Logo
সাতক্ষীরার এমপি-কাণ্ড : উলামায়ে কিরামের সতর্কতার বাস্তব প্রমাণ
জুলফিকার মুরতাজা
  • ১২ আগস্ট, ২০২৬

পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে দ্বীনের দাওয়াতের জন্য যারা কাজ করেন অথবা যেকোনো পদ্ধতিতে দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করেন তাদের প্রত্যেকের কাছে অনুপ্রেরণা আর অনুসরণের প্রধানতম উৎসস্থল প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সীরাত। নবীপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র সীরতের প্রতিটি ঘটনাই মুমিনের জন্য শিক্ষণীয়, যুহদ ও জিহাদের কঠিন মুহূর্তে সঠিক ফয়সালা নেওয়ার এক নির্ভুল দলীল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুবারক সীরাতের সাথে জড়িয়ে থাকা সাহাবায়ে কিরামের মহান জীবনাদর্শ ও ঘটনাবলিও উম্মাহর নিকট অনুপ্রেরণার উৎস। দ্বীন কায়িমের জন্য রাসূলুল্লাহর প্রতি সাহাবায়ে কিরামের শর্তহীন সমর্পণ, অবর্ণনীয় কষ্ট ও ত্যাগ কিয়ামত পর্যন্ত মুমিনদের মুত্তাকী হওয়ার এবং মুজাহিদ হওয়ার দীক্ষা দেয়। দুনিয়ার সকল প্রান্তে দ্বীনের খিদমত আনজামরতরা তাই নিজের সুখে-দুঃখে, বিশেষত বিপদের সময় সীরাত আর তারিখের বিখ্যাত সব ঘটনা স্মরণ করে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেন, নিজের ঈমানকে মজবুত করেন। রাসূলুল্লাহর সীরাত এবং সাহাবায়ে কিরামের স্বর্ণোজ্জ্বল ইতিহাসকে যেমন ঈমানদাররা নিজের ঈমানকে সুদৃঢ় করতে স্মরণ করেন, তেমনই আজকাল একশ্রেণির নফসের অনুগত পাপাচারীকে নিজের পাপ লুকানোর জন্য সীরাত আর তারিখের হাওয়ালা নিতে দেখা যায়।

অতি সম্প্রতি সাতক্ষীরার জনৈক সংসদ সদস্যের নৈতিক স্খলনের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে সে সংসদ সদস্যের দলের কর্মীরা কীভাবে এই ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল তা মোটাদাগে পর্যালোচনা করলে যেকোনো সৎ ও সুচিন্তকের নিকট এ কথা স্পষ্ট হবে যে, দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকে কেন উলামায়ে কিরাম যুগের পর যুগ ধরে এত কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে আসছেন। সাতক্ষীরার সেই বয়োবৃদ্ধ এমপি তথা সিনিয়র জামায়াত নেতার সাথে এক তরুণীর আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরে জামায়াতের সাইবার সেল ঢালাওভাবে প্রচার শুরু করে এই তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী। যারা এসব ভিডিও প্রচার করেছে তাদেরও ব্যাপক সমালোচনাও করে জামায়াতের সাইবার টিম। একই সময়ে জামায়াতের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজ থেকে হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে বোঝানো হয় যে, কোনো পাপাচারীকে নিয়ে সমালোচনা অনুচিত, আল্লাহ তাকে মাফও করে দিতে পারেন। একদিকে নিজেদের সেলিব্রেটি সাইবার অ্যাক্টিভিস্টরা দাবি করছে ভিডিওর তরুণী এমপি সাহেবের স্ত্রী, অন্যদিকে জামায়াতের পেইজ থেকে বলা হচ্ছে পাপীকে নিয়ে সমালোচনায় মত্ত না থাকতে! অ্যাক্টিভিস্টদের মতে তিনি নিষ্পাপ, কেন্দ্রীয় পেইজের পোস্ট অনুযায়ী পাপী! এই পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে যায় যখন জামায়াত অফিসিয়াল বিবৃতি দিয়ে জানায় যে “নৈতিক স্খলন”-এর সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ায় সেই এমপিকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। রসিকজন তখন বট বাহিনীর উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ে দেন, দ্বিতীয় বিয়ে করাকে ইসলামী দল দাবিদার জামায়াত কীভাবে নৈতিক স্খলন সাব্যস্ত করতে পারে?

নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ায় দল থেকে বহিষ্কার হওয়া থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে সেই তরুণী জামায়াতের এমপির স্ত্রী নন, বরং সেটা অবৈধ যৌনাচার। আর এই পর্যায়ে একজন বহিষ্কৃত নেতাকে জনসমালোচনা থেকে বাঁচাতে দৃশ্যপটে হাযির হন রফিকুল্লাহ আফসারী নামক জামায়াতের একজন পরিচিত বক্তা ও শিক্ষক। জামায়াতের এই বক্তা নীতিভ্রষ্ট এক ব্যভিচারকারী নেতার পাপকে লঘু করে দেখানোর জন্য রীতিমতো সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে কার কার ব্যভিচারের জন্য শাস্তি হয়েছিল তার তালিকা নিয়ে ভিডিও বানান! তথাকথিত দ্বীন কায়িমের শপথ নেওয়া এক নেতার ভণ্ডামি জাতির কাছে স্পষ্ট হওয়ায় দলটির প্রতি যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে তা কমিয়ে আনতে আফসারী সাহাবীদের সমালোচনা, সাহাবীদের পাপ নিয়ে ভিডিও বানানো শুরু করেন। এমনই পবিত্র (!) দল জামায়াত, যাদের ইমেজ পুনরুদ্ধারে সাহাবায়ে কিরামের ইযযতকেও লুণ্ঠিত করা যায়! কিন্তু যেই সাহাবীদের পাপের আলাপ সামনে এনে আফসারী সেই এমপির যিনাকে লঘু করতে চাইলেন, সেসব সাহাবায়ে কিরাম নিজেদের দ্বারা পাপ সংঘটিত হওয়ার পরে আল্লাহর ভয়ে কম্পমান হয়ে নিজেই রাসূলুল্লাহর দরবারে হাযির হয়ে শাস্তির জন্য অনুরোধ করেছেন, আর অন্য কোনো সাহাবীও তাদের সেই পাপকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য মিথ্যার আশ্রয় নেননি। আফসারীর জ্ঞাতি ভাই সেই জামায়াতী এমপি শরীআত অথবা দেশীয় আইন কোনোমতেই নিজের ওপর শাস্তি আরোপ তো দূরের কথা, নিজের পাপ স্বীকারই করেনি। তদুপরি আফসারী ও বট বাহিনী এই পাপাচারীর অপরাধকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টায় রত ছিলেন সব সময়। নিজেদের পাপকে আড়াল করতে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ব্যর্থ হয়ে সাহাবায়ে কিরামের দ্বারা সংঘটিত অনিচ্ছাকৃত গুনাহের আড়ালে নিজেদের পাপকে আড়াল করার এই জঘন্য চেষ্টা থেকে দুটি নুক্তা সুস্পষ্ট হয়। প্রথমত, জামায়াত ইসলামের ইতিহাসের যেকোনো ঘটনাকে নিজেদের এজেন্ডার সাথে মিলিয়ে বিকৃত করে উপস্থাপনে কখনোই পিছপা হয় না। এই ধারার সূচনা হয়েছিল দলটির প্রতিষ্ঠাতা মওদূদী সাহেবের মাধ্যমে। দ্বিতীয়ত, সাহাবায়ে কিরামের সম্মান উম্মাহর কাছে একটি অতীব স্পর্শকাতর বিষয় হলেও জামায়াতের কাছে একেবারেই গৌণ বিষয়। শুধুমাত্র মাওলানা আফসারীই নয়, বরং সাহাবায়ে কিরাম সত্যের মাপকাঠি নয়—মাওলানা মওদূদীর এই অবস্থানের পক্ষে ওকালতি করে জামায়াতের আরেক বক্তা মাওলানা আবুল কালাম বাশারও সাহাবায়ে কিরামের ভুল-ত্রুটির তালিকা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন বছরখানেক আগে।

কেবল যে নিজেদের দোষত্রুটি আড়াল করতে জামায়াত কখনো রাসূলুল্লাহর সীরাত, কখনো সাহাবায়ে কিরামের সীরাত আবার কখনো দ্বীনের অন্য কোনো অনুসঙ্গের অপব্যবহার করে তা নয়, বরং নিজেদের কাজের মকবূলিয়ত প্রমাণে অথবা নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিদের প্রশংসায়ও জামায়াতের দ্বীনের অপব্যবহার সর্বজনবিদিত। দলটির এমপি আমির হামজা ঘোষণা দিচ্ছেন, আল্লাহ জান্নাত দেওয়া শুরু করবেন সাতক্ষীরা থেকে। এই ঘোষণার মূল কারণ সাতক্ষীরায় জামায়াতের বড় ভোটব্যাংক। জামায়াতের এই এমপির ঘোষণা নির্বাচনের সময় ভোটের বিনিময়ে জান্নাতের টিকিট বিতরণের একটি ধ্রুপদি প্রমাণ। বছর দুয়েক আগে জামায়াতের আরও একজন আলোচিত সিনিয়র বক্তা কাজী ইবরাহীম বলেছিলেন, আল্লাহ যেভাবে নবীদের নির্বাচিত করেছিলেন, ড. ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচিত হয়েছেন একই পদ্ধতিতে। কেবলমাত্র নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সহায়ক হবে চিন্তা করে কাউকে নবীদের সমতুল্য বলে ভরা মজলিসে প্রচার জামায়াত বৈ অন্য কোনো ইসলামী দলের পক্ষেই সম্ভব নয়। এভাবে নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী দ্বীনের বাড়াবাড়ি রকমের অপব্যাখ্যার জন্য বিখ্যাত আরও এক সিনিয়র বক্তা মাওলানা তারেক মনোয়ারের বিষয়ে আলোচনা করলে এই লেখার কলেবর কয়েক ফর্মায় গিয়ে ঠেকবে।

আদতে আফসারী, আমির হামজা, তারেক মনোয়ার বা কাজী ইবরাহীমরা আলোচনার যোগ্য ব্যক্তিত্ব কি-না তা তর্কসাপেক্ষ। হয়তো আলোচনাযোগ্য না। কিন্তু এ কথা সুস্পষ্ট যে জামায়াত কী আকীদা লালন করে অথবা তাদের কার্যক্রমে কীভাবে দ্বীনকে ট্রান্সলেট করে এটা বুঝতে এসব বক্তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ সোর্স। কারণ জামায়াতের ন্যারেটিভের সবচেয়ে জনপ্রিয় ওরেটর তারাই। তারা যা বলেন তাই যে জামায়াতের সাইবার ফোর্সের কর্মকাণ্ডে প্রমাণ হয় অথবা জামায়াতের সাইবার ফোর্স যা করে তাই যে এসব বক্তার কণ্ঠে বাজে, আদতে এই দুয়ের মাঝে যে কোনো ফারাক নাই, তা আলোচিত যিনাকারী জামায়াতের এমপির পক্ষের সাফাই থেকেও পরিষ্কার হয়েছে।

উলামায়ে কিরাম কেন প্রতিষ্ঠাকাল থেকে জামায়াতের বিরুদ্ধে এত কঠোর, এর প্রধান কারণ সাতক্ষীরার এমপি-কাণ্ড থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। দলটির সাথে আকীদা-আমলের দ্বন্দ্বের আলাপেরও আগে উলামায়ে কিরাম যে বিষয়ে সবচেয়ে বেশি শঙ্কিত ছিলেন তা হলো নিজেদের দলীয় এজেন্ডার আলোকে দ্বীনের নানা শিআর এবং নানা ঘটনার তাহরীফ করা, অপব্যাখ্যা করা এবং নিজেদের অবৈধ কাজের পক্ষে বৈধতা উৎপাদন করা। উলামায়ে কিরাম এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন যে, গোষ্ঠী দলীয় স্বার্থে সীরাত, তারিখ, শরীআত—যেকোনো কিছুর অপব্যাখ্যা করতে পিছপা হয় না, তারা নিজেদের অপরাধ আড়াল করতেও দ্বীনের অপব্যাখ্যায় পিছপা হবে না। বহিষ্কারের পরেও আলোচিত এই এমপির পক্ষে সাফাই গেয়ে জামায়াতের অ্যাক্টিভিস্টরা প্রমাণ করেছেন, উপমহাদেশের আহলে হক উলামায়ে কিরাম যে কারণে উম্মাহকে জামায়াতের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন তা সত্য ছিল।

ফেইসবুকে আমরা...