1. redwan.iub@gmail.com : admin2021 :
  2. admin@parwana.net : Parwana Net : Parwana Net
  3. editor@parwana.net : Parwana Net : Parwana Net
Logo
শাওয়ালের রোযার গুরুত্ব
ইব্রাহিম আহমদ আরিফ
  • ৮ মে, ২০২১

মহান রাব্বুল আলামীন পবিত্র কালামে মাজীদে বলেন,

إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِندَ اللهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِى كِتٰبِ اللهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَالْأَرْضَ

-আল্লাহ যেদিন আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন সেদিনের ঠিক করা নিয়মে আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারোটি। (সূরা তাওবা, আয়াত-৩৬)

এই বারোটি মাসের মধ্যে অন্যতম মাস হচ্ছে শাওয়াল মাস। এই মাসে মুমিনদের কিছু বিশেষ করণীয় রয়েছে। সংক্ষেপে সেগুলো আলোকপাত করব ইনশাআল্লাহ।

এই মাসের প্রথম যে রাত আমাদের নিকটে আসে তা ঈদুল ফিতরের রাত। দীর্ঘ এক মাস সংযমের পর আমরা এ রাতটি আনন্দ ফূর্তিতে কাটিয়ে দেই অনেকে। কিন্তু এই রাতটি অনেক ফযীলতপূর্ণ একটি রাত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: “مَنْ قَامَ لَيْلَتَيِ الْعِيدَيْنِ مُحْتَسِبًا لِلَّهِ لَمْ يَمُتْ قَلْبُهُ يَوْمَ تَمُوتُ الْقُلُوبُ “.

-যে ব্যক্তি দুই ঈদের রাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ইবাদাত করবে তার অন্তর ঐ দিন মরবে না, যে দিন অন্তরসমূহ মরে যাবে। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ১৭৮২)

তাই ঈদের রাতে আনন্দ ফূর্তিতে কাটিয়ে না দিয়ে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকা আমাদের উচিত।

অতঃপর এই মাসে আমাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ করণীয় হচ্ছে; এই মাসে ছয়টি রোযা রাখা। সহীহ মুসলিম, তিরমিযীসহ নানা কিতাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর একটি হাদীস বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: “مَنْ صَامَ رَمَضَانَ، ثُمَّ أَتْبَعَهُ سِتًّا مِنْ شَوَّالٍ فَذَلِكَ صِيَامُ الدَّهْرِ ”

-যে ব্যক্তি রামাদান মাসে রোযা পালন করল, তারপর শাওয়াল মাসের ছয় দিন রোযা পালন করল, সে লোক যেন সম্পূর্ণ বছরই রোযা পালন করল। (তিরমিযী, হাদীস নং ৭৫৯)

এই হাদীসের ব্যাখ্যায় দুটি বিষয়ে আলোকপাত করতে চাই। ১. শাওয়ালের ছয়টি রোযার হুকুম কী? ২. ছয়টি রোযা কি রামাদানের সাথে মিলিয়ে রাখতে হবে? নাকি শাওয়ালের যেকোনো দিন রাখলেই চলবে?

১. শাওয়ালের ছয়টি রোযার হুকুম কী? এর জবাবে সহীহ মুসলিমের শরহে নববী থেকে কিছু বক্তব্য উদ্ধৃত করছি-

فيه دلالة صريحة لمذهب الشافعي وأحمد وداود وموافقيهم في استحباب صوم هذه الستة.

-ইমাম নববী (র.) বলেন, ইমাম শাফিঈ, আহমদ ও দাউদ জাহেরী (র.) এর মতে এই ছয়টি রোযা রাখা মুস্তাহাব। (শরহু সহীহ মুসলিম লিন নববী, ১১৬৪ নং হাদীসের ব্যাখ্যা)

শরহু সহীহ মুসলিম লিন নববী এবং তুহফাতুল আহওয়াযী গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইমাম আবূ হানীফা, ইমাম মালিক ও ইমাম আবূ ইউসুফ (র.) এর নিকট এ ছয়টি রোযা মাকরূহ। বস্তুত তা সঠিক নয়।

ইমাম কাসিম ইবনে কুতলুবুগা (র.) তাঁর تحرير الأقوال في صوم الست من شوال কিতাবের মধ্যে প্রমাণ করেছেন যে, ইমাম আবূ হানীফা ও ইমাম আবূ ইউসুফ (র.) এর মাযহাবও ইমাম শাফিঈ ও আহমদের মতো। তাদের নিকটেও এ রোযাগুলো রাখা মুস্তাহাব। ইলম পিপাসু বন্ধুগণ কাসিম ইবনে কুতলুবুগা (র.) এর কিতাবখানা দেখতে পারেন।

২. ছয়টি রোযা কি রামাদানের সাথে মিলিয়ে রাখতে হবে? নাকি শাওয়ালের যেকোনো দিন রাখলেই চলবে?

ইমাম মুহিউস সুন্নাহ (র.) বলেন, قد استحب قوم صيام ستة أيام من شوال و المختار أن يصومها في أول الشهر متتابعة

-একদল আলিম শাওয়ালের যেকোনো দিন এই ছয়টি রোযা রাখা মুস্তাহাব মনে করেন। কিন্তু পছন্দনীয় মত হচ্ছে রামাদানের সাথে মিলিয়ে শাওয়ালের প্রথম দিকে রাখা। তবে মাঝে ঈদের দিন ব্যতীত। (মিরকাতুল মাফাতিহ ৪/১৪১৬)

ইমাম ইবনুল মুবারক (র.)ও এই মতের পক্ষে। তিনিও শাওয়ালের প্রথম দিকে রামাদানের সাথে মিলিয়ে রাখাকে মুস্তাহাব মনে করেন। তবে কেউ যদি শাওয়াল মাসে বিক্ষিপ্তভাবে এই ছয়টি রোযা রাখেন তাহলে তিনি তা জায়িয মনে করেন। ইমাম তিরমিযী তাঁর বক্তব্য উল্লেখ করেন,

وَاخْتَارَ ابْنُ الْمُبَارَكِ أَنْ تَكُونَ سِتَّةَ أَيَّامٍ فِي أَوَّلِ الشَّهْرِ. وَقَدْ رُوِيَ عَنِ ابْنِ الْمُبَارَكِ أَنَّهُ قَالَ: إِنْ صَامَ سِتَّةَ أَيَّامٍ مِنْ شَوَّالٍ مُتَفَرِّقًا فَهُوَ جَائِزٌ. (سنن الترمذي، ٨٥٩(

ইমাম নববী (র.) বলেন,

قال أصحابنا: والأفضل أن تصام الستة متوالية عقب يوم الفطر، فإن فرقها أو أخرها عن أوائل شوال إلى أواخره حصلت فضيلة المتابعة؛

-আমাদের মনীষীদের মতে, উত্তম হচ্ছে ঈদুল ফিতরের পরের ছয় দিন পরপর রোযাগুলো রাখা। তবে যদি বিরতি দিয়ে দিয়ে রাখে বা মাসের শেষে রাখে তাহলেও ‘রামাদানের পরে’ রোযা রাখার ফযীলত পাওয়া যাবে। কারণ সব অবস্থায়ই বলা যায়, রামাদানের পরে শাওয়ালের ছয় রোযা রেখেছে। (শরহুল মুসলিম লিন-নববী)

ফকীহুল আহনাফ মুল্লা আলী কারী (র.) রামাদানের সাথে না মিলিয়ে বিক্ষিপ্তভাবে রাখাকে মুস্তাহাব বলেছেন। এমনই ইমাম আবূ ইউসুফ (র.)ও বিচ্ছিন্নভাবে রাখাকে প্রাধান্য দেন। (মাআরিফুস সুনান)

সুতরাং বুঝা গেল শাওয়ালের যেকোনো দিন এই ছয়টি রোযা রাখলে তা মুস্তাহাব হবে। সে রামাদানের সাথে মিলিয়ে রাখুক বা বিক্ষিপ্তভাবে রাখুক। কিন্তু অধিকাংশ আহনাফের মতে, বিক্ষিপ্তভাবে রাখা উত্তম। আল্লাহু আ’লাম।

রামাদানের সাথে শাওয়ালের ছয়টি রোযা রাখলে সম্পূর্ণ বছর রোযা রাখার সাওয়াব পাওয়ার কথা হাদীসে বলা হয়েছে। তো রামাদানের সাথে এই ছয়টি রোযা রাখলে সম্পূর্ণ বছর রোযা রাখার সাওয়াব কীভাবে পাওয়া যায়? এর ব্যাখ্যা ইমাম মুল্লা আলী কারী (র.), ইমাম নববী (র.)সহ অনেক ইমামই তাদের কিতাবে উল্লেখ করেছেন। তারা বলেন প্রতিটি আমলের জন্য উম্মতে মুহাম্মদীকে ১০ গুণ সাওয়াব দেওয়া হয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন, مَنْ جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا -যে একটি সৎকর্ম করবে, সে তার দশগুণ পাবে। (সূরা আনআম, আয়াত-১৬০)

এখন রামাদানের ৩০টি রোযার সাথে শাওয়ালের ছয়টি যোগ করলে হয় ৩৬টি। এখন ৩৬টি রোযাকে ১০ গুণ সাওয়াব দ্বারা গুণ দিলে হবে ৩৬০। সুতরাং এই ৩৬টি রোযা রাখলে চন্দ্র মাস অনুযায়ী সারা বছরের সাওয়াব পাওয়া যাবে।

এছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও হাদীসের মধ্যে এই ৩৬টি রোযা রাখলে কিভাবে সারা বছরের সাওয়াব পাওয়া যায় এর একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

عَنْ ثَوْبَانَ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: “صِيَامُ شَهْرٍ بِعَشَرَةِ أَشْهُرٍ، وَسِتَّةِ أَيَّامٍ بَعْدَهُنَّ بِشَهْرَيْنِ، فَذَلِكَ تَمَامُ سَنَةٍ “.

-রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, রামাদানের এক মাসের রোযা দশ মাসের রোযার সমান। এবং পরের (শাওয়ালের) ছয়টি রোযা দুই মাসের রোযার সমান। সুতরাং এই হলো পূর্ণ এক বছরের রোযা। (সুনানে দারামী, হাদীস নং ১৭৯৬)

সুতরাং রামাদানের সাথে শাওয়ালের ছয়টি রোযা রাখলে সম্পূর্ণ বছর রোযা রাখার সাওয়াব পাওয়া যাবে।

হযরত হাসান বসরী (র.) এর নিকটে যখন শাওয়ালের ছয় দিনের রোযার কথা আলোচনা করা হতো, তখন তিনি বলতেন,

وَاللهِ لَقَدْ رَضِيَ اللهُ بِصِيَامِ هَذَا الشَّهْرِ عَنِ السَّنَةِ كُلِّهَا.

-আল্লাহর কসম! নিশ্চিত আল্লাহ এই মাসের রোযার ওসীলায় সারা বছরের জন্য সন্তুষ্ট হয়ে গেছেন। (তিরমিযী, হাদীস নং ৭৫৯)

শাওয়াল মাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ করণীয় হচ্ছে, যারা হজ্জে যাওয়ার ইরাদা করেছেন তারা এই মাস থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণ করবেন। কেননা শাওয়াল থেকেই হজ্জের মওসুম শুরু হয়ে যায়। ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেন,

وَقَالَ ابْنُ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا: أَشْهُرُ الْحَجِّ: شَوَّالٌ وَذُو الْقَعْدَةِ وَعَشْرٌ مِنْ ذِي الْحَجَّةِ، (صحيح البخاري، كِتَابُ الْحَجِّ، بَابُ قَوْلِ اللهِ تَعَالَى: الْحَجُّ أَشْهُرٌ مَعْلُومَاتٌ(

-হজ্জের মাস হচ্ছে, শাওয়াল, যুলকায়দাহ ও যুলহাজ্জাহ মাসের প্রথম দশক। সুতরাং শাওয়াল থেকেই হজ্জের প্রস্তুতি নেওয়া উচিত।

শাওয়াল মাসের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ করণীয় হচ্ছে, যাদের রামাদানে রোযা কাযা হয়েছে; বিশেষত মহিলাদের হায়িযের কারণে যেসব রোযা কাযা হয়েছে তাদের সেসব রোযা শাওয়াল মাসেই আদায় করে নেওয়া। কেননা ফরয রোযা যা কাযা হয়েছে তা ঝুলিয়ে রাখা উচিত নয়। যদি আপনি তা আদায় করতে দেরি করেন আর মৃত্যু চলে আসে তবে অবশ্যই আপনি সেই সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। তবে চাইলে পরবর্তী রামাদান আসার পূর্ব পর্যন্ত আপনি কাযা আদায় করতে পারবেন। তবে তা শাওয়ালে আদায় করে নেওয়াই উত্তম। আল্লাহ তাআলা বলেন,  فَمَن كَانَ مِنكُم مَّرِيضًا أَوْ عَلٰى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ

-তোমাদের মধ্যে যদি কেউ অসুস্থ হয় কিংবা সফরে থাকে (এবং এ কারণে তাকে নির্ধারিত দিনের রোযা ছাড়তে হয়) তাহলে সে অন্য (সময়ের) দিনগুলোতে রোযা রেখে (রোযার) সংখ্যা পূরণ করবে। (সূরা বাকারা, আয়াত-১৮৪)

আল্লাহ আমাদের সবাইকে শাওয়াল মাসের যাবতীয় করণীয় পালন করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

ফেইসবুকে আমরা...