আরো ১৪ দিনের যুদ্ধ শেষে আপাতত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অঘোষিত যুদ্ধবিরতি চলছে বলা চলে। ঘোষিত যুদ্ধবিরতি যেটা হয়েছিল জুন মাসের মাঝামাঝি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে, সেটা আসলে কখনোই পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। জুলাইয়ের ১১ তারিখ থেকে তো রীতিমতো ঘোষণা দিয়ে উভয় পক্ষ সে সমঝোতা স্মারক থেকে বেরিয়ে এসে হামলা-পালটা হামলা চালাতে থাকে, যা আবার ২৪ জুলাই এসে অনেকটা আকস্মিক থেমে যায় বলা চলে। ট্রাম্প তার স্বভাবসুলভ হুমকি-ধামকির এক পর্যায়ে হঠাৎ ইরানের উপর হামলা থামানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, ইরান এবার শুরু থেকেই মূলত যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিনের হামলার জবাবে উপসাগরীয় রাষ্ট্রসমূহ এবং জর্ডানে পালটা হামলা করছিল, ২৪ তারিখ ট্রাম্প থেমে গেলে ইরানও যথারীতি থেমে যায়।
সমঝোতা স্মারক পরবর্তী এই ১৪ দিনের সংঘাত আসলে পূর্ণোদ্যমের যুদ্ধ ছিল না, কিন্তু তারপরও সমঝোতা স্মারকের দাফন-কাফন সম্পন্ন করার জন্য যথেষ্ট ছিল। ফলে এরপর ঠিক কীসের ভিত্তিতে আবার যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলো, সে প্রশ্নের জবাব খানিকটা জরুরি বটে। ১৪ দিনের এই লড়াইয়ে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো ইসরায়েল সরাসরি অংশগ্রহণ করেনি। ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কুয়েত ও বাহরাইন নাকি এই মাসে ইরানে হামলা চালিয়েছিল গোপনে, যদিও কুয়েত সেটা অস্বীকার করছে। ইসরায়েলের সরাসরি অংশগ্রহণ না করা এবং কুয়েত-বাহরাইনের গোপনে অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে বলা চলে, যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত এইবার সরাসরি আরব রাষ্ট্রদের পাশে নিয়ে যুদ্ধ করতে চাচ্ছিল। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে যেমন আরব রাষ্ট্রদের মুখরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের অনুমতি দেয়নি, সম্ভবত এবারও সেই একই কারণে এই ১৪ দিন ইসরায়েলকে প্রকাশ্যে মাঠে নামায়নি, যদিও বাস্তবে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের পিছনে পিছনে পুরোদমে হাযির ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত উপসাগরীয় ৬ দেশের ঐকমত্যের অভাবে আরব রাষ্ট্রসমূহ সরাসরি যুদ্ধে না জড়ানোর ফলে ট্রাম্প আপাতত যুদ্ধ থামানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কিনা, তা ভেবে দেখার বিষয় বটে। অবশ্য ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ট সংবাদ মাধ্যম বলে পরিচিত এক্সিওস-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে খোদ মার্কিন সেন্টকমের কমান্ডার নাকি হোয়াইট হাউসকে জানিয়েছেন, সামরিক হামলার কার্যকারিতা সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছেছে, এর চেয়ে বেশি ফল লাভের আশা নাই, অন্যদিকে মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সরঞ্জামাদির যথেষ্ট সংকট রয়েছে এই মুহূর্তে। ১৪ দিনের অনর্থক যুদ্ধের থেমে যাওয়ার পিছনে এটাও একটা কারণ হতে পারে। তবে এইবার যেহেতু সংঘাতের মূল কেন্দ্রে ছিল হরমুজ প্রণালী, কাজেই ওমানের সাথে ইরানের হরমুজ নিয়ে কার্যকর আলোচনাও এই পরিস্থিতিতে প্রভাবক হয়ে থাকতে পারে বলে অনেকের ধারণা।
হরমুজে আসলে কী হতে পারে? পৃথিবীর ইতিহাসের পরাশক্তিদের অন্যতম প্রধান পরিচয় হলো সমুদ্র পথে তাদের নিয়ন্ত্রণ। মুসলিমদের স্বর্ণযুগে মুসলিম শাসকদের সম্মতি ছাড়া সমুদ্রে তক্তা ভাসানোও কঠিন ছিল ইউরোপীয়দের জন্য, ব্রিটিশ রাজের স্বর্ণযুগে পুরো নৌপথ ছিল ব্রিটিশদের হাতে, এখন সে নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হরমুজে আসলে পরাশক্তির সেই ক্ষমতার পরীক্ষা চলছে। হরমুজের উপর এশিয়া ও ইউরোপ যতটা নির্ভরশীল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সে তুলনায় খুব একটা নির্ভরশীল নয়। কিন্তু হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে যদি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ কার্যকর না থাকে, তবে পরাশক্তি হিসেবে তাদের অস্তিত্বই সংকটের মুখে পড়বে। ঠিক এই জায়গায় ইরানের অবস্থান হচ্ছে— হরমুজে ওমানের সাথে সমঝোতা করতে তাদের আপত্তি নাই, প্রয়োজনে অন্যান্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রসমূহের সাথেও সমন্বয় করতে রাযী, শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোন ধরনের কর্তৃত্ব যেন না থাকে। ইরান এখন ওমানের সাথে যে সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে, তার মধ্য দিয়ে হয়তো হরমুজ উন্মুক্তও হয়ে যেতে পারে, কিন্তু এমন কোন না কোন শর্ত ইরান তাতে সংযুক্ত রাখবে, যা কিনা মার্কিন কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে। এদিকে উপসাগরীয় রাষ্ট্রসমূহের জন্য মার্কিন কর্তৃত্বের চেয়ে বেশি আশঙ্কার বিষয় ইরানের কর্তৃত্ব, যে কারণে এই ইস্যুতে ওমানের সাথে তাদের সমঝোতা খানিকটা কঠিন হয়ে পড়েছে। মোট কথা, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালীকে ২৮ ফেব্রুয়ারির আগের অবস্থায় নিয়ে যেতে চায়, এটা সফল হলে এশিয়া ও ইউরোপের বেশিরভাগ দেশ আনন্দিত হবে ঠিকই, কিন্তু এটা সফল করতে তার সক্রিয় সামরিক অংশগ্রহণ করতে চাইছে না কোন ভাবেই। অন্যদিকে ইরান যে কোন অবস্থায় ২৮ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী হরমুজ প্রণালীতে তাদের নিয়ন্ত্রণের ছাপ রাখতে মরিয়া, এই প্রশ্নে কোন ছাড় দিতে রাযী হচ্ছে না এখনো।
ট্রাম্প এখন অবধি আরব কিংবা ইউরোপকে সরাসরি সামরিক অভিযানে সক্রিয় করতে না পারলেও তার সে প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে প্রধানমন্ত্রী বদলে মার্কিন প্রশাসন খানিকটা আশার আলোও দেখছে এক্ষেত্রে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত “বাধাহীন নৌচলাচলের পক্ষে” কাগুজে বিবৃতিতে সবকিছু সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাস্তবেও কোন ইউরোপীয় অংশগ্রহণ দেখা যাবে, সেটা যথেষ্ট প্রশ্নসাপেক্ষ বটে। তাছাড়া ইরানের বিপক্ষে বিভিন্ন রাষ্ট্রের বিবৃতি, এমনকি সামরিক জোট গঠনও প্রকৃতপক্ষে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষ কোন প্রভাব ফেলতে পারবে না, কেননা ইরানের সাথে আসলে এসকল রাষ্ট্র কখনোই ছিলো না, আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার সাথে তাদের যুক্ত হওয়ার ফলে অতিরিক্ত কোন সামরিক শক্তিও তৈরি হবে না। আপাত দৃষ্টিতে যা মনে হয়, ইউরোপীয়রা সম্ভবত এই মুহূর্তে কেবল বিবৃতিই দেবে, যুদ্ধ পুরোপুরি থামলে ইরানের সম্মতিক্রমে হরমুজ প্রণালী থেকে বিস্ফোরণ অপসারণে অংশগ্রহণ করলেও করতে পারে। তবে চীন এবং রাশিয়া যেহেতু কিছুটা হলেও ইরানের দিকে অবস্থান নিয়েছে, ফলে এই দুটি রাষ্ট্রের অবস্থান ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সম্প্রতি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংকটের মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের সাথে চীনের যোগাযোগের ফলে এক্ষেত্রে চীনের সক্রিয়তার সম্ভাবনা অনেকেই দেখতে পাচ্ছেন, যদিও হরমুজ প্রণালী যদি মার্কিন ব্যর্থতার পর চীনের হস্তক্ষেপে উন্মুক্ত হয়, তবে সেটাও “মার্কিন পরাশক্তি”র জন্য খুব সুখকর অভিজ্ঞতা হবে না।
এদিকে মড়ার উপর খড়ার ঘায়ের মতো হুথিরা সক্রিয় হয়েছে ইয়েমেনে, কিংবা বলা চলে তাদেরকে সক্রিয় হতে বাধ্য করেছে সৌদি আরব। সান’আ বিমানবন্দরে হামলাকে কেন্দ্র করে হুথিরা এখন সাউদী জাহাজের উপর বাব এল-মান্দেবে অবরোধ আরোপ করেছে। হুথিরা যদিও ইরানের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েনি পুরোপুরি, তারা নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে কোন কিছুই আসলে ইরান সংকটের বৃহত্তর পরিসরের বাইরে নেই। হরমুজ আর বাব এল-মান্দেব এক সাথে অবরুদ্ধ হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে তার প্রভাব হবে ভয়াবহ। যদিও ওমান সেই পরিস্থিতির উত্তরণে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সাফল্যের সম্ভাবনা বহু প্রশ্নবোধক চিহ্নের আড়ালে আটকে আছে।
সব মিলিয়ে ১৪ দিনের যুদ্ধ শেষে আকস্মিক এই যুদ্ধবিরতির পর মার্কিনিদের হাতে খুব ভালো কোন সমাধান আসলে নেই। তাদেরকে হয়তো চীন-ওমান-পাকিস্তানের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে সম্মানজনক কূটনৈতিক সমাধানের জন্য, সেটা সম্ভব না হলে আবার যুদ্ধে ফিরতে হবে। যুদ্ধে ফিরে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ইরানের খুব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সমূহে শক্তিশালী আঘাত হেনে প্রতীকী বিজয় দাবি করে নিজে থেকেই যুদ্ধ থামাতে পারেন, অন্যথায় চলতে থাকবে অনিঃশেষ যুদ্ধ। মার্কিন অর্থনীতি ও আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতায় তা কতটুকু সম্ভব, সে প্রশ্ন যেমন রয়েছে, তেমনি দীর্ঘ যুদ্ধে ইরান আত্মসমর্পণ না করলেও কতদিন অবধি অস্তিত্ব রক্ষা সম্ভব, সে প্রশ্নের গুরুত্বও নেহায়েত কম নয়। গাযার প্রতিরোধযোদ্ধার যেমন তাদের সামর্থ্যের চেয়ে বহুগুণ বেশি প্রতিরোধ করেও গাযাকে রক্ষা করতে পারেননি, গাযার তুলনায় ইরান বহু গুণে শক্তিশালী হলেও শেষ অবধি অতি দীর্ঘ যুদ্ধে ইরানের জন্যও সে আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নাই।
চলমান যুদ্ধপরিস্থিতিতে গাযা তথা ফিলিস্তিন যেন একেবারে আলোচনার বাইরে চলে গেছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র “যুদ্ধবিরতি” চলাকালে হামাস গাযার বেসামরিক প্রশাসনের দায়িত্ব ত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার ফলে গাযা যদিও বা কিছুটা আলোচনায় এসেছিল, ১৪ দিনের যুদ্ধে আবার সে আলোচনা মুছে গেছে। বাস্তবে তাদের কাছ থেকে দায়িত্ব গ্রহণ করেনি কেউই। গাযায় কথিত যুদ্ধবিরতির পর এক তরফা হামাসই সে চুক্তি পালন করছে, ইসরায়েলের বর্বরতা মোটেও থেমে নেই। ট্রাম্পের কথিত শান্তি কমিটি কিংবা যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতাকারী পক্ষসমূহ, বাস্তবে কারোরই কোন ভূমিকা নেই গাযায়। এই পরিস্থিতিতে শহীদ ইয়াহিয়া সিনওয়ারের শাহাদতের দীর্ঘদিন পর গাযায় হামাস তাদের প্রধান হিসেবে নির্বাচিত করেছে খলীল হায়্যাকে। বর্বর দখলদার বাহিনীর হাতে ৪ পুত্র, ৫ নাতিসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন হারানো খলিল হায়্যার নেতৃত্বে সামরিক শক্তিতে দূর্বল হয়ে পড়া হামাস সামনে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছে, তা এখন দেখার বিষয়। এদিকে পশ্চিম তীরেও থেমে নেই আগ্রাসী দখলদারি। পশ্চিমতীরের ইতিহাসের ভয়াবহতম উচ্ছেদ ও নতুন দখলদার বস্তি নির্মাণ চলছে এই মুহূর্তে। সম্প্রতি ইসরায়েলীদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে পশ্চিমতীর পরিদর্শনে গিয়েছিলেন মার্কিন কংগ্রেস সদস্য রো খান্না। দখলদার সন্ত্রাসীরা তাকে পর্যন্ত আটকে রেখেছে দীর্ঘক্ষণের জন্য, সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় হলো কংগ্রেস সদস্য তার নিজ দেশের দূতাবাসের সাথে সবধরনের যোগাযোগ করেই সে সফলে গিয়েছিলেন, কিন্তু এই ঘটনার পর ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন জায়োনিস্ট রাষ্ট্রদূত সে বিষয় অস্বীকার করে পুরো ঘটনাকেই আড়াল করার চেষ্টা করেছেন। লেবাননেও থেমে নেই ইসরায়েলী বর্বরতা। কিন্তু ইরান যুদ্ধের বৈশ্বিক প্রভাব ইসরায়েলের জন্য বর্বরতা চালানো আরো সহজ হচ্ছে। তদুপরি ইরান সমঝোতা স্মারকের পর থেকে আর ইসরায়েলের উপর কোন হামলা না করার ফলে তারা আরো নিশ্চিন্তে বর্বরতা চালিয়ে যেতে পারছে। ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার এই নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধবিরতি নিয়ে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হলেও এক্ষেত্রে উভয়পক্ষেরই রয়েছে নানা কৌশলগত হিসাব-নিকাশ। শুধু ফিলিস্তিনই যেন সব হিসাব নিকাশের বাইরে চলে গেছে, থামছে না তাদের উপর চলমান বর্বরতা।

