বান্দা যখন সিজদায় লুটিয়ে পড়ে তখন সে আল্লাহর রহমতের অতি নিকটবর্তী হয়ে যায়। রাসূলে পাক সা. বলেন,
أَقْرَبُ ما يَكونُ العَبْدُ مِن رَبِّهِ، وهو ساجِدٌ، فأكْثِرُوا الدُّعاءَ. رواه مسلم (٤٨٢)
অর্থাৎ, বান্দা সিজদাহরত অবস্থায় তাঁর রবের রহমতের অধিক নিকটবর্তী হয়ে থাকে। সুতরাং তোমরা বেশি করে দুআ করো (নফল নামাযে সিজদারত অবস্থায়)। (সহীহ মুসলিম, হাদীস-৯৭০)
বান্দার নামাযের হালত হচ্ছে এমন যে, সে তখন আল্লাহর সাথে একান্ত আলাপে ব্যস্ত থাকে। রাসূলুল্লাহ সা. বলেন,
ألا إِنَّ كُلَّكُم مُناجٍ رَبَّهُ، فَلا يُؤْذِيّنَّ بَعضُكُمْ بَعضًا، ولا يَرفعُ بَعضُكم على بَعضٍ في القِراءةِ. أبو داود (١٣٣٢)، وأحمد (١١٨٩٦)
অর্থাৎ, জেনে রাখো! তোমাদের প্রত্যেকেই (নামায পড়ার সময়) স্বীয় রবের সাথে একান্ত আলাপরত আছো। কাজেই তোমরা পরস্পরকে কষ্ট দিও না এবং পরস্পরের সামনে কিরাআত পাঠে আওয়াজ উঁচু করো না। (সুনান আবূ দাঊদ, হাদীস-১৩৩২, সহীহ হাদীস)
আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় হাবীব রাহমাতুল্লিল আলামীন সা. কে তাঁর সাথে একান্ত আলাপের সর্বোত্তম সময় জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
اِنَّ نَاشِئَةَ الَّیۡلِ هِیَ اَشَدُّ وَطۡأً وَّاَقۡوَمُ قِیۡلًا ؕ
অবশ্যই রাত্রিকালের জাগরণ (কিয়ামুল লাইল) কঠিনভাবে প্রবৃত্তি কে দূর করে এবং এটি (একান্ত) কথা বলার জন্য উত্তম (সময়)। (আল মুযযাম্মিল, আয়াত-৬)
অর্থাৎ, আল্লাহর সাথে একান্ত আলাপের উত্তম সময় হচ্ছে রাত্রিবেলা। দিনের সমস্ত ব্যস্ততা শেষ করে যখন আপনি রাতের নিস্তব্ধতায় জায়নামাযে দাঁড়াবেন, মনে হবে আপনি এবং আপনার রবের মাঝে কোনো দূরত্ব নেই। আপনি যখন এক মনে তিলাওয়াত করবেন, তখন মনে হবে আপনি আপনার মহান রবের সাথে গভীর আলাপে লিপ্ত হয়েছেন।
‘কিয়ামুল লাইল’ রাতের যেকোনো অংশে নফল নামায আদায় করাকে বলা হয়। হযরত ইবন কাসীর (র.) বলেন,
وَقَالَ عُمَرُ، وَابْنُ عَبَّاسٍ، وَابْنُ الزُّبَيْرِ: اللَّيْلُ كُلُّهُ نَاشِئَةٌ. وَكَذَا قَالَ مجاهد، وغير واحد، يُقَالُ: نَشَأَ: إِذَا قَامَ مِنَ اللَّيْلِ. وَفِي رِوَايَةٍ عَنْ مُجَاهِدٍ: بَعْدَ الْعِشَاءِ. وَكَذَا قَالَ أَبُو مِجْلَز، وَقَتَادَةُ، وَسَالِمٌ وَأَبُو حَازِمٍ، وَمُحَمَّدُ بْنُ الْمُنْكَدِرُ.
অর্থাৎ, হযরত উমর, ইবন আব্বাস, ইবন যুবাইর রাদিয়াল্লাহু আনহুম বলেন, সারা রাতই কিয়ামুল লাইলের অন্তর্ভুক্ত (যখনই দাঁড়িয়ে নফল আদায় করবেন তখনই কিয়ামুল লাইল গণ্য হবে)। ইমাম মুজাহিদ (র.) সহ আরও বহু ইমামগণ এই কথা বলেছেন। তবে ইমাম মুজাহিদ (র.) থেকে আরেকটি মত বর্ণিত আছে যে, ইশার নামাযের পর থেকে কিয়ামুল লাইলের সময় শুরু হয়। (তাফসীরে ইবন কাসীর, আল মুযযাম্মিল, আয়াত-৬)
আমরা হাদীসেও দেখতে পাই রাসূলুল্লাহ সা. সারা রাতের বিভিন্ন অংশে নফল নামায পড়তেন। হযরত আনাস (রা.) বলেন,
وَكَانَ لاَ تَشَاءُ أَنْ تَرَاهُ مِنَ اللَّيْلِ مُصَلِّيًا إِلاَّ رَأَيْتَهُ وَلاَ نَائِمًا إِلاَّ رَأَيْتَهُ.
রাসূলুল্লাহ e কে তুমি রাতে নামাযরত অবস্থায় দেখতে চাইলে তাই দেখতে পেতে এবং ঘুমন্ত অবস্থায় দেখতে চাইলে তাও দেখতে পেতে। (সহীহ বুখারী, হাদীস-১১৪১)
এই হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবন হাজার আসকালানী (র.) বলেন,
أي إن صلاته ونومه كان يختلف بالليل، ولا يرتب وقتا معينا، بل بحسب ما تيسر له القيام.
অর্থাৎ, রাতে রাসূলুল্লাহ e এর নামায এবং ঘুম ভিন্ন ভিন্ন হতো। নির্ধারিত কোনো সময় ছিলো না। বরং যখনই সুযোগ হতো তখনই কিয়ামুল লাইল আদায় করতেন।
فتح البارح. باب قيام النبي ﷺ بالليل من نومه
এই কিয়ামুল লাইলের গুরুত্ব সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ e বলেন,
عليكم بقيامِ الليلِ؛ فإنَّه دَأْبُ الصالحينَ قبلَكم، وهو قُرْبةٌ إلى ربِّكم، ومَكْفَرةٌ للسِّيِّئاتِ، ومَنْهاةٌ عن الإثمِ.
তোমরা কিয়ামুল লাইলের প্রতি যত্নবান হও। কেননা তা তোমাদের পূর্ববর্তী সালিহীনের অভ্যাস এবং রবের নৈকট্য লাভের বিশেষ মাধ্যম। আর তা পাপরাশি মোচনকারী এবং গুনাহ থেকে বাধা প্রদানকারী। (জামি তিরমিযী, হাদীস-৩৫৪৯; সহীহ ইবন খুজাইমা, হাদীস-১১৩৫, হাসান হাদীস)
কিয়ামুল লাইল বান্দাকে জান্নাতে পৌঁছে দেয়। রাসূলুল্লাহ e বলেন,
“أَيُّهَا النَّاسُ أَفْشُوا السَّلاَمَ وَأَطْعِمُوا الطَّعَامَ وَصَلُّوا وَالنَّاسُ نِيَامٌ تَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ بِسَلاَمٍ”.
হে মানুষগণ! তোমরা সালামের প্রসার ঘটাও, খাদ্য দান কর এবং মানুষ ঘুমিয়ে থাকাবস্থায় নামায আদায় কর। তাহলে নিশ্চয়ই তোমরা সালামতে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (জামি তিরমিযী, হাদীস-২৪৮৫, সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস-১৩৩৪)
এজন্য আল্লাহ তাআলা কিয়ামুল লাইল আদায়কারীদের উদ্দেশ্যে বলেন,
تَتَجَافٰی جُنُوۡبُهُمۡ عَنِ الۡمَضَاجِعِ یَدۡعُوۡنَ رَبَّهُمۡ خَوۡفًا وَّطَمَعًا وَّمِمَّا رَزَقۡنٰهُمۡ یُنۡفِقُوۡنَ. فَلَا تَعۡلَمُ نَفۡسٌ مَّاۤ اُخۡفِیَ لَهُمۡ مِّنۡ قُرَّةِ اَعۡیُنٍۚ جَزَآءًۢ بِمَا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ
(রাতের বেলা) তাদের পার্শ্বদেশ বিছানা থেকে পৃথক হয়ে যায় (কিয়ামুল লাইলের জন্য) এবং তারা নিজ প্রতিপালককে ভয় ও আশার (মিশ্রিত অনুভূতির) সাথে ডাকে। আর আমি তাদেরকে যে রিযক দিয়েছি তা থেকে (সৎকাজে) ব্যয় করে। সুতরাং কোন ব্যক্তি জানে না এরূপ লোকদের জন্য তাদের কর্মফল স্বরূপ চোখ জুড়ানোর কত কী উপকরণ লুকিয়ে রাখা হয়েছে। (আস সিজদাহ, আয়াত-১৬, ১৭)
এই নামাযের সবচেয়ে বড় ফদীলত হচ্ছে, এই নামায বান্দাকে সাধারণ বান্দা থেকে শুকরিয়া আদায়কারী বান্দায় রূপান্তরিত করে। হযরত আয়িশা (রা.) বলেন-
أنَّ نَبِيَّ اللَّهِ ﷺ كانَ يَقُومُ مِنَ اللَّيْلِ حتّى تَتَفَطَّرَ قَدَماهُ، فَقالَتْ عائِشَةُ: لِمَ تَصْنَعُ هذا يا رَسولَ اللَّهِ، وقدْ غَفَرَ اللَّهُ لكَ ما تَقَدَّمَ مِن ذَنْبِكَ وما تَأَخَّرَ؟ قالَ: أفلا أُحِبُّ أنْ أكُونَ عَبْدًا شَكُورًا
রাসূলুল্লাহ e রাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এত বেশি নামায পড়তেন যে, তাঁর পা মুবারক ফুলে যেতো। এ দেখে তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এত কষ্ট করছেন, অথচ আপনার পূর্বাপর সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে! রাসূলে পাক e বললেন, আমি কি একজন পূর্ণ শুকর আদায়কারী বান্দা হব এমনটা পছন্দ করব না? (সহীহ বুখারী, হাদীস-৪৮৩৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস-২৮২০)
তাই কখনো কিয়ামুল লাইলকে অবহেলা করা উচিত না। বিশেষত এই রামাদানুল মুবারকে। কেননা এই মাস এমন এক মাস, যেই মাসে রহমতের দরজা খুলে যায়। বান্দার জন্য আল্লাহর অশেষ করুণা নাযিল হয়। রাসূলুল্লাহ সা. বলেন,
إِذَا كَانَ أَوَّلُ لَيْلَةٍ مِنْ شَهْرِ رَمَضَانَ صُفِّدَتِ الشَّيَاطِينُ وَمَرَدَةُ الْجِنِّ وَغُلِّقَتْ أَبْوَابُ النَّارِ فَلَمْ يُفْتَحْ مِنْهَا بَابٌ. وَفُتِّحَتْ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ فَلَمْ يُغْلَقْ مِنْهَا بَابٌ وَيُنَادِي مُنَادٍ يَا بَاغِيَ الْخَيْرِ أَقْبِلْ وَيَا بَاغِيَ الشَّرِّ أَقْصِرْ وَلِلَّهِ عُتَقَاءُ مِنَ النَّارِ وَذَلِكَ كُلَّ لَيْلَةٍ ” .
অর্থাৎ, শায়তান ও দুষ্ট জিনদেরকে রামাদান মাসের প্রথম রাতেই শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করা হয় এবং এর একটি দরজাও তখন আর খোলা হয় না। আর খুলে দেওয়া হয় জান্নাতের দরজাগুলো এবং এর একটি দরজাও তখন আর বন্ধ করা হয় না। (এ মাসে) একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দিতে থাকেন, হে কল্যাণ অন্বেষণকারী! অগ্রসর হও। হে পাপাসক্ত! বিরত হও। আর বহু লোককে আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে এ মাসে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং প্রত্যেক রাতেই এরূপ হতে থাকে। (জামি আত-তিরমিযী, হাদীস-৬৮২, সহীহ হাদীস)
রামাদানুল মুবারাকের কিয়ামুল লাইলের গুরুত্ব সম্পর্কে আবূ হুরাইরা (রা.) ইরশাদ করেন,
كانَ رَسولُ اللهِ صَلّى اللَّهُ عليه وسلَّمَ يُرَغِّبُ في قِيامِ رَمَضانَ مِن غيرِ أَنْ يَأْمُرَهُمْ فيه بعَزِيمَةٍ، فيَقولُ: مَن قامَ رَمَضانَ إيمانًا واحْتِسابًا، غُفِرَ له ما تَقَدَّمَ مِن ذَنْبِهِ.• أخرجه البخاري (٢٠٠٩)، ومسلم (٧٥٩) واللفظ له
রাসূলুল্লাহ e দৃঢ় বা কঠোরভাবে নির্দেশ না দিয়ে রামাদান মাসের কিয়ামুল লাইল আদায়ে উৎসাহিত করে বলতেন, যে ব্যক্তি ঈমানসহ ও একান্ত আল্লাহর সন্তষ্টির নিমিত্তে রামাদান মাসের কিয়ামুল লাইল আদায় করবে তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। (সহীহ মুসলিম, হাদীস-১৬৬৫)
তবে মনে রাখতে হবে, রামাদানুল মুবারকে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ দুটি আলাদা ইবাদত। যদিও উভয়টিকে কিয়ামুল লাইল বলা হয়। তাহাজ্জুদ আর তারাবীহ ভিন্ন নামায হওয়ার প্রমাণ হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ e তাহাজ্জুদ ৪/৬/৮/১০/১২ রাকআত পর্যন্ত পড়তেন। যেমন হযরত আয়িশা (রা.) ইরশাদ করেন,
مَا كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَزِيدُ فِي رَمَضَانَ وَلاَ فِي غَيْرِهِ عَلَى إِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً، يُصَلِّي أَرْبَعًا فَلاَ تَسَلْ عَنْ حُسْنِهِنَّ وَطُولِهِنَّ، ثُمَّ يُصَلِّي أَرْبَعًا فَلاَ تَسَلْ عَنْ حُسْنِهِنَّ وَطُولِهِنَّ، ثُمَّ يُصَلِّي ثَلاَثًا،
রাসূলুল্লাহ e রামাদান মাসে এবং অন্যান্য সময় (রাতে) এগার রাকআতের অধিক নামায আদায় করতেন না। তিনি চার রাকআত নামায আদায় করতেন। তুমি সেই সালাতের সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে আমাকে প্রশ্ন করো না। তারপর আরো চার রাকআত নামায আদায় করতেন, এর সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে আমাকে প্রশ্ন করো না। অতঃপর তিনি তিন রাকআত (বিতর) নামায আদায় করতেন। (বুখারী, হাদীস-১১৪৭)
এই হাদীসকে অনেকে তারাবীহ হিসাবে উপস্থাপন করেন, কিন্তু এই হাদীসে স্পষ্ট উল্লেখ আছে রাসূলুল্লাহ e রামাদান মাসে এবং অন্যান্য মাসে এই নামায আদায় করতেন, অথচ অন্যান্য মাসে তারাবীহ পড়া হয় না। যা স্পষ্ট বুঝিয়ে দেয় এটা তাহাজ্জুদের নামায। তাছাড়া তারাবীহর নামায দুই রাকআত করে পড়া হয়, অথচ আয়িশা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. চার রাকআত করে দুই বারে আট রাকআত পড়েছেন। এ থেকেও বুঝা যায় এটি তাহাজ্জুদের নামায, তারাবীহ নয়।
অন্য বর্ণনায় হযরত আয়িশা (রা.) বলেন-
كان رسولُ اللهِ ﷺ يُوترُ بأربعٍ وثلاثٍ، وستٍّ وثلاثٍ، وثمانٍ وثلاثٍ، وعشرٍ وثلاثٍ، ولم يكن يُوترُ بأنقصَ من سبعٍ ولا بأكثرَ من ثلاثَ عشرةَ
- ابن الملقن، البدر المنير (٤/٣٠٢) • إسناده صحيح • أخرجه أبو داود (١٣٦٢)، والطحاوي في [1]شرح معاني الآثار (١٦٩٧)،
অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহ সা. রাতে চার রাকআত (তাহাজ্জুদ) ও তিন রাকআত (বিতর), ছয় রাকআত (তাহাজ্জুদ) ও তিন রাকআত (বিতর), আট রাকআত (তাহাজ্জুদ) ও তিন রাকআত (বিতর), দশ রাকআত (তাহাজ্জুদ) ও তিন রাকআত (বিতর) পড়তেন। তিনি (তাহাজ্জুদ ও বিতির মিলে) সাত রাকআতের কম এবং তেরো রাকআতের বেশি পড়তেন না। (সুনান আবূ দাঊদ, হাদীস-১৩৬২, সহীহ হাদীস)
অন্য বর্ণনায় হযরত ইবন আব্বাস (রা.) বলেন,
فَصَلَّى رَكْعَتَيْنِ، ثُمَّ رَكْعَتَيْنِ، ثُمَّ رَكْعَتَيْنِ، ثُمَّ رَكْعَتَيْنِ، ثُمَّ رَكْعَتَيْنِ، ثُمَّ رَكْعَتَيْنِ، قَالَ الْقَعْنَبِيُّ: سِتَّ مَرَّاتٍ، ثُمَّ أَوْتَرَ، ثُمَّ اضْطَجَعَ، حَتَّى جَاءَهُ الْمُؤَذِّنُ فَقَامَ فَصَلَّى رَكْعَتَيْنِ خَفِيفَتَيْنِ، ثُمَّ خَرَجَ فَصَلَّى الصُّبْحَ.
অতঃপর তিনি দু’রাকআত, দু’রাকআত, অতঃপর দু’রাকআত, দু’রাকআত, আবার দু’রাকআত এবং আবার দু’রাকআত নামায আদায় করলেন। বর্ণনাকারী আল-কা‘নাবী বলেন, তিনি এভাবে ছয়বার আদায় করেন (অর্থাৎ ১২ রাকআত আদায় করেন)। অতঃপর বিতর করে বিশ্রাম নেন। অবশেষে মুয়াযযিন এলে তিনি উঠে সংক্ষেপে দু’রাকআত (সুন্নাত) নামায আদায় করে বের হলেন এবং (মাসজিদে গিয়ে) ফজরের সলাত আদায় করলেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস-১৮৩, সুনান আবু দাউদ, হাদীস-১৩৬৭)
সুতরাং সকল হাদীস একত্রিত করলে দেখা যায়, রাসূলুল্লাহ সা. এর তাহাজ্জুদের রাকআত সংখ্যা সব সময় সমান ছিলো না। তাই তাহাজ্জুদ বান্দার যতটুকু সামর্থ্য আছে ততটুকু আদায় করবে। এতে নির্ধারিত কোনো সংখ্যা নাই। কিন্তু তারাবীহের নামাযের সংখ্যা নির্দিষ্ট। সমস্ত ইমামগণ ঐক্যমত যে, তারাবীর নামায ২০ রাকআত। ২০ রাকআতই আদায় করা সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ।
ইমাম ইবনে আব্দুল বার (র.) লিখেছেন,
وَهُوَ قَوْلُ جُمْهُورِ الْعُلَمَاءِ وَبِهِ قَالَ الْكُوفِيُّونَ وَالشَّافِعِيُّ وَأَكْثَرُ الْفُقَهَاءِ، وَهُوَ الصَّحِيحُ عَنْ أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ مِنْ غَيْرِ خِلَافٍ مِنَ الصَّحَابَةِ
অর্থাৎ বিশ রাকআত তারাবীহ পড়ার কথা জমহুর উলামায়ে কিরাম বলেছেন। কূফার ফুকাহাগণ, ইমাম শাফিঈ (র.) এবং অধিকাংশ ফুকাহাদের মত এটি। আর বিশ রাকআত তারাবীহর নামাযের হাদীস হযরত উবাই ইবন কাব (রা.) থেকে বিশুদ্ধরূপে প্রমাণিত। সাহাবীগণের এক্ষেত্রে কোনো দ্বিমত ছিল না। (আল ইসতিযকার, খণ্ড-২, পৃ-৭০, শামিলা নুসখা)
তাই অবশ্যই তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদ ভিন্ন নামায। তাহাজ্জুদ আপনি চাইলে ৪/৬/৮/১০/১২ রাকআত পড়তে পারেন, কিন্তু তারাবীহ ২০ রাকআত পড়তে হয়। কারণ রাসূলুল্লাহ e থেকে বিশুদ্ধ সনদে ২০ রাকআত তারাবীহর নামায প্রমাণিত না হলেও খুলাফায়ে রাশিদীন থেকে ২০ রাকআত তারাবীর নামায প্রমাণিত।
ইমাম বুখারী (র.) এর উস্তাদ ইমাম আলী ইবনুল জা’দ (র.) স্বীয় ‘মুসনাদে’ সহীহ সূত্রে বর্ণনা করেন,
عَنِ السَّائِبِ كَانُوا يَقُومُونَ عَلَى عَهْدِ عُمَرَ فِي شَهْرِ رَمَضَانَ بِعِشْرِينَ رَكْعَةً، وَإِنْ كَانُوا لَيَقْرَءُونَ بِالْمِئِينَ مِنَ الْقُرْآنِ
হযরত সাইব ইবন ইয়াযীদ (রা.) বলেন, তাঁরা (সাহাবা ও তাবিঈন) উমর (রা.) এর যুগে রামাদান মাসে বিশ রাকাআত (তারাবীহ) পড়তেন এবং শতাধিক আয়াত বিশিষ্ট সূরাসমূহ পড়তেন। (মুসনাদ ইবনুল জা’দ, হাদীস-২৮২৫; আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকী, হাদীস-৪৬১৭, দারুল কুতুব ইলমিয়া)
বর্ণনাটির সূত্র সহীহ। কেননা ইমাম বুখারীর উস্তাদ যাদের থেকে বর্ণনা করেছেন, তারা সবাই বুখারী-মুসলিমের বর্ণনাকারী। এছাড়া ইমাম বুখারীর উস্তাদের সূত্রে ইমাম বাইহাকী এটি বর্ণনা করেছেন। এ সূত্রটিও সহীহ।
বেশ কয়েকজন মুহাদ্দিস সুস্পষ্টভাবে এটাকে সহীহ বলেছেন। যেমন ইমাম নববী বলেন, এই হাদীসটি সহীহ।
النووي، المجموع للنووي (٤/٣٢) • إسناده صحيح
হাফিয ইবনুল মুলাক্কিন (র.) বলেন, ইমাম বাইহাকী বর্ণনা করেন, হযরত উমর (রা.) এর যুগে সাহাবায়ে কিরাম ২০ রাকআত তারাবীহ আদায় করতেন। এই হাদীসের সনদ সহীহ।
وَرَوَى الْبَيْهَقِيّ بِإِسْنَاد صَحِيح عَن عمر أَن النَّاس كَانُوا يقومُونَ عَلَى (عَهده) بِعشْرين رَكْعَة.
(আল বাদরুল মুনীর, ৪/৩৫০. দারুল হিজরাহ)
ইমাম ইবনুল ইরাকি (র.)ও এই হাদীসকে সহীহ বলেছেন।
- ابن العراقي، طرح التثريب (٣/٩٧) • إسناده صحيح
ইমাম কাস্তালানী (র.)ও এই হাদীসকে সহীহ বলেছেন।
القسطلاني، إرشاد الساري (٣/٤٢٦) • إسناده صحيح
বদরুদ্দীন আইনী (র.)ও এই হাদীসকে সহীহ বলেছেন। (উমদাতুল কারী, আইনী ৫/৩৮৯)
আল্লামা শুআইব আরনাউত (র.) বলেন, এই হাদীসের সনদ সহীহ এবং এই হাদীসের সমস্ত রাবী ন্যায়পরায়ণ এবং নির্ভরযোগ্য।
شعيب الأرنؤوط، تخريج شرح السنة (٤/١٢٠) • إسناد صحيح رجاله كلهم عدول ثقات
সাহাবায়ে কিরাম (রা.) থেকে ২০ রাকআত তারাবীহ প্রমাণিত হওয়ার পরে আর কোনো কথা থাকতে পারে না। কারণ রাসূলুল্লাহ e বলেন,
فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الْمَهْدِيِّينَ الرَّاشِدِينَ تَمَسَّكُوا بِهَا وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ
- أخرجه أبو داود (٤٦٠٧)، والترمذي (٢٦٧٦)، وابن ماجه (٤٢)، وأحمد (١٧١٤٥) مطولاً.•
তোমরা অবশ্যই আমার সুন্নাত এবং আমার হিদায়াতপ্রাপ্ত খলীফাহগণের সুন্নাত অনুসরণ করবে, তা দাঁত দিয়ে কামড়ে আঁকড়ে থাকবে। (আবূ দাঊদ, হাদীস-৪৬০৭)
তাছাড়া ইমাম তিরমিযী (র.) স্পষ্ট করে বলেন,
وَأَكْثَرُ أَهْلِ الْعِلْمِ عَلَى مَا رُوِيَ عَنْ عُمَرَ وَعَلِيٍّ وَغَيْرِهِمَا مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم عِشْرِينَ رَكْعَةً. وَهُوَ قَوْلُ سُفْيَانَ الثَّوْرِيِّ وَابْنِ الْمُبَارَكِ وَالشَّافِعِيِّ. وَقَالَ الشَّافِعِيُّ وَهَكَذَا أَدْرَكْتُ بِبَلَدِنَا بِمَكَّةَ يُصَلُّونَ عِشْرِينَ رَكْعَةً
হযরত আলী ও উমার (রা.) প্রমুখ সাহাবায়ে কিরাম হতে বর্ণিত রিওয়ায়াত অনুযায়ী বেশিরভাগ আলিমের অভিমত তারাবীহর নামায বিশ রাকআত। এই মত সুফিয়ান সাওরী, ইবনুল মুবারাক ও শাফিঈ (র.)-এর। ইমাম শাফিঈ (র.) বলেন, আমাদের মক্কা নগরীর লোকদেরকেও বিশ রাকআত আদায় করতে দেখেছি। (জামি তিরমিযী, ৮০৬)
সুতরাং আমাদের উচিত রামাদানের উভয় কিয়ামুল লাইল অর্থাৎ তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ উভয়টি আদায় করা। এবং বিশেষ মর্যাদা হাসিল করা। কেননা সায়্যিদুনা জিবরীল আলাহিস সালাম এসে আল্লাহর রাসূল e কে জানিয়ে দেন,
واعلمْ أنَّ شرفَ المؤمنِ قيامُ اللَّيلِ وعزُّه استغناؤُه عن النّاسِ
জেনে রাখুন, মুমিনের মর্যাদা কিয়ামুল লাইল তথা রাতে দাঁড়িয়ে নামায আদায়ের মধ্যে, আর তাঁর সম্মান মানুষ থেকে অমুখাপেক্ষিতার মধ্যে।
- المنذري، الترغيب والترهيب (٢/٤٣) • إسناده حسن • أخرجه الطبراني في [2]المعجم الأوسط (٤٢٧٨) واللفظ له.
আল্লাহ তাআলা আমাদের মাকবূল কিয়ামুল লাইল আদায় করার তাওফীক দান করুন।

