Logo
এক আধ্যাত্মিক রাহবারের বিরল পাঠদান : আত্মিক উন্নয়নের ইশতেহার
ফজলুর রহমান জুয়েল
  • ১৮ জানুয়ারী, ২০২৬

(পর্ব-০২)
এবার বিশ্ববিশ্রুত দুআর গ্রন্থ হিযবুল বাহার সম্পর্কে আলোকপাত করেন আল্লামা ইমাদ উদ্দিন চৌধুরী। বলেন,
‘হিযবুল বাহার এর দুআ অনেক মূল্যবান। হিযবুল বাহার সম্পর্কে পরিব্রাজক ইবন বতুতাও উল্লেখ করেছেন। হাওয়ামিই শিরোনামে শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (র.) এক শরাহ লিখেছেন। পড়লে অনেক ফায়দা হবে। এসব কবিরাজি করার জন্য নয়, মানুষের ক্ষতি করার জন্য নয়। নফসে আম্মারা (নিজের কুপ্রবৃত্তি) আর শয়তানকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য।
শয়তান হচ্ছে তিন প্রকার। তার মধ্যে একপ্রকার হচ্ছে মানুষ। মানুষ কেমনে শয়তান হয়? দলীল কী? ইযা খালাও ইলা শায়াতীনিহিম, ক্বালু ইন্না মাআকুম, ইন্নামা নাহনু মুস্তাহযিউন। (যখন তারা নিভৃতে তাদের শয়তানদের সাথে মিলিত হয়, তখন বলে, আমরা তো তোমাদের সাথেই আছি। তাদের সাথে তামাশা করি মাত্র। সূরা বাকারা, আয়াত: ১৪)। যারা রাসূল (সা.) এর কাছে এসে বলে ঈমান এনে ফেলেছি। আর আবূ জাহল-আবূ লাহাবের কাছে গিয়ে বলে, না। এ হচ্ছে এক শয়তান। খারিজী সম্প্রদায় হচ্ছে শয়তান। এদের কাছে গেলে মাথার বল্টু (স্থিরতা) বিগড়ে দিয়ে দেবে। শাইখ আবদুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী (র.) লিখেছেন (ফার্সী অনুবাদ শেষে তরজমা) প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, হিযবুল বাহার তিনি (আল্লামা শাযুলী (র.) কে) কেমন করে পেয়েছেন। তিনি জবাব দিয়েছিলেন যে, বিল মুশাফাহা অর্থাৎ হুযূর (সা.) ফরমায়েছেন (রূহানী নিসবতে)। কেউ বলেছেন ঘুমন্ত অবস্থায় পেয়েছেন। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এটা রাসূল (সা.) তাঁকে তালকীন করেছেন। আপনার মুসীবত থেকে হিফাযতের জন্য এটা বহু বড় জিনিস।
আল্লামা ইমাদ উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী হিযবুল বাহার থেকে বিশেষ অংশ পাঠ করেন, ‘সিতরুল আরশি মাসবুলুন আলাইনা, ওয়া আইনুল্লাহি নাযীরাতুন ইলাইনা বি হাউলিল্লাহি লা ইয়াকদিরু আহাদুন আলাইনা, ওয়াল্লাহু মিন ওয়ারাইহিম মুহীত। বাল হুয়া কুরআনুম মাজীদুন ফী লাউহিম মাহফূয।’
আমীন বলুন। আমল করার জন্য (পুস্তিকা) আমাদের অফিসে আছে। নিলে মুখস্থ করে আমল করবেন।
এবার সমকালীন প্রসঙ্গ সম্পর্কে এক বিশেষ নির্দেশনা দেন এভাবে, অনেক সময় দেশের অবস্থা নানা আকার ধারণ করে। আল্লাহ যেন আমাদের এই দুআ কবূল করেন। রাব্বানা লা তুসাল্লিত আলাইনা জাব্বারান আনীদানÑআল্লাহ! যুলমকারী কেউ যেন আমাদের উপর (শাসক হিসেবে) না আসে। ওয়ালা শাইতানাম মারিদানÑমানুষের মধ্যে শয়তান যারা, তারা যেন আমাদের উপর কর্তৃত্বে না আসে। ওয়ালা ইনসানু আসুদান-হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করে, এমন কেউ যেন না-আসে।
আল্লাহ না-করুন। যদি আপনি এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হন, তাহলে ন্যায়পথে থাকবেন। আমরা প্রত্যেকে বুকে হাত দিয়ে বলবো, শ্যামল-সুন্দর এই জন্মভূমি! আল্লামা ইমাদ উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী গভীর আবেগের সাথে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন, গাছের লতাপাতার সাথে জড়িত হয়ে যখন মা-বাবার কবরের পাশে দাঁড়াই গহীন রাতে, মিটিমিটি তাঁরা আকাশে জ্বলছে, আমার নয়নে অশ্রু ঝরছে- কত আপনজন এখানে গোরস্থানে শুয়ে আছে। বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড় এর দিক থেকে। পাতাগুলো নড়ছে। এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে, যেন প্রতিটি পাতা সেই বিরহে কাঁদছে।
এত সুন্দর-শ্যামল আমাদের এই দেশ! এখানে হিংসা-বিদ্বেষ থাকবে কেন? আমরা মানুষকে ভালোবাসি।
আমার মা-বাবার ঘটনা আপনাদের আমি সূচনায় বলেছি। আল্লাহ আমাকে যতদিন (বাঁচিয়ে) রাখেন, আমি যেন মাটির আসনে মাটির মানুষের সাথে বসতে পারি। এই দুআটুকু করবেন।
পিতৃছায়া থেকে বঞ্চিত কোনো ইয়াতীম, মাত্র (হয়তো) দশ দিন আগে তার বাবা চলে গেছে। কবর এখানে। তার ঘরের বারান্দায় গিয়ে যখন পাটির মধ্যে বসি, তখন সেখানকার অনুভূতি আর কোথাও পাই না। সজল নয়নে তারা আমার দিকে চেয়ে থাকে। ভাঙা পাটির উপর বসি। ওদিক থেকে পাহাড়ি বাতাস আসছে। সেই বাতাস যেন রয়ে রয়ে কাঁদছে। যেন বলছে, এই ভ্রমণ এখানেই সীমাবদ্ধ রেখো না। গ্রামে-গঞ্জে ঘুরতে থেকো। কারণ তোমার মা-বাবা এই দুআ করে গেছেন। যতদিন জীবন আছে, দুআ করবেন, আমরা যেন এভাবে দীন-দুখী মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে পারি। তাদের যেন সঠিক সাহায্য করতে পারি। হিংসা-বিদ্বেষের পরিবেশ থেকে আল্লাহ যেন আমাদের মুক্ত রাখেন। আমরা বুকে হাত দিয়ে বলবো, আমরা কারও উপর অন্যায়-অত্যাচার করবো না। ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তুমি হিফাযত করো।
আর আমরা যদি মযলুম হই, তাহলে রাহমাতুল্লিল আলামীন (সা.)-এর সার্টিফিকেট দেওয়া আছে, যেকোনো ধর্মের মানুষ হোক, কেউ যদি মযলুম হয়, তাহলে তার দুআ কবূল হয়ে যায়। আমরা বদদুআও করবো না। কিন্তু সাবধান! যালিমরা সাবধান থেকো। সব সময় গদিতে বসা যায় না। মানুষের উপর অন্যায়-অত্যাচার করো না। বিভিন্ন ধরণের কেইস-মামলা দিয়ে মানুষকে হয়রানি করো না। অনেক দেখেছি, নতুন নয়।
দুআ করি, মা-বাবা আমাকে যেপথে পরিচালিত করে গেছেন, সেই সুরমার তীর, কুশিয়ারার তীর খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশ, এই বালাই হাওড়ের আনাচে-কানাচে রোহিঙ্গার সেই সমস্ত ক্যাম্প আমার স্মৃতির আয়নায় সংরক্ষিত। আমরা যেন দীন-দুখী মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে পারি। আমরা যেন আল্লাহর ওয়াস্তে খিদমত করতে পারি। মা-বাবার দুআর বরকতে এবছর কয়েক হাজার কম্বল ও শীতবস্ত্র বিতরণ করেছি। আরও শীতবস্ত্র বিতরণের ইচ্ছে আছে। গৃহনির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে কুমিল্লা ও নোয়াখালীতে। একাজে আমার ছেলেরা পানিতে সাতরিয়ে প্রয়োজনীয় শ্রম দিয়েছে। এবছর পোড়া- ঘর মেরামত করে দেওয়া হয়েছে প্রায় ৩৩-৩৪টা। কেমন করে যে এই তাওফীক এলো! মা-বাবার দুআর বরকতে আল্লাহ আমাকে পরিচালিত করেছেন।
বৃক্ষরোপণ। হুযুর পাক (সা.) বাণী প্রদান করে গেছেন, مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَغْرِسُ غَرْسًا أَوْ يَزْرَعُ زَرْعًا فَيَأْكُلُ مِنْهُ إِنْسَانٌ أَوْ طَيْرٌ أَوْ بَهِيمَةٌ إِلاَّ كَانَتْ لَهُ صَدَقَةٌ অর্থাৎ কোনো মুমিন যদি গাছের চারা লাগায় কিংবা ফসল ফলায়, আর কোনো প্রাণী তা খায়, তবে তা সাদাকাহ হিসেবে গণ্য। (সুনান আত তিরমিযী, হাদীস-১৩৮৬)
এই কাজও (বৃক্ষরোপণ) আমার মা-বাবা চালু করেছিলেন। বলতেন অমুকের বাড়িতে চারটি নারকেলগাছ লাগিয়ে এসো। আমার সেই মা-বাবা আজ আর নেই। তাঁরা আমার হাতে ধরে দুআ করেছিলেন। ৬০-৭০ হাজার নারকেলের চারা এপর্যন্ত রোপন করে দিতে পেরেছি। মাশাআল্লাহ। আমাদের একাজ চলমান আছে। দুআ করবেন।
এপর্যন্ত বলার পর আল্লামা ইমাদ উদ্দিন ছাহেব মূল প্রসঙ্গে ফিরে যান, তিনি বলেন, সায়্যিদুনা আনাস (রা.)কে এই দুআ কে শিখিয়ে দিয়েছিলেন? রাহমাতুল্লিল আলামীন (সা.)। তাঁকে আস্থা দিয়েছেন, কেউ তোমাকে ক্ষতি করতে পারবে না। আপনারা এই দুআ (বিপদ-আপদ ছাড়াও) এমনিতে পড়তে পারেন। পড়লে ফায়দা পাবেন।

[পাঠক! দু’অংশে উপস্থাপন সমাপ্ত হলো দিনের বেলার পাঠদান। পরবর্তীতে তুলে ধরা হবে রাতের পর্ব।-লেখক]

ফেইসবুকে আমরা...