1. redwan.iub@gmail.com : admin2021 :
  2. admin@parwana.net : Parwana Net : Parwana Net
  3. editor@parwana.net : Parwana Net : Parwana Net
Logo
আমীরুল মু’মিনীন হযরত আলী (রা.)
আল্লামা মো. নজমুদ্দীন চৌধুরী
  • ৬ মে, ২০২১

নাম ও বংশ পরিচয়
নাম আলী বিন আবি তালিব বিন আবদিল মুত্তালিব বিন হাশিম বিন আবদে মনাফ বিন কুসাই বিন কিলাব বিন মুররা বিন কা’ব বিন লুয়াই বিন গালিব বিন ফিহর। ফিহরকে কুরাইশ বলা হয়। ফিহর এবং তাঁর আওলাদকে কুরাইশী বলা হয়।
কুরাইশ গোত্রের মধ্যে হাশিমীগণ বংশ মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ। হাশিমের আওলাদকে হাশিমী বলা হয়। হযরত আলী (রা.) হাশিমী ছিলেন। হযরত আলী (রা.)-এর মাতার নাম ফাতিমা বিনতে আসাদ বিন হাশিম। হযরত আলী (রা.) হাশিমী পিতা-মাতার সন্তান। এখানে হাশিমী বংশের মর্যাদাজ্ঞাপক একটি হাদীস বর্ণনা করা হলো:
عن واسلة بن الأسقع قال سمعت رسول الله صلى عليه وسلم يقول إن الله اصطفى كنانه من ولد اسمعيل- واصطفي قريشا من كنانه واصطفي من قريش بني هاشم واصطفانى من بني هاشم (رواه مسلم)
-“ওয়াসীলা বিন আসকা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূলকে বলতে শুনেছি যে, আল্লাহপাক ইসমাঈল (আ.)-এর আওলাদের মাঝে কেনানাকে মর্যাদা দান করেছেন এবং কেনানার আওলাদের মাঝে কুরাইশকে মর্যাদা দিয়েছেন এবং কুরাইশের মাঝে বনূ হাশিমকে এবং বনূ হাশিমের মাঝে আমাকে মার্যাদা দান করেছেন।” (মুসলিম)
উল্লিখিত হাদীস দ্বারা সমগ্র কুরাইশ বংশের মাঝে হাশিমীদের বংশ মর্যাদা সবচেয়ে বেশি এ কথা প্রমাণিত হয়।

বনূ হাশিম ও বনূ মুত্তালিব এর সম্পর্ক
ইসলামপূর্ব যুগে ও ইসলামের পরে অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে আবদে মনাফের বংশের বিশেষ সম্পৃকতা আছে বিধায় এ বংশ সম্বন্ধে একটি স্বচ্ছ ধারণা থাকা আবশ্যক। কুরাইশ বংশের অধস্তন পুরুষ আবদে মনাফের পাঁচজন পুত্র ছিলেন। যথা: ১. হাশিম ২. আবদে শামস ৩. মুত্তালিব ৪. নওফল ৫. আবূ উমর। হাশিম, আবদে শামস ও মুত্তালিব এ তিনজনের মাতা আতিকা বিনতে মুররা। ৪র্থ পুত্র নওফলের মাতার নাম ওয়াকিদা বিনতে আমর। ৫ম পুত্র আবূ উমর এর মাতা সাকিফ গোত্রের মহিলা ছিলেন।
হাশিম ও আবদে শামস যমজ ভাই। জন্মের সময় একজনের আঙুল অন্যজনের কপালের সাথে যুক্ত ছিল। ধারালো অস্ত্রের সাহায্যে আঙুল ও কপাল আলাদা করা হয়। এতে রক্তপাত ঘটে। এ থেকে লক্ষণ ধরে নেওয়া হয় যে, এদের মাঝে রক্তপাত ঘটবে। আবদে মনাফের মৃত্যুর পর হাশিম কা’বার মুতাওয়াল্লী নিযুক্ত হন। হাজীদের জন্য পানি সরবরাহসহ অন্যান্য সেবাদানের বিষয় তাঁর দায়িত্বে আসে।
হাশিম সমাজসেবা, বদান্যতা ও অন্যান্য নেতৃত্বসুলভ প্রশংসনীয় গুণাবলি হেতু সমাজে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। তবে আবদে শামসের পুত্র উমাইয়া হাশিমের প্রতি বড়ই ঈর্ষান্বিত ছিলেন। হাশিমের প্রতি ঈর্ষাকাতর উমাইয়া নিজেকে কুরাইশ নেতা হিসাবে দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হাশিমের ব্যক্তিত্বের তুলনায় উমাইয়ার গ্রহণযোগ্যতা কুরাইশের কাছে অতি নগণ্য ছিল। ফলে তার এ উচ্চাকাক্সক্ষা বাস্তবায়িত হয়নি। (উমাইয়া ও হাশিমের দ্বন্দ্বের কথা তারিখে তাবারীতে বিশদভাবে বর্ণিত আছে)
ইসলামপূর্ব যুগে ও ইসলামের সময়ে উমাইয়া ও তাঁর বংশধর এবং নওফল ও তাঁর বংশধর পরস্পর একজোট ছিলেন। অন্যদিকে হাশিম ও তাঁর বংশধর এবং মুত্তালিব ও তাঁর বংশধর পরস্পর একজোট ছিলেন। রাসূল (সা.) এর পূর্বপুরুষ হাশিমের সাথে তাঁর ভাই মুত্তালিবের একাত্মতার কারণে মুত্তালিবীগণ রাসূল (সা.)-এর যাউয়িল কুরবা বা নিকটাত্মীয় হিসেবে স্বীকৃত।
রাসূল (সা.) ‘ফায়’ এর মাল বনূ হাশিম ও বনূ মুত্তালিবকে যাউয়িল কুরবা বা নিকটাত্মীয় হিসেবে দান করলেন। বনূ উমাইয়া ও বনূ নওফল ‘ফায়’ এর মাল থেকে বঞ্চিত রইলেন। এ প্রসঙ্গে তাফসীরে মাযহারীতে বর্ণিত আছে, যুবায়র বিন মুতঈম (রা.) বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সা.) তাঁর নিকটাত্মীয় বনূ হাশিম ও বনূ মুত্তালিবকে যখন মাল দিলেন (অর্থাৎ ফায় এর মাল) তখন আমি এবং উসমান (রা.) রাসূল (সা.)-এর খিদমতে হাজির হয়ে আরয করলাম, ইয়া রাসূল্লাল্লাহ! আল্লাহপাক আপনাকে বনূ হাশিমে জন্ম দিয়েছেন। তাই আমরা আমাদের ভাই বনূ হাশিমের মর্যাদার কথা অস্বীকার করি না। কিন্তু আমাদের ভাই বনূ মুত্তালিব এর সাথে আপনার বংশগত নৈকট্য এবং আমাদের সাথে আপনার বংশগত নৈকট্য সমান। এরপরও আপনি মাল বণ্টনকালে তাদেরকে দিলেন, কিন্তু আমরা বঞ্চিত রইলাম। তখন রাসূল (সা.) এক হাতের আঙুল অন্য হাতের আঙুলে রেখে জালের মতো করে বললেন বনূ হাশিম ও বনূ মুত্তালিব এভাবে একই।
আবূ দাউদ ও নাসাঈ শরীফে বর্ণিত আছে রাসূল (সা.) বললেন, আমি এবং বনূ মুত্তালিব জাহিলিয়াতের যুগেও আলাদা ছিলাম না, ইসলামের যুগেও নয়। আমরা এবং তারা একই। এ সময় রাসূল উভয় হাতের আঙুল একত্র করে জালের মতো করেছিলেন।
আল্লাহপাক ইরশাদ করেন,
مَّا أَفَاءَ ٱللهُ عَلٰى رَسُولِهِۦ مِنْ أَهْلِ ٱلْقُرَىٰ فَلِلّٰهِ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِى ٱلْقُرْبَىٰ وَٱلْيَتٰمٰى وَٱلْمَسٰكِينِ وَٱبْنِ ٱلسَّبِيلِ
-‘‘আল্লাহ জনপদবাসীদের কাছ থেকে তাঁর রাসূলকে যা দিয়েছেন তা আল্লাহর, রাসূলের, তাঁর আত্মীয় স্বজনদের, ইয়াতীমদের, অভাবগ্রস্তদের এবং মুসাফিরদের জন্য।’’ উল্লিখিত আয়াতে ফায় এর মাল বণ্টনের খাতসমূহ বর্ণনা করা হয়েছে (তবে কোনো পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়নি, পরিমাণ রাসূল (সা.) ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল)। এখানে ফায় এর মালের খাতগুলোর মধ্যে একটি খাত রাসূল (সা.) এর আত্মীয়-স্বজন হিসেবে রাসূল (সা.) বনূ হাশিমের সাথে কেবল হাশিমের ভ্রাতা মুত্তালিবের আওলাদকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। হাশিমের অন্য ভ্রাতা আবদে শামসের আওলাদ বনূ উমাইয়া ও বনূ নওফলকে স্বজন হিসাবে স্বীকৃতি দেননি।
উল্লেখ্য, যুদ্ধকালীন সময়ে বিনা যুদ্ধে শত্রুর কাছ থেকে যে মাল পাওয়া যায় তাকে ‘ফায়’ বলা হয়।

রাসূলুল্লাহ (সা.) এর প্রতি হযরত আলী (রা.) এর পিতা-মাতার স্নেহ-ভালোবাসা
রাসূল (সা.)-এর দাদা আব্দুল মুত্তালিব ইন্তিকালের পর হযরত আলী (রা.)-এর পিতা আবূ তালিব রাসূল (সা.)-এর লালন-পালনের ভার গ্রহণ করেন। মৃত্যু পর্যন্ত আবূ তালিব রাসূল (সা.)কে অব্যাহত সহযোগিতা করে গেছেন।
আর হযরত আলী (রা.)-এর মাতা ফাতিমা বিনতে আসাদ পুত্রস্নেহে রাসূল (সা.) কে লালন-পালন করেছেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং হিজরত করেছেন। ফাতিমা বিনতে আসাদ এর ইন্তিকাল বিষয়ে দুটি হাদীস এখানে উল্লেখ করা হলো-
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ لَمَّا مَاتَتْ فَاطِمَةُ بِنْتُ أَسَدِ بْنِ هَاشِمٍ أُمُّ عَلِيٍّ رضي الله عنهما دَخَلَ عَلَيْهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَجَلَسَ عِنْدَ رَأْسِهَا فَقَالَ رَحِمَكِ اللَّهُ يَا أُمِّي كُنْتِ أُمِّي بَعْدَ أُمِّي تَجُوعِينَ وتُشْبِعِينِي وتَعْرَيْنَ وتَكْسُونَنِي وتَمْنَعِينَ نَفْسَكِ طَيِّبَ الطَّعَامِ وتُطْعِمِينِي تُرِيدِينَ بِذَلِكَ وَجْهَ اللَّهِ وَالدَّارَ الآخِرَةَ. ثُمَّ دَعَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أُسَامَةَ بْنَ زَيْدٍ وَأَبَا أَيُّوبَ الأَنْصَارِيَّ وَعُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ وَغُلامًا أَسْوَدَ يَحْفِرُوا فَحَفَرُوا قَبْرَهَا فَلَمَّا بَلَغُوا اللَّحْدَ حَفَرَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِيَدِهِ وَأَخْرَجَ تُرَابَهُ بِيَدِهِ. فَلَمَّا فَرَغَ دَخَلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فاضْطَجَعَ فِيهِ وَقَالَ اللَّهُ الَّذِي يُحْيِي وَيُمِيتُ وَهُوَ حَيٌّ لا يَمُوتُ اغْفِرْ لأُمِّي فَاطِمَةَ بِنْتِ أَسَدٍ ولَقِّنْهَا حُجَّتَهَا وَوَسِّعْ عَلَيْهَا مُدْخَلَهَا بِحَقِّ نَبِيِّكَ وَالأَنْبِيَاءِ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِي فَإِنَّكَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ ثُمَّ كَبَّرَ عَلَيْهَا أَرْبَعًا ثُمَّ أدْخَلُوهَا الْقَبْرَ هُوَ وَالْعَبَّاسُ وَأَبُو بَكْرٍ الصِّدِّيقُ رضى الله عنهم. (رواه الطرانى فى الكبير والاوسط)
-আনাস বিন মালিক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত আলী (রা.) এর মাতা ফাতিমা বিনতে আসাদ যখন ইন্তিকাল করলেন তখন রাসূল (সা.) তাঁর শিয়রের পাশে বসলেন অতঃপর বললেন, আল্লাহ! তোমার উপর রহম করুন। আমার মায়ের পরে তুমিই ছিলে আমার মা। তুমি না খেয়ে, না পরে আমাকে খাইয়েছ, পরিয়েছ (তুমি না খেয়ে না পরে আমার খাওয়া পরায় যন্ত্রণা নিয়েছ), নিজেকে ভালো খাবার থেকে বঞ্চিত রেখেছ আর আমাকে পরিতৃপ্ত করেছ। এর দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখিরাতের সাওয়াব কামনা করেছ। অতঃপর উসামা বিন যায়দ, আবূ আইয়ূব আনসারী, উমর বিন খাত্তাব এবং একজন দাসকে কবর খনন করার আদেশ দিলেন। তারা কবর খনন করে যখন লাহাদ খোদাইয়ের পর্যায়ে পৌঁছলেন তখন রাসূল (সা.) নিজ হস্তে লাহাদ খোদাই করে মাটি বের করলেন। কবর শেষ করে নিজে কবরে শুইলেন এবং বললেন, তিনি আল্লাহ যিনি জীবিত করেন এবং মৃত্যুদান করেন, তিনি চিরঞ্জীব, তার মৃত্যু নেই, আমার মা ফাতিমা বিনতে আসাদকে ক্ষমা করুন, পূর্বেকার নবীগণের খাতিরে মাফ করে দিন, তাকে ঈমানের বাক্য শিখিয়ে দিন এবং তার কবরকে প্রশস্ত করে দিন। কেননা তুমি আরহামুর রাহিমীন। তারপর চার তাকবীরে জানাযা পড়লেন ও তিনি নিজে আব্বাস (রা.) ও আবূ বকর সিদ্দিক (রা.) কে নিয়ে ফাতিমা বিনতে আসাদের মৃতদেহ কবরে রাখলেন। (তাবারানী, মাজমাউয যাওয়াইদ, পৃষ্ঠা ২৫৯-২৬০)
অন্য বর্ণনায় আছে,
عن ابن عباس قال لما ماتت فاطمة أم علي ألبسها النبي قميصه واضطجع معها في قبرها فقالوا ما رأيناك يا رسول الله صنعت هذا فقال إنه لم يكن أحد بعد أبي طالب أبر بي منها إنما ألبستها قميصي لتكسى من حلل الجنة واضطجعت معها ليهون عليها(رواه الطرانى)
-হযরত আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ফাতিমা বিনতে আসাদ যখন ইন্তিকাল করলেন তখন রাসূল (সা.) তার জামা খুলে ফাতিমাকে পরিয়ে দেওয়ার জন্য দিলেন এবং তার কবরে শুইলেন। যখন কবরের মাটি বরাবর করা হলো, তখন সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমরা আপনাকে এমন কাজ করতে দেখলাম যা আপনি অন্য কারো জন্য করেননি। রাসূল (সা.) উত্তর দিলেন, আমি আমার জামা এজন্য পরিয়ে দিয়েছি যাতে তিনি জান্নাতের পোশাক পরিধান করেন। আর কবরে শয়ন করলাম যাতে তার কবরের চাপ সংকীর্ণ তথা হালকা হয়। আবূ তালিবের পর তিনিই সৃষ্টির মাঝে আমার সাথে সর্বোত্তম ব্যবহারকারিনী। (তাবারানী, মাজমাউয যাওয়াইদ, পৃষ্ঠা ২৬০)

হযরত আলী (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণ
প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী চারজনের মধ্যে হযরত আলী (রা.) একজন। আর প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী ছিলেন মহিলাদের মধ্যে হযরত খাদিজা (রা.), স্বাধীন পুরুষদের মধ্যে হযরত আবূ বকর (রা.), বালকদের মধ্যে হযরত আলী (রা.) ও মাওয়ালীর মধ্যে হযরত যায়িদ বিন হারিসা (রা.)।
কত বছর বয়সে হযরত আলী (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেছেন এ প্রসঙ্গে ইবনে কাসির বর্ণনা করেছেন, হযরত আলী (রা.) যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তার বয়স ছিল সাত বছর। কেউ বলেন আট বছর, কেউ বলেছেন দশ বছর, আবার কেউ বলেছেন ষোলো বছর। মুহাম্মদ বিন কাব আল কুরাযী বর্ণনা করেন, মহিলাদের মাঝে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছেন খাদিজা (রা.) এবং পুরুষদের মধ্যে আবূ বকর ও আলী (রা.)। কিন্তু আবূ বকর (রা.) ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি প্রকাশ করেছেন আর আলী (রা.) ইসলাম গ্রহণ গোপন রেখেছেন পিতার ভয়ে। অতঃপর আবূ তালিব আলীকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুসরণ ও সাহায্যের আদেশ দিয়েছেন। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া)
মাজমাউয যাওয়াইদ এর মধ্যে আছে,
عن ابن عباس رضي الله عنه قال دفع النبى صلى الله عليه وسلم الراية يوم بدر إلى علي وهو ابن عشرين سنة –
-ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বদর যুদ্ধের দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আলী (রা.) কে ঝা-া দিলেন তখন হযরত আলী (রা.)-এর বয়স ছিল বিশ বছর। (মাজমাউয যাওয়াইদ)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নুবুওয়াতের ১৩তম বছরের রবিউল আউয়াল মাসে হিজরত করেন। অর্থ্যাৎ তিনি নুবুওয়াতের পূর্ণ বার বছর মক্কায় অবস্থান করেছেন এবং ১৩তম বছরে হিজরত করেছেন। এদিকে হিজরতের দ্বিতীয় বছরের রামাদান মাসে বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয় অর্থাৎ হিজরতের পূর্ণ একবছর পর দ্বিতীয় বছরের রামাদান মাসে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এখানে আরো পূর্ণ একবছর পাওয়া গেল। নবুওয়াতের পূর্ণ বার বছর মক্কায় অবস্থান ও হিজরতের পূর্ণ এক বছর পর বদর যুদ্ধ হওয়ায় নবুওয়াতের পূর্ণ তেরো বছর পর বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। যেহেতু হযরত আলী (রা.) নবুওয়াতের একেবারে প্রারম্ভিক কালে প্রথম বছরে ইসলাম গ্রহণ করেছেন আর তখন তার বয়স ছিল সাত বছর, সেহেতু বদর যুদ্ধের সময় তাঁর বয়স ছিল পূর্ণ বিশ বছর।

বাল্য বয়সে দৃঢ় প্রত্যয়
নবুওয়াতের তৃতীয় বছরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আলী (রা.) কে আদেশ দিলেন দাওয়াতের ইন্তেজাম করার জন্য। আবদুুল মুত্তালিবের সমস্ত খান্দান দাওয়াতে আসলেন। খাওয়া দাওয়ার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আমি এমন একটি বিষয় নিয়ে এসেছি যাতে দ্বীন ও দুনিয়ার কল্যাণ নিহিত। আপনাদের মাঝে কে আমার সহযোগী হবেন? পুরো মজলিস নিরুত্তর। এমন সময় হযরত আলী (রা.) বলে উঠলেন, যদিও আমি সকলের মাঝে বয়সে ছোট, আমার পদদ্বয় দুর্বল, চোখ অসুস্থ তথাপি আমি আপনার সাথে থাকব।

হযরত আলী (রা.) আহলে বায়তের অন্তর্ভুক্ত
হাদীস শরীফে আছে,
عن سعد بن أبي وقاص رضي الله عنه قال لما نزلت هذه الآيةُ نَدْعُ أَبْناءَنا وَأَبْناءَكُمْ دعا رسولُ اللهِ صلّى اللهُ علَيهِ وسلَّمَ عليًّا وفاطمةَ وحسَنًا وحُسينًا، فقالَ: اللّٰهمَّ هؤلاءِ أَهل بيتي (رواه مسلم)
-হযরত সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন نَدْعُ أَبْناءَنا وَأَبْناءَكُمْ এ আয়াতটি নাযিল হয় তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আলী (রা.), ফাতিমা (রা.), হাসান (রা.) ও হোসাইন (রা.)কে ডেকে আনলেন এবং বললেন হে আল্লাহ! এরা আমার আহলে বায়ত। (সহীহ মুসলিম, ফাদ্বাইলুস সাহাবা, বাব: মিন ফাদ্বাইলি আলী ইবনে আবি তালিব)
অন্য হাদীসে আছে,
عن عائشة رضي الله عنها قالت خَرَجَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ غداة وعليه مِرْط مرَحَّل من شعر أسود فَجَاءَ الْحَسَنُ بْنُ عَلِيٍّ فَأَدْخَلَهُ ثُمَّ جَاءَ الْحُسَيْنُ فَدَخَلَ مَعَهُ ، ثُمَّ جَاءَتْ فَاطِمَةُ فَأَدْخَلَهَا ، ثُمَّ جَاءَ عَلِيٌّ فَأَدْخَلَهُ ، ثُمَّ قَالَ : إِنَّمَا يُرِيدُ اللهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا (رواه مسلم)

-হযরত আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন সকাল বেলা বের হলেন। আল্লাহর নবীর বদন মুবারকে কালো পশমী চাঁদর ছিল, যে চাঁদরে উটের গদির ছবি ছিল। তখন হাসান আসলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে চাঁদরে ডেকে নিলেন। তারপর হোসাইন আসলেন তিনিও চাঁদরের ভিতর ঢুকে গেলেন। অতঃপর ফাতিমা (রা.) আসলেন, তাকেও আল্লাহর নবী চাঁদরে বেষ্টন করলেন। তারপর আলী (রা.) এলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকেও চাঁদরে বেষ্টন করলেন। অতঃপর বললেন-
إِنَّمَا يُرِيدُ اللهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا-
-হে নবী পরিবারের সদস্যবর্গ! আল্লাহ কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূরে রাখতে এবং তোমাদেরকে পূর্ণরূপে পূত-পবিত্র রাখতে। (সহীহ মুসলিম, ফাদ্বাইলুস সাহাবা, বাবু ফাদ্বাইলি আহলি বাইতিন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)
অপর বর্ণনায় আছে,
عن ابن عمر قال قال رسول الله صلى الله عليه و سلم : الحسن والحسين سيدا شباب أهل الجنة وأبوهما خير منهما .
-হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হাসান ও হোসাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) বেহেশতি জোয়ানদের সরদার এবং তাদের পিতা তাঁদের চেয়ে উত্তম। (ইবনে মাজাহ, আবওয়াবু ফাদ্বাইলি আসহাবি রাসূলিল্লাহ, বাব: ফাদ্বলু আলী ইবনে আবি তালিব)

হযরত আলী (রা.) জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবী
হযরত আলী (রা.) জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত বিশেষ দশজন সাহাবী (আশারায়ে মুবাশশারাহ) এর একজন। হাদীস শরীফে আছে,
عن عبد الرحمن بن عوف قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم أبو بكر في الجنة وعمر في الجنة وعثمان في الجنة وعلي في الجنة وطلحة في الجنة والزبير في الجنة وعبد الرحمن بن عوف في الجنة وسعد في الجنة وسعيد في الجنة وأبو عبيدة بن الجراح في الجنة
-হযরত আবদুর রাহমান ইবনু আউফ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- আবূ বকর, উসমান, আলী, জুবায়ের, তালহা, আব্দুর রহমান বিন আউফ, সা’দ (ইবনে আবি ওয়াক্কাস), সাঈদ (ইবনে যায়দ) এবং আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুম জান্নাতী। (তিরমিযী, কিতাবুল মানাকিব, বাব: মানাকিবু আব্দির রাহমান ইবনে আউফ)

হযরত আলী (রা.)-এর ফয়সালা
হাদীস শরীফে আছে-
عن أنس بن مالك أن رسول الله صلى الله عليه و سلم قال أرحم أمتي بأمتي أبو بكر وأشدُّهم في دين الله عمر وأصدقهم حياء عثمان وأقضاهم علي بن أبي طالب (الخ)
-হযরত আনাস ইবনে মালিক থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আমার উম্মতের মধ্যে উম্মতের প্রতি সর্বাধিক দয়াশীল আবূ বকর, দ্বীনের ব্যাপারে সবচেয়ে কঠোর উমর, সর্বাধিক লজ্জাশীল উসমান ও সর্বোত্তম ফয়সালাকারী আলী ইবনে আবি তালিব। (ইবনে মাজাহ, আবওয়াবু ফাদ্বাইলি আসহাবি রাসূলিল্লাহ, বাব: ফাদ্বাইলু খাব্বাব রা.)
ইমাম বাগাভী (র.) বর্ণনা করেন,
عن انس رضي الله عنه عن النبى صلى الله عليه وسلم انه قال اقضي امتي علي-
-হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার উম্মাতের মধ্যে আলী সর্বোত্তম কাযী (ফায়সালাকারী)। (শরহুস সুন্নাহ; ফতহুল বারী)
অন্য বর্ণনায় আছে,
عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ قَالَ عُمَرُ عَلِيٌّ أَقْضَانَا وَأُبَيٌّ أَقْرَؤُنَا
-হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত উমর (রা.) বলেছেন, আমাদের মধ্যে আলী সর্বোত্তম ফায়সালাকারী এবং উবাই ইবনু কা’ব সর্বোত্তম কারী। (সহীহ বুখারী, কিতাবুত তাফসীর, সূরা বাকারা, বাবু কাওলিহি মা নানসাখু মিন আয়াতিহি)
অপর বর্ণনায় আছে,
عن على رضي الله عنه قال بعثني رسول الله صلى الله عليه و سلم إلى اليمن وأنا حديث السن قال قلت تبعثني إلى قوم يكون بينهم أحداث ولا علم لي بالقضاء قال ان الله سيهدى لسانك ويثبت قلبك
-হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে কাযী হিসেবে ইয়ামনে পাঠালেন। তখন আমার বয়স কম। আলী (রা.) বলেন, আমি আরজ করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি আমাকে এমন কওমের কাছে পাঠাচ্ছেন যাদের মাঝে নতুন বিষয়াদী দেখা দিবে, যা ফয়সালা করার মতো জ্ঞান আমার নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ পাক তোমার রসনাকে সঠিকভাবে পরিচালনা করবেন এবং তোমার কলবকে (হকের উপর) স্থির রাখবেন। (আবূ দাউদ, কিতাবুল আকদ্বিয়াহ, বাব: কাইফাল কাদ্বা)

হযরত আলী (রা.) ও একটি জটিল বিচার
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলীকে ইয়ামনে পাঠালেন। তিনি সেখানে গেলে একটি বিচার তার কাছে আসল। বিষয়টি হলো এই: চারজন লোক কূপে পতিত হয়ে এক সিংহের আক্রমণে নিহত হয়। এটি ছিল এমন একটি কূপ, যা সিংহ শিকারের জন্য খোদাই করা হয়েছে। প্রথম যে লোকটি পতিত হয় সে পতিত হওয়াকালে আরো একজনকে ঝাপটে ধরে এবং দ্বিতীয় ব্যক্তি আরো একজনকে ঝাপটে ধরে এভাবে তৃতীয় ব্যক্তি আরো একজনকে ঝাপটে ধরে এবং চারজনই সিংহের কূপে পড়ে যায়। গর্তের মধ্যে সিংহের আক্রমণে সকলেই নিহত হয়। নিহত চারজনের ওয়ারিশগণ কূপ খননকারীদের সাথে এ নিয়ে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়। এমনকি রক্তারক্তি কা- হওয়ার উপক্রম হয়। এমতাবস্থায় হযরত আলী (রা.) বললেন, আমি তোমাদের মাঝে বিচার করে দেব। যদি তোমরা রাজি হও তবে এটিই হবে ফয়সালা। আর যদি অসম্মত হও তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে যাবে, তিনিই তোমাদের ফয়সালা করে দিবেন। তোমরা কূপখননকারী গোত্রকে ডাক। এ বিষয়ে ফয়সালা হলো, পূর্ণ এক দিয়াতের চর্তুথাংশ, তৃতীয়াংশ, অর্ধাংশ এবং পূর্ণ একটি দিয়াত (রক্তপণ)। প্রথম যে ব্যক্তি পতিত হয়েছে তার জন্য এক দিয়াতের চর্তুথাংশ দিতে হবে। কেননা সে তার উপরের ব্যক্তিত্রয়কে হালাক করেছে। দ্বিতীয় ব্যক্তির জন্য এক দিয়াতের তৃতীয়াংশ কারণ সে তার উপরের ব্যক্তিদ্বয়কে হালাক করেছে, তৃতীয় ব্যক্তির জন্য এক দিরহামের অর্ধাংশ, কারণ সে তার উপরের ব্যক্তিটিকে ধ্বংস করেছে। আর চতুর্থ ব্যক্তির জন্য পূর্ণ একটি দিয়াত দিতে হবে। নিহত ব্যক্তিদের ওয়ারিশগণকে কূপ খননকারী উল্লেখিত হারে রক্তপণ দিবে। লোকেরা এ ফয়সালা মানতে রাজী হলো না। ফয়সালার জন্য তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে ঘটনা বর্ণনা করল। আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি ফায়সালা করে দেব। এমন সময় আগত দলের একব্যক্তি বলে উঠল যে, হযরত আলী এর ফয়সালা করেছেন এবং বিষয়টি সে খুলে বলল। আল্লাহর নবী তখন হযরত আলীর ফয়সালাটি অনুমোদন করলেন। (ইযালাতুল খিফা)

হযরত আলী ও হামদান গোত্র
বর্ণিত আছে যে, মক্কা বিজয়ের পর আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন গোত্র ইসলাম কবূল করল। যারা এখনও ইসলাম গ্রহণ করেনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের প্রতি ইসলামের দাওয়াতকারী প্রেরণ করলেন। হযরত আলী (রা.) কে ইয়ামনে হামদান গোত্রের কাছে পাঠালেন। হযরত বারা বিন আযিব হযরত আলীর সাথে ছিলেন। তিনি বললেন, আমরা ইয়ামনে পৌঁছলে হামদান গোত্রের লোকেরা জামায়েত হল। হযরত আলী আমাদের নিয়ে নামায আদায় করলেন। আমাদের নামায শেষ হলে লোকেরা কাতারবন্দি হয়ে আমাদের সম্মুখে হাজির হলো। হযরত আলী (রা.) হামদ ও সানার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পত্র তাদের সম্মুখে পাঠ করলেন। অতঃপর হামদান গোত্রের সকল মানুষ একদিনের মধ্যে ইসলাম গ্রহণ করল। হযরত আলী (রা.) পত্রযোগে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বিষয়টি অবগত করলেন। পত্র পাঠের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিজদায় পতিত হলেন এবং বললেন আসসালামু আ’লা হামদান, আসসলামু আ’লা হামদান অর্থাৎ হামদান গোত্রের উপর শান্তি বর্ষিত হোক, হামদান গোত্রের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। (যাদুল মাআদ)

বিচার-ফয়সালার আরেকটি নজীর
বর্ণিত আছে, একদা দুইজন লোক একত্রে খেতে বসল। তাদের একজনের কাছে তিনখানা রুটি, অন্যজনের পাঁচখানা রুটি। এমন সময় তারা এক ব্যক্তিকে তাদের কাছ দিয়ে যেতে দেখে তাদের সাথে খাবার জন্য আহবান করল। লোকটি আহবানে সাড়া দিয়ে তাদের সাথে খেতে বসল। তারা তিনজন সমপরিমাণ খাদ্য গ্রহণ করল। খাবার পরে আগন্তুক ব্যক্তি আটটি দিরহাম উভয়ের সামনে রেখে বলল, আমি যে তোমাদের সাথে খেয়েছি এর বদলে এই আটটি দিরহাম তেমরা গ্রহণ কর। তারপর সে চলে গেল। এখন এ দিরহামের বণ্টন নিয়ে উভয়ের মাঝে বিতর্ক দেখা দিল। পাঁচ রুটির মালিক বলল যেহেতু আমার রুটি পাঁচখানা তাই পাঁচ দিরহাম আমার প্রাপ্য। আর তোমার রুটি তিনটি তাই তুমি তিন দিরহাম গ্রহণ কর। এতে তিন রুটি ওয়ালা রাজি হলো না।
বিষয়টি ফায়সালার জন্য তারা হযরত আলী (রা.) এর খেদমতে হাজির হলো। হযরত আলী (রা.) তিন রুটির মালিককে বললেন, তুমি তিন দিরহামই নিয়ে নাও। কারণ দলীল ভিত্তিক ফায়সালা করলে তুমি পাবে মাত্র এক দিরহাম। লোকটি বলল, আমিরুল মুমিনীন বিষয়টি আমাকে বুঝিয়ে দিলে দলীল ভিত্তিক ফায়সালায় আমি রাজী হয়ে যাব। তখন হযরত আলী (রা.) তাকে বললেন, তোমার সাথীর পাঁচখানা ও তোমার তিনখানা মোট আটখানা রুটি ছিল। প্রত্যেক রুটি যদি তিনভাগে ভাগ করা হয় তবে চব্বিশ অংশ হবে। তোমরা প্রত্যেকে সমানভাগে খাদ্য গ্রহণ করেছ তাই প্রত্যেকে আট অংশ খেয়েছে। তোমার তিনখানা রুটিতে ছিল নয় অংশ তুমি নিজে আট অংশ খেয়ে ফেলেছ। বাকি রয়েছে মাত্র একটি অংশ। সুতরাং তুমি পাবে এক দিরহাম। তোমার সাথীর রুটি ছিল পাচঁখানা। পাঁচখানা রুটিতে পনের অংশ। সে নিজে খেয়েছে আট অংশ, বাকি রয়েছে সাত অংশ তাই তার প্রাপ্য সাত দিরহাম। (ইযালাতুল খিফা)

হিজরতের রাতে হযরত আলী (রা.)
হিজরতের রাতে হযরত আলী (রা.) কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ বিছানায় শয়ন করার নির্দেশ দেন। হযরত আলী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিছানায় শয়ন করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে রাখা লোকদের আমানত ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কর্জ আদায় করে তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে গিয়ে মিলিত হওয়ার জন্য তিনি আলীকে নির্দেশ দেন। হযরত আলী (রা.) যথানির্দেশ কাজ করেন। অতঃপর হিজরত করেন। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড)

হযরত আলী (রা.) এর হিজরত
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হিজরতের পর হযরত আলী (রা.) তিনদিন মক্কায় অবস্থান করেন এবং মানুষের আমানতসমূহ যথাযথভাবে আদায় করে মদীনার পথে হিজরত করেন। হযরত আলীর কোনো বাহন ছিল না। তিনি পায়ে হেঁটে অতি কষ্টে হিজরত করেছিলেন। মরু কংকরময় পথ, দুর্গম পাথুরে পাহাড় অতিক্রম করে হযরত আলী (রা.) মদীনায় উপস্থিত হন। বাহন ছাড়া কারো পক্ষে অগ্নিঝরা তাপে দিবাভাগে পথ চলা বড়ই কঠিন ছিল। হযরত আলী (রা.) দিনে পথ চলা বন্ধ রাখতেন, রাত্রে পায়ে হেঁটে চলতেন। শেষ পর্যন্ত অতি কষ্টে প্রিয়নবীর খিদমতে উপস্থিত হলেন। তখন তাঁর পদদ্বয় ফুলে গিয়েছিল ও রক্ত ঝরছিল। আল্লাহর নবী হযরত আলী (রা.) এর দুরাবস্থা দেখে তাকে জড়িয়ে ধরলেন, কাঁদলেন। তারপর মুখ মুবারকে হাত দিয়ে হযরত আলীর জখমে থুথু লাগিয়ে দিলে আলী (রা.) সুস্থ হয়ে উঠলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সময় কুলসুম বিন হিদামের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন।

বদর যুদ্ধে হযরত আলী (রা.)
বদর যুদ্ধের প্রারম্ভে কাফির দল থেকে উতবা বিন রবিআ, শায়বা বিন রবিআ ও ওলীদ বিন উতবা বের হয়ে উভয় কাতারের মাঝখানে এসে তাদের মল্লযুদ্ধের প্রতিদ্বন্ধী আহ্বান করল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নির্দেশে হযরত আলী (রা.), হামযা (রা.) ও উবায়দা বিন হারিস (রা.) তাদের মুকাবিলার জন্য বের হলেন। তাঁরা তিনজন যথাক্রমে ওলীদ, শায়বা ও উতবার মুকাবিলা করলেন। কাফির দলের তিনজনই নিহত হলো। (প্রাগুক্ত)
হযরত আলী (রা.) ও হামযা (রা.) অক্ষত ফিরে আসলেও উবায়দা (রা.) গুরুতরভাবে আহত হলেন। যুদ্ধ শেষে ফেরার পথে ‘সাফরা’ নামক স্থানে উবায়দা (রা.) আহত অবস্থায় ইন্তিকাল করেন। উবায়দা বিন হারিস রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কদম মুবারকের উপর নিজের গাল রেখে ইন্তিকাল করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি তুমি নিশ্চয়ই শহীদ। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭৪)
আল্লাহ তাআলা বলেন, هٰذَانِ خَصْمَانِ اخْتَصَمُوا فِي رَبِّهِمْ (এরা দুটি বিবাদমান পক্ষ, তারা তাদের প্রতিপালক সম্বন্ধে বিতর্ক করে)। উল্লেখিত আয়াতে যে দুটি বিবাদমান পক্ষের কথা বলা হয়েছে তাদের মধ্যে হযরত আলী, হামযা ও উবায়দা এক পক্ষ, যারা মুমিন। আর উতবা, শায়বা ও ওলীদ অন্য পক্ষ, যারা কাফির।

 

উহুদ যুদ্ধে হযরত আলী (রা.)
উহুদ যুদ্ধে হযরত আলী (রা.) কাফিরদের বিরুদ্ধে অতিশয় বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন ও বহু সংখ্যক কাফিরকে হত্যা করেন। উহুদ যুদ্ধে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাফিরদের হাতে আহত হলে হযরত আলী তাঁর চেহারা মুবারক থেকে রক্ত ধুয়ে দেন। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৪)
উহুদ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর ডান বাহুর নেতৃত্বে ছিলেন হযরত আলী (রা.)। প্রথমে তাঁর হাতে ঝান্ডা ছিল। তারপর যায় মুসআব বিন উমাইর (রা.) এর হাতে। বাম বাহুর নেতৃত্বে মুনযির বিন আমর আনসারী ও মধ্যভাগের নেতৃত্বে ছিলেন হযরত হামযা (রা.)। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড)

 

খন্দক যুদ্ধে হযরত আলী (রা.)
খন্দক যুদ্ধের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালা পর্বতকে পিছনে রেখে সম্মুখভাগে মুসলিম সেনাদের জন্য প্রয়োজনীয় ময়দান রেখে এ ময়দানকে পরিখার দ্বারা সুরক্ষিত করেন, এজন্য এই যুদ্ধকে খন্দক যুদ্ধ বলা হয়। এ যুদ্ধে মক্কার কাফির দল ছাড়াও আরবের আরো অনেক কাফির দল অংশগ্রহণ করে। এজন্য এ যুদ্ধের আরেক নাম আহযাব। কাফির বাহিনীর সম্মিলিত সংখ্যা ছিল প্রায় দশ হাজার। মুসলমান মাত্র তিন হাজার। পরিখা খনন শেষ হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন হাজার মুহাজির ও আনসারসহ সালা পর্বতের পাদদেশে পরিখা বেষ্টনীর ভিতরে অবস্থান নিলেন। সম্মিলিত কাফির দল পরিখার বাইরে ছাউনি ফেলল। উভয় দলের মাঝখানে পরিখা থাকায় সম্মুখযুদ্ধ সম্ভব ছিল না। তবে উভয় পক্ষে তীর বিনিময় হতো। এক মাসের কিছু কম সময় এ অবরোধ স্থায়ী ছিল। মুসলমানগণ ইতিপূর্বে এত বড় বিপদের সম্মুখীন হননি। কাফিরদের চেষ্টা ছিল কীভাবে খন্দক পার হওয়া যায়। একদিন আমর বিন আবদে ওদ্দ নামক এক ব্যক্তি, যে আরবের বিখ্যাত বীর ও পাহলোয়ান ছিল, ইকরামা বিন আবি জাহল, হুবায়রা বিন আবি ওয়াহাব ও দুরাব বিন খাত্তাব বনি কেনানার কিছু যোদ্ধাসহ খন্দকের কাছে আসল। সবদিক ঘুরে দেখল। এক জায়গায় খন্দক অপেক্ষাকৃত অপ্রশস্ত দেখে পার হয়ে গেল এবং সালা পর্বত ও খন্দকের মাঝখানের ময়দানে পৌঁছে মল্লযুদ্ধের আহ্বান জানাল। মুসলিম দল থেকে হযরত আলী (রা.) এবং আরো কয়েকজন মুকাবিলায় অগ্রসর হলেন। হযরত আলী (রা.) আমর বিন আবদে ওদ্দকে কতল করে ফেললেন। ফলে তাঁর হাতে আরবের কাফির দলের বিখ্যাত বীর নিহত হলো। অন্যরা পলায়ন করল। (আসাহ্হুস সিয়ার, পৃষ্ঠা: ১৪৭-১৪৮)

 

বায়আতে রিদওয়ান ও হযরত আলী (রা.)
ছয় হিজরী জিলকদ মাসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমরার নিয়তে পবিত্র মক্কার দিকে রওয়ানা হন। প্রথমে যুল হুলায়ফা নামক স্থানে পৌঁছেন। এ সময় মক্কা নগরী কাফিরদের দখলে ছিল। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কাবাসীর মনোভাব জানার জন্য যুল হুলায়ফা থেকে বিশর বিন সুফিয়ান নামে এক ব্যক্তিকে মক্কায় পাঠান। পথিমধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উসফান নামক স্থানে পৌঁছলে বিশর বিন সুফিয়ান মক্কার খবর নিয়ে আসলেন। তিনি বললেন, আমি কুরাইশদেরকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে দেখেছি। তারা আপনাকে মক্কায় প্রবেশ করতে দিবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণসহ সফর অব্যাহত রাখলেন। তারপর মক্কার অনতিদূরে হুদায়বিয়া নামক স্থানে পৌঁছলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু উমরার জন্য মক্কার পথে রওয়ানা হয়েছেন, যুদ্ধের কোনো ইচ্ছাই ছিল না। তাই হযরত উসমান (রা.) কে কুরাইশদের কাছে এই সংবাদসহ পাঠালেন যে, আমরা উমরার নিয়তে এসেছি, যুদ্ধের জন্য নয়। হযরত উসমান মক্কায় পৌঁছলেন। ইত্যবসরে মুসলিম শিবিরে হযরত উসমানের হত্যার খবর রটে গেল। তখন আল্লাহর নবী একটি গাছের নিচে বসেছিলেন। সাহাবীগণ গাছের নিচে জমা হতে আরম্ভ করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কিরামের নিকট থেকে বায়আত (শপথ) গ্রহণ করলেন এই মর্মে যে, যদি যুদ্ধ বেঁধে যায় তাহলে কেউ যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করবেনা। এই বায়আতকে ‘বায়আতে রিদওয়ান’ বলা হয়। হযরত আলী (রা.) বায়আতে রিদওয়ানে শরীক ছিলেন। এই বায়আতে যে সকল সাহাবী অংশগ্রহণ করেন তাদের জন্য আল্লাহ তাঁর সন্তুষ্টির ঘোষণা দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَقَدْ رَضِيَ اللهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ
-আল্লাহ মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন, যখন তারা বৃক্ষের নিচে আপনার কাছে শপথ করল।

 

হুদায়বিয়ার সন্ধি ও হযরত আলী (রা.)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুদায়বিয়ায় অবস্থান করছেন এ সময় কুরাইশদের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি হিসেবে বুদাইল বিন ওরকা কয়েকজন সঙ্গীসহ সেখানে আসলেন। আলাপ আলোচনার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি কুরাইশরা চায় তবে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সন্ধি করে যুদ্ধ বন্ধ করতে পারে। বুদাইল বিন ওরকা কুরাইশদের কাছে গিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী পৌঁছে দিলেন। তারপর উরওয়া বিন মাসউদ আসলেন। তারপর হুলাইস নামের একজন। উভয় প্রতিনিধি দীর্ঘ আলাপ আলোচনার পর কুরাইশদের কাছে ফিরে গেলেন। সব শেষে সুহাইল বিন আমর প্রতিনিধি হিসেবে আসলেন। এবারে সন্ধির আলোচনা শুরু হলো। এ সন্ধির কিছু কিছু শর্ত বাহ্যত মুসলিম দলের জন্য প্রতিকূল মনে হলেও সকল শর্তই মুসলমানদের জন্য সূদুরপ্রসারী সুফল বয়ে এনেছিল। প্রথমে সন্ধির শর্তাবলি মৌখিকভাবে স্থিরকৃত হয়। তারপর সন্ধি লেখার সময় এলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আলী (রা.) কে সন্ধি লিখার নির্দেশ দিলেন।

হুদায়বিয়ার ঐতিহাসিক সন্ধিপত্রটি হযরত আলীর হাতে লিপিবদ্ধ হয়। সন্ধিপত্র লেখা হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পক্ষে শীর্ষস্থানীয় যেসকল সাহাবা স্বাক্ষর করেন এর মাঝে আলী (রা.) একজন। ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় স্বাক্ষরকারীগণের নাম- হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা.), হযরত উমর বিন খাত্তাব (রা.), হযরত আব্দুর রহমান বিন আউফ (রা.), হযরত আলী বিন আবি তালিব (রা.), হযরত সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.), হযরত মাহমুদ বিন মাসলামা (রা.), কুরাইশদের পক্ষে মাকরাবা বিন হাফস, আবদুল্লাহ বিন সুহাইল বিন আমর।

হযরত আলী (রা.) এর ভাই-বোন
হযরত আলী (রা.) এর তিনজন ভ্রাতা ছিলেন। ১. তালিব ২. আকিল ৩. জাফর। তিনজনই বয়সে হযরত আলীর বড়। প্রতি দুই ভাইয়ের মাঝে দশ বছর বয়সের পার্থক্য ছিল। আর দুজন বোন ছিলেন। উম্মে হানী ও জুমানা। হযরত আলীসহ উল্লিখিত সকল ভাই বোনের মাতা ছিলেন ফাতিমা বিনতে আসাদ। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২২৩)

 

হযরত আলীর ভাই বোনের সংক্ষিপ্ত পরিচয়
তালিব বিন আবি তালিব
তালিব হারিয়ে গিয়েছিলেন তার খোঁজ পাওয়া যায় নি। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে ভালোবাসতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রশংসাসূচক কবিতাও বলেছেন। বদর যুদ্ধের সময় কুরাইশদের সাথে অনিচ্ছায় বের হয়েছিলেন। কুরাইশরা বলল হে বনী হাসিম! আমরা জানি যদিও তোমরা আমাদের সাথে বের হয়েছ কিন্তু তোমাদের অন্তর মুহাম্মদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে। একথা শুনে তালিব মক্কার দিকে ফিরে গেলেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রশংসায় কিছু কবিতা বলে গেলেন। তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

আকিল বিন আবি তালিব
তাঁর কুনিয়াত আবূ ইয়াযিম। তাঁর ইসলাম গ্রহণ ফতহে মক্কার বিজয়ের বছর। কেউ কেউ বলেছেন হুদায়বিয়ার পর ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং ৮ম হিজরীর প্রারম্ভে হিজরত করেছেন। বদর যুদ্ধে তিনি মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়েছিলেন। তখন হযরত আব্বাস (রা.) মুক্তিপণ দিয়ে তাকে মুক্ত করেছেন। তিনি মুতার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন তবে মক্কা বিজয়ে ও হুনায়নের যুদ্ধে অংশগ্রহণের কথা জানা যায় নি। কারণ তিনি তখন অসুস্থ ছিলেন।
আমীর মুআবিয়ার সময়ে তিনি ইন্তিকাল করেছেন। অন্য বর্ণনায়, ইয়াযিদের রাজত্বকালে হাররার ঘটনার পূর্বে ছিয়ানব্বই বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন। (ইসাবা, ২য় খ-, পৃষ্ঠা ৪৯৪)

জা’ফর বিন আবি তালিব
ইসলামের প্রাথমিক সময়ে ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে হযরত জা’ফর একজন। তিনি মিসকিনদের খুবই ভালোবাসতেন। তিনি তাদের খিদমত করতেন এবং তাদের সাথে উঠাবসা করতেন। নাজ্জাশী ও তাঁর অনুসারীগণ হযরত জা’ফর (রা.) এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি মুতার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং শাহাদাত বরণ করেন।

উম্মে হানি বিনতে আবি তালিব
উম্মে হানির নাম ফাখতা। তবে কেউ ফাতিম, কেউ হিন্দ বলেছেন। ফাখতা নামটিই প্রসিদ্ধ। তাঁর স্বামী হুরায়রা বিন আমর। মক্কা বিজয়ের সময় উম্মে হানী বনী মাখজুম গোত্রের দু’জন লোককে নিরাপত্তা দিয়েছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, উম্মে হানী যাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন আমিও তাকে নিরাপত্তা দিলাম। উম্মে হানী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। হযরত আলীর পরেও তিনি জীবিত ছিলেন।

জুমানা বিনতে আবি তালিব
তিনি আবদুল্লাহ বিন আবি সুফিয়ানের মাতা। আবূ সুফিয়ানের এক পুত্রের নাম জা’ফর।

খায়বার বিজয়ে হযরত আলী (রা.)
সফরের এমন একটি স্থলে যেখানে ইয়াহুদীর অনেকগুলি দূর্গ ছিল। এখানে বিস্তর কৃষি ভূমি ও বাগান ছিল। খায়বারের ইয়াহুদীগণ বড়ই ধনী ছিল। তারা ব্যবসা বাণিজ্য করত, কৃষি কাজও করত। ইসলামের বড় বড় শত্রুরা এখানে জামায়েত হয়েছিল। ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের এক কেন্দ্র হিসেবে খায়বারকে গণ্য করা হত। এখানে আটটি দূর্গ ছিল। ১. নাতাত ২. শক ৩. নাঈম ৪. কুতাইবা ৫. আলওয়াতিহ ৬. সুলালিম ৭. কামুছ ৮. সা’ব। এসকল দূর্গের মধ্যে কামুছ দূর্গ ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও দুর্ভেদ্য। এ দূর্গ বিজয়ের মাধ্যমে আসলে সমগ্র খায়বার বিজয় হয়েছিল। কারণ কামুছ দূর্গের পতনের পর খায়বারের ইয়াহুদীগণ আর জামায়েত হয়ে কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সমর্থ হয় নি। এ দূর্গটি হযরত আলী জয় করেছিলেন। তাই হযরত আলীকে (রা.) খায়বার বিজয়ী বলা হয়।
খায়বার যুদ্ধের সময় হযরত আলীর ঢাল পড়ে গিয়েছিল। এক ইয়াহুদী ঢাল নিয়ে পলায়ন করল। এমন সময় হযরত আলী দূর্গের একখানা দরজা উপরে তুললেন এবং ইহাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করলেন। যুদ্ধ শেষে হযরত আলী ইহা ফেলে দিলেন। তখন ৮জন শক্তিশালী মানুষের পক্ষে ইহার পার্শ্ব পরিবর্তন সম্ভব হয়নি। (বেদায়া ৭ম খ-, পৃষ্ঠা ২২৫)

কামুছ দূর্গ অবরোধের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মাথায় ব্যথা হওয়ার কারণে নিজে যুদ্ধের মাঠে যেতে পারেন নি। তাই কোনো আনসার অথবা মুহাজিরকে সেনাপতি হিসেবে পাঠাতেন। এ দূর্গটি সবচেয়ে বেশি দুর্ভেদ্য ছিল বিধায় অবরোধও দীর্ঘ হয়েছিল এবং বিজয় হচ্ছিল না। একদিন হযরত আবূ বকর (রা.) গেলেন, অনেক চেষ্টার পরও বিজয় হয় নি। দ্বিতীয় দিন হযরত উমর চেষ্টা করলেন, বিজয় হলো না। অনেক চেষ্টার পরও যখন বিজয় হয় নি। তখন একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আগামীকাল আমি এমন একজন ব্যক্তিকে ঝান্ডা দান করব যাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভালোবাসেন এবং তিনি নিজেও আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসেন। আল্লাহ পাক তাঁর হাতে বিজয় করিয়ে দেবেন। প্রতিজন মুসলিম আশা করতে থাকলেন তিনি যেন সে ব্যক্তি হন। হযরত উমর (রা.) বলেন, আমি কোনোদিন কোনো নেতৃত্বের আকাক্সক্ষা করি নি তবে ঐদিন আশা করেছিলাম। এটা এজন্য যে, আমি যেন তাদের অন্তর্ভুক্ত হই, যাদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভালোবাসেন।

প্রভাতে সকলে অপেক্ষা করতে লাগলেন যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কার নাম ঘোষণা করবেন ঝান্ডা দান করার জন্য। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন আলী কোথায়? হযরত আলী হাযির হলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলীর হাতে ঝান্ডা দিয়ে বললেন, তুমি যাও, যাতে আল্লাহ তোমাকে বিজয় দান করেন। এভাবে হযরত আলীর হাতে খায়বার বিজিত হয়।

বর্ণিত আছে এদিন হযরত আলীর চোখ রোগাক্রান্ত ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের থুথু মুবারক হযরত আলীর চোখে লাগিয়ে দিলে আলীর চোখের অসুখ সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায়। (বেদায়া ৭ম খ-, পৃষ্ঠা ২২৫)

তাবুক যুদ্ধের সময় হযরত আলীকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহলে বায়তের দেখাশুনার জন্য রেখে যান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রওয়ানা হওয়ার পর মুনাফিকরা আলোচনা করতে লাগল যে, আলীর উপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসন্তুষ্ট তাই রেখে গেছেন। একথা শুনে হযরত আলী হাতিয়ারপত্র সাথে নিয়ে রওয়ানা হয়ে গেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন জুরফ নামক স্থানে অবস্থান করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে সাক্ষাত করে হযরত আলী আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! মুনাফিকরা এভাবে বলছে। আপনি কি আমাকে মদীনায় এজন্য ছেড়ে এসেছেন? আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মুনাফিকরা মিথ্যা বলেছে। আমি তোমাকে এজন্য রেখে এসেছি যাতে আমি যাদেরকে ছেড়ে এসেছি তাদের দেখাশুনা করবে। তুমি যাও আমার আহল ও তোমার আহলে আমার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে থাক। হে আলী! তুমি কি রাজী নও যে তুমি আমার জন্য এমন হবে যেমন মূসার জন্য হারুন ছিলেন? (তবে) নিশ্চয় আমার পরে কোনো নবী নাই।
মোটকথা হযরত আলী তখন মদীনায় ফিরে গেলেন। (আসহুস সিয়ার, পৃষ্ঠা ৩২২)

বিদায় হজ্জের সময় হযরত আলী (রা.)
বিদায় হজ্জের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে তেষট্টিটি উট কুরবানী করলেন। তারপর আলীকে (রা.) আদেশ দিলেন একশত পূর্ণ হতে বাকি যেগুলো আছে কুরবানী করার জন্য। হযরত আলী বাকিগুলো কুরবানী করলেন। আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আলীকে আরো নির্দেশ দিলেন গোশত, চামড়া এবং পশুর প্রাসঙ্গিক বস্তুসমূহ সদকা করে দাও এবং গোশত কাটার এবং চামড়া ছিলানো কোনো মজুরী কুরবানীর পশু থেকে দেওয়া যাবে না। অন্য বর্ণনায় আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাকি সাতটি কুরবানী করেছেন তারপর বাকিগুলো তেষট্টি পূর্ণ করার সময় হযরত আলী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সহযোগিতা করেছেন। তারপর একশত পূর্ণ হতে বাকি যা ছিল হযরত আলী একাকি কুরবানী করেছেন। বিদায় হজ্জের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে নির্দেশ দিতেন আলী (রা.) তা মানুষকে ঘোষণা করে শুনাতেন। আমর বিন সালিম তাঁর মাতা থেকে বর্ণনা করেছেন, এ মহিলা বলেন, আমরা মিনায় ছিলাম তখন আলী (রা.) ঘোষণা করলেন যে আল্লাহর নবী বলেছেন, এই দিনগুলো পানাহারের দিন সুতরাং এদিনে কেউ রোযা রাখবে না।

 

বিভিন্ন যুদ্ধ ও অভিযানে হযরত আলী (রা.)
হযরত আলী (রা.) উমরাতুল কাযায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে ছিলেন। ৬ষ্ঠ হিজরী সনে হুদায়বিয়ার সন্ধি হয়। এ সন্ধির একটি শর্ত ছিল যে, মুসলমানগণ এ বছর ফিরে যাবেন এবং পরবর্তী বছর মক্কায় আসবেন তিন দিন অবস্থান করবেন। এ সময় প্রত্যেকে তরবারি খাপে বন্ধ রাখতে হবে। সে মুতাবিক পরবর্তী বছর ৭ম হিজরীর জুলকায়দা মাসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমরার নিয়তে মক্কায় আগমন করেন এবং উমরা আদায় করেন। এটাকে উমরাতুল কাযা বলা হয়। এ উমরার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কা থেকে রওয়ানা হওয়ার উদ্যোগ নিলেন তখন হযরত হামযা (রা.) এর মেয়ে (যার বয়স তখন কম) বের হয়ে আসলেন এবং ‘ইয়া আম্মি’ ‘ইয়া আম্মি’ বলে চিৎকার করতে লাগলেন। হযরত আলী (রা.) তাঁকে সঙ্গে নিয়ে হযরত ফাতিমার কাছে আসলেন। ফাতিমা তাঁকে নিজ বাহনে উঠিয়ে নিলেন। তারপর এ মেয়ের অভিভাবকত্ব নিয়ে হযরত আলী (রা.), জাফর (রা.) এবং যায়দ বিন হারিসার মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিল। হযরত আলী (রা.) বললেন, এ মেয়ে আমার চাচাতো বোন এবং আমিই তাঁকে প্রথমে এনেছি। হযরত জাফর বললেন, আমার চাচাতো বোন এবং এর খালা আমার কাছে আছেন। হযরত যায়দ (রা.) বললেন, আমার ভাইয়ের মেয়ে। হযরত যায়দ (রা.) ভাইয়ের মেয়ে বলার কারণ হিজরতের পূর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় সাহাবায়ে কিরামকে একে অন্যের সাথে ভাই করে দিয়েছিলেন। তখন হযরত হামযা (রা.) এর ভাই হয়েছেন হযরত যায়দ (রা.)। শেষ পর্যন্ত হযরত হামযা (রা.) এর মেয়েকে তাঁর খালা হযরত আসমা বিনতে উমাইসের কাছে দিয়ে দিলেন এবং বললেন, খালা মায়ের সমতুল্য। এদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আলী (রা.) কে বলেছিলেন, انت منى وانا منك -তুমি আমার এবং আমি তোমার (আপনজন।)
হযরত আলী মক্কা বিজয়ে, হুনায়নের যুদ্ধে ও তায়েফের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন এবং অসাধারণ বীরত্ব প্রদর্শন করেছেন। উমরা জিরানায় হযরত আলী (রা.) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে ছিলেন। (বিদায়া, ৭ম খ-, পৃষ্ঠা ২২৫)

পবিত্র মক্কা থেকে এক মানযিল দূরে অবস্থিত একটি স্থান জিরানা। ইহা হিল্ল এ অবস্থিত। তায়েফের দিক থেকে আগত লোকেরা এখানে ইহরাম করেন। হাওয়াজিনের যুদ্ধের পর গনীমতের মালসমূহ জিরানায় আনা হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাওয়াজিনের গনীমত এখানে বণ্টন করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিরানা থেকে ইহরাম করে মক্কায় আগমন করেন। এক বর্ণনা মতে ঈশার নামায জিরানায় পড়েন এবং ফজরের নামায মক্কায় পড়েছিলেন। এই উমরাকে উমরায়ে জিরানা বলা হয়। হযরত আলী (রা.) এ উমরায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে ছিলেন। (বিদায়া, ৭ম খণ্ড, আসাহহুস সিয়ার)

হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুক থেকে ফিরে আসার পর বাকী রামাদান, শাওয়াল, জিলকায়দা মদীনায় অবস্থান করলেন। তারপর হযরত আবূ বকর (রা.) কে আমীর করে হজ্জের জন্য পাঠিয়ে দিলেন। যাতে মুসলমানদের হজ্জ করাবেন। মদীনা থেকে হযরত আবূ বকর (রা.) এর সঙ্গে ৩০০ জন লোক রওয়ানা হন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ১০টি উট কুরবানীর জন্য হযরত আবূ বকর (রা.) এর সাথে দিলেন। হযরত আবূ বকর নিজের পক্ষ থেকে পাঁচটি উট কুরবানীর জন্য নিয়েছিলেন।

ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় এরপর সূরা বারাআতের সন্ধি ভঙ্গ সম্পর্কিত আয়াত নাযিল হয়। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আলীকে নিজের উটনী (আদবা) সঙ্গে নিয়ে রওয়ানা করলেন যাতে হযরত আলী (রা.) সূরা বারাআত কাফিরদের সামনে পড়ে শুনাবেন।

ইবনে সাদের বর্ণনায় হযরত আবূ বকর (রা.) ‘আরজ’ নামক স্থানে যখন পৌঁছলেন তখন হযরত আলী (রা.) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উটনীতে সাওয়ার হয়ে পৌঁছলেন। হযরত আবূ বকর (রা.) হযরত আলী (রা.) কে দেখে বললেন, আপনি আমীর হিসেবে এসেছেন না মা’মুর (অধীন) হিসেবে। হযরত আলী উত্তর দিলেন মা’মুর (অধীন) হিসেবে এসেছি। ইবনে সাদ বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আবূ বকর (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে মানাসিকে হজ্জ আদায় করানোর জন্য পাঠিয়েছেন? হযরত আলী (রা.) উত্তর দিলেন, না। আমি শুধু সূরা বারাআতের ঘোষণা করব। হজ্জ আপনি করাবেন। সে সময় কাফিরগণ কোন সন্ধিকে তখন ভঙ্গ হিসেবে গণ্য করত যখন সন্ধিকর্তা নিজে অথবা তাঁর পরিবারের কেউ সন্ধি ভঙ্গের ঘোষণা দিতেন। এজন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আলীকে সন্ধি ভঙ্গের ঘোষণার জন্য পাঠিয়েছেন।

চলবে…

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও শায়খুল হাদীস

 

ফেইসবুকে আমরা...