1. redwan.iub@gmail.com : admin2021 :
  2. admin@parwana.net : Parwana Net : Parwana Net
  3. editor@parwana.net : Parwana Net : Parwana Net
Logo
সাদাকাতুল ফিতর ও সংশ্লিষ্ট মাসাঈল
মাওলানা মো. কুতবুল আলম
  • ৬ মে, ২০২১

সাদাকাতুল ফিতর একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, এটি যাকাতেরই একটি প্রকার। রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুরুত্ব সহকারে তা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। সাদাকাহ শব্দের অর্থ দান এবং আল-ফিতর শব্দের অর্থ ভঙ্গ করা বা রোযা ভেঙে পানাহারের বৈধতা লাভ করা। সাদাকাতুল ফিতর অর্থাৎ পানাহারের বৈধতার সুযোগ প্রাপ্তিতে কিছু দান করা। ‘ঈদুল ফিতর’ মানে পানাহারের বৈধতা দানের আনন্দে খুশি। শাওয়াল মাসের প্রথম তারিখ ঈদুল ফিতর, কেননা একাধারে রামাদান মাস রোযা রাখার পর এ তারিখে রোযা ভঙ্গ করা হয়। ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় যে ‘দান’ ওয়াজিব হয় তাকে সাদাকাতুল ফিতর বলা হয়। ইসলামী শরীআতের পরিভাষায় ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক তার নিজের ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান-সন্ততির পক্ষ হতে শরীআত কর্তৃক নির্ধারিত যে সাদকাহ আদায় করেন তাকে সাদাকাতুল ফিতর বলা হয়। একে যাকাতুল ফিতরও বলা হয়। আমাদের দেশে এটি ‘ফিতরা’ নামে পরিচিত।

ফিতরার উপকারিতা
অনেক উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সাদাকাতুল ফিতর এর বিধান ইসলামী শরীআয় বিধিবদ্ধ করা হয়েছে। রামাদান মাসে রোযা পালনের তাওফীক দানের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বান্দার প্রতি যে অফুরন্ত নিআমত দান করেছেন, সেজন্য মহান রাব্বুল আলামীনের গভীর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের বহিঃপ্রকাশ হলো এই ফিতরা আদায়। কেননা মহান আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে দীর্ঘ এক মাস রোযা রাখার তাওফীক দান করেছেন। রোযা পালনকালে ইচ্ছা-অনিচ্ছায় ছোট ছোট ত্রুটি হয়ে গেছে তা থেকে ক্ষমা লাভ করে রোযার পরিপূর্ণ কল্যাণ ফিতরার মাধ্যমে অর্জিত হয়।
আল্লাহ তাআলার শোকর প্রকাশ ছাড়াও ফিতরা আদায়ে রয়েছে অনেক উপকারিতা। রোযা পালনরত অবস্থায় রোযাদার অনিচ্ছাকৃত যেসব ভুল করে থাকে, তার ক্ষতিপূরণস্বরূপ এবং রোযাদারের দ্বারা ঘটে যাওয়া সব অবাঞ্ছনীয় কাজ তথা ফাহিশা কাজ থেকে রোযাকে পবিত্র করার অন্যতম মাধ্যম হলো ‘ফিতরা’। কেননা মহান আল্লাহ নিজেই বলেছেন, إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ -নিশ্চয়ই ভালো কাজ পাপকে ধ্বংস করে দেয়। (সূরা হুদ, আয়াত ১১৪)
রোযা পালনের ত্রুটি বিচ্যুতির ক্ষতিপূরণ বিবেচনায় এবং ধনী-গরীব সকলে সমানভাবে যেন ঈদুল ফিতরের দিন আনন্দ উপভোগ করতে পারে। ঈদের দিন গরীব ও মিসকীনদের আনন্দ ও উত্তম খাবারের আয়োজনে ফিতরা সহায়ক হয়ে থাকে। ফিতরা থেকে প্রাপ্ত অর্থে তারাও ধনীদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে সেজন্য এই সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব করা হয়েছে। ফিতরা মূলত রোযার যাকাত। যাকাত যেমন সম্পদকে পবিত্র করে, ঠিক তেমনি ফিতরাও রোযাকে পবিত্র করে। এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে,
عن عبدالله بن عباس رضي الله عنهما قال: “فرض رسول الله صلى الله عليه وسلم زكاة الفطر طهرة للصائم من اللغو والرفث، وطعمة للمساكين” )أبو داود وابن ماجه(

-হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাকাতুল ফিতর নির্ধারণ করেছেন রোযাদারের অনর্থক, অশালীন কথা ও কাজের দ্বারা রোযার যে ক্ষতি হয়েছে তা পূরণের জন্য এবং গরীব-মিসকীনদের খাদ্যের যোগানোর জন্য। (আবূ দাউদ ও ইবনে মাজাহ)
সাদাকাতুল ফিতর রোযাদারের ঐসকল ক্রটি-বিচ্যুতির ক্ষতিপূরণ করবে যা তার রোযাকে ক্রটিপূর্ণ করেছে এবং এটি ঈদের দিন দরিদ্র ও অভাবগ্রস্তদেরকে অন্যের কাছে সাহায্য চাওয়া থেকে বিরত রাখবে অন্তত তাদের এ খুশির দিনের প্রয়োজন পূরণ করবে, তারা উত্তম পোশাক ও উন্নতমানের খাবার খেতে পারবে, তাদের খাদ্য বৃদ্ধি করবে যাতে করে সমাজের ধনী-গরীব সকলের জন্য ঈদের দিনটি হয় অত্যন্ত আনন্দময়।
ওয়াকি ইবনুল জাররাহ (র.) বলেন, “زكاة الفطرة لشهر رمضان كسجدة السهو للصلاة، تجبر نقصان الصوم، كما يجبر السجود نقصان الصلاة” -রামাদান মাসের জন্য যাকাতুল ফিতর নামাযের সিজদায়ে সাহুর সমতুল্য। যেমন, নামাযে ক্রটি-বিচ্যুতি হলে সিজদায়ে সাহু দ্বারা এটা পূর্ণ হয়ে যায় তদ্রুপ রোযার মধ্যে ক্রটি-বিচ্যুতি হলে সাদাকাতুল ফিতর দ্বারা এর প্রতিকার হয়।

ফিতরা যাদের উপর ওয়াজিব
জীবিকা নির্বাহের আবশ্যকীয় উপকরণ যেমন- বসবাসের ঘর, পরিধেয় বস্ত্র, খাদ্য দ্রব্য এবং ঘরের সরঞ্জামাদি ব্যতীত ঋণ আদায়ের পর কোনো স্বাধীন, জ্ঞানবান, প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমান যদি সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপা (প্রায় ৬১৩ গ্রাম) অথবা সাড়ে সাত তোলা সোনা (প্রায় ৮৮ গ্রাম) কিংবা এর যে কোনো একটির সমমূল্যের নগদ টাকা বা ব্যবসায়িক মাল বা অন্যান্য সম্পদের মালিক হয় তবে এ মালকে শরীআতের পরিভাষায় ‘যাকাতের নিসাব’ বলা হয়। এক্ষেত্রে বর্তমান হিসাবে যেহেতু স্বর্ণের মূল্য থেকে রৌপ্যের মূল্য অনেক কম সেহেতু রৌপ্যের মূল্যই ধর্তব্য হবে। যদি কারো নিকট কিছু পরিমাণ ব্যবসার মাল, নগদ টাকা, স্বর্ণ ও রৌপ্য থাকে এবং কোনোটাই পৃথকভাবে নিসাব পরিমাণ না হয় তবে এগুলোর সম্মিলিত মূল্য যদি সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্যের মূল্যের সমপরিমাণ হয় (বর্তমান বাজারমূল্যে এটি ৫০ হাজার টাকা প্রায়) তবে এতে নিসাব পূর্ণ হবে। যে ব্যক্তি উল্লিখিত পরিমাণ মালের মালিক তাকে মালিকে নিসাব বা সাহিবে-নিসাব বলা হয়। অবশ্য এ মাল ঋণমুক্ত এবং তার মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত হতে হবে। যে ব্যক্তি ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় এ পরিমাণ মালের মালিক থাকবে তার উপর তার নিজের পক্ষ হতে এবং অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান-সন্ততির পক্ষ থেকে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা আবশ্যক হবে। পরিবারস্থ স্ত্রী, কন্যা ও রোজগারবিহীন সাবালক সন্তানের পক্ষ থেকেও সাদাকাতুল ফিতর প্রদান করা উত্তম। তবে ওয়াজিব নয়। সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হওয়ার জন্য ‘মালে নামী’ তথা বর্ধনশীল মাল হওয়া শর্ত নয়। মালে নামী বলতে যে মাল শরীআতের দৃষ্টিতে বাড়তে থাকে, সেগুলো সর্বমোট চার প্রকার, সোনা, রূপা, ব্যবসার মাল ও গবাদি পশু। এগুলোকে যেহেতু শরীআত বাড়ন্ত মাল বলে আখ্যা দিয়েছে, সুতরাং এগুলো বাড়ন্ত মাল। বাস্তবে এগুলো বাড়ুক বা নাই বাড়ুক। মালে গায়রে নামী বলতে যে মাল শরীআতের দৃষ্টিতে বাড়ে না। উপরোক্ত মালে নামী ব্যতীত সবগুলোই অবাড়ন্ত। যেমন- স্থাবর সম্পত্তি এবং নিজ প্রয়োজনে খরিদকৃত গাড়ি, আসবাবপত্র ইত্যাদি। সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হওয়ার জন্য যাকাতের অনুরূপ পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হওয়াও শর্ত নয় বরং কেবল ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় উপরোক্ত পরিমাণ মালের মালিক থাকলেই সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হবে।

 

ফিতরার পরিমাণ
সাদাকাতুল ফিতর এর পরিমাণ হচ্ছে, যব, খেজুর, পনির ও কিসমিস দ্বারা আদায় করলে এক ‘সা’ এবং গম দ্বারা আদায় করলে অর্ধ ‘সা’। বর্তমান হিসাব মতে এক ‘সা’ ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম এর একটু কম এবং আধা ‘সা’ ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম এর একটু কম।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত,
أن النبي صلى الله عليه وسلم بعث مناديا ينادي في فجاج مكة : ألا إن صدقة الفطر واجب على كل مسلم، ذكر أو أنثى، حر أو عبد، صغير أو كبير، مدان من قمح، أو صاع مما سواه من الطعام
-রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন ঘোষক প্রেরণ করলেন সে যেন মক্কার পথে পথে এ ঘোষণা করে যে, জেনে রেখো! প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, গোলাম-স্বাধীন, ছোট-বড় প্রত্যেকের উপর সাদকায়ে ফিতর অপরিহার্য। দুই ‘মুদ’ (আধা সা) গম কিংবা এক ‘সা’ অন্য খাদ্যবস্তু। (জামে তিরমিযী)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রামাদানের শেষ দিকে বসরার মিম্বারের উপর খুতবা প্রদানকালে বলেন,
فرض رسول الله صلى الله عليه وسلم هذه الصدقة صاعا من تمر أو شعير، أو نصف صاع من قمح على كل حر أو مملوك، ذكر أو أنثى، صغير أو كبير-

-রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদাকাতুল ফিতর অপরিহার্য করেছেন এক ‘সা’ খেজুর বা যব কিংবা আধা ‘সা’ গম; গোলাম-স্বাধীন, নারী-পুরুষ ও ছোট-বড় প্রত্যেকের উপর। (সুনানে আবূ দাউদ)

উপরোক্ত খাদ্যবস্তুর পরিবর্তে সেগুলোর মূল্য আদায় করারও অবকাশ রয়েছে। সেক্ষেত্রে উল্লিখিত খাদ্যবস্তুগুলোর মধ্য থেকে যেকোনো একটির নির্ধারিত পরিমাণের বাজারমূল্য আদায়ের মাধ্যমে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা যাবে। মূল্যের দিক থেকে ঐ খাদ্যবস্তুগুলোর মধ্যে তফাৎ রয়েছে, কোনোটির দাম বেশি, আবার কোনোটির দাম কম। বর্তমান বাজার দর হিসাবে যেহেতু গমের দামই সবচেয়ে কম এবং নির্ধারিত পরিমাণও অন্যান্য খাদ্যবস্তুগুলোর অর্ধেক। যব, খেজুর, পনির ও কিসমিস দ্বারা আদায় করলে এক ‘সা’ আর গম দ্বারা আদায় করলে অর্ধ ‘সা’ দিতে হয়। বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে প্রতি বছর অর্ধ ‘সা’ গমের বাজারমূল্য হিসাবে ফিতরার সর্বনিম্ন পরিমাণ ঘোষণা করা হয়। যেহেতু সহীহ হাদীসে গমকেও ফিতরা প্রদানের খাদ্যবস্তু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এর পরিমাণও নির্ধারণ করা হয়েছে অর্ধ ‘সা’ তাই অর্ধ ‘সা’ গম বা তার মূল্য আদায় করলে সাদাকাতুল ফিতর আদায় হয়ে যাবে। অর্থাৎ সবচেয়ে কম দামের বস্তুর দ্বারা যদি কেউ সাদাকাতুল ফিতর আদায় করে তাহলেও আদায় হয়ে যাবে। তবে উত্তম হলো, নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী বেশি মূল্যের খাদ্যবস্তু দ্বারা সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা। খেজুর, কিসমিস, পনির এবং যবের ক্ষেত্রে যেকোনো একটির এক ‘সা’ (৩ কেজি ৩০০ গ্রাম) অথবা তার বাজার মূল্য এবং গমের ক্ষেত্রে আধা ‘সা’ (১ কেজি ৬৫০ গ্রাম) বা তার বাজার মূল্য যেকোনো একটি আদায় করলে ফিতরা আদায় হয়ে যাবে। অবশ্য যিনি সামর্থ অনুযায়ী যত বেশি আদায় করবেন তিনি তত বেশি সাওয়াবের অধিকারী হবেন।

ইমাম আযম (র.) এর মতে, অধিক মূল্যের দ্রব্য দ্বারা ফিতরা আদায় করা উত্তম; অর্থাৎ যা দ্বারা আদায় করলে গরীবদের বেশি উপকার হয়, সেটাই উত্তম ফিতরা। ইমাম মালিক (র.) এর মতে, খেজুর দ্বারা ফিতরা আদায় করা উত্তম এবং খেজুরের মধ্যে সবচেয়ে উন্নত ‘আজওয়া’ খেজুর দ্বারাই আদায় করা উত্তম। ইমাম শাফিঈ (র.) এর মতে, হাদীসে উল্লিখিত বস্তুসমূহের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট ও সর্বোচ্চ মূল্যের দ্রব্য দ্বারা সদকা আদায় করা শ্রেয়। অন্য সব ইমামের মতও অনুরূপ। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (র.) এর মতে, সাহাবায়ে কিরাম (রা.) এর অনুসরণ হিসেবে খেজুর দ্বারা ফিতরা আদায় করা উত্তম। এছাড়া সাদকার ক্ষেত্রে সব ফকীহ এর ঐকমত্য হলো, ‘যা গরীবদের জন্য বেশি উপকারী।’ (আল মুগনী ও আওযাযুল মাসালিক)

হাদীস শরীফে গম বা আটা, যব, কিসমিস, খেজুর ও পনির- এ পাঁচটি দ্রব্যের যেকোনো একটি দ্বারা বা তার মূল্য দ্বারা সাদকায়ে ফিতর আদায়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছে যেন প্রত্যেকে নিজ নিজ সামর্থ্যানুযায়ী আদায় করতে পারে। তবে সবার জন্য সবচেয়ে কম দামের দ্রব্য দিয়ে ফিতরা আদায় করা অনুচিত; বরং সামর্থ্যানুসারে সবার উচিত উৎকৃষ্ট জিনিস দ্বারা আদায় করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সময়ে সামর্থ্যানুযায়ী সবাই উত্তম পণ্য দিয়ে ফিতরা আদায় করতেন। সর্বোত্তম দান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, দাতার কাছে যা সর্বোৎকৃষ্ট এবং যার মূল্যমান সবচেয়ে বেশি। (বুখারী)

ফিতরা আদায়ের ক্ষেত্রে আমাদের দেশের অধিকাংশ লোক সাধারণত সর্বনিম্ন পরিমাণ অর্ধ ‘সা’ গম এর মূল্য হিসেবে জনপ্রতি ৭০ টাকা হারে ফিতরা আদায় করতে চান। উচ্চবৃত্ত হতে নিম্নবৃত্ত সবাই সর্বনিম্ন হার ৭০ টাকা দিয়েই দায়মুক্ত হতে চান। সবচেয়ে কম মূল্যের ফিতরা আদায় করার প্রবণতা খুব বেশি। বিষয়টি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বরং এটা তো নিম্ন আয়ের লোকদের জন্য মানানসই, কিন্তু আল্লাহ তাআলা যাদেরকে তাওফীক দিয়েছেন, তাদের সামর্থ্যানুযায়ী পনির, কিসমিস বা খেজুর এরূপ মূল্যবান দ্রব্য বা দ্রব্যের মূল্য দিয়ে সর্বোচ্চ মূল্যবান ফিতরা আদায় করা উচিত। সাদাকাতুল ফিতর আদায়ের ক্ষেত্রে আদায়কারীর সামর্থ্যকে বিবেচনায় রাখা বাঞ্ছনীয়। যেমন ধনীদের জন্য যে বস্তুর মূল্য সর্বোচ্চ, মধ্যবিত্তদের ক্ষেত্রে যে বস্তুর মূল্য মাঝামাঝি এবং নিম্ন মধ্যবিত্তদের ক্ষেত্রে যে বস্তুর মূল্য সর্বনিম্ন এর মূল্য দ্বারা ফিতরা আদায় করাই শ্রেয়।

চলতি বছরে ফিতরার সম্ভাব্য মূল্য
চলতি বছর ১৪৪২ হিজরী, ২০২১ সালের সাদাকাতুল ফিতর এর হার বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক ঘোষিত সাদাকাতুল ফিতর এর পরিমাণ নিম্নরূপ-
সর্বোৎকৃষ্ট গম বা আটা দ্বারা আদায় করলে প্রতি কেজির মূল্য ৪২ টাকা দরে ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম এর মূল্য ৭০ টাকা।
যব দ্বারা আদায় করলে প্রতি কেজির মূল্য ৮৪ টাকা দরে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম এর মূল্য ২৮০ টাকা।
কিসমিস দ্বারা আদায় করলে প্রতি কেজির মূল্য ৪০০ টাকা দরে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম এর মূল্য ১৩২০ টাকা।
মরিয়ম খেজুর দ্বারা আদায় করলে প্রতি কেজির মূল্য ৫০০ টাকা দরে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম এর মূল্য ১৬৫০ টাকা।
পনির দ্বারা আদায় করলে প্রতি কেজির মূল্য ৭০০ টাকা দরে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম এর মূল্য ২৩১০ টাকা।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজার যাচাই করলে উপরোক্ত হারের একটু তারতম্য হবে।
যেমন সিলেট শহরের স্থানীয় বাজার যাচাইপূর্বক নির্ধারিত পণ্যের বাজার মূল্য বিবেচনা করে কতিপয় তারতম্য নিম্নে উল্লেখ করা হলো।
সর্বোৎকৃষ্ট আজওয়া খেজুর দ্বারা আদায় করলে প্রতি কেজির মূল্য ১২০০ টাকা দরে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম এর মূল্য ৩৯৬০ টাকা।
পনির দ্বারা আদায় করলে প্রতি কেজির মূল্য ১০০০ টাকা দরে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম এর মূল্য ৩৩০০ টাকা।
মরিয়ম খেজুর দ্বারা আদায় করলে প্রতি কেজির মূল্য ৭০০ টাকা দরে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম এর মূল্য ২৩১০ টাকা।
সাধারণ খেজুর দ্বারা আদায় করলে প্রতি কেজির মূল্য ১৮০ টাকা দরে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম এর মূল্য ৬০০ টাকা।

সাদাকাতুল ফিতরের সংশ্লিষ্ট মাসাঈল
একজনের ফিতরা একজনকে বা কয়েক জনকে এবং কয়েকজনের ফিতরা একজনকে দেওয়াও জায়িয। রোযা ও ফিতরা দুটি পৃথক ইবাদাত, তাই কেউ যদি বার্ধক্য, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে রোযা রাখতে না পারে তবে তার থেকে  সাদকাতুল ফিতর রহিত হবে না। বরং তাদের উপর ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব। কোনো ব্যক্তি যদি ঈদের নামাযের আগে রামাদানের মধ্যে সাদকাতুল ফিতর আদায় করে দেয় তবে তা জায়িয আছে। ঈদের দিন তা পুনরায় আদায় করতে হবে না। অবশ্য ঈদের দিন সুবহে সাদিকের পর ঈদের নামায আদায়ের পূর্বে সাদকাতুল ফিতর আদায় করা মুস্তাহাব। আর যদি ঈদের নামাযের আগে আদায় করতে না পারে তবে তার সাদাকাতুল ফিতর মাফ হবে না। পরে তা আদায় করা ওয়াজিব। তবে ঈদের ২-৩ দিন পূর্বে আদায় করা উত্তম, যাতে ফিতরা গ্রহণকারীগণ এর টাকা দিয়ে কেনাকাটা করে ঈদের আনন্দে শরীক হতে পারে।

সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হওয়ার সময় হল ঈদুল ফিত্রের দিন সুবহে সাদিক হওয়ার পর। সুতরাং সুবহে সাদিকের পূর্বে কেউ মারা গেলে তার ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব হবে না। সুবহে সাদিকের পূর্বে কোনো বিত্তবান লোকের সন্তান ভূমিষ্ট হলে তার ফিতরা আদায় করতে হবে। কোনো অমুসলিম ব্যক্তি সুবহে সাদিকের পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করলে তবে তার উপর ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব হবে। আর সুবহে সাদিকের পর কোনো সন্তান জন্মগ্রহণ করলে কিংবা কেউ মুসলমান হলে তার উপর ফিতরা ওয়াজিব নয়। যদি কোনো ফকীর সুবহে সাদিকের পূর্বে নিসাবের মালিক হয়ে যায় তবে তার উপরও ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব হবে। আর যদি কোনো ধনী ব্যক্তি সুবহে সাদিকের পূর্বে গরীব হয়ে যায় তবে তার উপর সাদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব হবে না।

একে অন্যের ফিতরা আদায় করতে পারবেন। নিজ পরিবারভুক্ত নয় এমন লোকের পক্ষ থেকে তার অনুমতি ছাড়া ফিতরা দিলে আদায় হবে না। যে সকল সম্পদশালী ব্যক্তি তাদের খাদিম বা চাকর বাকরের পৃষ্ঠপোষকতা ও ভরণ-পোষণ করেন তারা তাদের পক্ষ থেকে ফিতরা দিতে পারবেন। স্ত্রীলোক যদি সচ্ছল হয় তবে শুধু নিজের সাদকায়ে ফিতর তার উপর ওয়াজিব। তার স্বামী, সন্তান বা মা-বাবার পক্ষ থেকে দেওয়া তার উপর ওয়াজিব নয়।

গরীব-মিসকীন যার নিকট নিসাব পরিমাণ সম্পদ নেই এমন ব্যক্তিকে সাদকায়ে ফিতর প্রদান করতে হবে। যাদের যাকাত দেওয়া যায়, তাঁদের ফিতরাও দেওয়া যায়। পিতা, মাতা ও ঊর্ধ্বতন এবং ছেলে, মেয়ে ও অধঃস্তন এবং যার ভরণপোষণের দায়িত্ব রয়েছে (যেমন স্ত্রী), তাদেরকে ওয়াজিব ফিতরা ও যাকাত প্রদান করা যায় না। শরীআতের পক্ষ থেকে ধার্যকৃত ফরয, ওয়াজিব ইত্যাদি আর্থিক ইবাদতগুলো, যেমন- যাকাত, ফিতরা ইত্যাদি বাধ্যতামূলক দানগুলো কেবল মুসলিম ফকীর, মিসকীন, ঋণী ও অসহায়দের প্রদান করা যায়; অমুসলিম কাউকে দেওয়া যায় না।

সাদকাতুল ফিতর উত্তম হলো ঈদের নামাযের আগে আদায় করে দেওয়া। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদগাহে যাওয়ার আগেই সাদাকাতুল ফিতর আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি ঈদের সালাতের আগে এটা আদায় করবে, তা সাদকাতুল ফিতর হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে। আর যে ঈদের সালাতের পর আদায় করবে তা অপরাপর (নফল) সাদকা হিসেবে গৃহীত হবে। (আবূ দাউদ)

কোনো ব্যক্তি যদি তার অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েকে অন্যত্র বিয়ে দিয়ে স্বামীর ঘরে তুলে দেয় তবে পিতার উপর তার ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব নয়। অনুরূপভাবে কোনো ব্যক্তির উপর তার দাদা-দাদী, নানা-নানী, মাতা-পিতা, প্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে-মেয়ে ও স্ত্রীর পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব নয়।

বিত্তহীন অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানের সাদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়ালীর উপর ওয়াজিব। এমনিভাবে প্রাপ্তবয়স্ক মতিভ্রম ও পাগল সন্তানের ফিতরা আদায় করাও ওয়ালীর উপর ওয়াজিব। প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান এবং স্ত্রী ও পিতা-মাতার সাদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়ালীর উপর ওয়াজিব নয়। তবে আদায় করলে আদায় হয়ে যাবে। এক ভাইয়ের সাদকাতুল ফিতর আদায় করা অন্য ভাইয়ের উপর ওয়াজিব নয়। অনুরূপভাবে কোনো নিকট আত্মীয়ের ফিতরা আদায় করা অন্য আত্মীয়ের উপর ওয়াজিব নয়।

যার উপর সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব ছিল সে যদি তা আদায় করার পূর্বেই মারা যায় তবে মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পত্তি হতে ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব নয়। কিন্তু তার উত্তরসূরিরা যদি ফিতরা আদায় করে দেয় তবে আদায় হয়ে যাবে। উত্তরসূরিরা নিষেধ করলে জোরপূর্বক তাদের থেকে ফিতরা আদায় করা জায়িয হবে না। অবশ্য মৃত ব্যক্তি যদি এ ব্যাপারে ওয়ারিসদের ওসীয়ত করে গিয়ে থাকেন তবে তার মালের এক তৃতীয়াংশ হতে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব হবে।

ফেইসবুকে আমরা...