জানুয়ারি। ইংরেজি বর্ষপঞ্জিকা শুরু। শুরুর মাসে সমাপ্তি ঘটলো একটি জীবনের, একটি বিপ্লবের, একজন মহানায়কের। দিনটি ছিল বুধবার। ২০০৮ সালের ১৬ জানুয়ারি। ইন্তিকাল উত্তর তিনি যেমন আলোচনায় এসেছেন, ঠিক তেমন কাগজে কলমে অঙ্কিত হয়েছে তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের বিভিন্ন দিক। তিনি বহু বিশেষণে বিশেষিত, বহু অভিধায় অভিহিত। প্রায় এক শতাব্দির কাছাকাছি জীবনকাল। সমাজ, ধর্ম, দেশ, জাতি ও রাষ্ট্রের এক ক্রান্তিলগ্নে তাঁর আগমন। দেশের সাধারণ মুসলমানদেরকে ভ্রান্ত ফিরকা থেকে উত্তরণে তাঁর পরিকল্পনা প্রচেষ্টা তৎপরতা, বলা যায় এক বৈপ্লবিক ভূমিকা। পার হয়েছে মৃত্যুর দেড়যুগ; তিনি এখনো প্রাসঙ্গিক। বারবার যেতে হয় তাঁর কাছে। আমার শব্দপাত তাঁর ওফাত বার্ষিকীর স্মরণ মাত্র।
আল্লাহ: আল্লাহর অস্তিত্ব সকল ধর্মে স্বীকৃত। বিশ্বাস বিনিময় ধ্যান—ধারণা, চিন্তা—চেতনা লালনপালন ভিন্ন ভিন্ন। ইসলাম ধর্মে আল্লাহতে বিশ্বাস প্রথম এবং প্রধান। আল্লাহ বিষয়ক বিষয়াদি আল্লাহ—রাসূলের স্পষ্ট বর্ণনায় বর্ণিত। আল্লাহকে কোন নামে ডাকতে হবে, সেটাও বলে দেওয়া হয়েছে কুরআনে। অথচ প্রবৃত্তি থেকে আবিষ্কার করা হলো— আল্লাহ আমাদের প্রভু। এই সম্বোধন কুরআনের সাথে মুখোমুখি সাংঘর্ষিক। সাংঘর্ষিক এই রণাঙ্গণে একজন বিপ্লবী সংগঠকের উপস্থিতি অনিবার্য হয়ে দাঁড়ালো। তখনই খানকা থেকে বেরিয়ে পড়লেন এক মর্দে মুজাহিদ। রুখে দাঁড়ালেন ঈমান আগ্রাসনের বিপক্ষে। ঈমান লুটেরার বিরুদ্ধে। বয়ানকে বানালেন বর্শা। মাহফিলে মাহফিলে শোনালেন- قُلِ ادْعُوا اللَّهَ أَوِ ادْعُوا الرَّحْمَٰنَ ইতিহাস সচেতন এই বিপ্লবী পুরুষ, জাতিকে শোনালেন দীর্ঘ ইতিহাস। হিন্দুধর্মে ঠাকুরকে বলা হয় ‘প্রভু’। যিনি ঠাকুরের চেয়ে বড় তার নাম— ‘মহাপ্রভু’। বাস্তবতায় বিশ্বাসী এই ইতিহাসবিদ টানলেন বাস্তব উদাহরণ। আল্লাহ (প্রভু) নয়, মহাপ্রভুর বাড়ি আমার সিলেটের ঢাকা দক্ষিণ। তাঁর মরণপণ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে উম্মাহ বুঝতে পারলোÑ প্রভু শব্দ দিয়ে আল্লাহ সম্বোধন হয় না, হবে না। এর উৎপত্তি সনাতন ধর্ম থেকে। প্রয়োগ ব্যবহার হিন্দু সমাজের।
কুরআন: রদবদলের কোনো সুযোগ নেই। ধর্মগ্রন্থ পরিবর্তন পরিবর্ধনের অভ্যাস ইয়াহুদ—নাসারার। অথচ অন্তহীন আক্ষেপ যে, কুরআনের সুনির্দিষ্ট একটি হরফের উচ্চারণ সম্পূর্ণরূপে বদলে দেওয়া হয়েছিল। অবশিষ্ট অক্ষরগুলোর উচ্চারণ ছিল নিজস্ব খেয়াল খুশি মতো। অনেকটা বাংলা বর্ণের আদলে। এতে অর্থের মারাত্মক বিকৃতি ঘটে। নামায হয় না। হরফ বদলের মহোৎসব, গলত তিলাওয়াতের ছড়াছড়ি নিতান্ত স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে এসেছিল। তখন অনিবার্য হয়ে পড়লো শুদ্ধ তিলাওয়াতের স্বপক্ষে গর্জে ওঠা। হ্যাঁ, যথার্থভাবে গর্জে ওঠলেন আহমদ হিজাযীর হাতেগড়া শিষ্য। ভারতবর্ষে তাঁর সনদপ্রাপ্ত একমাত্র ছাত্র। তৎকালীন ভয়াবহ পরিস্থিতি শুনি এই শিষ্যের যবানে- ভারত বিভক্তির পর ১৯৫০ইং সনে আমি বদরপুর থেকে বাড়িতে (ফুলতলী) চলে আসি। তখন দোয়াদ হরফের উচ্চারণ যারা যোয়া এর মতো পড়তেন তাদেরকে বলা হতো হক্কানী আলিম। প্রতিবাদ প্রতিরোধের ঝড় তুললেন। এখানেও দেখা যায় মূল হাতিয়ার বয়ান। ফিকহ শাস্ত্রের উদ্ধৃতি টানলেন। হরফ পরিবর্তন করা কুফরী, ভুল তিলাওয়াতে নামাযের মতো বড় ইবাদত বরবাদ। গড়ে তুললেন সহীহ তিলাওয়াতের প্রতিষ্ঠান। লিখলেন তাজবীদ বিষয়ে মূল্যবান কিতাব। কঠোর পরিশ্রমে তৈরি করলেন শুদ্ধ তিলাওয়াতে সক্ষম বিশাল কর্মী বাহিনী। কুরআনের খিদমতে তাঁর তাজদীদী ভূমিকা বহন করে চলছে সফল একটি বিপ্লবের নিশান। বিকৃতির কবল হতে কুরআন সংরক্ষণ, উম্মাহর মুখে বিশুদ্ধ তিলাওয়াত, কুরআন পঠনে আরবী লেহেন পুনঃস্থাপন এই বিপ্লবের উৎপন্ন ফসল। আহমদ হিজাযীর হাতেগড়া এই সৈনিক যদি শির উঁচু করে না দাঁড়াতেন, উম্মাহ গলতের দরিয়ায় তলিয়ে যেত।
রাসূল সা.: নবী যুগে মুনাফিকদের আপত্তির বড় বিষয় ছিল রাসূলের শান—মান। রিসালতের বিশালত্ব। গত শতাব্দিতে তাদের দোসররা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। রাসূলের শানে এমন কটূক্তি করে, যা অতীতের অনেক রেকর্ড অতিক্রম করে। রাসূল সা. আরো দশজনের মতো একজন সাধারণ মানুষ। নবুওয়াতের ২৩ বছর আমাদের জন্য অনুসরণীয়, নবুওয়াত পূর্ব ৪০ বছর অনুসরণীয় নয়। উক্তির সাথে যুক্তি জড়িয়ে দেওয়া হলো, যদি তিনি আরো দশজনের মতো না হতেন, তবে মায়ের গর্ভ থেকে জন্ম হতো না। বিয়ে—শাদী করতেন না, বাজারে যেতেন না, ব্যবসা—বাণিজ্য করতেন না, যুদ্ধে যেতেন না, মার খেতেন না। ২৫ বছর বয়সে হিলফুল ফুযুল প্রতিষ্ঠা করে সমাজে শান্তি আনতে পারেননি, তিনি দোষে গুণে মানুষ, এজন্য তাঁকে ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাসূলের মান ক্ষুণ্ণ হয় এমন আরো অনেক কটূক্তি। রাসূলকে আহ্বান করার পরিভাষা খোদ আল্লাহ বলে দিয়েছেন। তথাপি Political Labrotory থেকে আবিষ্কার হলো- রাসূল আমাদের নেতা। সাংগঠনিক প্রশিক্ষণ, তাফসীর মাহফিলের স্লোগান, দেয়াল লিখনসহ সবকিছুতে যুক্ত হলো এই পরিভাষা। এই প্রেক্ষাপট অনিবার্যভাবে ডাকলো উমরের তলোয়ার। হাসসান বিন সাবিতের শের। আচমকা ময়দানে অবতীর্ণ হলেন জিহাদী চেতনায় উজ্জীবিত, সময়ের এক সূর্য সন্তান, হুব্বে রাসূলের বিদগ্ধ আত্মার অধিকারী এক বীরপুরুষ। তাঁর ওয়ায—নসীহত, মজলিস, মাহফিল, সভা সেমিনার, তালীম—তরবিয়াত রূপ নিলো তিতুমীরের বাঁশের কেল্লায়। জীবনভর মাঠে ময়দানে গাইলেন রাসূলের আযমতের গান। রাসূলের ইযযত লুণ্ঠিত হয় এমন একটি শব্দ পৃথিবীর যেখানে উচ্চারিত হয়েছে, সেখানেই হাযির বীরবেশী এই আশিকে রাসূল। হাত মুখ কলবের সম্মিলিত যুদ্ধাভিযান। হাঁকলেন আল্লাহর বিধানÑ মুহাম্মদ সা. তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন। তাঁর পরিচয় তিনি আল্লাহর রাসূল لَّا تَجْعَلُوا دُعَاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاءِ بَعْضِكُم بَعْضًا তিলাওয়াত করে শোনালেন। মর্মার্থ বুঝালেন। নবী জীবনের যত পয়েন্ট আক্রান্ত হলো, পয়েন্টে পয়েন্টে তোললেন প্রতিবাদের ঝড়। নানামুখী প্রতিরোধ। কবিতায় বয়ানে স্বতন্ত্র সমাবেশে। নালায়ে কলন্দর, দরবারে রিসালাতে গৌরবের গান। গোস্তাখে রাসূলের জবাব। লিখিত আপত্তি। মানহানির কাব্যিক নিন্দা। রিসালাতের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন। রাসূলের শানে কটূক্তির দাঁতভাঙা জবাব, গোস্তাখীর নিন্দায় তিনি ব্যয় করেছেন সারা জীবন। তৃণমূল থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উজ্জ্বল উদাহরণ। আন্তর্জাতিক শানে রিসালাত মহাসম্মেলন। মুনতাখাবুস সিয়ার। নবী জীবনের উপর সংক্ষিপ্ত আলোকপাত। ছয়শত পৃষ্ঠার বিশাল সীরাতগ্রন্থ; সিরাত চর্চায় প্রামাণ্য দলীল। তিনি নিজের জীবনের চেয়ে, নিজের প্রাণের চেয়ে অধিক ভালোবাসতেন একটি জীবন, একটি প্রাণ, মুহাম্মদ সা. এর নাম। প্রতিপক্ষ তাঁর রক্ত ঝরিয়েছে, প্রতিবাদে নেই টু শব্দ। রাসূলের শানে সামান্য বেয়াদবী তিনি সহ্য করতেন না। জ্বলে উঠতেন আগুনের মতো। বারুদ হয়ে দাঁড়াতেন, প্রতিকার না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরতেন না। রাষ্ট্র সামলাতে রাষ্ট্র শক্তি এগিয়ে আসতো। প্রতিকার করতো। রাসূলের ইজ্জত সমুন্নত রাখতে এই আত্মত্যাগ কেবল ইতিহাস নয়, পরিপূর্ণ এক বিপ্লব ঘটিয়েছেন। এই বিপ্লবের ফলিত ফসল দিকে দিকে হুব্বে রাসূলের জয়জয়কার। তিনি জীবনের বিনিময়ে, আপন শরীরের তাজা খুন উৎসর্গ করে, রাসূলের ভালোবাসা জাগ্রত করেছেন হৃদয়ে হৃদয়ে।
রাজনীতি: তিনি সাঁতরাতে অভ্যস্ত ছিলেন না প্রচলিত রাজনীতির ঘোলা পানিতে। চলমান রাজনীতির বাহিরে ছিল তাঁর অবস্থান। বটবৃক্ষের মতো দেশ জাতি ধর্ম গোষ্ঠীর অভিভাবক হিসেবে। দেশ—ধর্মের যেকোনো সংকটে তাঁকে পাওয়া গেছে নিতান্ত নিকটে। আন্দোলন সংগ্রামের সামনের সারিতে। এই সংগ্রামী মানুষটির জন্মের পর নাম রাখা হয়— মো. আব্দুল লতীফ চৌধুরী। পরিণত বয়সে নিজের নাম নিজে রাখলেন কলন্দর। দুনিয়াদারীর ঝামেলামুক্ত ব্যক্তি। মুক্তমনা স্বাধীনচেতা চির প্রতিবাদী এই মানুষ ঊর্ধ্বে ছিলেন দলীয় সংকীর্ণতার, ক্ষমতা কেন্দ্রীক রাজনীতির, ভোট সর্বস্ব প্রতীকের। পাকিস্তান আমলের কথা। পাকিস্তানের শিল্পমন্ত্রী দেওয়ান আব্দুল বাছির প্রস্তাব করলেন তাঁকে মন্ত্রী বানাতে। জবাব শুনিÑরাজনৈতিক দর্শন বুঝি। চেয়ারে বসলে রাজা, নেমে গেলে ডোরাসাপ। আমাকে দিয়ে এমনটি হবে না। তাই বলে বিমুখ ছিলেন না নির্বাচন ভোটে, আন্দোলন সংগ্রামে, প্রতিবাদ—প্রতিরোধে। ব্রিটিশ আমলে মাদরাসা শিক্ষা বন্ধের ষড়যন্ত্রে বদরপুরে আন্দোলনের যে দাবানল দেখা যায়, সেটা তাঁরই সৃষ্টি। পাকিস্তান আমল। ১৯৫৪ সনে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন। পরবর্তী ইসলামী শাসনব্যবস্থা কায়িমের সংগ্রাম। কেবল অংশগ্রহণ নয়, ছিল তাঁর সক্রিয় নেতৃত্ব। বলিষ্ঠ দিক নির্দেশনা। হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানবীর খলীফা মাওলানা আতহার আলী (যুঙ্গাদিয়া) এর বিশেষ অনুরোধে তিনি দেশের জেলায় জেলায় সফর করেন। ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পক্ষে জনমত গড়ে তোলেন দেশ জাতির প্রয়োজনে, ইসলাম ও মুসলমানের স্বার্থ রক্ষায়। তড়িৎ বেগে মাঠে নামতেন বিরল সাহসিকতায়। চৌকস বুদ্ধিমত্তায়। সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণে তিনি ছিলেন রাজনীতিবিদগণের অভিভাবক, আশ্রয়স্থল। প্রয়োজনের তাগিদে ভোটে নেমেছেন। জোটে অংশ নিয়েছেন। নিজের প্রতিনিধি হিসেবে প্রার্থী দিয়েছেন। যোগ্য প্রার্থীকে সমর্থন জানিয়েছেন। ১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচন। পাকিস্তান প্রত্যাখ্যান, স্বাধীনতা অর্জনের মাইলফলক। তৎকালীন সিলেট—৭ আসন। জকিগঞ্জ—কানাইঘাট—বিয়ানীবাজার। সংসদীয় অঞ্চলে তাঁর নির্দেশে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন শাইখুল হাদীস আল্লামা হবিবুর রহমান। এরকম বহু উদাহরণ দেওয়া যাবে। পেশাদার রাজনীতিবিদ কিংবা রাজনীতিবিমুখ আলিমে দ্বীন, তাঁর বেলায় উভয়ই অকার্যকর। ব্রিটিশের বিদায়লগ্ন। পুরো পাকিস্তান আমল। আমৃত্যু বাংলাদেশ, তিনি লড়েছেন লড়াকু সৈনিকের মতো। বালাকোটের উত্তরাধিকার হিসেবে ন্যায্য আন্দোলন সংগ্রামে তাঁর সরব উপস্থিতি, বীরত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ, আন্দোলনকে দিয়েছে বিপ্লবের রূপ। প্রায় শতাব্দিব্যাপী জীবনকাল। জীবনের সমূহ ঘটনা প্রবাহ, সূচিত খিদমত, তাঁর অনুপস্থিতিতে জীবন্ত। সবেগে সচল। একটি ইঙ্গিত দিয়ে যায়, তিনি অনিবার্য বিপ্লবের অবিসংবাদিত একজন স্থপতি।

