Logo
জায়োনিস্টদের বিরুদ্ধে ইরানের সংগ্রামে আমাদের অবস্থান
জুলফিকার মুরতাজা
  • ৬ মার্চ, ২০২৬

ইরানে সম্প্রতি জায়োনিস্ট শক্তির আগ্রাসন এবং এর বিরুদ্ধে তাদের সর্বোচ্চ প্রতিরোধ দেশটিকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে পরিচিত করেছে। চলমান এ যুদ্ধকে

কেবল একটি আঞ্চলিক সামরিক উত্তেজনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি পশ্চিম এশিয়ার (মধ্যপ্রাচ্যের) দীর্ঘদিনের ভূরাজনৈতিক, আদর্শিক ও ক্ষমতার রাজনীতির বহুমাত্রিক প্রতিফলন।

১৯৭৯ সালের ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে ইরান নিজেকে পশ্চিমা আধিপত্যের বাইরে একটি স্বাধীন ভূরাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে। তাদের রাষ্ট্রদর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে বৈশ্বিক দাদাগিরির বিরোধিতা। অপরদিকে জায়নবাদী ইসরায়েল নিজেকে পশ্চিমা ব্লকের প্রধান মিত্র হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য ধরে রাখতে চায়। এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান যুদ্ধকে অনেকেই সাম্রাজ্যবাদ বনাম আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রের লড়াই হিসেবে দেখেন। ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইরানের অবস্থান, তথা রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিকভাবে এক্সিস অব রেজিস্ট্যান্সকে সমর্থন, ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে সত্যিকার সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শক্তি হিসেবে প্রমাণ করে। যদিও ইরানের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় স্বার্থও এখানে কাজ করে, তবুও বহুকাল ধরে তারা প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ যোদ্ধাদের পক্ষে যে অবস্থান নিয়ে আসছে তা পুরোপুরি কৃত্রিম এ দাবি আদতে সাধারণ যুক্তিতে গ্রহণযোগ্য বলে গৃহীত হয় না।

মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক দশক ধরে সকল রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে শিআ-সুন্নী এর দ্বন্দ্ব হিসাবে দেখানোর মাধ্যমে ব্যাপকভাবে “ইরান ফোবিয়া” ছড়ানো হয়েছে। এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে শিআদের সাথে আহলুস সুন্নাহর দ্বন্দ্ব যৌক্তিক এবং ঐতিহাসিক। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যে আরব রাষ্ট্রগুলোর পৃষ্ঠপোষকতায় ইরানের উত্থানকে “শিআ ফোবিয়া” দ্বারা প্রতিহত করার চেষ্টা করা হয় এই সকল রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধান উদ্বেগ কখনোই কোন ধর্মীয় মতবাদ নয়; বরং ক্ষমতার ভারসাম্য ও নিজেদের শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা।

সাউদী আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন- এসব রাষ্ট্রের নীতিতে ইরানবিরোধিতা সর্বাংশে ভূরাজনৈতিক। ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডস-এর মাধ্যমে কিছু আরব রাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া দেখায় যে, এসব আরব শাসকদের কাছে সুন্নী মতাদর্শ সমুন্নত রাখা বড় কোন বিষয় নয়, বরং নিজেদের রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে তারা জায়োনিস্টদের বন্ধু হতেও পিছপা হবে না। আরব রাষ্ট্রগুলোর কাছে ইসলাম, মুসলমান, ফিলিস্তিন, আল আকসা কোন কিছুই যে আদতে গুরুত্বপূর্ণ নয় তা আমরা তুফান আল আক্বসা পরবর্তী সময়ে গত দুই বছরে গাযায় জায়োনিস্টদের বর্বর গণহত্যায় আরবদের চুপ থাকা থেকে স্পষ্টতই বুঝতে পারি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সর্বশেষ আরব সফরকালে সাউদী, কাতার, আরব আমিরাত যখন আমেরিকার সাথে ট্রিলিয়ন ডলার চুক্তি করছিল তখন তারা একবারও ট্রাম্পকে গাযায় গণহত্যা বন্ধের জন্য চাপ প্রয়োগ করেনি, যা খোদ ট্রাম্প প্রশাসনকেই বিষ্মিত করেছিলো বলে ওয়াশিংটন পোস্টের খবরে জানা যায়।

সাম্রাজ্যবাদী যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের ভূখণ্ডে প্রায় বিশটি সামরিক ঘাটি নির্মাণের অনুমতি দিয়ে এসব আরব শাসকরা এ অঞ্চলে যে কোন স্বাধীনচেতা জাতির জন্য হুমকি হিসেবে নিজেরাই নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তার ফলস্বরূপ চলমান ইরান-জায়োনিস্ট যুদ্ধে ইরান তাদের ভূখণ্ডে অবস্থিত মার্কিন ঘাটি অথবা জায়োনিস্ট সেনারা অবস্থান করছে এমন স্থাপনায় হামলা করছে। এসব হামলাকে আরবে শিআদের হামলা হিসেবে দেখানোর যে প্রাণান্তকর চেষ্টা এদেশের আহলে হাদীস আলিমরা করছেন তা তাদেরকে কেবল আরব রাজতন্ত্রের একনিষ্ঠ সেবক হিসেবেই প্রমাণিত করছে। আরব রাজতন্ত্রের সেবক এসব আলিমদের কেউ কেউ ইরান বিরোধিতাকে ঈমানী প্রশ্নে রূপ দিয়েছেন, যা সুস্পষ্টভাবে তাদের পদস্খলন এবং দ্বীনী ইলমের খিয়ানত। বিশেষতঃ আহলে সাউদের নিয়ন্ত্রণাধীন নজদ অঞ্চলের কেন্দ্রবিন্দু রিয়াদে মার্কিন সেনা ঘাটিতে ইরানের হামলাকে যেসব নজদী আহলে হাদীস আলিম “হারামাইনে হামলা” হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে উপস্থাপন করে অন্যায্য ইরান বিরোধী ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। এরা যে প্রকারান্তরে এদেশের মুসলমানদের মধ্যে পরোক্ষভাবে জায়োনিস্ট এজেন্ডাই প্রচারে শামিল হচ্ছেন, এ বিষয়ে তারা বেখবর হওয়ার কথা না।

বস্তুত গালফ অঞ্চলের রাষ্ট্রসমূহের সাথে ইরানের দ্বন্দ্ব যতোটা না শিআ-সুন্নী দ্বন্দ্ব, তার থেকে বেশি আরব-পারসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আঞ্চলিক নেতৃত্বের লড়াই এবং মসনদ রক্ষার রাজনীতি। যে লড়াইয়ে জায়োনিস্টদের প্রচারিত ইরান ফোবিয়া আরবের শাসকদের এমন অধঃপতনে নিমজ্জিত করেছে যে, তারা বাইতুল মুকাদ্দাসে মুসলমানদের বৈধ অধিকার, ফিলিস্তিনে জায়োনিস্টদের বর্বর গণহত্যা এবং জায়োনিস্টদের দ্বারা গালফ-লেভান্টের রাষ্ট্রসমূহের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন কোন কিছুকেই নিজেদের জন্য বিবেচ্য বিষয় হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে না। ফলশ্রুতিতে সারা বিশ্বের মুসলমানদের হৃদয়ে এ বিশ্বাস প্রোথিত হয়ে গিয়েছে যে, এসব আরব শাসকরা কখনোই উম্মাহ হিসেবে মুসলমানদের স্বার্থ সমুন্নত রাখার চেষ্টা করবে না। বিশ্বের মুসলমানরা যে এসব শাসকদের মুসলমান হিসেবে নিজেদের আপন ভাবা থেকে গুটিয়ে নিয়েছে তা স্পষ্ট হয়েছে চলমান যুদ্ধে উপসাগরীয় অঞ্চলের আরব রাষ্ট্রগুলোতে ইরানের হামলার মাধ্যমে। এসব হামলায় সারা বিশ্বের মুসলমানদেরই প্রকাশ্য সম্মতি আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে স্পষ্ট দেখতে পাই। নজদী মাদখালী শাইখরা এসব হামলাকে “সুন্নী আরবে শিআ ইরানীদের হামলা” হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করলেও সাধারণ মুসলমানরা তো বটেই এমনকি হামলার শিকার দেশে অবস্থান করা মুসলমানরাও এসব ন্যারেটিভ গ্রহণ করেনি। ইরানের ছোড়া মিসাইল বাহরাইন, কাতার, কুয়েতে আঘাত করলে এসব দেশে অবস্থানরত মুসলমানদের উচ্ছ্বাসের যেসব ভিডিও আমরা দেখতে পাই, তা থেকে স্পষ্ট হয় বর্তমান আরব শাসকরা কতটা জনবিচ্ছিন্ন, উম্মাহর অনুভূতি থেকে কত দূরে তাদের অবস্থান। এসব আরব রাষ্ট্রে ইরানের হামলার নীরব সম্মতি মুসলমানদের হৃদয়ে তৈরি হয়েছে মূলতঃ গত আড়াই বছরে ফিলিস্তিনে গণহত্যা চলাকালে স্বার্থপর আরব শাসকদের নীরবতার কারণে।

একথা স্বীকারে কোন দ্বিধা থাকা উচিত নয় যে বর্তমান সময়ে বাহ্যিকভাবে ইরানই মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহের মধ্যে ফিলিস্তিন ও আল আকসার জন্য সংগ্রামের প্রশ্নে প্রত্যাশিত অবস্থান নিয়েছে। ইরানের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়া এক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স এর অস্তিত্ব বহু আগে বিলিন হতে পারতো, যারা দীর্ঘদিন যাবত গালফ এবং লেভান্টে জায়োনিস্টদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম জারি রেখে আল আকসায় মুসলমানদের অধিকারের প্রশ্ন এখনো সতেজ রেখেছে; এবং জায়োনিস্টদের গ্রেটার ইজরায়েল বাস্তবায়নে বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর প্রায় সাতচল্লিশ বছরের শাসনামলে তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদে অনেক মুসলিম রাষ্ট্র যে উজাড় হয়েছে, অন্যায়ভাবে অসংখ্য মুসলমানের রক্ত ঝরেছে, সে সত্যও অস্বীকার করার মতো নয়। সুতরাং আল আকসার অধিকার প্রশ্নে কিংবা সাম্রাজ্যবাদী জায়োনিস্টদের বিরোধিতার প্রশ্নে ইরানের বর্তমান অবস্থানকে সঠিক হিসেবে সাধুবাদ জানালেও এটিকে শিআ মতবাদের সঠিকতা হিসেবে দেখে শিআবাদ দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার সুযোগ নেই। আল আকসায় নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সাম্রাজ্যবাদী বহিঃশক্তির মুকাবিলায় হাজার বছর ধরে আহলুস সুন্নাহর অনুসারী সূফী মতাদর্শের মুজাহিদরাই যে বারবার উম্মাহর জন্য জিহাদ করেছেন; সে ইতিহাস আমাদেরকে স্মরণ রাখতে হবে। নূর উদ্দীন জঙ্গী, সালাহউদ্দীন আইয়ূবী, সাইফুদ্দীন কুতুজ, রুকনুদ্দীন বাইবার্স প্রমুখ থেকে শুরু করে সর্বশেষ শহীদ ইসমাঈল হানিয়া পর্যন্ত প্রতিটি নামই আল আকসার জন্য এবং উম্মাহর স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামে আহলুস সুন্নাহর অনুসারী আহলুত তাসাউফের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।

বর্তমানে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অনুসারীদের দুর্ভাগ্য এটাই যে, কিছু নফস পূজারি আরব শাসকরা এখন বিশ্বজোড়ে তথাকথিত “সুন্নী” শাসক হিসেবে পরিচিত। এসব নফসের পূজারি শাসকদের অবস্থানের তুলনায় ইরানের শাসকদের অবস্থানকে আমরা হক হিসেবে গ্রহণ করলেও সেটিকে শিআ মতবাদ গ্রহণের পথ হিসেবে দেখার কোন সুযোগ নেই। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, বিভিন্ন মতের মুসলমানরা একটি নির্দিষ্ট ন্যায্য ইস্যুতে একসঙ্গে অবস্থান নিয়েছেন, কিন্তু নিজেদের ধর্মতাত্ত্বিক পরিচয় অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়া আর কোনো নির্দিষ্ট মতবাদে ঝুঁকে পড়া এক বিষয় নয়, এ দুইয়ের পার্থক্য বোঝাই বর্তমান সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ।

ফেইসবুকে আমরা...