Logo
জনগণের মনোযোগ বিকেন্দ্রীকরণের সেকাল ও একাল
ইমাদ উদ্দীন তালুকদার
  • ১ এপ্রিল, ২০২৬

রাজনীতি শব্দ বলেন আর এর অর্থ বলেন, সবদিক থেকেই মানুষ এর সাথে খুব পরিচিত। এটি কেবল নীতি নির্ধারণ বা প্রশাসনিক কার্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং জনগণের মনোযোগ, উপলব্ধি ও নিজস্ব বয়ানের ওপরও গভীরভাবে নির্ভরশীল। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, যখন শাসকগোষ্ঠী অর্থনৈতিক সংকট, শাসনগত ব্যর্থতা বা জনঅসন্তোষের সম্মুখীন হয়েছে কিংবা ক্ষমতার মসনদকে দীর্ঘস্থায়ী করতে চেয়েছে, তখন তারা সরাসরি সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়ার কৌশল গ্রহণ করেছে।

এই distraction বা মনোযোগ বিচ্যুতি কৌশলটি প্রাচীন সভ্যতা থেকে শুরু করে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা পর্যন্ত এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। প্রযুক্তির বিকাশ, গণমাধ্যমের সম্প্রসারণ, চিত্তবিনোদনের বৈচিত্র, সরাসরি বা শীতল যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক রাজনীতির ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই কৌশল আরও জটিল, সূক্ষ্ম এবং কার্যকর হয়ে উঠেছে।

ঐতিহাসিকভাবে প্রচলিত Bread and Circuses” নীতি

প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যে Bread and Circuses তথা খাদ্য আর বিনোদন ধারণা ছিল রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের একটি সুপরিকল্পিত রূপ। রোমান কবি জুভেনাল তার Satires X-এ ব্যঙ্গাত্মকভাবে এ ধারণা উল্লেখ করে বলেন যে, জনগণ ধীরে ধীরে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের চেয়ে খাদ্য ও বিনোদনের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। সাম্রাজ্য কেমন আছে, শাসনব্যবস্থা কেমন—এইসব না দেখে জনগণ সামান্য খাদ্য বা আর্থিক সুবিধা আর খেলাধুলার চিত্তবিনোদনেই সন্তুষ্ট থেকে যায়।

রোমান সাম্রাজ্যে সরকার দূর অঞ্চল থেকে গম সংগ্রহ করে রাষ্ট্রীয় ভাণ্ডারে জমা রাখত। এরপর সেই গম শহরের গরিব জনগণের মধ্যে তালিকা অনুযায়ী বিনামূল্যে বা খুব কম দামে বিতরণ করা হত। অনেক সময় মানুষ নির্দিষ্ট কেন্দ্রে গিয়ে রেশনিং বা টোকেনের মতো ব্যবস্থায় এই গম সংগ্রহ করত। এইভাবে খাবার দিয়ে দরিদ্র জনগণকে বাঁচিয়ে রাখা হলেও তাদের নির্ভরশীল করে রাখা উদ্দেশ্য, যাতে তারা রাষ্ট্রের প্রতি বেশি অনুগত থাকে এবং অসন্তোষ কম হয়। এই খাদ্যের সুবিধার পাশাপাশি রোমান সাম্রাজ্য সামাজিক জীবনে বিনোদনকে বিশেষায়িত রূপ প্রদান করে। জনগণকে আনন্দ দেওয়ার জন্য শাসকরা বিভিন্ন আয়োজন করত, যার মধ্যে বন্দি ও দাসদের দিয়ে জীবন-মরণ রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে গ্ল্যাডিয়েটর যুদ্ধ এবং রথদৌড় ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। গ্ল্যাডিয়েটরদের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ দর্শকদের উত্তেজিত করত, অন্যদিকে দ্রুতগতির রথদৌড় মানুষের মধ্যে প্রতিযোগিতার রোমাঞ্চ সৃষ্টি করত। এসব আয়োজন শুধু বিনোদনই নয়, বরং জনগণকে ব্যস্ত ও সন্তুষ্ট রাখার একটি কৌশল হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।

লেখক পাউল ভেইন তার Bread and circuses : historical sociology and political pluralism বইয়ে বিশ্লেষণে দেখান যে এটি কেবল দানশীলতা নয়; বরং শাসনব্যবস্থার একটি অংশ ছিল, যার মাধ্যমে জনগণের আনুগত্য নিশ্চিত করা হতো।

আধুনিক বিশ্বে “ব্রেড” ধারণাটি শুধু খাদ্য নয়, বরং জাতীয় বা আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ক্ষেত্রে এটি সামান্য অর্থনৈতিক সহায়তা, ভর্তুকি বা প্রতীকী মানবিক সাহায্যের মাধ্যমেও প্রকাশ পায়। কিন্তু এসব সহায়তার আড়ালে অনেক সময় বৃহৎ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ আদায়ের উদ্দেশ্য কাজ করে। অর্থাৎ অতীতের রোমান নীতির মতোই, আজও সীমিত “দান” বা সুবিধার মাধ্যমে বৃহৎ ক্ষমতাকাঠামো নিজেদের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার চেষ্টা করে। আবার রোমানদের জমকালো গ্ল্যাডিয়েটর যুদ্ধ ও রথদৌড় কেবলমাত্র বিনোদনের মাধ্যম ছিল না; এগুলো ছিল এক ধরনের শাসনকে জবাবদিহিতার বাইরে রাখার অপকৌশল। শাসকগোষ্ঠী এসব জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মাধ্যমে জনগণকে আনন্দে ব্যস্ত রাখত এবং তাদের দৃষ্টি রাষ্ট্রের প্রকৃত সমস্যা থেকে দূরে সরিয়ে দিত। ফলে প্রশাসনিক দুর্বলতা, অর্থনৈতিক সংকট কিংবা শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা সহজেই আড়াল হয়ে যেত। এই প্রক্রিয়াটি ইতিহাসে “Bread and Circuses” নামে পরিচিত, যা জনগণকে নিয়ন্ত্রণের এক সূক্ষ্ম কিন্তু কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। আধুনিক সময়ে এই ধারণাটিকে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে বড় ক্রীড়া আয়োজন যেমন ফিফা বিশ্বকাপ, অলিম্পিক গেমস বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিনোদনমূলক ইভেন্টকে অনেক গবেষক “আধুনিক ব্রেড অ্যান্ড সারকাসেস” হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, একাডেমিক আলোচনায় Bread, Circuses, and Feeds: Spectacle Politics from Classical Greece to the United States শীর্ষক গবেষণায় দেখানো হয়েছে যে প্রাচীন যুগের গণবিনোদন ও আধুনিক যুগের স্পেকট্যাকল সংস্কৃতির মধ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের কিছু মিল রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে বলা যায়, “Bread and Circuses” ছিল এক ধরনের রাজনৈতিক কৌশল, যেখানে জনগণের তাৎক্ষণিক সন্তুষ্টি নিশ্চিত করে দীর্ঘমেয়াদি জবাবদিহিতা এড়িয়ে যাওয়া হতো। এই ধারাবাহিকতা এখনো চলমান। দেখা যায় ফিলিস্তিন, লিবিয়া, ইয়ামেন কিংবা সিরিয়াসহ বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে দখলদার বা হামলাকারীরাই অনুদান প্রদান করে সাধারণ জনগণকে মন ভুলিয়ে নিজেদের বিশাল ক্ষতিকে সহনীয় করে দিচ্ছে। অনেকসময় ক্ষমতাসীনরা মসনদকে পাকাপোক্ত করতে রাষ্ট্রকে মেরুণ্ডহীন কিংবা তলাবিহীন ঝুরিতে পরিণত করতেও পিছপা হয় না। তখন দেখা যায় জনগণকে সাধারণ সুবিধা কিংবা বিনোদনে মত্ত রেখে রাষ্ট্রের বিপক্ষে এই প্রক্রিয়া প্রয়োগ করে। আবার রাষ্ট্রের অর্থায়নে ও ব্যবস্থাপনায় বছরব্যাপী বিনোদনমূলক নানান আয়োজন থাকে যেখানে জনগনকে মনোরঞ্জনের মাধ্যমে কেবল রাষ্ট্রের ব্যাপারে সচেতনতা থেকে নয়, বরং তার জীবনের দায়িত্বশীল ফিকর, মূল ফোকাসের জায়গা থেকে সরিয়ে রাখা হয়। এর রূপ অনেক সময় হতে পারে জনদরদী, ধর্মীয় মোড়ক কিংবা জাতীগত চেতনায়ও; যেখানে প্রত্যেকটি দাবির বাস্তবতা বা প্রতিফলন নামমাত্র থাকে। বেশিরভাগ মানুষই এই bread and circuses এর চক্রে অজান্তেই অবচেতনের মত মজে রয়।

মনোযোগ নিয়ন্ত্রণে মিডিয়ার ব্যবহার

মনোযোগ বিচ্যুতি কৌশলটি আধুনিক রাজনৈতিক তত্ত্বে বিভিন্নভাবে পরীলক্ষিত হয়। একসময় সংবাদ প্রচার বা পাবলিক কানেকশনের মাধ্যম ছিলো সীমিত এবং সময়সাপেক্ষ। সেই সীমিত ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়ায়ই জনগণের চিন্তায় প্রভাব, সমর্থন তৈরি, প্রতিটি বাস্তবতার নিজস্ব বয়ান দিয়ে জনগণকে ম্যানুপুলেট করা হতো। বর্তমাবে সে কাজ মিডিয়ার মাধ্যমে আরও দ্রুত ও চমকপ্রদ পদ্ধিতিতে করা যায়। এজন্যই এখন জনগণের মনস্তত্ত্বকে নিয়ন্ত্রণে মিডিয়া শক্তিশালী হাতিয়ার। কারণ কোনো মেসেজ সর্বস্তরে পৌঁছে দিতে মিডিয়া শীর্ষেই রয়েছে। এই প্রক্রিয়াকে কয়েকটি দিকে বিভক্ত করা যায়। যেমন, জনগণ কী নিয়ে ভাববে—তা নির্ধারণকে প্রভাবিত করা; কোনো জিনিসের সমর্থন তৈরি; প্রতিটি বাস্তবতার ক্ষেত্রে নিজস্ব বয়ান।

১) Agenda-Setting বা কী নিয়ে ভাববে, তা নির্ধারণ: এই Agenda-setting theory অনুযায়ী, গণমাধ্যম মানুষকে কী ভাবতে হবে তা সরাসরি বলে না; বরং কোন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ—তা ঠিক করাই লক্ষ্য। Maxwell McCombs এবং Donald Shaw দেখিয়েছেন যে, মিডিয়া যে বিষয়গুলো বেশি প্রচার করে, সেগুলোই জনমনে অগ্রাধিকার পায়। ফলে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু আড়ালে রেখে বিকল্প বিষয় সামনে আনা সম্ভব হয়।

২) Manufacturing Consent বা সম্মতি তৈরি করার প্রক্রিয়া:

Edward S. Herman এবং Noam Chomsky তাদের Manufacturing Consent তত্ত্বে দেখান যে, গণমাধ্যম একটি নিরপেক্ষ মাধ্যম নয়; বরং এটি এমনভাবে কাজ করতে পারে যা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর স্বার্থকে প্রতিফলিত করে। এর মাধ্যমে জনমত ধীরে ধীরে এমনভাবে গড়ে ওঠে, যা বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামোকে বৈধতা দেয়।

৩) Framing Effect বা বাস্তবতা উপস্থাপনের ধরন:

Framing theory অনুযায়ী, কোনো ঘটনা কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে—তা জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। Robert M. Entman দেখিয়েছেন, একটি ঘটনাকে “নিরাপত্তা সংকট”, “মানবিক বিপর্যয়” বা “সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান” হিসেবে উপস্থাপন করলে মানুষের প্রতিক্রিয়াও ভিন্ন হয়। বৈশ্বিক যুদ্ধের ক্ষেত্রে পরাশক্তিগুলো এমনটাই চিত্রায়িত করে। আবার পরিস্থিতি অনুযায়ী যুদ্ধে সফলতা বা ব্যর্থতা, যা-ই প্রচার করতে চায়, সেভাবেই তুলে ধরে।

এ যুগে এলিটশ্রেণি প্রকৃতপক্ষে মিডিয়াকে অন্যতম হাতিয়ার হিসেবেই গ্রহণ করে। ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর চাহিদামত মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে জনগণের মনোযোগ বিকেন্দ্রীকরণের পদ্ধতিটা বেশ কার্যকরী। তাদের স্বার্থের জন্য জনগণকে যা দেখাতে চায়, তাদের থেকে যা গোপন রাখতে চায়, যে কঠিন বাস্তবতার চিত্তাকর্ষক ভিন্ন বয়ান প্রতিষ্ঠা করতে চায়—সব উদ্দেশ্য সাধনে মিডিয়া ব্যবহৃত হয়। জনগণ মেনে নিবে না, অসন্তোষ বৃদ্ধি পাবে—এমন বিষয় আলোচনার বাইরে রেখে বাতাবি লেবুর বাম্পার ফলনের সংবাদ তখন প্রচার হয়। ক্ষমতাসীনরা অনেক সময় ভিন্ন দেশের সাথে এমনসব চুক্তিতে যায়, যা জাতিগত, অর্থনীতি, ভৌগলিক কিংবা নিরাপত্তাজনিত হুমকি; এসবের বাস্তবতা সাধারণ জনগণ মেনে নেয় না, তখন এটিকে অভাবনীয় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয় কিংবা দেশজুড়ে ম্যারাডোনার জুতোজোড়া এনে সপ্তাহব্যাপী প্রদর্শনী হবে, ব্রাজিলের প্রীতিম্যাচের আয়োজন হবে—এসব মিডিয়া চব্বিশ ঘন্টাই লাইভ টেলিকাস্ট করবে, ব্রেকিং নিউজ করে রাখবে কয়েকদিন। এজন্য নিউজ কভারেজের ক্ষেত্রে দেখবেন ফিলিস্তিন, সিরিয়া, লিবিয়া কিংবা কাশ্মির বা চীনের উইঘুর মুসলমানদের দশকের পর দশক ধরে দখল কিংবা লক্ষ লক্ষ মুসলমানদের নির্যাতন করা হলেও এদেরকে নিয়ে মিডিয়া আলোচনা অনুপস্থিত। অন্যদিকে ইউক্রেনের ক্ষেত্রে সবাই খুব সচেতনভাবে পক্ষে নেরেটিভ তৈরি করে আন্তর্জাতিক সিম্পেথি এনে দেয়।

সমর গবেষক Peter Pomerantsev তার গবেষণায় দেখান যে, আধুনিক বিশ্বে তথ্য কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; বরং এটি একটি “information warfare”-এর অংশ, যেখানে সত্য, মিথ্যা এবং বিভ্রান্তির মিশ্রণ জনমতকে প্রভাবিত করে।

এই প্রেক্ষাপটে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও কেবল তথ্য সরবরাহ করে না; বরং এটি একটি সক্রিয় রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে মনোযোগই প্রধান সম্পদ। ফলে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ও শক্তি এই মনোযোগ দখলের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকে, যা রাজনৈতিকভাবে এজন্ডা বাস্তবায়নে ব্যবহৃত হয়। ডিজিটাল অ্যালগরিদম, ভাইরাল কনটেন্ট এবং তথ্যের অতিপ্রবাহ (information overload) মানুষের মনোযোগকে ক্রমাগত বিভক্ত করে। ফলে গভীর রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ইস্যুগুলো অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়। ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী বাস্তবতার বিপরীত হোক বা পক্ষে, তারা যেমনটা চায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে তেমনটাই জনগণের দৃষ্টিগোচর হয়, তেমনটাই বুঝে।

কৃত্তিম সংকট ও সামরিক যুদ্ধ :

রাজনীতিতে আরেকটি অপকৌশল হচ্ছে—কৃত্তিম সংকট তৈরি বা যুদ্ধ বাঁধিয়ে দেওয়া। এখানেও উদ্দেশ্য থাকে প্রকৃত বিষয় চাপা দিয়ে মানুষের মনোযোগ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা। যেমন, হঠাৎ করে শীর্ষস্থানীয় কোনো নেতা দূর্নীতিতে ধরা খেয়ে ফেললেন, সেদিন বা পরেরদিন একটি স্কুল বাসকে পেছন থেকে কোনো ট্রাক ধাক্কা মেরে নদীতে ফেলে দিল। মারা গেলো বিশজন শিশুসন্তান, যাদের নিষ্পাপ ফুলের মত ঝরে যাওয়া নিথর দেহ দেখে দেশের আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠাই বাস্তব। রাষ্ট্রনায়ক সরাসরি জায়গা পরিদর্শনে গেলেন, তাৎক্ষণিক আর্থিক ক্ষতিপূরণ ঘোষণা দিয়ে তদন্ত টিম গঠন করলেন। তদন্ত শেষ হতে কয়েক সপ্তাহ লাগলো। অতঃপর রিপোর্ট আসলো, ট্রাকের ধাক্কায় নয়, চাকা ব্লাস্ট হয়ে বাসটি নিজে নিজেই নদীতে পড়ে গেছে। এদিকে শীর্ষ নেতার আড়াল বা নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ হয়ে গেল। এভাবেই ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতার হুমকির বিপরীতে কৃত্রিম সংকট আসে, আর জনগণের ক্ষত দিয়েই তারা হুমকি থেকে উতরে ওঠে। ঠিক এভাবেই ক্ষমতাসীনরা দেশের জন্য অনেক সময় কোনো দেশকে শত্রু বানিয়ে রাখে, তাদের মেয়াদান্তে কিংবা পরিকল্পনা মতোই সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি আখ্যা দিয়ে যুদ্ধ বাঁধিয়ে দেওয়া হয়। আক্রান্ত রাষ্ট্র থেকে পালটা আঘাত আসে দেশের উপর, জনগণকে বলা হয়—এই দেখো, এরা শুধু আমাদের জন্য না, বরং সারাবিশ্বের জন্য হুমকি। সারা দেশ আন্দোলনে ফুঁসে ওঠে। দেশ জাতির যেকোনো সংকট দেশের জনগণকে এককাতারে এনে ফেলে। ক্ষমতাসীনদের দুর্বলতা, জনঅসন্তোষ সত্ত্বেও দেশ বা জাতিপ্রেম জাগ্রত করে জনসমর্থন বাড়িয়ে দেয়। এজন্যই খেয়াল করলে দেখা যায়, জাতীয় সংকট, সরাসরি যুদ্ধ, শীতল যুদ্ধ—অনেকসময় মনোযোগ বিচ্যুতির জন্যই আয়োজন করা হয়।

গবেষক John Mueller এর “Rally Round the Flag Effect” দেখায় যে, যুদ্ধ বা জাতীয় সংকটের সময় জনগণ স্বাভাবিকভাবেই সরকারের প্রতি বেশি সমর্থন প্রদর্শন করে।

গবেষক Citation Levy, Christopher Gelpi এবং Karl DeRouen এর গবেষণায় “Diversionary War Theory” ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যেখানে বলা হয় যে, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সংকট থেকে মনোযোগ সরাতে সরকার কখনো কখনো বাহ্যিক সংঘাতকেও ব্যবহার করতে পারে।

এই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার দিকে গভীর দৃষ্টিপাত করলে দেখবেন, এখানে অনেক উদ্দেশ্য বিদ্যমান থাকে। বিশেষ করে সময়ের যুক্তরাষ্ট্র, দখলদার ইসরায়েল, ভারতসহ অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও খেয়াল করে দেখবেন তাদের বেশিরভাগ এমন কৌশল এই নীতিরই অনুসরণ করে।

আমাদের আলোচিত তত্ত্বগুলো সম্মিলিতভাবে মোটামুটি সবগুলো অন্তর্ভুক্ত করে এবং প্রমাণ করে যে, মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ একটি কাঠামোগত ও বিশ্লেষণযোগ্য রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। যদিও এগুলো সবসময় কেবল মনোযোগ বিকেন্দীকরণের জন্যই কাজ করে না, পাশাপাশি শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো নিজেদের জাতিগত, আদর্শগত শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা, সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদী মিশনের অংশ হিসেবেও গ্রহণ করে। এটি স্বতন্ত্রভাবে বিস্তারিত আলোচনার বিষয়। জনগণের উচিত মনোযোগ বিকেন্দ্রীকরণের এই জটিল প্রক্রিয়া থেকে বাঁচতে স্রোতের সাথে গা না ভাসিয়ে, সচেতনভাবে চিন্তা করা। কারণ এই প্রক্রিয়ার বিভ্রমে পড়ে জনগণ বারবার ঘুরপাক খায়। এই বাস্তবতায় সত্যকে অসত্য কিংবা অসত্যকে সত্য হিসেবে বিশ্বাসের ভুল অবচেতনেই হয়ে যেতে পারে।

ফেইসবুকে আমরা...