Logo
দখলদারদের “গ্রেটার ইসরাইল” পরিকল্পনা : ঐতিহাসিক নিরীক্ষণ ও বাস্তবতা
জুনাইদ আহমদ মাশহুর
  • ১ এপ্রিল, ২০২৬

সাম্রাজ্যবাদ বা রাষ্ট্র-সম্প্রসারণের আকাঙ্ক্ষা ও এর নিমিত্তে যুদ্ধবিগ্রহ একটি প্রাচীন রীতি। ইতিহাসের পাতায় যুদ্ধের অধ্যায় আসলে দেখা যায় অধিকাংশ রক্তপাতের কারণই ছিল সাম্রাজ্যবাদ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীতে নূতন বিশ্বমোড়ল আমেরিকা ও তার মিত্ররা এক নয়া বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে হাযির হয়। যুদ্ধের বর্বরতা দর্শনে বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোও তা মাথা পেতে গ্রহণ করে। তৈরি করা হয় জাতিসংঘ।

ইউএন চার্টারের অন্যতম একটি উদ্দেশ্যই ছিল আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। অর্থাৎ, ঐতিহাসিক হোক অথবা রাজনৈতিক কোনো কারণ দেখিয়েই আপনি অন্য আরেকটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের বৈধ এলাকায় আক্রমণ বা দখল করতে পারবেন না। অন্যথায় তা সরাসরি জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন বলে বিবেচিত হবে। ফলে, জাতিসংঘভুক্ত দেশগুলোকে অন্য দেশের জায়গা দখল থেকে বিরত থাকতে হয়।

আসল কথা হলো, এই ভালোমানুষি নিতান্তই কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ। বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো ভেতরে ভেতরে তাদের হারানো সাম্রাজ্য ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে চলছে; যাকে বইয়ের ভাষায় ‘ইরেডেন্টিজম’ বা সম্প্রসারণবাদী জাতীয়তাবাদ বলে আখ্যায়িত করা হয়। যেটা ধীরে ধীরে ‍‘নিও-ইম্পেরিয়ালিজম’ বা নব‍্য-সাম্রাজ্যবাদের দিকে নিয়ে যায়। রাশিয়া সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার মানচিত্র ফিরিয়ে আনতে চায়; যার ফলাফল ইউক্রেন ও ক্রিমিয়ায় আগ্রাসন। চীন মিং ও কিং ডাইনাস্টির বিশাল ভূখণ্ডকে পুনরায় একত্রিত করে সেই স্বর্ণযুগ ফিরে পেতে চায়। ইন্ডিয়ার ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি যাদের পুরো রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজি নির্ভর করে ধর্মীয় দাঙ্গার ওপর সেই বিজেপি তার অন্ধভক্তদের স্বপ্ন দেখায় অখণ্ড ভারতের, যার সীমানায় অন্তর্ভুক্ত আছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভুটান, নেপালের মতো সার্বভৌম দেশগুলো। প্রভাবশালী দেশগুলোর সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবের অস্তিত্ব আসলেই বিদ্যমান।

এই রাষ্ট্রগুলোর পুরনো সাম্রাজ্য ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তীব্র হলেও এসব বাস্তবায়নে তাদের কার্যক্রম খুবই সীমাবদ্ধ ও গোপনীয়। কেউই চায় না সরাসরি জাতিসংঘের চক্ষুশূল হতে। তবে ইসরাইল নামক ভিত্তিহীন, অবৈধ ও দখলদার রাষ্ট্রের “গ্রেটার ইসরাইল” নামক সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনা ও কার্যক্রম এতই খোলামেলা ও দুঃসাহসী যে, প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু সরাসরি প্রেসব্রিফিং করে এই প্ল্যানের ঘোষণা দেয় এবং এমন এক ম্যাপ প্রদর্শন করে যেখানে ফিলিস্তিন, সাউদী আরব, সিরিয়া, জর্ডান, ইরাক, লেবানন, মিশরের মতো সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলোর সীমানাকে কুক্ষিগত করা হয়। যা জাতিসংঘ চার্টারের সাক্ষাৎ বিরোধিতা। জাতিসংঘের যখন এদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা, তখন এর নেতৃবর্গ অকালকুষ্মাণ্ডরূপ ধারণ করে চুড়ি পরে আরাম করেন। চার্টার লঙ্ঘনে কি-ই বা আর আসে যায়!

জায়োনিস্টদের গাযা দখল নিয়ে প্রশ্ন করলে প্রত্যুত্তরে এই জায়গাকে তাদের জন্য “প্রমিজড ল্যান্ড” বা ওয়াদাকৃত জমি এবং নিজেদেরকে “গড’স চুজেন ওয়ানস” বা আল্লাহর নির্বাচিত প্রতিনিধি বলে দাবি করতে দেখা যায়। এই সো-কলড প্রতিশ্রুতিতেই লুকিয়ে আছে “গ্রেটার ইসরাইল”-এর জঘন্য পরিকল্পনা।

জায়নবাদীদের দাবি অনুযায়ী, তানখ (হিব্রু বাইবেল)-এ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের সাথে একটি অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ আছে; যেখানে তাঁর বংশধরদের জন্য নীল নদ থেকে ফোরাত নদী পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল এই ভূখণ্ডের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। যেহেতু জায়োনিস্টরা মনে করে তারাই ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের একমাত্র বংশধর কেননা তারা হযরত ইয়াকুব বা ইসরাঈল আলাইহিস সালামের সন্তান অর্থাৎ বনী ইসরাঈল তাই এই পুরো জায়গাটা তাদের দখলেই থাকতে হবে।

প্রতিশ্রুতিটা কার সাথে সেটার যথার্থ বিশ্লেষণ দরকার। আমরা তাদের মতটাকেই যদি ধরি, তানখের মধ্যে সরাসরি হযরত ইসরাঈলের সন্তানদের প্রতি করা কোনো ওয়াদার কথা আসেনি। ওয়াদা আছে হযরত ইব্রাহীমের বংশধরদের সাথে। ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের বংশধর বলতে সেটা শুধু বনী ইসরাঈলেই সীমাবদ্ধ হয় না, তাতে হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালামের সন্তানরাও অন্তর্ভুক্ত হন। অথচ এসব বিচার না করে জায়োনিস্টদের স্বঘোষিত উত্তরাধিকারী বনে যাওয়াটা যারপরনাই হাস্যকর।

আল্লাহ তাআলা কখনোই নিছক কারো বংশধর হওয়ার জন্য তাঁর সৃষ্টির কাউকে অন্য কারোর ওপর প্রাধান্য দিয়ে তাঁর “চুজেন ওয়ানস” বানাননি কিংবা কোনো ভূখণ্ডের উত্তরাধিকার দেননি। দিয়েছেন তাঁর বান্দাদের মধ্যে সৎকর্মশীলদের। হ্যাঁ, হতে পারে সে বনী ইসরাঈলের কেউ; তবে সেটা সালিহীনদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে, বনী ইসরাঈল হওয়ার কারণে নয়। জেনে রাখা ভালো, তানখ (হিব্রু বাইবেল)-এর মধ্যে ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের বংশধরদের জন্য ওয়াদাকৃত জমিটির সীমানা সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। একটি বর্ণনা অনুযায়ী, গাযাসহ বর্তমান দখলকৃত অঞ্চলই সেই ওয়াদাকৃত ভূখণ্ড। আর অন্য বর্ণনা অনুযায়ী নীল নদ থেকে ফোরাত এর মধ্যকার পুরোটাই তাদের জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ। ভয়ংকর বিষয় হলো, ইসরাইল রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা থেকে শুরু করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সবাই দ্বিতীয় বর্ণনায় বিশ্বাসী!

ফিরে আসা যাক ১৯ শতকের শেষের দিকে। বিশ্বে জায়োনিজমের যাত্রা সবেমাত্র শুরু। ‘থিওডর হারজেল’ নামক হাঙ্গেরিয়ান এক ইয়াহুদী লেখক ও রিভাইশনিস্ট জায়োনিস্টের আবির্ভাব ঘটে। পলিটিক্যাল জায়োনিজমের জনক সে। সর্বপ্রথম তার লেখা ও অ্যাক্টিভিজমের মাধ্যমে স্বতন্ত্র একটি ইয়াহুদী রাষ্ট্র তৈরির ধারণা ফুটে ওঠে। তার জন্য একটি জায়গা নির্ধারণ প্রয়োজন। তানখের সেই বর্ণনা অনুযায়ী তার নযর পড়ে ফিলিস্তিনের ওপর। এই রাষ্ট্রের অস্তিত্বের সাথে সাথে সে এটাও মনে করত যে, মিশরের নীল নদ থেকে ফোরাত নদী পর্যন্ত এর বিস্তার হবে। পরবর্তীতে সে ওয়ার্ল্ড জায়োনিস্ট অর্গানাইজেশন তৈরির মাধ্যমে ফিলিস্তিনে ইয়াহুদী অভিবাসনের কাজ শুরু করে। এজন্য তাকে ইয়াহুদী রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টাও বলা হয়। অর্থাৎ, ইসরাইল অস্তিত্বে আসার শুরু থেকেই জায়োনিস্টদের প্ল্যান ছিল ‘গ্রেটার ইসরাইল’-এর বর্তমান যে ম্যাপ আমরা দেখি, ঠিক ততটুকু জায়গা নিয়ে ইয়াহুদীদের জন্য স্বতন্ত্র একটি রাষ্ট্র তৈরি করা।

সাল ১৯২০। এই কয়েক দশকের মধ্যেই বিশ্বে বিশাল কয়েকটা ঘটনা ঘটে গেছে। মানুষ প্রথমবারের মতো বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা দেখেছে। এযুদ্ধে উসমানীয় শাসকরা পক্ষ নিয়েছিলেন জার্মানদের। জার্মানরা যুদ্ধে পরাজিত হয়েছে। ফলে ভাগ-বাটোয়ারায় ফিলিস্তিন পড়ল ব্রিটিশদের অংশে। ইয়াহুদী রথসচাইল্ড পরিবারের পুষ্য ও বিশ্বস্ত ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার বেলফোর ওয়াদা করেছিল সে ফিলিস্তিনে ইয়াহুদীদের স্থায়ী আবাসন বন্দোবস্ত করবে। সে তার কথা রাখল। শুরু হলো ফিলিস্তিনে ইয়াহুদীদের ‘আলিয়াহ’। খুব জোরেশোরে তা চলতে থাকে। পরবর্তীতে জার্মানিতে ইয়াহুদীদের ওপর নাৎসি বাহিনীর অত্যাচার তীব্র হলে এই অভিবাসন আরও প্রকট রূপ ধারণ করে।

সে সময়ই জায়োনিস্টদের প্রবল আগ্রহ ছিল এই অভিবাসন শুধু ফিলিস্তিনে সীমাবদ্ধ না রেখে আশেপাশে আরও বৃদ্ধি করা। ঠিক তখন রিভাইশনিস্ট জায়োনিস্টরা দেখা পেল নতুন আরেক হারজেলের; নাম তার ‘জেভ জেবোটিনস্কি’। সে খুব করে চাইলো জর্ডানকেও তাদের সীমানায় নিয়ে আসতে; হোক সেটা অস্ত্রশস্ত্রের মাধ্যমে। সে সময় তার বিখ্যাত স্লোগান ছিল “Both sides of the Jordan river, This one’s ours, that side too”। জায়োনিস্টদের মাঝে তার এই চিন্তা-চেতনা বেশ প্রভাব ফেলে। কিন্তু সবকিছু তো তাদের পরিকল্পনা মাফিক আগায় না। আরবরা প্রথম দিকে ইয়াহুদীদের স্বভূমিতে সাদরে বরণ করলেও অভিবাসনের তীব্রতা ও ইয়াহুদীদের দখলের মনোভাব তাদেরকে ভাবিয়ে তোলে। তার ওপর পুরো মুসলিম বিশ্বে খিলাফত পতনের রেশ এখনো বিদ্যমান। বেশি কিছু করতে গেলে মুসলিমদের পক্ষ থেকে বড় ধরনের ঝামেলায় পড়ার ঝুঁকিতে ব্রিটিশরা পিছু হটল। তারা আরবদের খুশি রাখতে মাঝেমধ্যে ইয়াহুদী অভিবাসনে শর্তারোপ ও নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করত। ব্রিটিশদের সেই চিরায়ত রূপ!

হারজেল-জেবোটিনস্কির অনুসারী জায়োনিস্টরা এতে ব্রিটিশ ও আরব উভয়ের প্রতি চরম ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। রিভাইশনিস্টদের নামে বিভিন্ন সন্ত্রাসী মিলিশিয়া গড়ে ওঠে। এরা আরব ও ফিলিস্তিনে বসবাসরত ব্রিটিশদের ওপর কয়েক দফায় গণহত্যা চালায়। জায়োনিস্টরা খেয়াল করল, এভাবে চললে খুব একটা সুবিধা করে ওঠা যাবে না; তাই বড় স্বপ্ন থেকে কিছুটা সরে আসা যায়। আপাতত যা পাওয়া যাচ্ছে তা নিয়েই খুশি থাকতে হবে। রিভাইশনিস্টদের বিপরীতে মেইনস্ট্রিম করা হলো লিবারেল জায়োনিস্টদের; যারা নিজেদেরকে টু-স্টেট সল্যুশনে বিশ্বাসী ও উগ্রতা বিরোধী বলে দাবি করত। এ দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্য ছিল তা শতভাগ সন্দেহপ্রবণ। ভালোমানুষ সাজবার এই প্রতিযোগিতায় জায়োনিস্টরা আগেভাগেই যোগ দেয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ব্রিটিশরা মোড়লগিরি মার্কিনীদের কাছে গচ্ছা দিয়ে বিশ্বব্যাপী সাজানো পসরা গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত। আরব-জায়োনিস্টদের মোকদ্দমা এখন জাতিসংঘের টেবিলে। ফিলিস্তিনকে দুই ভাগ করে জায়োনিস্টদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ঘোষণা এলো। সেই লিবারেল জায়োনিস্টদের নেতা বেন গুরিয়ান হলো দখল করা দেশটির প্রধানমন্ত্রী। বেন গুরিয়ান গ্রেটার ইসরাইলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ এক লোক ছিল। ১৯৩৭-এর চুক্তি পরবর্তী সময়ে তার সন্তানের কাছে প্রেরিত এক চিঠিতে তার এই মনোভাব স্পষ্ট ফুটে ওঠে। তাই ফিলিস্তিনকে দুই ভাগ করার এই চুক্তিকে সে সাময়িক চাল হিসেবেই দেখত। স্বাভাবিকভাবে একটি দেশ বিভক্ত হলে এর সীমানা আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারণ করা হয়। বেন গুরিয়ান এর কার্যক্রম রুখে দেয়। কারণ সে জানত সীমানা অমীমাংসিত রয়ে গেলে তাদের বৃহত্তর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন আরও সহজ হয়ে যাবে।

একে তো আরবরা ফিলিস্তিনের ভাগ হওয়াটা মেনে নিতে পারেনি, এখন আবার সীমানা নিয়েও জটিলতা। এই কারণগুলো দখলদারদের সাথে আরবদের যুদ্ধকে অনিবার্য করে তোলে। ফলে জায়োনিস্টরা তাদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় সফল হতে শুরু করে। দখলদার রাষ্ট্রের জন্য জাতিসংঘের নির্ধারিত সীমানা ছিল পুরো অংশের অর্ধেকের মতো। প্রথম আরব যুদ্ধ শেষে তাদের সীমানা বেড়ে ৭৭ শতাংশ হয়ে যায়। এভাবে দফায় দফায় তা বাড়তেই থাকে। ১৯৬৭ সালের আরব যুদ্ধে দখলদারদের জয়ী হওয়া পুরো ফিলিস্তিন দখলের জন্য তাদেরকে উদগ্রীব করে তোলে। তারা সিরিয়ার গোলান হাইটসও দখল করে। এছাড়া মিশরের সিনাই উপদ্বীপও তারা দখল করতে চেয়েছিল; তবে মিশরের আনোয়ার সাদাতের সাথে ক্যাম্প ডেভিড অ্যাকর্ডে চুক্তির পর তা তারা ফিরিয়ে দেয়।

সাল ১৯৯৩ পর্যন্ত জায়োনিস্টরা পুরো ফিলিস্তিনজুড়েই দখলবাজি চালিয়ে যায়। তখন দখলদারদের প্রধান নেতা ইজহাক রবিন ও প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও)-এর নেতা ইয়াসির আরাফাত কর্তৃক ওসলো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পিএলও ইসরায়েল রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয় এবং ইসরায়েল পিএলও-কে ফিলিস্তিনী জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে মেনে নেয়। সম্প্রসারণবাদী জায়োনিস্টরা এটা মেনে নিতে পারে না। ডানপন্থী সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো রবিনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমে পড়ে। এমনকি সে সময়কার চরম ফার-রাইট নেতা, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী বেন গেভির রবিনকে হত্যার হুমকিও দিয়েছিল। হয়েছিল ঠিক সেটাই; দুই বছরের মাথায় উগ্র-ডানপন্থী আততায়ী ইগাল আমির দ্বারা রবিনকে হত্যা করে। রাষ্ট্রের ক্ষমতায় আসে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু। এরপর থেকে ওসলো চুক্তি পুরোপুরিভাবে কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। পশ্চিম তীরকে তিন জোনে বিভক্ত করা হয়েছে। যার কিয়দংশ নামমাত্র পিএলও-এর বর্তমান প্রধান মাহমুদ আব্বাসের দ্বারা শাসিত হলেও তা দখলদারদের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত। অদ্যাবধি, প্রায় সাড়ে সাত লাখ ইয়াহুদী অবৈধভাবে বসতি গেড়েছে সেখানে। প্রতিনিয়ত এর সংখ্যা বাড়ছে বৈ কমছে না। সিরিয়ার গোলান হাইটসেও এই সংখ্যা বাড়ছেই। গাযায় বলার মতো এমন কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। ৭১ হাজারের বেশি শহীদ, ২ লাখের মতো আহত। ২৫ লাখ মানুষের মাথার ছাদ মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরা আজ শরণার্থী শিবিরে আশ্রিত। হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিছুরই অস্তিত্ব নেই সেখানে।

কয়েক বছর আগেও বৃহত্তর ইসরাইল নিয়ে কথাবার্তা উঠলে তা কন্সপিরেসি বলে উড়িয়ে দেওয়া হতো। আজ ইসরাইলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা পুরো বিশ্বের সামনে বিষয়টি গর্বের সাথে প্রকাশ করছে। নেতানিয়াহুকে প্রেস কনফারেন্সে এ নিয়ে জিজ্ঞাসা করলে সে বলেছিল “এটা প্রজন্মের মিশন”। সাম্প্রতিক এই পরিকল্পনা নিয়ে তার নিজস্ব ভিশন কী সেটা জানাতে একটি ভিডিও প্রকাশ করে। সে এই মিশনকে “আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক” হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। আবার তাদের অর্থমন্ত্রী বলেছে:  “জেরুজালেমের ভবিষ্যৎ হলো, এটাকে সিরিয়ার দামেস্ক পর্যন্ত বিস্তৃত করা”। এমনকি ইসরাইলের সেনাদের ইদানীং ইউনিফর্মে “গ্রেটার ইসরাইল”-এর ম্যাপ সংবলিত ব্যাজ পরিধান করতেও দেখা যায়।

দখলদারদের জায়গায় অন্য কোনো রাষ্ট্র যদি এরকম কিছু করার চিন্তাও করত, আমেরিকা ও মিত্ররা তাদের কী পরিমাণ স্যাংশন আর আক্রমণের ওপর রাখত তা ভাবাটাও মুশকিল। অথচ সাম্রাজ্যবাদী এই রাষ্ট্রকে সবকিছুরই বৈধতা দিয়ে দিয়েছে তারা। গাযা ধ্বংসে তারা যে মনোবল অর্জন করেছে, তার ঝলক সাম্প্রতিক ইরান হামলায় ঠিকই আঁচ করা যাচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে বাকি দেশগুলোতে হামলা করলেও অবাক হওয়ার কিছুই নেই।

গ্রেটার ইসরাইলের পরিকল্পনায় থাকা সাতটি দেশের দিকে আপনি একবার নযর দিন। দেখবেন, এদের সবার সাথেই এই অবৈধ রাষ্ট্রটির সম্পর্ক মোটেও সুবিধার নয়। এই দেশগুলোর মধ্যে যেগুলোর রাষ্ট্রপ্রধান তাদের দাবি মেনে চলছে এবং এ অঞ্চলে তাদের আধিপত্য মেনে নিতে কোনো দ্বিধাবোধ করছে না, তারাই শুধুমাত্র কিছুটা শান্তিতে আছে। এ শান্তিও স্থায়ী নয়। একে একে সবার দিকেই জায়নবাদীদের সম্প্রসারণবাদী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটবে। আজ ফিলিস্তিন, সিরিয়া; কাল জর্ডান, মিশর এবং অন্যান্যরা।

ফেইসবুকে আমরা...