মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সাথে জায়নবাদীদের চলমান যুদ্ধকে সকল বিবেচনায় আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। বিবাদমান দুই পক্ষের মধ্যে শান্তি আলোচনা চলা অবস্থাতেই এক পক্ষের অতর্কিত আক্রমণ করে অন্য পক্ষের শীর্ষ নেতাকে হত্যা ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর মাধ্যমে জায়নবাদী অক্ষ ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে যে তারা কোন শান্তি আলোচনার উপযুক্ত নয়। এজন্য রাষ্ট্র হিসেবে ইরানের অতীতের নানা বিচ্যুতি, তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের বিচ্যুতি ইত্যাদি সত্ত্বেও এই যুদ্ধে পৃথিবীর সকল প্রান্তের স্বাধীনচেতা জনতার সমর্থন পেয়ে আসছে দেশটি। এক মাস ধরে চলমান এই যুদ্ধে ইরান এখন পর্যন্ত যে অবিশ্বাস্য দৃঢ়তা এবং শক্তিমত্তার পরিচয় দিয়েছে তা পর্যবেক্ষণ করে অনেক বিশ্লেষকই মনে করছেন এই যুদ্ধের শেষে মধ্যপ্রাচ্য তো বটেই, সারা পৃথিবীর ভূরাজনৈতিক শক্তি কাঠামোতে বড় ধরণের প্যারাডাইম শিফট হতে যাচ্ছে। ইরানের এই দৃঢ় অবস্থানদৃষ্টে পশ্চিমা আধিপত্যবাদ থেকে মুক্তিকামী জনগণ যখন আশায় বুক বাঁধছেন তখন এই যুদ্ধ নতুন করে উন্মোচন করছে আরবের শাসকগোষ্ঠীর শঠতা, ক্ষমতালিপ্সা এবং ব্যক্তিত্বহীনতা। আরবের ক্ষমতা কুক্ষিগত করা এবং তা সংহত রাখার জন্য বর্তমান আরব শাসকগোষ্ঠী এবং তাদের পূর্বপুরুষরা কয়েক শতাব্দী ধরে পশ্চিমের সাথে আঁতাত করে আসছেন। পশ্চিমের সাথে অর্থাৎ জায়নবাদীদের সাথে আরব শাসকগোষ্ঠীর আঁতাতের সবচেয়ে লজ্জাজনক দিক হলো তাদের এই আঁতাতকে ইসলাম রক্ষার নামে জাস্টিফাই করার চেষ্টা এবং ইরানের সাথে এই সংঘাতকে শিআ-সুন্নী সংঘাতের আলোকে দেখার জন্য বিশ্বের সুন্নী মুসলমানদের প্রভাবিত করার চেষ্টা।
ইরান আর জায়োনিস্টদের এই সংঘাতে সাউদী আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইনসহ আরো কিছু আরব শাসকের জায়োনিস্টদের পপক্ষাবলম্বনকে যৌক্তিক প্রমাণের জন্য যে যুক্তিটা সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে সেটি হলো, যুদ্ধে সরাসরি অংশ না নিয়েও আরব রাষ্ট্রগুলো ইরানের হামলার শিকার হয়েছে; তাই বাধ্য হয়েই তারা জায়োনিস্টদের সাথে আঁতাত করেছে। এটি যে অত্যন্ত ঠুনকো যুক্তি তা আধুনিক যুদ্ধের নিয়মকানুন যে অল্প বিস্তর জানে তার কাছেই পরিষ্কার। প্রথমত, ইরানে যেসব মার্কিন ঘাটি থেকে হামলা চালানো হয়েছে সেগুলো এসব আরব রাষ্ট্রে অবস্থিত। দ্বিতীয়ত, ইসরায়েল অথবা মার্কিন ঘাটির উদ্দেশ্যে লঞ্চ করা ইরানের মিসাইল এবং ড্রোনকে আরব রাষ্ট্রগুলোর সীমানাতেই সবচেয়ে বেশি ইন্টারসেপ্ট করা হয়েছে। তৃতীয়ত, বিভিন্ন মার্কিন ঘাটি থেকে পালানো জায়োনিস্টদের এসব আরব রাষ্ট্র তাদের সিভিলিয়ান এরিয়া এবং ফাইভ স্টার হোটেলগুলোতে আশ্রয় দিয়েছে। দুটি বিবাদমান শক্তির মধ্যে তৃতীয় কোন পক্ষ যদি উল্লিখিত তিনটি কাজের একটিও করে তবে এই তৃতীয় পক্ষও কোন একটা শক্তির পক্ষ বলে বিবেচিত হয়। এমনকি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের রেজ্যুলিউশন অনুযায়ী কোন দেশে যদি অন্য কোন দেশ থেকে হামলা করা হয়, তাহলে সেদেশে পালটা হামলা চালানোর বৈধতা রয়েছে। মোটকথা আরব রাষ্ট্রগুলোতে ইরানের হামলা চালানোর বৈধতা তৈরি হয় বিভিন্ন আরব রাষ্ট্রে মার্কিন ঘাটি থেকে ইরানে হামলা চালানোর মাধ্যমে। তুফান আল আকসার সময় প্রতিরোধ যোদ্ধাদের মিসাইল ও ড্রোন প্রতিহত করতে আরব রাষ্ট্রগুলোর আকাশ ব্যবহৃত হওয়ায় সে সময়ও আরব রাষ্ট্রগুলো হামাস, হিযবুল্লাহ এবং হুথির আক্রমণের বৈধ লক্ষ্য হতে পারতো। কিন্তু তারা তা করেনি। আবারও যখন আরবরা নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানকে প্রতিহতে জায়োনিস্টদের সহযোগিতা করছে তখন তাদের উপর হামলা করা ছাড়া ইরানের কাছে কোন ভিন্ন পথ খোলা ছিলো না। তথাপি ইরান পুরো আরব উপদ্বীপকে টার্গেট না করে কেবল মার্কিন ঘাটি এবং যেসব স্থাপনায় জায়োনিস্টরা অবস্থান করছে সেসব স্থাপনার উপরই হামলা চালিয়েছে। এখানে উল্লেখ করা জরুরি যে “ইরান আরব ভূখণ্ডে হামলা করেছে বলে আরবরা জায়োনিস্টদের পক্ষে”, এই ন্যারেটিভের অসারতা প্রমাণ হয় পশ্চিমা গুরুত্বপূর্ণ মিডিয়ার রিপোর্টের ভিত্তিতে। যেসব রিপোর্ট বহুদিন ধরে দাবি করে আসছে যে ইরানে আক্রমণ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে বহুদিন ধরে গাল্ফ রাষ্ট্রগুলো উৎসাহিত করে যাচ্ছে। সর্বশেষ গার্ডিয়ান এবং নিউইয়র্ক টাইমস রিপোর্ট করেছে যে যুক্তরাষ্ট্র যেন যুদ্ধ বন্ধ না করে ইরানে হামলা অব্যাহত রাখে সে জন্য সাউদী আরব ক্রমাগত লবিং করে যাচ্ছে।
আরবে অবস্থিত সকল জায়োনিস্ট অর্থাৎ মার্কিন স্থাপনার উপর ইরানের হামলার প্রতি বিশ্বের সকল মুসলমানের মধ্যে সম্মতি তৈরি হওয়ায় আরব শাসকদের অনুগত শাইখরা নতুন ন্যারেটিভ তৈরির চেষ্টা করেছেন। তারা প্রচার করছেন এসব মার্কিন ঘাটি স্থাপনের অনুমতি আরবরা মূলত ইরানের কারণেই দিতে বাধ্য হয়েছে। দেশ-বিদেশের নজদী উলামারা তো এটা প্রচার করছেই, এমনকি সৌদ পরিবারের আনুকূল্য পাবার আশায় কিছু পীর নামধারীদেরও সম্প্রতি এই ন্যারেটিভ প্রচার করতে দেখা যাচ্ছে। তাদের যুক্তি অনুযায়ী উপসাগরীয় যুদ্ধের পরে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন জ্বালানির জন্য বেপরোয়া হয়ে কুয়েত আক্রমণ করলে বাধ্য হয়ে আরবরা মার্কিন ঘাটি স্থাপনের অনুমতি দেয়। এই ঠুনকো যুক্তির প্রথম অসুবিধা হলো প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন সুন্নী ছিলেন এবং ইরাকের শাসক ছিলেন। সুতরাং তার কুয়েত আক্রমণের কারণে যদি আরবরা মার্কিন ঘাটি স্থাপনে বাধ্য হয় তাহলে তো এর দায় এক সুন্নী শাসকের এবং ইরাকের। এটাকে ব্যবহার করে শিআফোবিয়া ছড়িয়ে আরবে মার্কিন ঘাটির বৈধতা দেওয়ার কোন সুযোগ নেই। দ্বিতীয়ত, উপসাগরীয় যুদ্ধের বহু পূর্ব থেকেই বর্তমান আরব শাসকগোষ্ঠীর সাথে পশ্চিমাদের বেশ নিবিড় বুঝাপড়া ছিলো। উসমানীয় খিলাফতের পতনের জন্য দায়ী এসব আরব শাসকদের পূর্বপুরুষরা ব্রিটিশদের সাথে আঁতাত করে হেজায এবং শাম অঞ্চলে বিদ্রোহ করে ধীরে ধীরে খিলাফতকে দুর্বল করেন। আরবের গত কয়েকশত বছরের ইতিহাস সম্পর্কে ন্যূনতম পড়াশোনা কারো থাকলে এই ঐতিহাসিক সত্য তার অজানা থাকার কথা না। অধিকন্তু সাদ্দাম হোসেনের কুয়েত আক্রমণের পূর্বেও অনেক আরব রাষ্ট্রে পশ্চিমা মিলিটারি ফোর্স এর উপস্থিতি ছিল।
সাউদী আরবের নজদ অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাটিতে ইরানের হামলাকে মক্কা-মদীনায় (যা মূলত হেজায অঞ্চল) হামলার নামান্তর বলে আহলে হাদীস আলিমরা এখনো প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের এমন বিভ্রান্তিকর প্রোপাগাণ্ডা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তারা মার্কিনীদের নিরাপত্তার স্বার্থে হারামাইনের নাম সওদা করতেও লজ্জা বোধ করেন না। হারামাইন থেকে শত শত মাইল দূরে মার্কিন ঘাটিতে হামলাকে তারা হারামাইনে হামলা বলে দেখান হেজায এবং নজদ উভয়ই সাউদী আরবের অংশ হওয়ায়। তাদের কাছে তখন মক্কা, মদীনা, হেজায সবই সাউদী আরবের সমার্থক। অথচ যখন রিয়াদে পশ্চিমা গায়ক-গায়িকাদের নিয়ে অশ্লীল কনসার্টের আয়োজন হয় তখন তারা যুক্তি দেন এগুলা মক্কা-মদীনা থেকে বহু দূরে। এমনকি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মক্কার নিকটবর্তী জেদ্দায় একের পর এক কনসার্টের আয়োজনেও তারা নির্বিকার। যেসব আরব শাসকদের মাধ্যমে পবিত্রভূমি হেজাযে দেদারসে অশ্লীলতা বেচাকেনা হচ্ছে তাদের সম্পর্কে ন্যূনতম সমালোচনা আহলে হাদীস নজদী আলিমদের কাছ থেকে শোনা না গেলেও ইরান নজদে মার্কিন ঘাটিতে হামলা করলে সেটাকে হারামাইনে (হেজাযে) হামলা বলে প্রচার করা নিছক প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়। এটি অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে, এমনকি ফিলিস্তিন গণহত্যায়, আরবদের অন্যায্য উম্মাহ-বিরোধী অবস্থানের পক্ষে ন্যারেটিভ তৈরি করতে আহলে হাদীস নজদী উলামারা মিথ্যার আশ্রয় নিতেও লজ্জা বোধ করছেন না। অতি সম্প্রতি ইবন আবদিল ওয়াহাবের মতাদর্শে বিশ্বাসী একজন আহলে হাদীস শাইখ ও প্রফেসর সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়িয়েছেন যে আলোচিত হরমুজ প্রণালীর আসল নাম ছিলো খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) প্রণালী; শিআরা নাকি ষড়যন্ত্র করে এই বীর সাহাবীর নাম পরিবর্তন করেছে। অথচ এই দাবির পক্ষে ন্যূনতম কোন প্রমাণ নাই। এটি একেবারেই মিথ্যা একটি দাবি। অথচ জাযিরাতুল আরবের নাম এক ব্যক্তির নামে “সাউদী আরব” করায় তারা মোটেও কষ্ট পান না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখ নিসৃত হেজাজ, শাম ইত্যাদি নাম আজ বিলুপ্তপ্রায় হয়ে গেলেও এসব শাইখরা কষ্ট পান না। তাদের এই দ্বৈতনীতি থেকে স্পষ্ট হয় ইসলাম আর জায়নবাদের মধ্যে চলমান সংঘাতে আরব শাসকগোষ্ঠীর অন্যায্য অবস্থানকে বৈধতা দিতেই তারা এমন নির্জলা মিথ্যা প্রোপাগাণ্ডা প্রচারে নেমেছেন। তাদের এই অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তাদের গ্রহণযোগ্যতার এবং নৈতিক মানদণ্ডের নীচতা উন্মোচিত করে।
সাম্প্রতিক সময়ে অত্যন্ত পরিতাপের সাথে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, জায়নবাদী গোষ্ঠীর তাঁবেদারীতে আরব শাসকদের গত তিন বছরে সব রকমের লজ্জা বিসর্জনের পর এখন দুনিয়ার তাবৎ মাদখালী, নজদী শাইখরাও সকল লজ্জা বিসর্জন দেওয়া শুরু করেছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় বিখ্যাত ক্বারী ও নাশীদ শিল্পী মিশারী রশীদ আল আফাসীর কথা। তিনি “ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে জাহান্নামের দরজা খুলে দিবে বলে” হোয়াইট হাউজের টুইটকে রিটুইট করেছেন। অর্থাৎ ইরানকে ট্রাম্পের হুমকি-ধামকিকে এই ক্বারী পাবলিকলি সেলিব্রেট করছেন। তার কাছে মনে হচ্ছে কোন এক উন্মাদ শাসক অন্য একটি রাষ্ট্রের উপর “জাহান্নাম” চাপিয়ে দেওয়ার খবর উদযাপন করার বিষয়! ইরানের জনগণ এবং শাসকগোষ্ঠী মুসলমান কি না এই বিতর্কের বাইরে গিয়ে একথা তো অস্বীকারের সুযোগ কোন মুসলমানের হবে না যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প আর জায়নবাদীরা গণহত্যাকারী, খুনী এবং মুসলমানের জনপদ উজাড়কারী। সারা বিশ্বের মুসলমান যে ক্বারী সাহেবের তিলাওয়াতে, নাশীদে মোহিত হয় তিনিই ট্রাম্পের মতো একজন গণহত্যাকারী পেডোফাইলের নতুন গণহত্যার ঘোষণাকে উদযাপন করছেন! ইরানের বিরোধীতা মাদখালী আলিমদের ঠিক কতোটা অধঃপতনে নিমজ্জিত করেছে তার একটি উদাহরণ আলোচিত এই ক্বারী। অবশ্য এই অধঃপতন ইরানের বিরোধীতা করতে গিয়ে হয়েছে তা নয়, এই অধঃপতন হয়েছে বেদ্বীন আরব শাসকগোষ্ঠীর নির্বিচার তাঁবেদারী করতে গিয়ে। এই অধঃপতন যে আজকে শুরু হয়েছে তেমনও না। উপসাগরীয় যুদ্ধের পরে সাদ্দাম হোসেনের ভয়ে তটস্থ অন্যান্য আরব শাসকদের ক্ষমতার মসনদ নিরাপদ রাখতে প্রয়োজনে বিধর্মীদের সাথেও আঁতাত করা যাবে, এমন ফতোয়া দিয়েছিলেন শাইখ বিন বায এবং শাইখ উসাইমিনসহ তৎকালীন উল্লেখযোগ্য নজদী শাইখরা। যেকোন পরিস্থিতিতে ইয়াহুদী এবং নাসারাদের সাথে আঁতাত করার সম্মতির বীজ নিহিত আছে শাইখদের এই ফতোয়ায়, যা অদ্যাবধি আরব শাসকরা ইচ্ছামতো ব্যবহার করছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা জরুরি যে, যেসময় শাইখ বিন বায আর শাইখ উসাইমিন রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে বিধর্মীদের সাথে সামরিক সহযোগিতা বৈধ বলে সম্মিলিত ফতোয়া দেন, প্রায় একই সময় ফিলিস্তিনের মুসলমানদের হিজরত করা উচিত বলেও ফতোয়া দিয়েছিলেন। অর্থাৎ আল আকসার দাবি ত্যাগ করে পালিয়ে যেতে বলেছিলেন, যা সুস্পষ্টভাবে আরব শাসকদের ফিলিস্তিন প্রশ্নে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়াকে বৈধতা দেওয়ারই নামান্তর।
একথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান পাওয়ার স্ট্রাকচারের মধ্যে থেকে মুসলমানদের আজাদীর সম্ভাবনা একেবারেই নাই। এই ক্ষমতা কাঠামো তৈরিই হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে জায়নবাদী শক্তিকে নিরাপদ রাখতে, মার্কিন স্বার্থ সমুন্নত রাখতে। সুতরাং কেবল তখনই মুসলামদের মুক্তির দ্বার উন্মোচিত হবে, যখন বর্তমান ক্ষমতা কাঠামো ভেঙে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ক্ষমতা কাঠামো নির্মিত হবে। ইরানের সাথে জায়নবাদীদের এই যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতা কাঠামোর ব্যাপক পরিবর্তনের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, এই সম্ভাবনাই আরব শাসকদের ভীত করে তুলেছে। এই সম্ভাবনার কথা চিন্তা করেই আহলে হাদীস শাইখরা প্রচার করে বেড়াচ্ছেন বর্তমান কাঠামো ভেঙে গেলে আরব তথা বিশ্বে সুন্নী বলতে কিছু থাকবে না। ফিলিস্তিনের মুজাহিদদের সাথে স্পষ্ট প্রতারণা করা বেদ্বীন এবং যালিম আরব শাসকগোষ্ঠীর টিকে থাকার উপরে সুন্নীদের টিকে থাকা নির্ভর করছে এধরণের কথা প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়। বস্তুত এসব যালিম শাসকদের অধীনে সুন্নী ইসলামের প্রচার হয় নাকি সহীহ আকীদা আর মানহাজের নামে নাসেবী, নজদী ফিরকার প্রসার হয় তা বিশ্বের মুসলমান গত একশত বছরে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। শিআদের সাথে সংঘাতের সময়ই এসব ফিরকা নিজেদের সুন্নী বলে পরিচয় দেন এবং অন্য সময় নিজেদের “সুন্নী” বলে পরিচিয় দিতে তারা লজ্জাবোধ করেন। বনূ উমাইয়ার তাঁবেদারী করা নাসেবী, নজদী এবং খারিজী ফিরকাকে আহলে সুন্নাত নামে প্রচারের যে ধোঁকাবাজী চলছে, এর মূলোৎপাটন হলে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের ন্যূনতম কোন ক্ষতিও হবে না। আরবজুড়ে নাসেবী নজদীদের দৌরাত্ম্য এতোটাই প্রকট যে, আহলে বাইতের প্রতি একটু বেশি ভালোবাসার প্রকাশ ঘটালেই “শিআ” বলে অভিহিত হতে হয়। অথচ গোটা শাম (সিরিয়া) জুড়ে বনূ উমাইয়ার লিগ্যাসির জয়গানের নামে ইয়াযীদের বন্দনা চলমান থাকলেও তা কোন শাইখের মর্মবেদনার কারণ হয় না। যারা “আমরা ইয়াযীদ ইবন মুআবিয়ার গর্বিত উত্তরাধিকার” বলে গর্ব করতে পারে, এই শ্রেণীকে কোনভাবেই সুন্নী বলার সুযোগ নাই। এটা প্রায় হাজার বছর ধরে বনূ উমাইয়া শাসকদের তাঁবেদার আহলে বাইতের প্রকাশ্য শত্রু নাসেবীদের ভাষা। এই ভাষাকে যে আরব শাসক আর শাইখরা পেট্রোনাইজ করেন সে শাসক আর শাইখের পতনে আহলে সুন্নাহর কোন ক্ষতি নাই।
কয়েকদিন পূর্বে মুহাম্মদ বিন সালমান সম্পর্কে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রেস কনফারেন্সে প্রকাশ্যে বলেছেন- “He didn’t think he’d be kissing my a**.” অর্থাৎ “(কিছুদিন আগেও) সে (মুহাম্মদ বিন সালমান) কল্পনাও করেনি যে সে আমার পশ্চাদ্দেশ চাটবে।” কোন দেশের সরকার প্রধানকে নিয়ে এমন অবমাননাকর মন্তব্য অবিশ্বাস্য। কোন আত্মমর্যাদাবান দেশের সরকার প্রধানকে নিয়ে এমন মন্তব্য করার কথা অন্য কোন রাষ্ট্র প্রধান চিন্তাও করার কথা না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ বিন সালমানকে নিয়ে এমন অপমানজনক ভাষা প্রয়োগ করতে পারার পিছনে মূল শক্তি হিসেবে কাজ করেছে এমবিএসের শাসন টিকিয়ে রাখার পিছনে আমেরিকার ভূমিকা। এই ঘটনার দ্বারা স্পষ্ট হয়েছে জায়নবাদী শক্তি তথা ট্রাম্প-নেতানিয়াহু কী নিদারুণ তাচ্ছিল্যের সাথে আরব শাসকদের সাথে সম্পর্কে রাখে। ট্রাম্পের ভাষায় বুঝা যায় সাউদী আরবের কাছে সে “মহান দাতা” আর প্রিন্স এমবিএস “বিনীত গ্রহীতা”। নিজেদের অবস্থানকে এতো সংকীর্ণ করে জায়নবাদীদের অনুগ্রহে টিকে থাকার এই যিল্লতী আরব শাসকরা নিজেরাই পছন্দ করেছেন। তাদের জন্য আরও অপমান এবং লাঞ্চনা অপেক্ষা করছে বিশ্ব রাজনীতিতে। পরাজিত এই যুদ্ধের খরচের বোঝাও ট্রাম্প প্রশাসন আরব শাসকগোষ্ঠীর উপরে ফেলবে এবং তারা তা পরিশোধ করতে রাযীও হবে এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। আরবদের পেট্রো-রিয়াল গ্রহণ করে যেসব নাসেবী, নজদী, আহলে হাদীস আলিমরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জায়নবাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করছেন তারাও সামনে আরও বেশি বেশি করে নিজেরা নিজেদের মুখোশ উন্মোচন করবেন, নিজেরাই প্রমাণ করবেন যে তারা বনূ উমাইয়ার অত্যাচারী শাসকদের নাসেবী লিগ্যাসি, তারা ইবন আবদিল ওয়াহাবের বিচ্ছিন্ন নজদী খারিজী ফিতনার উত্তরাধিকার। জায়নবাদীদের সাথে ফিলিস্তিনের মুজাহিদদের সংগ্রাম, গাযায় গণহত্যা এবং ইরানের সংগ্রাম বিশ্বের মুসলমানদের জন্য যে দুইটা ফায়দা নিশ্চিতভাবে নিয়ে এসেছে তার প্রথমটি হলো, এই তিন বছরের ঘটনাপ্রবাহ জায়োনিস্টদের গ্রেটার ইসরায়েলের স্বপ্ন বহু বছরের জন্য ভেঙে দিয়েছে, আর দ্বিতীয়টি হলো এই সংগ্রাম মুসলমানদের জন্য হক আর বাতিল চেনার একটি কষ্টিপাথর হিসেবে কাজ করছে।
ইরানের বিরুদ্ধে আরব শাসকদের জায়নবাদের পক্ষাবলম্বনকে যৌক্তিক প্রমাণে মরিয়া নজদী উলামাদের জন্য দুটি অতি সাম্প্রতিক তথ্য দিয়ে এই লেখার ইতি টানছি। অতি সম্প্রতি (৩০শে মার্চ) ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেট সন্ত্রাসবিরোধী আইনের নামে ফিলিস্তিনীদের ফাঁসি দেওয়ার আইন পাশ করেছে। ইসরায়েলে ফাঁসির অন্য কোন আইন না থাকলেও দশ হাজার ফিলিস্তিনী বন্দিকে হত্যার উদ্দেশ্য এই আইন পাশ করা হয়েছে। “সুন্নী” ফিলিস্তিনীদেরকে শায়েস্তা করতে এমন আইন করা হলেও জায়নবাদীদের বিশ্বস্ত দোস্ত, তথাকথিত “শিআ” ইরানের দুশমন সাউদী আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এখনো এ বিষয়ে কোন প্রতিবাদ জানায়নি। অন্যদিকে “শিআ” ইরানের পক্ষে “জিহাদ”-এ অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন “সুন্নী” চেচেন বাহিনীর প্রধান রমযান কাদিরভ। কেবল এই দুইটি ঘটনা থেকেই বুঝা যায় মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিকে “শিআ -সুন্নী” বাইনারি দিয়ে ব্যাখ্যা করা কতোটা বিভ্রান্তিকর এবং প্রতারণাপূর্ণ।

