Logo
ইবন সাইয়্যাদ : হাদীসে বর্ণিত এক রহস্যময় চরিত্র
জুনাইদ আহমদ মাশহুর
  • ১৩ আগস্ট, ২০২৬

রাসূলুল্লাহ (সা.) এর জীবদ্দশায় যে কয়টা রহস্যময় চরিত্রের অবতার হয়েছিল, তাদের মধ্যে অন্যতম এক নাম ইবন সাইয়‍্যাদ। তার আচার-আচরণ এতটাই বিচিত্র আর হেঁয়ালিপূর্ণ ছিল যে, তা সাহাবাদের মাঝে বেশ ধোঁয়াশার সৃষ্টি করে।

তার নাম সাফি। অন‍্য বর্ণনায় এসেছে, আবদুল্লাহ ইবন সাইয়‍্যাদ বা সাইদ। তবে, ইবন সাইয়‍্যাদ নামেই সে পরিচিত ছিল। মদীনার এক ইয়াহুদী পরিবারে সে জন্মগ্রহণ করে। জন্মগতভাবেই সে ছিল একচোখা।

সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বর্ণনামতে, রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন মদীনায় আগমন করেন, ইবন সাইয়‍্যাদ তখন অনেক ছোট। অন‍্যা‍ন‍্যদের থেকে তার বাহ‍্যিক ভিন্নতা তো ছিলই, তার উপর ছোটবেলা থেকেই সে গণকদের মতো ভবিষ‍্যদ্বাণী করত। সেগুলোর কিছু সত‍্যি হত, আর কিছু ভেস্তে যেত। তার এই অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ড মানুষের মাঝে খুব দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ল। দাজ্জালের সাথে তার কতিপয় বৈশিষ্ট্য মিলে যাওয়ায় বলাবলি শুরু হলো, ইবন সাইয়‍্যাদই দাজ্জাল!

এই খবর রাসূলুল্লাহ (সা.) এর দরবার পর্যন্ত পৌঁছে গেল। রাসূলে করীম (সা.) এর মনে হলো- ইবন সাইয়‍্যাদকে পরীক্ষা করে দেখা দরকার। সায়‍্যিদুনা উমর (রা.) ও আরো কয়েকজন সাহাবীদের সাথে নিয়ে তিনি ইবন সাইয়‍্যাদের সন্ধানে রওয়ানা হলেন। তাকে বনী মাগালার দুর্গের পাশে অন‍্যান‍্য বাচ্চাদের সাথে খেলা করতে পাওয়া গেল। আগমন বোঝে ওঠার আগেই, নবী করীম (সা.) তার পিঠে মৃদু আঘাত করে তাকে কয়েকটি প্রশ্ন করতে লাগলেন। যাতে তার হাল-হাকীকত বুঝা যায়। সে সবকটির উলটা-পালটা উত্তর দেওয়া শুরু করলো। রাসূলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করলেন- তুমি কি সাক্ষ‍্য দাও আমি আল্লাহর রাসূল?

ইবন সাইয়‍্যাদ উত্তর দেয়- আমি সাক্ষ‍্য দিচ্ছি যে, আপনি মূর্খদের রাসূল!

এবার রাসূলুল্লাহ (সা.) কে-ই পালটা প্রশ্ন করে বসলো- আপনি কি সাক্ষ‍্য দেন যে, আমি আল্লাহর রাসূল? নবীজি (সা.) প্রত‍্যাখ‍্যানের সুরে বললেন- আমি আল্লাহ ও তাঁর (সত‍্য) রাসূলদের উপর ঈমান রাখি।

তিনি (সা.) আবার জিজ্ঞেস করলেন- তুমি (স্বপ্নে) কী দেখ? সে বলল- আমার কাছে সত‍্যবাদী ও মিথ‍্যাবাদী, উভয়ই আসে।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন- তোমার সবকিছু গড়বড় হয়ে গেছে। আচ্ছা, আমার কাছে তোমার জন‍্য কিছু লুকিয়ে রেখেছি। বলো তো, সেটা কী? সে বলল- “দুখ”। (রাসূলুল্লাহ (সা.) তার জন্য যা লুকিয়ে রেখেছিলেন, সে তা বলে দিল। মানে, তিনি “দুখান” বলতে চেয়েছিলেন কিন্তু সে পুরোটা বলতে পারেনি, বলছে “দুখ”। এখানে “দুখান” দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সা.) কী বোঝাতে চেয়েছেন সে সম্পর্কে মুহাদ্দিসীনের ইখতিলাফ আছে। (ফাতহল বারী-৬/১৭৩)

রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন- দূর হয়ে যাও! আল্লাহ তোমার ভাগ‍্যে যা রেখেছেন, তা তুমি কখনই অতিক্রম করতে পারবে না।

সায়‍্যিদুনা উমর (রা.) বলে উঠলেন- হুযুর‍! অনুমতি দিন; এখনি এর গর্দান ফেলে দিব।

নবীজি (সা.) বললেন- উমর! ও যদি সত‍্যিই দাজ্জাল হয়, তাহলে তুমি তাকে হত‍্যা করতে পারবে না। আর যদি দাজ্জাল না হয়, তাহলে তাকে হত‍্যা করে কোনো লাভ নেই। (সহীহ বুখারী, হাদীস-১৩৫৪)

বোঝা গেল, বিষয়টি তখনও অস্পষ্টই রয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সা.) পরবর্তীতে আরেকদিন তার রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করলেন।

উবাই ইবন কা’ব (রা.) কে সাথে নিয়ে একটি খেজুর বাগানের দিকে রওয়ানা হলেন। ইবন সাইয়্যাদ ঐ বাগানে বসবাস করতো। নবী করীম (সা.) চাইলেন ইবন সাইয়‍্যাদ তাকে লক্ষ্য করার আগেই তার কিছু কথা শুনতে। বাগানে প্রবেশ করেই দেখতে পেলেন, ইবন সাইয়‍্যাদ গায়ে চাদর জড়িয়ে শুয়ে আছে। আর কী যেন বিড়বিড় করছে। তা শোনার জন্য খেজুর গাছের আড়ালে থেকে ধীরে ধীরে তার দিকে আগাতে লাগলেন। এমতাবস্থায়, ইবন সাইয়‍্যাদের মা রাসূলুল্লাহ (সা.) কে দেখে ফেলল এবং ইবন সাইয়‍্যাদকে ডাক দিল- সাফি! এই যে মুহাম্মদ (সা.) এসেছেন। এতে ইবন সাইয়‍্যাদ চট করে উঠে বসলো। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন- ওর মা যদি ওকে সাবধান না করতো, তাহলে ওর বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যেত। (সহীহ বুখারী, হাদীস-১৩৫৪)

রাসূলুল্লাহ (সা.) দুইবার পরীক্ষা করার পরও ইবন সাইয়‍্যাদের রহস্য উন্মোচিত হলো না। এই ঘটনাগুলোই অন্য বর্ণনায়, অন্যভাবে পাওয়া যায়। সেগুলোর সারও সমান, যেখানে এই রহস্যের কোনো খোলাসা নেই।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর উপর এ সম্পর্কে কোনো ওহী নাযিল হয়েছে বলে জানা যায় না। এমতাবস্থায় তিনি (সা.) দুনিয়া ত্যাগ করলেন। ফলে এই বোধাতীত চরিত্র ও তার পারিপার্শ্বিকতা সাহাবাদের মাঝে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে রইল।

ইবন সাইয়‍্যাদকে নিয়ে মানুষের মাঝে ক্রমবর্ধমান আতঙ্ক আরো ত্বরান্বিত হয়, যখন বড় বড় কয়েকজন সাহাবী তাকে দাজ্জাল বলে অভিহিত করেন। সায়‍্যিদুনা উমর (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.) এর জীবদ্দশায় তাঁর সামনে হলফ করে ইবন সাইয়‍্যাদকে দাজ্জাল দাবি করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)ও উনাকে এতে বাধা দেননি।

ইবন সাইয়‍্যাদের দাজ্জাল হওয়ার ব‍্যাপারে হযরত আব্দুল্লাহ ইবন উমর (রা.) এর অবস্থান খুবই দৃঢ় ছিল। তিনি বলতেন- আল্লাহর কসম! ইবন সাইয়‍্যাদ-ই দাজ্জাল। এতে আমার কোনো সন্দেহ নেই। (সুনান আবূ দাঊদ, হাদীস-৪৩৩০)

ইবন উমর (রা.)’র এ ব‍্যাপারে এত কঠোর অবস্থান নেওয়ার কারণ আরেকটি ঘটনার প্রেক্ষিতে স্পষ্ট হয়। একবার মদীনা শরীফের কোনো এক পথে ইবন সাইয়‍্যাদের সাথে হযরত ইবন উমর (রা.) এর দেখা হয়। তিনি তাকে এমন কিছু কথা বলেন, যার ফলে সে রাগে ফুলতে শুরু করে। সে এমন ভাবে ফুলে-ফেঁপে উঠলো যে, পুরো গলি পূর্ণ হয়ে গেল।

এরপর ইবন উমর (রা.) হাফসা (রা.) এর নিকট গেলেন। ইতোমধ্যেই তাঁর কাছে এ ঘটনার সংবাদ চলে গিয়েছিল। আম্মাজান বললেন, আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করুন। ইবন সাইয়‍্যাদের কাছে তোমার এমন কী প্রয়োজন ছিল? তুমি কেন তাকে খোঁচা দিতে গেলে? তুমি কি জানো না যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো ব্যাপারে রাগান্বিত হয়েই দাজ্জাল আত্মপ্রকাশ করবে। (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফিতান, ২৯৩২/ই.ফা-৭০৯৩)

অন‍্য বর্ণনায় এসেছে, ইবন উমর (রা.) বলেন- একবার ইবন সাইয়‍্যাদের সাথে আমার দেখা হলো। আমি লক্ষ‍্য করলাম, তার একটি চোখ ফুলে বাইরে বের হওয়ার মতো অবস্থা। জিজ্ঞেস করলাম- তোমার চোখের এই দশা কেন? সে উত্তর দিল- জানি না। আমি বললাম- চোখ তোমার মাথায় অথচ তুমি জানো না! সে বলল- আল্লাহ চাইলে তোমার এ লাঠিতেও চোখ পয়দা করে দিতে পারেন। এরপর সে গাধার মতো এমন বিকট আওয়াজ করলো, যা আমি কোনোদিন শুনিনি। পরে আমার এক সাথি আমাকে বলেছে যে, আমি নাকি তাকে আমার সাথে থাকা লাঠি দ্বারা এমন পিঠিয়েছি যে, লাঠিটি টুকরা টুকরা হয়ে পড়েছে। আল্লাহর কসম! অথচ এ সম্পর্কে আমি কিছুই মনে করতে পারি না।

ইবন উমর (রা.) আম্মাজান হাফসা (রা.) এর কাছে এসে এ ঘটনা বর্ণনা করলে তিনি বলেন- ইবন সাইয়‍্যাদের নিকট তোমার কী প্রয়োজন ছিল? তুমি কি জানো না যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কারো প্রতি রাগান্বিত হয়েই দাজ্জালের প্রকাশ ঘটবে। (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফিতান,২৯৩২/ই.ফা-৭০৯৪)

হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা.)ও ইবন সাইয়‍্যাদকে দাজ্জাল মনে করতেন। মুহাম্মদ ইবন মুনকাদির থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- আমি দেখলাম হযরত জাবির (রা.) আল্লাহর নামে কসম করে ইবন সাইয়‍্যাদকে দাজ্জাল বলে দাবি করছেন। জিজ্ঞেস করলাম- আপনি আল্লাহর নামে কসম করছেন? প্রতুত্ত‍্যরে তিনি বললেন- আমি হযরত উমর (রা.) কে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সামনে এ সম্পর্কে কসম করতে দেখেছি এবং তিনি (সা.) এতে কোন বাধা দেননি। (সহীহ বুখারী, হাদীস- ৭৩৫৫)

হযরত আবূ যর গিফারী (রা.) এর একটি হাদীসও এ ব‍্যাপারে বেশ প্রসিদ্ধ। তিনি বলেন- ইবন সাইয়‍্যাদই যে দাজ্জাল, এই কথার উপর আমি দশবার কসম করতে বেশি ভালোবাসব; সে দাজ্জাল নয়, এই কথার উপর একবার কসম করার চেয়ে। (মুসনাদে আহমদ-الرسالة, হাদীস- ২১৩১৯)

উপরের নসগুলো থেকে প্রতীয়মান হয়, অনেক জলীলুল কদর সাহাবীও ইবন সাইয়‍্যাদকে দাজ্জাল হিসেবে সন্দেহ করতেন। যদিও অনেক মুহাদ্দিসীন এ বিষয়ে ইবন সাইয়‍্যাদের চেয়ে তামীম আদ-দারী (রা.)’র হাদীস, যা দাজ্জালের কোনো এক দ্বীপে বন্দি থাকার উপর নির্দেশ করে; সেটাকে প্রাধান্য‍ দিয়েছেন। ইমাম বাইহাকী রাহিমাহুল্লাহ‍’র মতে, যে সকল সাহাবীরা ইবন সাইয়‍্যাদের দাজ্জাল হওয়ার উপর দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন তারা তামিম আদ-দারী (রা.)-এর হাদীসটি শুনেননি। পরবর্তীতে যারা জেনেছেন তারা তাদের মত পরিবর্তন করেছেন। (ফাতহুল বারী, ১৩/৩২৬-৩২৭)

কিন্তু, খোদ হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা.) থেকে তামীম আদ-দারী (রা.) এর ঘটনাটির অনুরূপ বর্ণনা পাওয়া যায়। যেখানে ঘটনাটি বর্ণনার পর তিনি বলেন- দাজ্জাল হলো ইবন সাইয়‍্যাদ। রাবী আবূ সালামাহ বললেন- কিন্তু সে তো মারা গেছে। তিনি বললেন- যদিও সে মারা গিয়ে থাকে। রাবী বললেন- সে তো মুসলিম হয়েছিল। তিনি বললেন- যদিও সে মুসলিম হয়েছিল। রাবি বললেন- সে তো মদীনায় প্রবেশ করেছিল। তিনি বললেন- যদিও সে মদীনায় প্রবেশ করেছিল। (সনদে দুর্বলতা আছে। সুনান আবূ দাঊদ, হাদীস-৪৩২৮)

রাসূলুল্লাহ (সা.) এর ইন্তিকালের পরে ইবন সাইয়‍্যাদ ইসলাম গ্রহণ করে এবং তাকে যে মানুষেরা দাজ্জাল বলে সন্দেহ করেন, তা বারবার অস্বীকার করতে থাকে। এর বিপরীতে সে বিভিন্ন যুক্তিও দাঁড় করাতো।

একবার হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) হজ্জ অথবা উমরাহ পালনের জন্য রওয়ানা হলেন। ইবন সাইয়‍্যাদও তাদের সফরসঙ্গী। সফর বিরতির জন‍্য কোন এক জায়গায় অবস্থান করলে ইবন সাইয়‍্যাদ তার কাছে এসে বসলো। সে বলতে লাগলো- হে আবূ সাঈদ! মানুষের এসব কথাবার্তার কারণে আমার ইচ্ছা করছে একটা দড়ি নিয়ে গাছে ফাঁস দিয়ে মরে যাই।

আবূ সাইদ! রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদীস যদি অন্য কারো কাছে অস্পষ্টও থাকে, আপনারা আনসারদের কাছে তো তা গোপন থাকার কথা নয়! আপনি কি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদীস সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জ্ঞাতদের একজন নন? রাসূলুল্লাহ (সা.) কি বলেননি যে, দাজ্জাল হবে কাফির, অথচ আমি একজন মুসলিম? রাসূলুল্লাহ (সা.) কি বলেননি যে, সে হবে নিঃসন্তান, অথচ আমি মদীনায় আমার সন্তান রেখে এসেছি। রাসূলুল্লাহ (সা.) কি বলেননি যে, সে মদীনা ও মক্কায় প্রবেশ করতে পারবে না, অথচ আমি মদীনা থেকেই এসেছি এবং মক্কার উদ্দেশ্যে যাচ্ছি।

আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) বলেন, (তার এসব যুক্তিতে) আমি তাকে নির্দোষ বলেই মেনে নিচ্ছিলাম! এমন সময় সে বলে উঠলো- তবে আল্লাহর কসম! আমি নিশ্চিতভাবে তাকে (দাজ্জালকে) চিনি, তার জন্মবৃত্তান্ত জানি এবং সে এখন কোথায় তাও জানি। এ কথা শুনে আমি বললাম- তোর সারাটা দিনই ধূলিসাৎ হয়ে যাক! (সংক্ষেপিত। সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফিতান,২৯২৭/ই.ফা-৭০৮৬)

অন্য বর্ণনায় এসেছে, সবশেষে তাকে জিজ্ঞেস করা হলো- তোমার দাজ্জাল হওয়াটা কি তুমি পছন্দ করো? জবাবে সে বললো, যদি আমাকে দাজ্জাল হওয়ার প্রস্তাব করা হয়, তবে আমি তা অপছন্দ করব না। (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফিতান,২৯২৭/ই.ফা-৭০৮৫)

হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) এর কাছে নিজের পক্ষে ইবন সাইয়‍্যাদের দেওয়া যুক্তিগুলোর খণ্ডনে ইমাম নববী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ইবন সাইয়‍্যাদ এখানে যে বিষয়গুলো বললো, এসবের মধ্যে (সে যে দাজ্জাল নয়) তার কোনো শক্ত দলীল বা প্রমাণ নেই। কারণ, নবী করীম (সা.) দাজ্জালের এসব বৈশিষ্ট্যের কথা মূলত শেষ যামানায় তার আত্মপ্রকাশ ও পৃথিবীতে ফিতনা জাহিরের প্রেক্ষাপটে জানিয়েছেন। বরং তার থেকে সন্দেহজনক যে বিষয়গুলো প্রকাশ পেয়েছে, সেগুলো তার দাজ্জাল হওয়ার পক্ষে স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে। আর তার ইসলাম গ্রহণ করা, হজ্জ করা, জিহাদে অংশ নেওয়া এবং আগের স্বভাব-চরিত্র ছেড়ে ভালো হয়ে যাওয়া, এসব কোনো স্পষ্ট প্রমাণ নয় যে সে দাজ্জাল নয়। (সংক্ষেপিত, শরহে মুসলিম- ১৮/৪৬)

ইবন সাইয়‍্যাদের শেষ পরিণতি নিয়েও অস্পষ্টতা রয়েছে। হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা.) বলেন- হাররার যুদ্ধের দিন ইবন সাইয়‍্যাদ আমাদের থেকে উধাও হয়ে যায়। (আবূ দাঊদ, হাদীস- ৪৩৩২)

তাছাড়া, ইবন সাইয়‍্যাদের মৃত‍্যু, মদীনা তায়‍্যিবায় হয়েছে এবং মদীনাবাসী তার জানাযার নামায পড়েছেন মর্মে একটি বর্ণনা পাওয়া গেলেও, মুহাদ্দিসীনে কিরাম প্রথম মতটাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।

এ ব‍্যাপারে তারিখে ইসফাহানে একটি ঘটনা পাওয়া যায়। রাবী হাসান ইবন আবদুর রহমান তার বাবার থেকে বর্ণনা করেন- ইসফাহান বিজিত হওয়ার পর (আমি সেখানে প্রায়ই যাওয়া-আসা করতাম) আমাদের সেনাশিবির ও ইয়াহুদীয়া নামক শহরের মাঝে প্রায় ৩ মাইলের দুরত্ব ছিল। আমরা সেখানে কেনাকাটা করতে যেতাম। তেমনি একদিন আমি সেখানে গিয়ে দেখি, ইয়াহুদীরা নাচ-বাজনা করে আনন্দ ফুর্তি করছে। সেখানে থাকা আমার এক বন্ধুকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে সে বললো- যেই রাজার নেতৃত্বে আমরা আরব বিজয় করবো, আজ তার আগমন ঘটবে।

অতঃপর আমি সেখানেই রাত্রিযাপন করলাম। ভোর হওয়ার পর সেনাশিবিরের দিক থেকে ধূলিঝড় উঠতে দেখা গেল। আমি তাকিয়ে দেখলাম, ফুলের গম্বুজসদৃশ বিশেষ ছায়াতলে এক লোক আসছে, আর তাকে ঘিরে ইয়াহুদীরা নাচগান ও বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে। আমি ভালোভাবে তাকিয়ে দেখলাম, এ তো ইবন সাইয়‍্যাদ! এরপর সে শহরে প্রবেশ করলো এবং এখন পর্যন্ত আর ফিরে আসেনি। (ফাতহুল বারী- ৩/৩২৭)

আর শেষ যামানায় ইসফাহান থেকে, বিশেষত সেই ইয়াহুদীয়া নামক জনপদ থেকে দাজ্জালের আবির্ভাব হওয়ার কথা বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়। ফলে, এই ঘটনা ইবন সাইয়‍্যাদের দাজ্জাল সাব‍্যস্ত হওয়ার সন্দেহকে আরো প্রবল করে তুলে।

এতদসত্ত্বেও অনেক মুহাদ্দিসীনে কিরাম দাজ্জালের ব‍্যাপারে ইবন সাইয়‍্যাদের চেয়ে তামিম আদ-দারী (রা.)-এর হাদীসকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তাদের অনেকে ইবন সাইয়‍্যাদকে- হাদীসে উল্লেখিত কয়েকজন দাজ্জালদের একজন বলেছেন, আবার কেউ কেউ তাকে গণক, শয়তান ইত‍্যাদি বলেছেন।

ইমাম নববী রাহিমাহুল্লাহ এ সম্পর্কে বলেন- ইবন সাইয়‍্যাদের ঘটনাটা আসলেই খুব জটিল। তার বিভিন্ন কাজকর্ম অস্পষ্টতা তৈরি করে যে, সে-ই শেষ যামানায় আগত দাজ্জাল নাকি অন‍্য কেউ। কিন্তু, এতে কোন সন্দেহ নেই যে সে দাজ্জালদের (মিথ্যাবাদীদের) একজন। আর এটাই আলিমদের বক্তব্য। (শরহে মুসলিম- ১৮/৩৬)

ইবন সাইয়‍্যাদকে নিয়ে সবচেয়ে সুন্দর ও নির্ভরযোগ্য সমাধান দিয়েছেন হাফিয ইবন হাজার আসকালানী রাহিমাহুল্লাহ। তিনি বলেন- তামীম আদ-দারীর বর্ণিত হাদীস আর ইবন সাইয়‍্যাদের দাজ্জাল হওয়ার মাঝে সবচেয়ে উত্তম সুরাহা হলো- তামীম দারী (রা.) যাকে ঐ দ্বীপে শেকলবদ্ধ দেখেছিলেন, সে-ই আসল দাজ্জাল। আর ইবন সাইয়‍্যাদ হলো একটা শয়তান। সে দাজ্জালের সুরত ধরে সেসময় আবির্ভূত হয়েছিল। পরবর্তীতে সে ইসফাহানের দিকে চলে যায় এবং তার সহচর (প্রকৃত দাজ্জাল)-এর সাথে আত্মগোপন করে। নির্ধারিত সময় না আসা পর্যন্ত সে এভাবেই গোপনে থাকবে। (ফাতহুল বারী- ১৩/৩২৭)

ইবন সাইয়‍্যাদের ঘটনা সত‍্যিকার অর্থেই খুব জটিল ও উম্মতের জন‍্য আল্লাহ প্রদত্ত এক বড় পরীক্ষা। আমাদের উচিত- এই ফিতনার ব‍্যাপারে উলামায়ে আহলে হকের ইজমার উপর তাওয়াক্কুফ করা। আর ইবন সাইয়‍্যাদের হাকীকত কী ছিল, তার রহস‍্যই বা কী ছিল, সে সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহ তাআলা ও তার রাসূল (সা.)-ই অধিক অবগত। (الله ورسوله أعلم بالصواب)

ফেইসবুকে আমরা...