Logo
এক আধ্যাত্মিক রাহবারের বিরল পাঠদান : আত্মিক উন্নয়নের ইশতেহার
ফজলুর রহমান জুয়েল
  • ১৮ জানুয়ারী, ২০২৬

ফুলতলী-মাহফিলে বিপুল জনসমাগমের কথা বহুল আলোচিত। দেশের বিভিন্ন ইসলামী মাহফিলে সর্বাধিক জনসমাগমের যে রেকর্ড রয়েছে, তাতে ফুলতলী-মাহফিল অন্যতম।

জোয়ান-যুবা তো যায়ই, বয়সের ভারে হীন-দুর্বল হয়ে পড়া বুড়ো লোকেরাও লাঠি-ভর দিয়ে ছুটে চলে। অন্ধ-বিকলাঙ্গ পর্যন্ত বাদ থাকে না। জমায়েতে শামিল হয়ে নিথর-নিস্তব্ধের মতো বসে বয়ান শোনে বুঁদ হয়ে। নিজ চোখে না-দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।

সিলেট শহরের আন্তঃনগর কদমতলী-বাস-স্ট্যান্ড থেকে পূর্ব দিকে সড়কপথে প্রায় আশি কি.মি. দূরের পথ জকিগঞ্জের ফুলতলী। সারা পথজুড়ে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মাহফিলগামী সারি সারি গাড়ির ভিড়। কাছাকাছি দূরত্বে যাওয়ার পর ঝাঁকে ঝাঁকে পায়ে হাঁটা মানুষ। এরা আশপাশের নানা এলাকার। সে-এক অভাবনীয় দৃশ্য! এত মানুষ কেন যায়? সে প্রশ্নের জবাব অনুসন্ধানে না গিয়ে চলতি ২০২৫-এ অনুষ্ঠিত এ-মাহফিলের নৈর্ব্যক্তিক কিছু অনুভূতি-অভিজ্ঞতার খ-চিত্র তুলে ধরা এই লেখার মুখ্য বিষয়।

ফুলতলীর পীর নামে সমধিক প্রসিদ্ধ সমকালীন মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ বুযুর্গ আলিম আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (র.) বিগত ২০০৮ইং সালের ১৬ জানুয়ারি ইন্তিকালের প্রেক্ষিতে প্রতি বছর আগের দিন ১৫ জানুয়ারি এই মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলার ফুলতলী গ্রামে। বালাই হাওরের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে। আয়োজকদের ভাষায় যা ঈসালে সাওয়াব-মাহফিল নামে খ্যাত। অভ্যাগত অতিথিদের মধ্যে সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিপুল সংখ্যক শীর্ষ উলামা-বুযুর্গ আর দেশ ও বিদেশের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বরেণ্য শিক্ষাবিদ। ছিলেন রাজনৈতিক নেতা, খ্যাতিমান আইনজীবী থেকে শুরু করে লেখক ও গবেষক অনেকে।

দলমত নির্বিশেষে বিজ্ঞ মহলে যে-সব কথা মুখে মুখে ফেরে, বর্তমান বিশ্বে ইসলামী আদর্শ-চর্চায় সকল বিভক্তি-বিভ্রান্তির ঘেরাটোপমুক্ত মূলধারার অনুসারী ছিলেন আল্লামা ফুলতলী (র.)। পীর-ফকিরের নামে সমাজে প্রচলিত সকল কুসংস্কার-অনাচারের ঘোর বিরোধী ছিলেন তিনি। ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর ছিল অকুতোভয় ভূমিকা। বহির্বিশ্বেও তিনি সুপরিচিত ছিলেন। নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক ধারাক্রম তথা নিসবত ও সনদভিত্তিক ইলমে কিরাতের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা দেশ-বিদেশে সুচারুরূপে বাস্তবায়নে তাঁর অসামান্য অবদানের কারণেও তিনি ব্যাপক আলোচিত।

বিজ্ঞ আলিম-উলামার মুখ থেকে জানা ছিল আগেই, ইসলামী জ্ঞান-চর্চায় আল্লামা ফুলতলী ছিলেন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের বুযুর্গ আলিমগণের ঐতিহ্যের একনিষ্ঠ ধারক।

এমন বুযুর্গের দুনিয়া ত্যাগের পর তাঁর সাড়া জাগানো ঈসালে সওয়াব-মাহফিলে চলতি বছর জীবনে প্রথমবারের মতো শরীক হওয়ার সুযোগ হয়েছিল। তাতে অর্জিত কিছু অভিজ্ঞতা সত্যি ধারণাতীত ছিল। যার মধ্যে সবিশেষ আকৃষ্ট হওয়ার মতো ছিল প্রধান মুখপাত্র আল্লামা ইমাদ উদ্দিন চৌধুরীর আলোচনা। ধরণ ও বৈশিষ্ট্য-বিবেচনায় যা বক্তব্য না-বলে পাঠদান বলাই শ্রেয়।

পাঠদানের বিষয়, বৈশিষ্ট্য কিংবা ধরণ ও প্রভাব, সবই বিরল। হাল আমলের বিভিন্ন ইসলামী মাহফিলে যার দৃষ্টান্ত খুব কমই দেখতে পাওয়া যায়। সে-আলোচনায় যাওয়ার আগে প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতা খানিক বলে নিই। এত বিশাল লোক সমাগমে সামগ্রিক শৃঙ্খলা রক্ষা ছিল সুচারু। বিশেষ পোশাক-পরা স্বেচ্ছাসেবী পর্যাপ্ত। শ’য়ে শ’য়ে মাইক। কিন্তু আওয়াজ ছিল নিয়ন্ত্রিত। আগন্তুক প্রতিটি লোকের বিনয়ী আচরণ যে-কাউকে বিমোহিত করবে।

আল্লামা ইমাদ উদ্দিন চৌধুরী প্রথিতযশা বুযুর্গ আলিম হিসেবে সুখ্যাত। তিনি আল্লামা ফুলতলী (র.) এর জ্যেষ্ঠপুত্র। পিতার সুযোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে সকল মহলে গ্রহণযোগ্যতা তাঁর প্রশ্নাতীত। বয়স আশি ছুঁই ছুঁই। নিজ পরিম-লে তিনি বড় সাহেব (স্থানীয় উচ্চারণে বড়ছাব) নামে পরিচিত।

লক্ষ লক্ষ জনতার সামনে তিনি কথা বলছিলেন একদম মজলিসী মেজাজে। শ্রেণীকক্ষে শিক্ষকের আলোচনা কিংবা নিভৃত খানকায় বসে বুযুর্গদের ভাব-গম্ভীর তালিম-তরবিয়াত প্রদানের মতো। ১৫ জানুয়ারি দিনে ও দিনগত রাতে তিনি ধাপে ধাপে পাঠদান করেন। তাঁর সে- পাঠদানে ছিল নামায, আল্লাহর যিকর ও দুআ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ ও নির্দেশনাসূচক আলোচনা। তাতে, ইতিহাস, সাহিত্য, জ্ঞান-চর্চা থেকে শুরু করে গবেষণালব্ধ অভিজ্ঞতা- অনুভূতির কথা ছিল। আরো ছিল ইলমে তাসাওউফ-নির্দেশিত জীবনাচারে বিভ্রান্তি- বিপত্তি উতরানোর কথাও। পাঠদানের একটা বিরাট অংশজুড়ে ছিল সমাজের সকল গরিব- অসহায় মানুষকে সহায়তার নির্দেশনা। জানা যায়, একান্ত ব্যক্তিগত উদ্যোগে একাজ তিনি নিজেও পরিচালনা করে থাকেন। যা এক ব্যতিক্রম নযীর।
তিনি কথা বলছিলেন আড়ম্বরহীন মঞ্চে সাধারণ মানের একটা কাঠের চেয়ারে বসে। দেশবরেণ্য অসংখ্য আলিম ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ তখন মঞ্চের নিচে সামনে মাটিতে পাতা চটের উপর হাঁটু-মুড়ে নীরব বসে পাঠগ্রহণ করছিলেন।

আল্লামা ইমাদ উদ্দিন চৌধুরী তাঁর সম্পূর্ণ পাঠদান সম্পন্ন করে মঞ্চ ত্যাগ করার পর আলিমগণ মঞ্চে ওঠেন। ইসলামী আন্দোলন ও রাজনীতি, জাতীয় স্বার্থ ইত্যাদি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য পেশ করেন। তাতে বিশেষ আলোড়ন ছিল চরমোনাইর মরহুম পীর আল্লামা সায়্যিদ মো. ফজলুল করিম র. (ইন্তিকাল: ২০০৬ ইং)-এর সুযোগ্য পুত্র ও স্বনামধন্য দেওবন্দী আলিম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর অন্যতম মুখপাত্র সায়্যিদ মুসাদ্দিক বিল্লাহ’র উপস্থিতি ও ইসলামী ঐক্য গঠনে তাঁর দ্ব্যর্থহীন আহ্বান।

আল্লামা ইমাদ উদ্দিন চৌধুরীর আলোচনায় এমন কিছু বিশেষত্ব ছিল, যা সচরাচর পাওয়া যায় না। শোনার পর কৌতুহল বেড়ে যায়। প্রথমে কাগজে নোট করি এবং পরে মোবাইল ফোনে ধারণ করি। মনে হলো, মুরীদ-অনুসারী হতে না-পারলেও প্রসিদ্ধ এই সিলসিলা’র বর্তমান প্রধান মুখপাত্রের কথাগুলো জ্ঞান ও চিন্তার খোরাক যোগাতে কেবল সহায়কই নয়, নেহাত প্রয়োজনও। পরে সুহৃদজনদের সাথে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় আমার অনুধাবন-অভিভূতি শুনে ফুলতলী-সিলসিলা সম্পর্কে জানতে খ্যাতিমান পত্রিকা- সম্পাদকসহ আগ্রহী উচ্চশিক্ষিত ও বড় দায়িত্বে নিয়োজিত কেউ কেউ আল্লামা ইমাদ উদ্দিন চৌধুরীর আলোচনার বিবরণসহ পর্যবেক্ষণের লিখিত রূপ তুলে ধরতেও অনুরোধ করেন। সেই প্রেক্ষিতে আলোচিত সেই পাঠদানের পুনরালোচনা ও সংক্ষিপ্ত এই পর্যালোচনা- প্রয়াস।

মূল প্রসঙ্গে আসি। দিনের বেলা ও রাতে দু’পর্বেই আল্লামা ইমাদ উদ্দিন পর্যায়ক্রমিকভাবে পাঠদান করেন। দিনে তাঁর পাঠদানের বিষয়বস্তু ছিল ইয়াকীনের সাথে সঠিক দুআ পাঠ করলে কেমন করে আল্লাহ পাকের সাহায্য পাওয়া যায়, এ বিষয়ে আলোচনা ও নির্দেশনা। এক্ষেত্রে তিনি সাহাবী হযরত আনাস বিন মালিক (রা.)-এর সাথে স্বৈরাচারী প্রশাসক হাজ্জাজ বিন ইউসুফ (ইন্তিকাল: ৭১৪ইং)-এর ঘটনা তুলে ধরেন। ইতিহাসে যা আনাস (রা.) এর দুআ নামে প্রসিদ্ধ।
লাখো জনতার যিকর-ধ্বনি আর দুআ-দুরূদ। তারই পরতে পরতে সরল ভাষায় মজলিসী আলোচনা। স্থানীয় শব্দের রূপান্তর সহকারে তাঁর সে-আলোচনার ভাষ্য হুবহু নি¤েœ পেশ করা হলো।

প্রথমে আনাস (রা.)-এর শিশুকালের স্মৃতিচারণ করেন এভাবে, আনাস (রা.)-এর আম্মাজান উম্মে সুলাইম এক বাচ্চা কোলে নিয়ে রাসূল -এর কাছে এলেন। কেন নিয়ে এলেন? আল্লাহর হাবীবের সাথে মায়া-ডোরে বাঁধবেন।

যেন কিয়ামতের দিন পর্যন্ত (এ মায়া-ডোর) বিচ্ছিন্ন না-হয়। আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মানুষ আপনাকে অনেক হাদিয়া-তুহফা দিচ্ছে। আমি আমার এই ছেলেটিকে নিয়ে এসেছি। আপনি গ্রহণ করুন।

রাসূল  একসময় এই আনাস (রা.) সম্পর্কে তিন বিষয়ে দুআ করেছিলেন। হায়াতে যেন বরকত হয়। সন্তান-সন্ততি আর সম্পদে বরকত যেন হয়। (পরে দেখা গেল) বসরায় তাঁর দুটি বাগান ছিল। বছরে দুবার ফসল আসত। তাতে বিশেষ সুগন্ধি ছিল। ফলে বেশি দামে বিক্রি হত। একটার মধ্যে আল্লাহ কত দিয়েছিলেন!

তাঁর বয়স হয়েছিল একশো’য়ের বেশি। অনেক পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এর সাথে তাঁর অনেক ঘটনা ঘটেছে। হাজ্জাজকে অনেকে কাফির বলে থাকেন। আসলে তিনি মুসলমানই ছিলেন। যালিমের দৃষ্টান্ত দিতে আমরা হাজ্জাজের নাম মুখে এনে থাকি। ইয়াযীদের নামটাও তদ্রুপ।
হাজ্জাজ নিজেকে মুসলমান মনে করতেন। কিন্তু ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার লক্ষ্যে- কর্তৃত্ব বহাল রাখার জন্যে হাজার হাজার আলিমকে জেলে পাঠিয়েছিলেন। হত্যা করেছিলেন। বহু ঘটনা।

ওয়াসিত নগরীতে হাজ্জাজ মনোরম এক অট্টালিকা তৈরি করলে সুবিধাভোগী খারিজী আলিমরা এসে প্রশংসা করল। কবিতা লিখল। কিন্তু হাসান বসরী (র.) যখন তা দেখলেন, তখন বললেন, এমন দালানের চেয়ে বহু শক্ত দালান তৈরি করেছিল নমরূদ। শুনে অনেকে হাসান বসরী (র.)কে বললেন, জনাব! আপনাকে মেরে ফেলা হবে।

আনাস (রা.) পড়লেন পরীক্ষায়। হাজ্জাজ প্রদর্শনীর জন্যে চার শ ঘোড়া এনে রেখেছিল। নামিদামি ঘোড়া। যা দেখিয়ে আনাস (রা.)কে ভীত করে তুলতে চেয়েছিল। যাতে তিনি বশ্যতা স্বীকার করে নেন। কিন্তু তখন আনাস (রা.) এর নিকট বহু মূল্যবান এক সম্পদ (প্রতিরোধের হাতিয়ার) ছিল। তা হলো রহমতে আলম  এর যবানে শিখিয়ে দেওয়া এক দুআ। যা যে কোনো জায়গায় পড়লে কোনো যালিম কিছু করতে পারবে না। এই মর্মে আনাস (রা.) এর দৃঢ় ইয়াকীন ছিল। সে-দুআ তিনি তখন পড়েছিলেন। ফলে হাজ্জাজ তাঁকে কিছু করতে পারেনি।

এই দুআ অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমার ভাই মুফতি সাহেব (মুফতি গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী) আমাকে এসব সংগ্রহ করে দিয়েছেন। আমি অনেক উপকৃত হয়েছি। আনাস (রা.) বলেছেন, এই দুআর বরকতে তখন আল্লাহ পাক সকল যুলম আর ফিতনা থেকে আমাকে হিফাযত করে দিয়েছেন। আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (র.) তাঁর জামউল জাওয়ামিই কিতাবে তা লিখেছেন। শাইখ আবদুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী (র.) ফার্সী ভাষায় তার দীর্ঘ শরাহ লিখেছেন। শিরোনাম: ইসতেনাসু আনওয়ারিল কবস, ফি শরহে দুআ-ই আনাস (রা.)। এই দুআ পড়বো আমি শেষে।

যদি দিল্লী যান, তবে শামসী তালাব এর পাশ দিয়ে এগিয়ে গিয়ে শাইখ আবদুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী (র.)-এর মাযার যিয়ারত করবেন। সুবহানাল্লাহ! অনেক শান্তি পাওয়া যায়! খাযা নিজামুদ্দীন মাহবূব-ই ইলাহী (র.) যিয়ারত করবেন। মাই সাহিবা যিয়ারত করবেন। মাহবূব-ই ইলাহী’র কিছু আগে শাইখ আবদুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী (র.)-এর মাযার। যিয়ারত করলে বড় ফায়দা হয়।

হাজ্জাজ তলব করল আনাস (রা.)কে। তাঁর সামনে চারশ দামি ঘোড়া এনে হাযির করল নিজের বাহাদুরি যাহিরের জন্যে। রাজ-ক্ষমতায় থাকলে অনেকে যা করে থাকেন। হাজ্জাজ বেআদবীর সহিত আনাস (রা.) কে জিজ্ঞাসা করল, তোমার যে সাহেব নবী মুহাম্মদ, তিনি কি এ ধরণের ঘোড়ার অধিকারী হতে পেরেছিলেন?’

বেআদবীর কথা আলোচনায় প্রাসঙ্গিক অন্য একটি ঘটনাও ফাঁকে স্মরণ করেন আল্লামা ইমাদ উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘এরকম ঔদ্ধত্যের আরেক ঘটনা মনে পড়ে গেল। সিলেট রেজিষ্ট্রি মাঠে বিরাট এক প্রতিবাদ সভা হয়েছিল। আমার পিতা (আল্লামা ফুলতলী (র.)) তাশরীফ নিয়েছিলেন। গাযী ফজলু নামক এক অবাঞ্ছিত ব্যক্তি উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রা.) সম্পর্কে এক কটূক্তি করেছিল।

এজাতীয় লোকদের রূহানী সম্পর্ক হচ্ছে আবদুল্লাহ ইবন উবাই’র সাথে। সেখান থেকে তাদের (ঔদ্ধত্য প্রদর্শনকারীদের) কাছে চেতনা আসে, ‘আমি সহ¯্রাধিক বছর আগে চলে গেলেও তুমি যে আমার দায়িত্ব পালন করছ, সেজন্য ধন্যবাদ। রাতে এসে রূহ দেখা করে।’ এসময় আল্লামা ইমাদ উদ্দিন হযরত খাদিজা (রা.)-এর কথাও স্মরণ করেন। বলেন, জান্নাতুল মুআল্লাতে খাদিজা (রা.)-এর মাযার আছে। সেখানে যিয়ারত করলে এক মায়া নিয়ে আসবেন। দুনিয়া-আখিরাতে কাজে আসবে। রাসূল  এর সাহেবজাদাগণও সেখানে আছেন। তবে খারাপ আকীদা থাকলে সেখানে যাবেন না।

এ পর্যন্ত বলে আল্লামা ইমাদ উদ্দিন পূর্বের সেই আনাস (রা.) ও হাজ্জাজের আলোচনায় ফিরে যান, হাজ্জাজের জিজ্ঞাসার জবাবে আনাস (রা.) জানালেন, হুযুর পাক  এর কাছে এরচেয়ে অনেক উত্তম জিনিস আমি দেখেছি। আনাস (রা.) হাদীসে বিভিন্ন প্রকার ঘোড়ার যে বর্ণনা রয়েছে, কোন ঘোড়া দোযখে নিয়ে যাবে আর কোন ঘোড়া বেহেশতে নিয়ে যাবে, এরকম তিন শ্রেণির ঘোড়ার কথা বলার পর যে ঘোড়া দাম্ভিকতার ফসল, তা দোযখে নিয়ে যাবে। এই বিবরণ শুনে বেটা হাজ্জাজ উত্তেজিত হয়ে উঠল।

হাজ্জাজ প্রসঙ্গে আল্লামা আবদুর রহমান কাশগরী’র সাহিত্যে প্রাসঙ্গিক আলোচনার কথা স্মরণ করেন। তারপর কিছুক্ষণ দুরূদ পাঠ শেষে ফিরে যান পূর্বের প্রসঙ্গে। বলেন, ‘আনাস (রা.)কে বুঝিয়ে দিল যে, তোমাকে শেষ করে ফেলা হবে। কিন্তু আনাস (রা.) কে সরওয়ারে কায়িনাত  যে দুআ শিখিয়ে দিয়েছিলেন, তার উপর তাঁর দৃঢ় ইয়াকীন ছিল। তাই বললেন, আল্লাহর কসম, তুমি আমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। কারণ রাসূল  আমাকে যে কালিমা শিখিয়ে গেছেন, সেটার কারণে আমাকে কিছু করতে পারবে না। শুনে হাজ্জাজের ভেতর নীরব কম্পন শুরু হলো। আরয করল, তাহলে নবী তোমাকে যে দুআ শিখিয়ে দিয়ে গেছেন, সেটা আমাকে শিখিয়ে দিয়ে যাও। তিনি বললেন, এই দুআ’র উপযুক্ত তুমি নও। তোমাকে দেওয়া যাবে না। এ দুআ সবার কাজে আসবে না।

আনাস (রা.) ইন্তিকালের আগে তাঁর খাস খাদিমকে (এই দুআ) বলে গিয়েছিলেন।’ আগেই বলা হয়েছে, দিনের বেলা ও রাতে দুপর্বে আল্লামা ইমাদ উদ্দিন পর্যায়ক্রমিকভাবে পাঠদান করেন। উপস্থাপনের সুবিধার্থে দিনের বেলার পাঠদান দুঅংশে ভাগ করে প্রথমাংশ এখানে সমাপ্ত দেওয়া হলো। (চলবে)

ফেইসবুকে আমরা...