শরীফ ওসমান হাদীর আত্মত্যাগের খবর কারো অজানা নেই। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উঠে আসা এই তরুণ নেতা আততায়ীর গুলিতে শাহাদত বরণ করেন এই ডিসেম্বরে। ঢাকা-০৮ আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী হিসেবে প্রচারণা চালাচ্ছিলেন, তফসিল ঘোষণার পরপর আততায়ীর গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়েছিল তার মাথা, শেষ পর্যন্ত চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে। আপাত দৃষ্টিতে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরপর সম্ভাব্য প্রার্থীর উপর আক্রমণকে কেবলই নির্বাচন সংশ্লিষ্ট ঘটনা মনে হতে পারে, দেশের নামকরা এক দৈনিক পত্রিকার শিরোনামও ছিলো এরকম— “তফসিলের পরদিন ‘প্রার্থী’ গুলিবিদ্ধ”। আবার আওয়ামীলীগের পলায়নের পর শূন্য কোটায় রাজনীতির প্রথম সারিতে চলে আসা একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীও ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাকে নির্বাচনী রাজনীতির সাথে জড়িয়ে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেছিল হাদির সংসদীয় আসনে বিএনপির প্রার্থীকে এই ঘটনায় দায়ী করার চেষ্টাও করেছিল, যদিও শেষ অবধি সে প্রচারণার হালে পানি পায়নি।
নামকরা পত্রিকা কিংবা বর্ণিত রাজনৈতিক গোষ্ঠী আপাতদৃষ্টিতে আদর্শিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভিন্ন দুই মেরুতে অবস্থান করলেও শহীদ ওসমান হাদির শাহাদত নিয়ে তারা প্রায় একই বয়ানের আশ্রয় নিতে চাইলেও বাংলাদেশের জনগণ ঠিকই পুরো ঘটনাকে ঠিকটাক পড়তে সক্ষম হয়েছে। ওসমান হাদির উপর হামলার সময় নির্ধারণে নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ না থাকলেও তার উপর হামলাকারীদের আক্রোশের সাথে নির্বাচনী রাজনীতির সংযোগ খুবই সামান্য। এই আক্রোশের পিছনের প্রকৃত রহস্য বুঝতে হলে ওসমান হাদির কার্যক্রম যথাযথভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। ওসমান হাদি জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সামনে চলে আসা তরুণ নেতা, তরুণদের প্রথম প্লাটফর্ম জাতীয় নাগরিক কমিটিতেও তিনি ছিলেন, কিন্তু শেষ অবধি কোন রাজনৈতিক প্লাটফর্মে না জড়িয়ে তিনি শুরু করেন তার পৃথক সংগ্রাম, এবং সেটা ইনকিলাব মঞ্চের ব্যানারেই এগিয়ে যেতে থাকে। ওসমান হাদি খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারেন এ দেশের মানুষের মধ্যে ভারতীয় আধিপত্যবাদী শক্তি যতটা না আওয়ামীলীগের মতো রাজনৈতিক শক্তির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে, তার চেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ভারতীয় গোলামদের মাধ্যমে। আর তাই চরম রাজনৈতিক সচেতন ওসমান হাদি নিজে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের মতো রাজনৈতিক কার্যক্রমে জড়ালেও মূল কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন সাংস্কৃতিক লড়াইকে।
দুঃখজনক হলেও বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বাস্তবতা হলো, এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলিম হলেও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মূলধারা বলে যারা প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে, তারা খাঁটি ভারতীয় সংস্কৃতির খিদমতগার, পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুয়ানী সংস্কৃতিকেই তারা এতোটা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে জাতীয় পরিসরে যে, ক্ষমতায় যে দলই থাকুক, তারাই সাংস্কৃতিক মূলধারা হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত। এই পরিস্থিতিতে ওসমান হাদির কার্যক্রম আধিপত্যবাদীদের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রটিকে লক্ষ্য করে আঘাত হানতে শুরু করেছিল, যা আধিপত্যবাদী শক্তির পক্ষে মেনে নেওয়ার কোন উপায় ছিল না আসলে।
এসকল দিক বিবেচনা ছাড়াও ওসমান হাদির নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টা এতোটাই স্পষ্ট ছিল যে এরপরও তার উপর আততায়ীর হামলা এবং হামলা শেষে মূল আততায়ীর পালিয়ে যাওয়া কিংবা এতোদিন পরও ধরা না পড়ার পিছনে নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রযন্ত্রের দায় রয়েছে। শুধু তাই নয়, জীবিত ওসমান হাদিকে যারা মুরতাদ কিংবা মুলহিদ মনে করতো গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে অংশগ্রহণের অপরাধে, সেই তারা যখন ওসমান হাদির নাম ব্যবহার করে এদেশের সেক্যুলারদের ত্রাণকর্তা দুই বড় পত্রিকায় হামলা ও ভাঙচুর চালালো, সে ঘটনার তথ্যও জনপরিসরে বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় সংস্থাসমূহ কোন কার্যকর ব্যবস্থাগ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়। এ সকল ঘটনা প্রবাহে ওসমান হাদির মতো আধিপত্যবাদবিরোধী নেতাকে যেমন জীবন দিতে হলো, তেমনি দুই পত্রিকার উপর হামলার মাধ্যমে সেই ওসমান হাদির লিগ্যাসিকেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করানো হলো।
আমরা কোন ধরনের ষড়যন্ত্র তত্ত্ব কিংবা গুজবে ভর করে এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে চাই না, কিন্তু পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের রাষ্ট্রের চূড়ান্ত ব্যর্থতা ও অনেকাংশে ঐচ্ছিক অকর্মণ্যতা এতোটাই স্পষ্ট যে, তা এড়িয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। আততায়ী ভারতে পালিয়ে গিয়েছে কি না, এ বিষয়ে এখনো সরকারের তরফ থেকে কোন নিশ্চিত তথ্য আমরা পাইনি, তবে ভারতে পালালে যেমন সেটা সরকারের চরম ব্যর্থতা, তেমনি দেশের মধ্যে এতো দীর্ঘদিন ধরে যদি আত্মগোপনে থাকতে সক্ষম হয়, তবে সেটাও কোন গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হতে পারে না। এভাবে প্রকাশ্যে দিবালোকে গুলি চালিয়ে যদি আততায়ী পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়, তবে সামনের চ্যালেঞ্জিং সময়ে এই সরকার কীভাবে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, সে প্রশ্ন উঠবেই।
এই পরিস্থিতিতে ওসমান হাদিকে নিয়ে নোংরা রাজনীতির চেষ্টা যে সকল গোষ্ঠী চালিয়ে যাচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে তারা প্রত্যেকেই হাদির আদর্শের বিরোধিতা করছে। ওসমান হাদির সাথে বহু প্রশ্নে আমাদের দ্বিমত ছিলো, কিন্তু তিনি যে এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্ব দেশের সাংস্কৃতিক মূলধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে আধিপত্যবাদের সেবাদাসদেরকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করতে চেয়েছিলেন, সেটি দেশের স্বাতন্ত্র্য-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সবচেয়ে বেশি জরুরি। তাই তার এ লিগ্যাসিকে কোন রাজনৈতিক নোংরামির শিকার হতে দেওয়া যাবে না। জীবিত ওসমান হাদি প্রায় প্রতিটি পক্ষের মাথাব্যথার কারণ ছিলেন, কোন রাজনৈতিক গোষ্ঠীই তার প্রশ্নাতীত আনুগত্য দূরে থাক, সমালোচনাহীন সমর্থনও পায়নি, তিনি তার কথা রেখেছেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের পক্ষে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন, আধিপত্যবাদের পক্ষে ন্যূনতম ভূমিকা রাখতে চাওয়া প্রতিটি পক্ষকে সমালোচনায় ঝাঁঝরা করেছেন। আততায়ীর গুলিতে জীবনদান করে সে ওসমান হাদি হয়ে উঠেছেন আরো বেশি শক্তিশালী, তার আদর্শ এদেশের মানুষের নিকট আরো বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেছে তার শাহাদতের মাধ্যমে। ভবিষ্যতের বাংলাদেশে তাই কোন নির্দিষ্ট গোষ্ঠী ওসমান হাদির লিগ্যাসির উত্তরাধিকার দাবি করার সুযোগ নেই, বরং বাংলাদেশ পন্থার পক্ষের সবাইকে এ আদর্শ ধারণ করতে হবে, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সব ধরনের লড়াই জারি রাখতে হবে, বাংলাদেশের স্বাতন্ত্র্য-সার্বভৌমত্ব ধরে রাখতে এর কোন বিকল্প নেই।

