্যা, খোদ ইরানী প্রেসিডেন্টের মৃত্যু, কোন ঘটনাতেই তারা যথাযথ জবাব দেয়নি। এবারের যুদ্ধের শুরুর কিছুদিন আগে ইরানের এক কর্মকর্তা বলেছিলেন, বিশ্ববাসী এখনো ধৈর্যশীল কৌশলী ইরানকে দেখে অভ্যস্থ, কিন্তু চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু হলে বিশ্ববাসী খ্যাপাটে ভয়াবহ যোদ্ধা ইরানের দেখা পাবে। এবারের যুদ্ধের শুরুতে সর্বোচ্চ নেতাসহ অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের প্রাণহানী ইরানকে সেই যুদ্ধের সূচনা করতে বাধ্য করে। ইরান এ যুদ্ধকে তাদের অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখছে। এ যুদ্ধের পর হয়তো ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা টিকে থাকবে, নয়তো ধ্বংস হয়ে যাবে। যদি ধ্বংসই হয়ে যায়, তবে কূটনৈতিক নিয়ম রক্ষা করে আর কী লাভ। তাই ইরান এ যুদ্ধের প্রথম দিন শুধু মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতেই আক্রমণ করেনি, বরং কাতার-কুয়েত-সৌদি-আমিরাত সব কয়টি দেশের বেসামরিক বিমানবন্দরেও আক্রমণ করে। প্রথম দিনেই যেন ইরান ঘোষণা দিয়ে বসে– উপসাগরীয় আরব দেশগুলো তাদের চোখে মার্কিন সাম্রাজ্রবাদের বৈদেশিক ভূখণ্ডমাত্র, কাজেই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যা যা করা দরকার হবে, সেটা এসকল রাষ্ট্রের উপরই করা হবে। এখন অবধি ট্রাম্প বারবার ইরানের সব বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করার হুমকি দিয়েও শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে হচ্ছে এই ভয়ে যে, তাহলে ইরানের মিসাইলের আঘাতে সব কয়টি উপসাগরী দেশও অন্ধকারে তলিয়ে যাবে। ইরানের পানি শোধনাগারে আঘাত হানলে তাও তাদের কিছু সুপেয় পানির উৎস আছে, কিন্তু এর বিপরীতে উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রায় কোন সুপেয় পানিরই উৎস অবশিষ্ট থাকবে না। ইরানের স্টিল ও ক্যামিকেল কারখানায় আক্রমণের জবাবে ইরান আরবদের উপরই আক্রমণ করেছে, ইসরায়েলের উপর তো করেছেই।

সব মিলিয়ে যুদ্ধ এখন এমন একটা পর্যায়ে আছে যে, ইরানের উপর আক্রমণের তীব্রতা যত বৃদ্ধি পাবে, ইসরায়েল এবং আপসাগরীয় আরবদের উপর ঠিক সেই মাত্রায় আক্রমণ চলতে থাকবে। সেই সাথে যুক্ত হয়েছে হরমুজ প্রণালি। ট্রাম্প বারবার হরমুজ নিয়ে হুমকি-ধামকি দিলেও কার্যত ইরানের হাত থেকে হরমুজ প্রণালি উদ্ধারের সক্ষমতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেন, কোন দেশেরই নাই। কেননা ইরান রাষ্ট্র হিসেবে যতদিন টিকে থাকবে, তাদের সব ক্ষমতা ধ্বংস হয়ে গেলেও হরমুজে আক্রমণের ক্ষমতা থেকে যাবে। কারণ হরমুজে আক্রমণের জন্য দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইলের দরকার নাই, সাধারণ অস্ত্র দিয়েই হরমুজের যে কোন জাহাজে আক্রমণ করার মতো ভৌগলিক সক্ষমতা ইরানের আছে। তার উপর যুক্ত হয়েছে ইরানের বিখ্যাত প্রতিরোধ অক্ষ বা মিহওয়ারুল মুক্বাওয়ামা। এই অক্ষে থাকা লেবাননের হিযবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুথিরা প্রায় নিঃশেষ হয়ে গেছে বলে ধারণা করা হলেও যুদ্ধ শুরুর পর তারা ঠিকই সক্রিয় হয়ে উঠেছে। হিযবুল্লাহ তো পূর্ণোদ্যমে ইসরায়েলের সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছে, অতি সম্প্রতি যোগ দিয়েছে হুথিরাও। ভুলে গেলে চলবে না, এই হুথিদের হাতে হরমুজের পর মধ্যপ্রাচ্যের আরেক গুরুত্বপূর্ণ প্রণালি বাব এল-মান্দেবের দখল রয়েছে। ইরান চাইলে যে কোন সময় সেটাও বন্ধ করে দিতে পারবে। তাতে বিশ্ব অর্থনীতির বেহাল দশা আরো বেহালতর হবে। এছাড়া ইরাকের ভিতরে থাকা শিআ মিলিশিয়ারা তো ইরাকের ভিতরে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের অস্তিত্বই হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে বলা চলে।

ট্রাম্প বারবার ইরানের সমস্ত সামরিক শক্তি ধ্বংস করে ফেলার ঘোষণা দিলেও বাস্তবে সাম্প্রতিক ইতিহাসে আমেরিকা এতো বেশি ক্ষতিগ্রস্থ আর কখনো হয় নাই, যতটা এবার ইরানের সাথে যুদ্ধ করতে এসে হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে অন্তত ১৩টি মার্কিন ঘাঁটি ইরানের হামলায় এই মুহূর্তে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বলে নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে।  ইরান কর্তৃক হামলার ঘোষণার পর কথিত ‘কারিগরি ত্রুটির’ কারণে মার্কিন নৌবহরকে মধ্যপ্রাচ্য ত্যাগ করতে হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের গর্বের এফ-৩৫সহ বিভিন্ন মডেলের যুদ্ধ বিমান ও জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এ কথা সত্যি, শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অভাবে সবচেয়ে বেশি জানমালে ক্ষতি হচ্ছে ইরানের, কিন্তু দেশটির সরকার ও জনগণ নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে সেই ক্ষয়-ক্ষতি মেনে নিতে প্রস্তুত। এমনকি ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার ঘোর বিরোধী অনেকেও এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা অনুযায়ী তাদের স্বার্থ হাসিলে সক্রিয় হচ্ছে না। বিশেষতঃ যুদ্ধের প্রথম দিনে বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলা করে নৃশংস যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, তারপর ইরানের অভ্যন্তরে আর কোন বিরোধ অবশিষ্ট থাকেনি। ইরান এখন ঐক্যবদ্ধভাবে লড়ে যাচ্ছে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

এই ভয়াবহ যুদ্ধের শেষ কোথায়? পাকিস্তান, তুর্কী ও মিসর মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিচ্ছে। সৌদিও সে উদ্যোগে যোগ দিচ্ছে, কাতার-ওমান পরোক্ষ সহায়তা করলেও সরাসরি মধ্যস্থতার কোন উদ্যোগে থাকতে আগ্রহী নয়। কিন্তু সমস্যা হলো, ট্রাম্পের এই যুদ্ধে জয় দরকার, তা যেভাবেই হোক; আর ইরান চায় এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেরকে এমন শিক্ষা দিতে– যাতে ভবিষ্যতে আর কখনো ইরানে আক্রমণের চিন্তা কোন মার্কিন প্রেসিডেন্টের মাথায় না আসে। ইরান মোটামুটি একটা চুক্তিতে রাযী হয়ে গেলে ট্রাম্প সেটাকেই নিজের জয় বলে প্রচার করতেন, কিন্তু সচেতনভাবে ইরান এবার সে সুযোগ দিতে অনাগ্রহী। এদিকে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর চাহিদা– কমপক্ষে হরমুজ প্রণালীকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরত আনতে হবে যুদ্ধ থামানোর আগে। কারণ এই প্রণালি দিয়ে আরবরা শুধু তেল-গ্যাস রফতানিই করে না, নিজেদের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য ও অন্যন্য আমদানির জন্যও এটি প্রয়োজন। ইরান শেষ পর্যন্ত এই কার্ডটি শক্তভাবে ধরে রাখবে, যেহেতু এটি সবচেয়ে সহজে ধরে রেখে প্রতিপক্ষকে সবচেয়ে বেশি বিপদে ফেলা সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ উন্মুক্ত করতে ব্যর্থ হলে এই প্রণালি ব্যবহারকারী দেশসমূহ বাধ্য হবে ইরানের শর্তে এই নৌপথ দিয়ে চলাচল করতে। তাতে মার্কিন প্রভাব ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হবে। এই পরিণতি থেকে বাঁচতে ট্রাম্প ইরানে সীমিত পরিসরে স্থল অভিযানের সব প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছেন। যে কোন সময় মার্কিন বাহিনী ইরানের কিছু দ্বীপে বা উপকূলীয় অঞ্চলে স্থল অভিযান পরিচালনা করতে পারে। তাতে সাময়িক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হলেও হরমুজ প্রণালি মোটেও নিরাপদ হবে না। কারণ তেহরান থেকেও যদি ছোটখাট মিসাইল ছোড়া হয়, তাহলেই তেলবাহী জাহাজগুলো আটকে যাবে। অন্য দিকে মার্কিন বাহিনীর পক্ষে ইরানের ভূমিতে টিকে থাকা রীতিমতো অসম্ভব। এরচেয়ে বহুগুণ বেশি প্রস্তুতি ও শক্তিমত্তা নিয়ে এসেও ইরাকে মার্কিন বাহিনীর পরিণতি খুব একটা সুখকর হয়নি। আর ইরান রাষ্ট্র হিসেবে ইরাকের চেয়ে শক্তিশালী, ভৌগলিক দিক থেকে অধিক সুরক্ষিত, সামরিক সক্ষমতায়ও বহু গুণ এগিয়ে। অন্যদিকে মার্কিন বাহিনী আসলে যুদ্ধের শুরুতেও স্থল অভিযানের কথা চিন্তাও করেনি। এখন সে চিন্তা করতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে স্থলযুদ্ধে নিঃসন্দেহে ইরান এগিয়ে থাকবে।

ফলে এবারের যুদ্ধ শেষ হওয়ার জন্য যে কোন এক পক্ষকে হার মানতে হবে, এখন পর্যন্ত কোন পক্ষই সে জন্য প্রস্তুত নয়। ইরান খুব হিসাব করে প্রতিদিন মিসাইল ব্যবহার করছে যেন তারা দীর্ঘ দিন টিকে থাকতে পারে ময়দানে। এদিকে পশ্চিমা ব্লকের মিসাইল প্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রায় শেষের দিকে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে। আবার শেষ পর্যন্ত এমনও হতে পারে, ট্রাম্প সব উপায় প্রয়োগের পর সফল হতে না পেরে ইসরায়েলকে মাঠে রেখে নিজে নিজে এক তরফা বিজয় ঘোষণা করে যুদ্ধ শেষ করে বসতে পারেন। আরব দেশগুলোকে সরাসরি যুদ্ধে নামাতে পারলে এই কৌশল আরো সহজ হবে। সামরিক সক্ষমতায় মার্কিন-ইসরায়েলী বাহিনী বহুগুণ এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও নিছক কৌশলগত ‍দিক থেকে ইরানকে বশ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এখন দেখার বিষয় ইরান কতক্ষণ এই কৌশলগত সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে টিকে থাকতে পারে। শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে সক্ষম হলে এ যুদ্ধের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য ব্যাপক হ্রাস পাবে। ইরান অনেক বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠবে। ওমান ও কাতারের মতো দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি চীন-রাশিয়াকে সমান গুরুত্ব দিতে শুরু করবে। এই দুটি দেশে এখনই মার্কিন ঘাঁটি তাদের দেশে থাকা উচিত কি-না সে আলাপ শুরু হয়ে গেছে। তবে সৌদি-আমিরাত এখনো মার্কিনীদের উপর আস্থা রাখলেও যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত কতটা আস্থা রাখতে সক্ষম হবে তা সময়ই বলে দেবে। আর যদি ইরান শেষ পর্যন্ত টিকতে না পারে, তবে এই যুদ্ধের পর ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়ে উঠতে পারে, মধ্যপ্রাচ্যসহ পুরো বিশ্বজুড়ে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, শুধু উপকৃত হবে অবৈধ রাষ্ট্র ইসরায়েল। ইসরায়েল যেহেতু মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি রাষ্ট্রকে ব্যর্থ ও দূর্বল রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়, তাই তাদের জন্য সবচেয় কাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি হচ্ছে, এই যুদ্ধের মাধ্যমে ইরান এবং ইরানের মিসাইলে সবকয়টি আরব রাষ্ট্র যেন দূর্বল হয়ে পড়ে। এমনকি যে আরব আমিরাত এই মুহূর্তে ইসরায়েলের প্রকাশ্য মিত্র, ইসরায়েল সেই আমিরাতকেও আসলে শেষ অবধি দূর্বল রাষ্ট্র হিসেবেই দেখতে চায়।  মধ্যবর্তী কোন ফলাফল হলে উপসাগরীয় রাষ্ট্রসমূহ সবচেয় খুশি হবে, কারণ তারা প্রতিবেশী ব্যর্থ রাষ্ট্রের অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব বৃদ্ধি কোনটাই চায় না। অধিকাংশ আরব রাষ্ট্র তাদের তুলনায় দূর্বল ইরানকে দেখতে চায়, গৃহযুদ্ধে জর্জরিত দূর্বল ইরান তাদের স্বার্থের পরিপন্থি। কিন্তু বাস্তবে তাদের চাওয়া বাস্তবায়নের সম্ভাবনা সবচেয়ে কম, যেহেতু কোন পক্ষই এখনো ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়।

এই প্রবন্ধে ইরানের পরমাণু প্রকল্প সম্পর্কে প্রায় কোন আলোচনাই করা হলো না, তার কারণ এটি নিয়ে যত চর্চাই হোক, প্রকৃতপক্ষে এটি অজুহাত মাত্র, মূল সমস্যা নয়। তবে ভিন্ন দিক থেকে পারমাণবিক অস্ত্রের আলোচনা থেকেই যায়, কৌশলগত পরাজয়ের ভয়ে শেষ অবধি ইসরায়েল কিংবা আমেরিকা তাদের সর্বশেষ অস্ত্র ব্যবহার করে বসবে? কোন সম্ভাবনাই উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ না থাকলেও আমরা আপাতত এই আলোচনা করতে চাই না। এটি ঘটলে তা পুরো পৃথিবীর জন্য সবচেয়ে বড় দুর্যোগ বয়ে আনবে, শুধু ইরানের জন্য নয়। ইরানের মিসাইল সক্ষমতা এখন সকল পক্ষের সত্যিকারের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বটে, তবে সেটার ভাগ্য নির্ধারিত হবে যুদ্ধের ফলাফলের ভিত্তিতে। শেষ পর্যন্ত টিকে থাকলে ইরান কোনভাবেই তাদের মিসাইল প্রকল্প ত্যাগ করতে রাযী হবে না, অন্তত এবারের যুদ্ধের পর তো নয়ই। তবে টিকে থাকতে না পারলে ভিন্ন কথা। সব মিলিয়ে ইরান তথা মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ অনেকগুলো যদি-কিন্তুর উপর নির্ভরশীল, শেষ পর্যন্ত কী হবে তা এখনই বলা কঠিন।

ফেইসবুকে আমরা...