Logo
হেযবুত তওহীদ সমাচার
আহমদ ইশতিয়াক আত তানভীর
  • ১৩ আগস্ট, ২০২৬

নিশ্চয়ই আপনারা অনেকেই ইন্টারনেটে সামরিক কুচকাওয়াজের মতো সটান ও দ্রুতগতিসম্পন্ন এক নামায-রীতি দেখেছেন। ‘আল্লাহু আক…বার’ বলেই নামাযে ঝাঁপ দেয়, আবার তাকবীর দিয়ে তড়িৎগতিতে রুকূতে যায়। নামায নিয়ে খেল-তামাশা করছে মনে করে অনেকেই তাদেরকে সক্ষোভ গালমন্দ করেছেন, আবার অনেকে হয়তো এই অভিনব লম্ফঝম্প উপভোগ করেছেন। আদতে এটাকে আমরা যেরকম ভাবি ঠিক সেরকম না। এটা এক গোষ্ঠীর (পড়ুন নব্য ফেরকার) এক ধরনের আদর্শ। খুব বেশিদিন আগে এর গোড়াপত্তন হয়নি। ১৯৯৫ সালে মোহাম্মদ বায়েজিদ খান পন্নীর (১৯২৫-২০১২ খ্রি.) হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় এই ‘হেযবুত তওহীদ’ (নামের বানান তাদের বই থেকে নেওয়া) নামক সংগঠন। এটা নিছক তার হেঁয়ালিপনার‌ই ফসল ছিল। তিনি টাঙ্গাইলের করটিয়া গ্রামের পন্নী পরিবারের সন্তান; মোটাদাগে ছিলেন রাজনীতিক, শিকারি ও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক। যৌবনের শুরুর দিকে তিনি ব্রিটিশবিরোধী ‘খাকসার’ আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন; এনায়েতউল্লাহ মাশরেকী (১৮৮৮-১৯৬৩ খ্রি.) দ্বারা পরিচালিত। পরবর্তীতে রাজনীতির মাঠ থেকে অবসর নেন। এক সময় পন্নীর মনে উদয় হলো, বর্তমান ইসলাম বিকৃত ইসলাম; মানুষ দিনকে দিন ঘোর জাহিলিয়াতের দিকেই আগাচ্ছে। এজন্য তিনি মানুষকে ‘প্রকৃত ইসলাম’-এর পথ দেখাতে দলটির সূচনা করেন এবং নিজেকে এই যুগের ইমাম বা এমামুয্যামান ঘোষণা করেন। বর্তমান যুগে একশ ষাট কোটি মুসলমানের মধ্যে কেবল তার অনুসারী ‘পাঁচ লক্ষ’ মানুষকে তিনি ‘প্রকৃত মুসলমান’ মনে করেন (ব‌ই: ইসলামের প্রকৃত রূপরেখা)। এই দলের অনুসারীদের বিশ্বাস হলো, বায়েজিদ খান পন্নীকে আল্লাহ বর্তমান যুগে সমগ্র মানবজাতির ত্রাতা হিসাবে পাঠিয়েছেন (ব‌ই: হেযবুত তওহীদের গঠনতন্ত্র)। তারা মনে করেন, নবীজি (সা.)-এর ইন্তিকালের পর একশ বছরের ভিতরে ইসলাম সঠিক ও অক্ষুন্ন ছিল। পরবর্তীতে বিকৃত হয়ে গেছে। অর্থাৎ গত ১৩০০ বছর ধরে বিশ্বের সকল মুসলমানরা আদতে মুসলমান‌ই ছিল না।‌ অতঃপর রব্বুল ইযযত মানবজাতির কল্যাণের জন্য দীর্ঘকাল পর বায়েজিদ পন্নীর বোধোদয়ের মাধ্যমে ইসলামকে যিন্দা করেছেন। তিনি আবার মুজিযা প্রাপ্তির দাবি করে প্রকারান্তরে নিজেকে নবী দাবি করেছেন। যেমন তিনি ২রা ফেব্রুয়ারি ২০০৮ সালে নিজের দেওয়া ১০ মিনিটের একটি খুতবাকে আল্লাহর কুদরত হিসেবে দাবি করেন এবং প্রচার করেন যে, এই মুজিযার মাধ্যমে আল্লাহ তাকে এবং হেযবুত তওহীদকে হক হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, “এর চেয়ে বড় রহমত আর কি হতে পারে? যেসকল মুজিযা তিনি নবীদের দ্বারা ঘটাতেন একটা একটা করে, এখন তিনি নিজে একসাথে ৮টা মুজিযা ১০ মিনিটের মধ্যে ঘটিয়ে দিলেন” (বই: আল্লাহর মুজিযা: হিজবুত তওহীদের বিজয় ঘোষণা)। তাদের গঠনতন্ত্রে লেখা আছে, ‘হেযবুত তওহীদে’র সবচেয়ে বড় মাইলফলক হচ্ছে ঐ ভাষণ যার দ্বারা আল্লাহ তাআলা তিনটি বিষয় সত্যায়ন করেন। যথা : হেযবুত তওহীদ হক (সত্য), এর ইমাম আল্লাহর মনোনীত হক ইমাম, হেযবুত তওহীদের মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে আল্লাহর সত্য দ্বীন প্রতিষ্ঠিত হবে’। শুধু তাই নয়, তারা মনে করেন পন্নীর এই ভাষণ মর্যাদার দিক থেকে কুরআন শরীফের পর্যায়ভুক্ত। এমনকি যে এই ভাষণকে কটাক্ষ অথবা অস্বীকার করবে সে যেন কুরআনকে অপমান করার মতো অপরাধে অপরাধী হলো।

এই দলের আমলগত কুফরী এবং আকীদাগুলোও গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতোই ভয়ংকর। তারা মনে করেন, প্রকৃত ইসলাম হলো তাওহীদ ও জিহাদ। আর ইবাদত হলো খিলাফত। অর্থাৎ প্রকৃত ইবাদত হলো আল্লাহর দেয়া দ্বীন (জীবনব্যবস্থা) মুতাবিক তাঁর পক্ষ হয়ে শাসন করা। নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত এগুলো প্রকৃত ইবাদতের কাজ নয়, বরং এগুলো জীবন পরিচালনার জন্য কিছু বিধান মাত্র (বই: দাজ্জাল? ইয়াহুদী-খ্রিষ্টান ‘সভ্যতা’)। এই ইবাদত তথা খিলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাদের আকীদা ও ঈমানের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো জিহাদ। এমনকি তারা বলেন ঈমানের মূল শর্তই হলো জিহাদ। তাই সশস্ত্র জিহাদ ত্যাগ করলে সে আর মুমিন‌ই থাকে না, বরং দ্বীন থেকেই সে বহিষ্কৃত হয়ে যায় (বই: ইসলামের প্রকৃত সালাহ)। নামাযকে তারা মনে করেন জিহাদের প্রশিক্ষণ এবং ‘উম্মতে মুহাম্মাদী’ সম্পূর্ণ জাতিটাই সামরিক বাহিনী। তাই সামরিক প্রশাসনে কর্মরত ব্যক্তিবর্গরাই নামায পড়ার বেশি হকদার, সাধারণ মানুষরা নয়। এই দলে যারা যুক্ত হবেন তাদের শপথবাক্যে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যারা এই দলভুক্ত নয় অর্থাৎ দুনিয়ার বাকি সমস্ত মুসলমান পথভ্রষ্ট ও বিকৃত ইসলামের অনুসারী। অতএব তাদের সাথে কোনো ইবাদতে অংশগ্রহণ করা যাবে না। কেবল এই আন্দোলনের সাথে যুক্তদের সাথেই ইবাদতে অংশগ্রহণ করা যাবে। তাই তারা অন্য মুসলমানদের সাথে সালাত আদায় করে না এবং তাদের সাথে কোনো ইবাদতেও অংশগ্রহণ করে না। ধর্ম নিয়ে তাদের সুস্পষ্ট অবস্থান হলো, “আল্লাহর রাসূল (সা.) কোনো ধর্মকেই বাতিল করেননি, বরং সবগুলোকে সংরক্ষণ ও সত্যায়ন করেছেন। তাই সব ধর্মই সত্য” (বই: সকল ধর্মের মর্মকথা, সবার ঊর্ধ্বে মানবতা)।

পন্নীর ভাষ্যমতে, কোনো ব্যক্তি ‘হেযবুত তওহীদে’ যোগ দিলেই দুই শহীদের মর্যাদা পাবে, যদি সে শেষ পর্যন্ত থাকে। শুধু তাই নয়, ‘হেযবুত তওহীদে’ যারা সত্যিকারভাবে এসেছে তাদের জন্য জান্নাত নিশ্চিত; এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। এখন কে কোন জান্নাতে যাবে তা আমলের উপর নির্ভর করবে (বই: আল্লাহর মু‘জিযা: হিজবুত তওহীদের বিজয় ঘোষণা)। দাজ্জাল সম্পর্কেও তাদের হাস্যকর ও মুখরোচক দর্শন আছে। তাদের মতে, দাজ্জাল কোনো প্রাণী নয়, বরং দাজ্জাল হলো ‘ইহুদী-খ্রিষ্টান সভ্যতাই’। আধুনিক যুগে এমামুয্যামান তথা পন্নী প্রথম এই দাজ্জালকে চিহ্নিত করেছেন এবং তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন যে, পাশ্চাত্য বস্তুবাদী ইয়াহুদী-খ্রিষ্টান-যান্ত্রিক সভ্যতাই হচ্ছে সেই দাজ্জাল, যেই দানব ৪৮১ বছর আগেই জন্ম নিয়ে তার শৈশব-কৈশোর পার হয়ে বর্তমানে যৌবনে উপনীত হয়েছে এবং দোর্দণ্ড প্রতাপে সারা পৃথিবীকে পদদলিত করে চলেছে। আজ মুসলিমসহ সমস্ত পৃথিবী অর্থাৎ মানবজাতি তাকে প্রভু বলে মেনে নিয়ে তার পায়ে সিজদায় পড়ে আছে (ব‌ই: দাজ্জাল? ইয়াহুদী-খ্রিষ্টান ‘সভ্যতা’!, ‘মহাসত্যের আহ্বান’)। তারা নিজ দলের সদস্যদেরকে শেষ যামানায় দাজ্জালের বিরুদ্ধে যোদ্ধা ভাবেন এবং তাদের পুরুষ ও নারী সদস্যদের যথাক্রমে মুজাহিদ ও মুজাহিদা সম্বোধন করেন। শুধু তাই নয়, মুজাহিদ হিসাবে শাহাদত লাভের প্রমাণ হিসাবে তাদের কর্মীদের লাশ অন্যদের মতো শক্ত বা শীতল হয় না বলে তারা দাবি করেন।

আর হজ্জ সম্পর্কে তারা বলেন এটি কোনো ইবাদত‌ই নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য মুসলমানদের বার্ষিক সম্মেলন। তাদের ভাষায, “হজ্জ কোনো তীর্থযাত্রা নয় বরং আন্তর্জাতিক কনফারেন্স। ইসলামের অন্য সব কাজের মতোই আজ হজ্জ সম্বন্ধেও এই জাতির আকীদা বিকৃত হয়ে গেছে। এই বিকৃত আকীদায় হজ্জ আজ সম্পূর্ণরূপে একটি আধ্যাত্মিক ব্যাপার; আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জন করার পথ। প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে- আল্লাহ সর্বত্র আছেন, সৃষ্টির প্রতি অণু-পরমাণুতে আছেন, তবে তাঁকে ডাকতে, তাঁর সান্নিধ্যের জন্য এত কষ্ট করে দূরে যেতে হবে কেন?” তারা আরও বলেন, দাড়ি-টুপি-বোরকা ইত্যাদি ইসলামের কোনো লেবাস নয়। এগুলো ব্যক্তি-পছন্দের উপর নির্ভর করে। এগুলো হাল যামানায় স্বার্থান্বেষী পীর-আলিমদের আরোপিত একটি ব্যবস্থা। এই সকল অনাচারের প্রেক্ষিতে আল্লাহ ‘হেযবুত তওহীদ’কে মানবজাতির উদ্ধারকর্তা হিসেবে মনোনীত করেছেন। কাজেই এই সময়ে কেউ যদি খাঁটি মুমিন-মুসলিম হতে চায়, আল্লাহর সঠিক দিক-নির্দেশনা, সত্যপথ লাভ করতে চায় তাদের এমামুয্যামানের আনুগত্য করা ছাড়া কোনো মুক্তি নেই। আবার, তারা আলিম-উলামার প্রতিও যারপরনাই বিদ্বেষ পোষণ করেন এবং মনে করেন যে, হাদীস, তাফসীর, ফিকহসহ ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা কেবল অপ্রয়োজনীয়ই নয়, বরং মুসলিম উম্মাহর বিভক্তির কারণ (বই: হেযবুত তওহীদের গঠনতন্ত্র)। শুরুর দিকে পন্নীর প্রদর্শিত বিধানে মানুষের কাছে সরাসরি জিহাদের দাওয়াত পৌঁছানো হতো। বর্তমানে তারা অবশ্য দাবার চাল ঘুরিয়ে ফেলেছে। তাদের মহিলা কর্মীদের প্রকট তৎপরতাই উল্লেখযোগ্য। সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করা এবং ইসলামে অবাধ স্বাধীনতার প্রলোভন দেখিয়ে মেয়েদের মগজধোলাই করাই তাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। সামাজিক মাধ্যমগুলোতেও তাদের উপস্থিতি আশ্চর্যজনক এবং এগুলো সবই তাদের কৌশলেরই একাংশ হিসেবে ধরা হয়।

২০০৮ সালে বাংলাদেশ সরকার সংগঠনটির বিতর্কিত মতবাদ ও রাজনৈতিক আস্ফালনের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করে। তাদের বর্তমান এমামুয্যামান হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম; জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র। ২০১২ সালে বায়েজিদ খান পন্নীর মৃত্যুর পর তিনি সংগঠনের উত্তরসূরি (এমাম) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমান গণমাধ্যম ও মিডিয়ায় তার তৎপরতা খুবই অস্বাভাবিক। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাদের আদর্শগুলো ফলাও করে প্রচার হচ্ছে এবং ইসলামের নামে সুশীলতাকে গিনিপিগ বানিয়ে উপমহাদেশের সরলপ্রাণ মুসলিমদের মধ্যে আরেক বিভাজন তৈরি করার উদ্দাম প্রয়াস চলতেছে (আল্লাহুল মুস্তাআন)।

ফেইসবুকে আমরা...