Logo
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার ভেতর ইসলামী রাজনীতি ও সামনের দিনকাল
মারজান আহমদ চৌধুরী
  • ১২ মার্চ, ২০২৬

গত ফেব্রুয়ারি মাসে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। প্রায় অনুমিত ফলাফলের মাঝেও যে বিষয়টি চোখ এড়ায়নি, তা হলো, ভোটের রাজনীতিতে ইসলামপন্থীদের নিঃস্বতা। অনেকে দ্বিমত পোষণ করবেন, যেহেতু জামায়াতে ইসলামী এবারের নির্বাচনে যথেষ্ট ভালো করেছে। তবে সাম্প্রতিক কিছু পরিবর্তনের কারণে আমি জামায়াতকে ‘উসূলী ইসলামপন্থী’ দলের তালিকা থেকে একটু আলাদা রাখছি। প্রসঙ্গত, ইসলামপন্থী দ্বারা বুঝাচ্ছি, যারা রাষ্ট্রযন্ত্রকে ইসলামের আইন-আদর্শ দ্বারা পরিচালনা করতে চান।

বাংলাদেশে ইসলামের নামে রাজনীতি করা দলগুলোকে দুইভাগে ভাগ করা যায়—একভাগে জামায়াত এবং দ্বিতীয় ভাগে অন্যসব ইসলামী দল। দ্বিতীয় ভাগের মধ্যে তিনটি ধারা আছে, যারা রাজনীতিতে কমবেশি সক্রিয়- দেওবন্দী তথা কউমী মাসলাক, মাসলাকে আলা হযরত (ভারত-পাকিস্তানে এরা “বেরলভী” নামে পরিচিত) এবং বালাকোটী তথা সায়্যিদ আহমদ বেরলভী (র.)-এর অনুসারীদের মাসলাকসমূহ। আলা হযরতী ও বালাকোটীরা নিজেদেরকে মোটাদাগে “সুন্নী” বলে অভিহিত করে থাকেন। কউমী ও সুন্নী ঘরানা থেকে জামায়াতকে আলাদা করার কারণ কেবল ‘আকীদা’ নয়। বরং আকীদাগত পার্থক্য তো আছেই; সাথে বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্যও আছে। দেশের ইসলামী দলগুলোর মধ্যে একমাত্র জামায়াত-ই পুরোদস্তুর ‘পলিটিক্যাল পার্টি’। দল হিসেবে তারা কাঠামোবদ্ধ। সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, ক্যাডার বাহিনী, অনলাইন উপস্থিতি, সামাজিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সবই তাদের আছে। জামায়াত বিবর্তনশীল—তারা তাদের লক্ষ্য ও পদ্ধতিতে সময়-সময় পরিবর্তন এনেছে। মরহুম আবুল আলা মওদুদী যখন জামায়াত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন—তাঁর লক্ষ্য ছিল ইসলামী শরীআহভিত্তিক রাষ্ট্র কায়িম করা। দাওয়াত ও বিপ্লবকে তিনি সেই লক্ষ্য অর্জনের পদ্ধতি বানিয়েছিলেন। মাত্র ছয় বছরের মাথায় পদ্ধতি পরিবর্তন করে মওদুদী দলবল নিয়ে ভোটের রাজনীতিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন, যদিও উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য তাদের ভাগ্যে জুটেনি। তবে জামায়াতকে ইসলামপন্থী দল না বলার কারণ হচ্ছে, সম্প্রতি তারা তাদের বুনিয়াদি আদর্শ “ইকামাতে দ্বীন” তথা রাষ্ট্রে শরীআহ কায়িম করার দাবি থেকে প্রকাশ্যে সরে এসেছে। পলিটিক্যাল স্টান্টবাজিতে তারা পাঁড় সেক্যুলার দলগুলোর পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। এছাড়া আকীদাগত কারণেও মরহুম মওদুদী ও তাঁর দল উপমহাদেশের উলামা-মাশাইখের কাছে সমালোচিত। জামায়াত ইসলামপন্থী নয়, এর মানে এই না যে, বাকি সবগুলো দল ও ধারা শতভাগ ‘উসূলী ইসলামপন্থী’। বরং বহু ‘ইসলামী’ নেতা সেক্যুলার-লিবারেল রাজনৈতিক কালচারে স্বচ্ছন্দচিত্তে জীবন ব্যয় করে যাচ্ছেন। তবে এসব দলের হাজারো কর্মী-সমর্থক এমন আছে, যাদের মধ্যে দ্বীন ও উম্মাহর দরদ রয়েছে। তাঁদের জ্ঞাতার্থেই লেখাটির অবতারণা।

কউমী ও সুন্নী ঘরানার দলগুলোর নিজস্ব সবলতা-দুর্বলতা রয়েছে। প্রথমত, কউমী ও সুন্নী দলগুলো জামায়াতের মতো ‘পলিটিক্যাল পার্টি’ নয়; বরং মাদরাসা, উলামা ও খানেকাভিত্তিক কিছু ‘জনসমষ্টি’ মাত্র। রাজনীতি ও ক্ষমতার চেয়ে আকীদা, ইলম, মাদরাসা, আধ্যাত্মিকতা ইত্যাদির প্রতি তাঁদের অঙ্গীকার দৃঢ়। দ্বিতীয়ত, এদের বেশিরভাগের নিজস্ব কোনো ‘রাজনীতি’ নেই। কী জন্য তারা ভোটের মাঠে এসেছেন এবং অন্য দলের চেয়ে তাঁরা কোন দিক থেকে আলাদা, সেটি তারা স্পষ্ট করতে পারেন না। এবার কউনী ও সুন্নী ঘরানার অনেক প্রার্থীর সাথে আমার কথা হয়েছে। তাঁদের কোনো শক্তিশালী দলীয় লক্ষ্য ও ন্যারেটিভ নেই। প্রার্থীভেদে ছোট ছোট দুই-একটি স্থানীয় লক্ষ্য পাওয়া যায়, এর বেশি কিছু না। এরকম শক্তিহীন অস্পষ্ট ন্যারেটিভ নিয়ে ভোটে ভালো ফলাফল আশা করা যায় না। প্রচলিত রাজনৈতিক কালচারে সুবিধা করতে না পারার পেছনে কউমী ও সুন্নী দলগুলোর জন্য আরেকটি বাধা হচ্ছে, তারা জামায়াতের মতো ‘বাস্তববাদী’ নয়। যে কোনো পরিস্থিতিতে নিজেদেরকে গুলিয়ে ফেলার ইচ্ছা ও সক্ষমতা যে জামায়াতের আছে, গত দেড় বছরে তারা তা দেখিয়েছে। কিন্তু কউমী ও সুন্নী দলগুলোর সেই বিলাসিতার সুযোগ নেই। উপমহাদেশের বরেণ্য এই ইসলামী ধারাগুলোর পক্ষে অন্তত প্রকাশ্যে শরীআহ’র দাবি থেকে সরে আসা সম্ভব নয়, এমনকি যদি শরীআহ কায়িম করা তাদের রাজনীতির মূল লক্ষ্য না-ও হয়। আবার জনতাকে আকৃষ্ট করা বা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য অনৈতিক কৌশল বা স্টান্টবাজি করাও সম্ভব নয়। দলগতভাবে এমন অনেক কাজ তারা করতে পারবেন না, যা সেক্যুলার দলগুলো অনায়াসে করে ফেলে। অর্থাৎ, কউমী ও সুন্নী দলগুলো (যারা সেক্যুলার-লিবারেল হতে পারেনি) প্রচলিত রাজনৈতিক কালচারে একপ্রকার ‘আনফিট’, এমনকি তারা যদি নির্বাচনে দু-চারটি আসন পেয়েও থাকে।

রাজনীতির মাঠে ইসলামের পক্ষে কিছু চাওয়া-পাওয়ার আগে ইসলামপন্থী দলগুলোর উচিত হচ্ছে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থাকে ভালোভাবে অনুধাবন করা। আমাদের দেশ বিশ্বরাজনীতির ধরাছোঁয়ার বাইরে মহাসাগরের এককোণে লুকিয়ে থাকা অচেনা কোনো দ্বীপরাষ্ট্র নয়। বরং বাংলাদেশের সাথে বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর ভূরাজনৈতিক স্বার্থ আছে। অর্থনৈতিকভাবেও বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার ওপর আমাদের নির্ভরশীলতা আছে। তাই আমরা চাইলেও সেই বিশ্বব্যবস্থার (World order) বাইরে যেতে পারব না, যে বিশ্বব্যবস্থা আজ দুনিয়াতে চলমান। তাই বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা কীরূপ, এর হাওয়া কোনদিকে বইছে, এর নাটাই কার হাতে—সে সম্পর্কে ধারণা থাকা আবশ্যক। সংক্ষেপে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা সম্পর্কে একটি ধারণা দিই।

চোখের সামনে যে বিশ্বব্যবস্থাকে দেখে আমরা অভ্যস্ত, তার একটি ইতিহাস আছে। ছোট ছোট গোত্রে বসবাস করা মানুষ যখন বড় বড় শহর-বন্দর তৈরি করল, তখন প্রয়োজন পড়ল কিছু নিয়মকানুনের। নিয়মকানুন ছাড়া একত্রে বসবাস করা অসম্ভব। ধীরে ধীরে নগরগুলো সাম্রাজ্যে রূপ নিল, কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা এলো, আইন কঠোর হলো, স্বাধীনতাচেতা মানুষ সামাজিক শৃঙ্খলার স্বার্থে নিজের ব্যক্তি-স্বাধীনতাকে বহুলাংশে বিসর্জন দিয়ে দিল। মানবিতিহাসের সুদীর্ঘ একটি সময় পার হয়েছে রাজতন্ত্রের অধীনে। রাজতন্ত্রে সবার ওপরে থাকতেন রাজা। এর নিচে সামন্তবর্গ, এরপর প্রজা। সামন্তরা প্রজাদের উৎপাদিত সম্পদ শুষে নিয়ে কিছু নিজে রাখত, কিছু রাজার কাছে পৌঁছে দিত। প্রসঙ্গত বলে রাখি, রক্তপিপাসু সেই রাজতন্ত্রের যুগেও মুসলমানরা পৃথিবীতে খিলাফতের মতো ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করে দেখিয়েছেন।

গত দুই-আড়াই শতকে মানুষ যখন বিদ্যাবুদ্ধিতে উৎকর্ষ হাসিল করল এবং নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হলো, তখন রাজতন্ত্রগুলো ধ্বসে পড়তে লাগল। শুরু হলো নানাবিধ তন্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। তবে মূল ঝগড়াটি হলো গণতন্ত্র বনাম সমাজতন্ত্রের মধ্যে। গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী পশ্চিমারা মানবাধিকার, নাগরিক অধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, উদারপন্থা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, মুক্তবাজার অর্থনীতি ইত্যাদির স্লোগান তুলে মানুষকে আকৃষ্ট করল। অপরদিকে সমাজতন্ত্র নিয়ে এলো শ্রমিকের অধিকার, সম্পদে রাষ্ট্রমালিকানা, সাম্য, সমবায় অর্থব্যবস্থা, ধর্মহীনতা, একদলীয় শাসন ইত্যাদি। মুসলিম অঞ্চলগুলো তখন হয় পশ্চিমাদের উপনিবেশ, নতুবা সদ্য সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছে মাত্র। দীর্ঘ ৭৫ বছর সমানে-সমান লড়াই করে ৯০’র দশকে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার পতন হলো এবং ইউরোপ-আমেরিকার নেতৃত্বে জন্ম নিল New World Order বা নতুন বিশ্বব্যবস্থা। এই বিশ্বব্যবস্থার নাম দেওয়া হলো Rule-based International Order বা নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা। পশ্চিমাদের হাতে চলে গেল পুরো বিশ্বের কর্তৃত্ব, যাদের একক নেতা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

তবে শুরু থেকেই এই নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ছিল ছলনাপূর্ণ। মুখে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কথা বললেও যে রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তারা কায়েম করল, তা ছিল Crony Capitalism বা স্বজনতোষী ধনতন্ত্র। রাজার হাত থেকে বের হলেও রাষ্ট্রক্ষমতা তখন বন্দি হয়ে গেল কিছু পলিটিক্যাল এলিটদের হাতে। আগে যেভাবে সামন্তরা প্রজাদের সম্পদ শুষে নিত; এবার বড় বড় ধনকুবেররা ব্যাংক ও বহুজাতিক কোম্পানির মাধ্যমে জনগণের রক্ত চুষে নেয়। যেসব নেতা এই ধনকুবেরদের পথ প্রশস্ত করতে পারে, তারাই ক্ষমতায় বসার অনুমতি পায়। বিশ্ব অর্থনীতিতেও উৎপীড়ন ও বৈষম্যের শেষ নেই। ১৯৩৪ সাল থেকে ব্রেটন উডস সিস্টেমে স্বর্ণের বিপরীতে ডলারকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা গণ্য করা শুরু হলো। ১ ডলারের বিপরীতে ছিল ৩৫ আউন্স স্বর্ণ। সব দেশ আমেরিকার কাছে যার যার স্বর্ণ গচ্ছিত রাখল। ১৯৭১ সালে ব্রেটন উডস সিস্টেম রহিত করা হলো। এরপর থেকে ডলারের বিপরীতে স্বর্ণ নয়; বরং মার্কিন সরকার ও ফেডারেল রিজার্ভের (আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক) ওপর আস্থাই একমাত্র গ্যারান্টি হয়ে দাঁড়াল। এটি যে কতটুকু ভঙ্গুর ও উৎপীড়ক আর্থিক বন্দোবস্ত, তা চিন্তাশীল মানুষ মাত্রই জানেন। আজ বিশ্বের প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্র মার্কিন ডলারকে রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে জমা করে, যার বিপরীতে সমপরিমাণ স্বর্ণের মজুদ নেই। আছে কেবল আমেরিকার তথাকথিত গ্যারান্টির ওপর অটুট আস্থা! ডলারের এই আধিপত্যের ওপর ভিত্তি করে আমেরিকা বিশ্ব-অর্থনীতির ওপর ইচ্ছামতো ছড়ি ঘুরায়, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তথাকথিত এই নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নিয়মনীতিও সবার বেলায় সমান নয়। জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রণীত নিয়মনীতি পশ্চিমাদের জন্য এক, প্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য আরেক। পশ্চিমাদের বন্ধু হলে যে কোনো দেশ সহজেই এসব নিয়মনীতি ভঙ্গ করতে পারে, যেভাবে ইসরায়েল যুগের পর যুগ ধরে করে যাচ্ছে। আবার কোনো দেশ পশ্চিমাদের শত্রু হলে সে দেশের ক্ষেত্রে এসব নিয়মনীতির তোয়াক্কা করা হয় না। ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়ামেন, সুদান, সুমালিয়া প্রমুখ দেশগুলো এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ, যেখানে পশ্চিমারা আন্তর্জাতিক নিয়মনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এসেছে। যে আমেরিকা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে বহু দেশ তছনছ করেছে, সেই আমেরিকা নিজের স্বার্থে আরব বিশ্বের রাজতন্ত্রগুলোকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। এসব কথা ঘরে বসে বানানো কোনো ‘ষড়যন্ত্রতত্ত্ব’ নয়। গত মাসে সুইজারল্যান্ডে আয়োজিত World Economic Forum-এ কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এসব কথা স্বীকার করেছেন। তবে স্বীকার করেছেন তখন, যখন খোদ আমেরিকা তার মিত্রদের স্বার্থের ওপর আঘাত হেনেছে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট কর্তৃক বিশ্বব্যাপী অভাবনীয় ট্যারিফ আরোপ করা, ন্যাটোভূক্ত দেশগুলোর নিরাপত্তার ব্যাপারে উদাসীনতা ও ইউরোপের দেশ গ্রিনল্যান্ডকে দখলের হুমকি দেওয়ার পর পশ্চিমাদের স্বাদের বিশ্বব্যবস্থা নড়ে গেছে। ইউরোপ বুঝতে পেরেছে, আস্থাভাজন বড়ভাই আমেরিকা তাদের নিরাপত্তার প্রতি আগের মতো অঙ্গীকারবদ্ধ নয়। আবার ট্যারিফ আরোপ করে আমেরিকা তাদের বাণিজ্য সংকোচিত করছে। সেইসাথে বিশ্বব্যাপী গর্জে ওঠা উগ্র ডানপন্থা ও গাযায় ইসরায়েলের নৃশংসতা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার ভদ্রতার মুখোশকে টেনে খুলে ফেলেছে। রাজনৈতিক বোদ্ধাদের মতে, ৯০’র দশকে গঠিত তথাকথিত নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে যাচ্ছে এবং প্রাচীন “জোর যার মুল্লুক তার’ নীতির বিশ্বব্যবস্থার আমদানি হচ্ছে। এই নতুন বিশ্বব্যবস্থার পতাকাবাহী হচ্ছে চীন।

পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার সাংস্কৃতিক দিক কতটা কুৎসিত, তা বুঝার জন্য সম্প্রতি ফাঁস হওয়া এপস্টিন ফাইলই যথেষ্ট। যারা জেফ্রি এপস্টিনের দ্বীপে “সভ্য’ পশ্চিমা নেতা, শিল্পপতি, পণ্ডিতবর্গ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জেনেছেন, তারা স্বীকার করবেন যে, পশ্চিমাদের তথাকথিত সভ্যতা-সংস্কৃতি নিতান্ত কদর্যতা ব্যতীত আর কিছু নয়। এপস্টিনের দ্বীপে ছোট ছোট শিশুদের সাথে যে ঘৃণ্য কাজ করা হতো, তা এখানে লিখতেও রুচিতে বাধছে। তবে শুধু যৌন নিপীড়ন নয়; গোপনে বিশ্বরাজনীতি ও মুদ্রাব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করা বহু প্রভাবশালী ব্যক্তি, বিশেষত ধনকুবের ও মিডিয়া জগতের লোকেরা যাদুটোনা ও শয়তানের উপাসনায় লিপ্ত। বা’ল ও মলোচ নামক প্রাচীন পৌত্তলিকদের দুটি উপাস্য, যেগুলোর পূজা বনী ইসরাঈলের মধ্যে একসময় শুরু হয়েছিল, সেগুলোকে আজও তুষ্ট করা হয়। বড় বড় কনসার্ট ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া অনুষ্ঠানে ছাগলসাদৃশ্য মলোচের মূর্তি প্রদর্শন করা হয়। এর জন্য শিশু বলি দেওয়া হয়। এপস্টিনের দ্বীপেও বা’ল দেবতার পূজা করা হতো বলে তথ্য আছে। ইসরায়েল যে গাযার হাজার হাজার নিরপরাধ শিশুকে টার্গেট করে হত্যা করেছে, এর পেছনেও এসব শয়তানী ধর্মাচারের ভূমিকা আছে। সবকিছু খুলে বলতে চাচ্ছি না, সবাই হজম করতেও পারবে না। সংক্ষেপে এই হচ্ছে পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমরা এই বিশ্বব্যবস্থার ভেতরেই বাস করি—আমরা এর অংশ।

ওদিকে চলমান বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে চীন-মডেলের যে নতুন বিশ্বব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে, তা আরও বেশি ভয়ানক। এই বিশ্বব্যবস্থায় গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র উভয়ের খারাপ দিককে একত্রিক করা হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে এটি কট্টর নিপীড়নমূলক, যেখানে সিস্টেমের বিরুদ্ধে টু শব্দটি করা যাবে না। আবার অর্থনৈতিকভাবে এটি লাগামহীন ধনতান্ত্রিক, যেখানে মানুষের কোনো অধিকারই নেই। মানুষকে রোবটের মতো ব্যবহার করে কেবল উৎপাদন বৃদ্ধি করার দিকে মনোযোগ দেওয়া হয়। চীন এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। বলা বাহুল্য, বিশ্বের ধনাঢ্য হর্তাকর্তারা এই বিশ্বব্যবস্থার দিকে ছুটছে। এবার চিন্তা করুন। এই দাজ্জালী বিশ্বব্যবস্থার ভেতরে থাকা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল বাংলাদেশে বসে, তাদেরই বানানো রাজনৈতিক বন্দোবস্তে ইসলামের জন্য বা ইসলামের নামে রাজনীতি করার অর্থ কী? এককথায় এর অর্থ হচ্ছে, আপনি একটি চলন্ত সিঁড়িতে (escalator) চড়েছেন, যা চলছে নিচের দিকে। আর আপনি সেটিতে দাঁড়িয়ে ওপরে উঠার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। যার ফল শূন্য।

তাহলে করণীয় কী? প্রথমেই বলে রাখি, এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য কাউকে হতাশ করা নয়; কেবল বাস্তবতার আয়না দেখানো। মোটাদাগে, ইসলামপন্থীদের সামনে চারটি পথ খোলা আছে। প্রথম পথ হচ্ছে, রাজনৈতিক কার্যক্রম একদম বাদ দিয়ে কেবল নির্দিষ্ট কিছু ধর্মাচার নিয়ে পড়ে থাকা। তবে এটি কোনো উপযোগী সমাধান নয়। এর দ্বারা গণসংযোগ (public contact) ও ন্যারেটিভ তৈরির পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে এবং সাধারণ মুসলমানরা আরও দিকভ্রান্ত হবে। দ্বিতীয় পথ হচ্ছে, ইসলামের জন্য রাজনীতি করার দাবি বাদ দিয়ে গণতন্ত্র, ইনসাফ বা উন্নয়ন ইত্যাদির ন্যারেটিভ নিয়ে আসা। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই দাজ্জালী বিশ্বব্যবস্থার ভেতরে থেকে যে ইনসাফ বা উন্নয়ন হবে, তা কি আদৌও সত্যিকারের ইনসাফ হবে? ইসলাম ছাড়া কেবল জাগতিক ইনসাফ বা বস্তুগত উন্নয়ন কি আসলেই আমাদের লক্ষ্য? তৃতীয় পথ হচ্ছে, এই দাজ্জালী বিশ্বব্যবস্থার ভেতর থেকে বের হওয়া কিংবা এটিকে সমূলে উৎপাটন করা। এরপর ইসলামের আলোয় দেশ-দুনিয়াকে সাজানো। তবে এটি সহজ তো নয়-ই, আপাতত সম্ভবও নয়। না এই উম্মাহর সেই ইচ্ছা আছে, না ঐক্য আছে, না শক্তি আছে। এই দাজ্জালী বিশ্বব্যবস্থা ভাঙবে ইমাম মাহদী ও সায়্যিদুনা মাসীহ (আ.) এর মুবারক হাতে, অন্তত আমার এই ধারণা। এর আগে মাযলুম এই উম্মাহকে আরও বহু পরীক্ষা দিয়ে যেতে হবে। চতুর্থ পথ হচ্ছে, ইসলামপন্থীরা (যারা সেক্যুলার-লিবারেল হতে পারবে না) নিজেদের রাজনৈতিক চিন্তা ও কার্যক্রমকে নতুন ধারায় সাজাবেন। আপাতত কয়েকটি বছর ভোটের রাজনীতির ওপর গুরুত্ব কমিয়ে (একেবারে বাদ দেওয়ার কথা বলছি না) সামাজিক-সাংস্কৃতিক রাজনীতির ওপর গুরুত্ব দেবেন। এর দ্বারা ছোট হলেও ভিন্ন কিছু রাস্তা খুলবে, গণসংযোগ হবে, দিকভ্রান্ত সাধারণ মুসলমানদের চিন্তার জগতে নাড়া পড়বে, ন্যারেটিভ তৈরি হবে, প্রস্তুতি সম্পন্ন হবে। এ ব্যাপারে আমার কিছু ভ্রাতৃসুলভ পরামর্শ আছে। তবে কলেবর বৃদ্ধির আশঙ্কায় এই নিবন্ধ এখানেই শেষ করছি। পরবর্তী কোনো পর্বে চতুর্থ পথ নিয়ে বিশদ আলাপ করব।

ফেইসবুকে আমরা...