Logo
রোযার গুপ্তকথা ও আভ্যন্তরীণ শর্ত
ইমাম আবূ হামিদ আল গাযালী রাহিমাহুল্লাহ
  • ৬ মার্চ, ২০২৬

জেনে রাখা প্রয়োজন, রোযার ক্ষেত্রে তিনটি স্তর রয়েছে। সাধারণ ব্যক্তির রোযা, বিশেষ ব্যক্তির রোযা এবং বিশেষদের মধ্যেও খাস ব্যক্তিবর্গের রোযা।
সাধারণের রোযা হচ্ছে, কেবল ক্ষুধা ও লজ্জাস্থানের লোভ-লালসা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এ সংক্রান্ত আলোচনা ইতিপূর্বে গত হয়েছে। বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের রোযা হচ্ছে চোখ, কান, জিহ্বা, হাত-পা এবং সমস্ত অঙ্গকে গোনাহ থেকে বিরত রাখা। আর বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধেও খাস শ্রেণির রোযা হচ্ছে, অন্তরকে নিকৃষ্টতর কাজ, দুনিয়াবী আসক্তি এবং সামগ্রিকভাবে আল্লাহ ব্যতীত সকল বিষয় থেকে ফিরিয়ে রাখা। আল্লাহ ও আখিরাত ছাড়া অন্য বিষয়াদি এবং পার্থিব চিন্তার কারণে এমন রোযা নষ্ট হয়ে যায়। তবে, দীন পালনের জন্যে যতটুকু জাগতিক চিন্তা জরুরী, ততটুকুর চিন্তা রোযা নষ্ট করে না। কেননা, এটা আখেরাতেরই কাজ; দুনিয়ার নয়। এ বিষয়ে বুযুর্গ বলেন, যে ব্যক্তি দিনের বেলায় ইফতারের উপকরণের চিন্তায় অস্থিরতা করে, এটি তার ভুল বলে লেখা হবে। কেননা, সে আল্লাহ তাআলার বদান্যতার উপর ভরসা কম করে এবং তাঁর রিযকের ব্যাপকতার উপর বিশ্বাস কম রাখে। রিযকের চিন্তাহীন এই জীবন নবী, সিদ্দীক ও নৈকট্যশীলগণের স্তর। আমরা এ স্তরের অধিক বর্ণনা দিতে চাই না। এই রোযা তখন অর্জিত হয়, যখন মানুষ দৃঢ় চিত্তে আল্লাহ তাআলার প্রতি মনোনিবেশ করে, অন্য সবকিছুর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং এই আয়াতের বিষয়বস্তুতে নিজেকে আচ্ছন্ন রাখে,
قُلِ اللهُ ثُمَّ ذَرْهُمْ فِي خَوْضِهِمْ يَلْعَبُونَ
বলুন, আল্লাহ, অতঃপর তাদেরকে তাদের নিরর্থক আলোচনা নিয়ে খেলা করতে দাও।
আর বিশিষ্ট ব্যক্তি অর্থাৎ সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তিদের রোযা প্রত্যেক অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে গুনাহের কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখার মাধ্যমে অর্জিত হয়। ছয়টি কার্যাদির মাধ্যমে এই রোযা পূর্ণতা লাভ করে।
প্রথম: দৃষ্টিকে অবনত রাখা, মন্দ বিষয়সমূহের প্রতি দৃষ্টিপাত না করা এবং আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেলকারী বিষয় থেকে নজরকে ফিরিয়ে রাখা। রাসূলুল্লাহ (রা.) বলেন,
النَّظْرَة سَهْمٌ من سِهَامِ إِبْلِيسَ مَسْمُومٌ من تَرَكَهَا مَخَافَتِي أَبْدَلْتُهُ إِيمَانًا يَجِدُ حَلاوَتَهُ في قَلْبِهِ
-মন্দ বিষয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করা শয়তানের একটি বিষ মিশ্রিত তীর। আল্লাহ তাআলার ভয়ে যে এটা বর্জন করে, আল্লাহ তাকে এমন ঈমানের পূর্ণতা দান করেন, যার স্বাদ সে তার অন্তরে অনুভব করে।
জাবির (রা.) রাসূলে করীম  থেকে রিওয়ায়েত করেন,
خَمْسٌ يُفَطِّرْنَ الصَّائِمَ الْكَذِبُ وَالْغِيبَةُ وَالنَّمِيمَةُ وَالْيَمِينُ الْكَاذِبَةُ وَالنَّظَرُ بِشَهْوَةٍ
-পাঁচটি বিষয় রোযাদারের রোযা নষ্ট করে দেয়- মিথ্যা বলা, কুটনামি করা, পরনিন্দা করা, মিথ্যা কসম খাওয়া এবং কামভাব সহকারে দৃষ্টিপাত করা।
দ্বিতীয়: অনর্থক কথাবার্তা, মিথ্যা, পরনিন্দা, অশ্লীল প্রলাপ, যুলম, কলহ বিবাদ ইত্যাদি গর্হিত কর্ম থেকে জিহবাকে সংযত রাখা, সাধ্যমত নিরবতা পালন করা এবং যিকর ও তিলাওয়াতে নিয়োজিত থাকা এটা জিহ্বার রোযা। বিশর ইবনুল হারিস রাহিমাহুল্লাহ ইমাম সুফিয়ান সাওরী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, ‘পরনিন্দা রোযাকে নষ্ট কওে দেয়।’ হযরত মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে, দুটি অভ্যাস রোযা নষ্ট করে- পরনিন্দা ও মিথ্যা। রাসূলুল্লাহ  বলেন,
إِنَّمَا الصَّوْمُ جُنَّةٌ فَإِذَا كَانَ أَحَدُكُمْ صَائِمًا فَلَا يَرْفُثْ وَلَا يَجْهَلْ وَإِنِ امْرُؤٌ قَاتَلَهُ أَوْ شَاتَمَهُ فَلْيَقُلْ إِنِّي صَائِمٌ إِنِّي صَائِمٌ
রোযা হল ঢাল স্বরূপ। তোমাদের কেউ যখন রোযা রাখে, তখন যেন মূর্খোচিত ও অশ্লীল কথা না বলে। কেউ তার সাথে ঝগড়া করলে অথবা গালি দিলে সে যেন বলে দেয়- আমি রোযাদার। হাদীসে আছে- রাসূলুল্লাহ  এর যুগে দু’জন মহিলা রোযা রাখে। রোযার শেষ ভাগে তারা ক্ষুধা ও পিপাসা তীব্রতার কারণে মৃত্যুর নিকটবর্তী হয়ে পড়ে। তখন তারা রোযা ভঙ্গের অনুমতি নেয়ার জন্যে রাসূলুল্লাহ  এর কাছে প্রতিনিধি প্রেরণ করল। তিনি প্রেরিত লোকের হাতে একটি পেয়ালা দিয়ে বললেন, উভয় মহিলাকে বলো, তারা যা খেয়েছে তা যেন এই পেয়ালায় বমি করে। একজন মহিলা তাজা রক্ত ও টাটকা মাংস দিয়ে অর্ধেক পেয়ালা ভরে দিল। অপর মহিলাও সমান বমি করল। ফলে পাত্রটি কানায় কানায় ভর্তি হয়ে গেল। উপস্থিত লোকেরা ঘটনাটি দেখে বিস্মিত হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ  বললেন, তারা উভয়েই আল্লাহর হালাল করা বস্তু দ্বারা রোযা রেখেছে এবং হারাম করা বস্তু দ্বারা রোযা নষ্ট করেছে। তারা একে অপরের কাছে বসে পরনিন্দায় মেতে উঠেছে। তাদের এই পরনিন্দাই পেয়ালায় গোশতের আকারে দেখা যাচ্ছে।
তৃতীয়: মন্দকথা শোনা থেকে বিরত থাকা। কেননা, যেসব কথা বলা হারাম সেগুলো শুনাও হারাম। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা মিথ্যা শ্রবণকারী ও হারাম ভক্ষণকারীদের পাশাপাশি উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
سَمَّاعُونَ لِلْكَذِبِ أَكَّالُونَ لِلسُّحْتِ
-তারা মিথ্যা শ্রবণকারী ও হারাম ভক্ষণকারী।
আরও বলা হয়েছে-
لَوْلا يَنْهَاهُمُ الرَّبَّانِيُّونَ وَالأَحْبَارُ عَنْ قَوْلِهِمُ الإِثْمَ وَأَكْلِهِمُ السُّحْتَ
-তাদের ধর্মীয় প-িত ও আলিমগণ কেন তাদেরকে গুনাহের কথা বলতে এবং হারাম ভক্ষণ করতে নিষেধ করে না?
সুতরাং পরনিন্দা শুনে চুপ থাকা নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন,
إِنَّكُمْ إِذًا مِثْلُهُمْ
-তখন তোমরাও তাদের মত।
এজন্যই রাসূলুল্লাহ  বলেন,
الْمُغْتَابُ وَالْمُسْتَمِعُ شَرِيكَانِ فِي الْإِثْمِ
-গীবতকারী ও শ্রবণকারীÑউভয়েই গুনাহের মাঝে শরীক।
চতুর্থ: হাত, পা ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে খারাপ বিষয় থেকে এবং ইফতারের সময় সন্দেহযুক্ত আহার গ্রহণ থেকে বিরত রাখা। কেননা, যদি কেউ সারাদিন হালাল থেকে বিরত থেকে হারাম দ্বারা ইফতার করে, তবে তার কেবল উপবাসই হয়; রোযা হয় না। লোকটি সেই ব্যক্তির মত, যে একটি ঘর বানালো কিন্তু বিপরীতে একটি নগরীকে ধ্বংস করে দিল। এভাবেই খাদ্য হালাল হলেও বেশি বেশি ভক্ষণ ক্ষতিকর। খাবারের এই ক্ষতিকে হ্রাস করার জন্যেই রোযার বিধান।
যে ব্যক্তি অনেক ওষুধ সেবনের ক্ষতিকে ভয় করে বিষ পান করে, সে নির্বোধ। হারাম খাদ্য বিষতুল্য, যা দীন ইসলামকে বরবাদ করে দেয়। আর হালাল খাদ্য ওষুধস্বরূপ, যা কম খাওয়া উপকারী এবং বেশি খাওয়া ক্ষতিকর। রোযার উদ্দেশ্যই খাদ্য গ্রহণের ক্ষতি হ্রাস করা। রাসূলুল্লাহ  ইরশাদ করেন-
كَمْ مِنْ صَائِمٍ لَيْسَ لَهُ مِنْ صَوْمِهِ إِلَّا الْجُوعُ وَالْعَطَشُ
-অনেক রোযাদারের রোযায় ক্ষুধা ও তৃষ্ণা বৃদ্ধি ছাড়া কিছুই লাভ হয় না।
কেউ বলেন, যে হারাম দ্বারা ইফতার করে, (এই) হাদীসে তাকেই বুঝানো হয়েছে। কারও কারও মতে সে ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে, যে হালাল খাদ্য থেকে বিরত থাকে এবং মানুষের গোশত অর্থাৎ গীবত দ্বারা ইফতার করেÑ হাদীসে সেই ব্যক্তিকেই বুঝানো হয়েছে।
পঞ্চম: ইফতারে হালাল খাদ্য এত বেশি খাওয়া অনুচিত যাতে পুরোপুরি উদর পূর্তি হয়ে যায়। কেননা, আল্লাহ তাআলার কাছে বৈধ বিবেচ্য কার্যাদির মধ্যে নিচু স্তরের হালাল কর্ম হলো পেট পুরে খাওয়া, হোক হালাল খাদ্য। এছাড়া সারা দিনের ক্ষুধা ও পিপাসার ক্ষতি ইফতারের সময় পূরণ করে নেয়া হলে মানুষ রোযার এই ত্যাগের ইবাদত দ্বারা শয়তানকে কিরূপে দাবিয়ে রাখবে এবং কামভাবকে কিরূপে চূর্ণ করবে? প্রায়ই এক্ষেত্রে দেখা যায়, রোযার মধ্যে বাহারী খাদ্যের আয়োজন হয়ে থাকে। মনে হয় যেন, মানুষের অভ্যাস এই হয়ে পড়েছে, তারা রমযান মাসের জন্যে তাদের সবচেয়ে উত্তম খাবার নির্বাচন করে রেখেছে এবং এমাসে ভোজনের সকল চাহিদা পূরণ করে, যা অন্য সময় কয়েক মাসেও খায় না। এটি জানা বিষয় যে, রোযার উদ্দেশ্য পেটের খিদের চাহিদা দমন রাখা এবং কামনা-বাসনাকে চূর্ণ করা, যাতে তাকওয়ার ভিত মজবুত হয়। কিন্তু সারাদিন আহার গ্রহণ থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখে যখন খাদ্যের টান অনেক বেড়ে যায়, তখন পেট পুরে ও তৃপ্তি সহকারে সুস্বাদু খাদ্য খেলে নফসের আনন্দ শক্তি আরও দ্বিগুণ হয়ে যায় এবং এমন সব মন্দ বাসনা উদিত হয়, যা রমযান মাস না হলে হয় তো উত্থিত হত না। মোট কথা, যেসব শক্তি মানুষকে মন্দ কাজের দিকে ধাবিত করার সহায়ক এবং শয়তানের হাতিয়ার, সেগুলোকে দাবিয়ে রাখাহ রোযার উদ্দেশ্য। এটা খাবারে নিয়ন্ত্রিত না হওয়া ছাড়া হাসিল হয় না। অর্থাৎ, রোযায় রাতের বেলা এই পরিমাণ খাবে, যে পরিমাণ রামাদান মাস ছাড়াও প্রতি রাতের স্বাভাবিক খাওয়ার রুটিন। দিনের বেলা রোযা রেখে রাতে দুপুর ও রাতের খাবার একসাথে খেয়ে ফেললে সেই রোযা দ্বারা কোন উপকার হবে না। বরং ক্ষুধা, পিপাসা ও দৈহিক দুর্বলতা অনুভূত হওয়ার জন্য দিনের বেলায় বেশি নিদ্রায় না যাওয়াও মুস্তাহাব। রাতেও কিছু দুর্বলতা থাকা ভাল, যাতে তাহাজ্জুদ ও অন্যান্য ওযীফা কঠিন হয় না এবং ইবাদতের স্বাদ পাওয়া যায়। এতে শয়তান মনের নাগাল পেতে পারে না। ফলে মানুষের দৃষ্টিতে ঊর্ধ্বজগতের মালিকের সাথে নৈকট্যতার প্রতিবন্ধকতা দূর হয়ে গেলে বিস্মিত হওয়ার কিছুই নেই।
যে ব্যক্তি অন্তর ও পেটের মাঝে ভোজন রসিকতার থলে স্থাপনের মাধ্যমে প্রতিবন্ধকতা দাঁড় করায়, সে ঊর্ধ্ব জগতের নৈকট্যতা থেকে পর্দার আড়াল থাকে। আর যে এ থেকে দূেের থাকতে পারে সে এই নিআমত লাভ করতে পারে।
ষষ্ঠ: ইফতার করে আনন্দচিত্তে না থেকে রোযার ব্যাপারে হৃদয়মাঝে আশা ও ভয় নিয়ে থাকা। কেননা, একথা কারোর জানা নেই, রোযাদারের রোযা কবূল হয়েছে কিনা এবং সে আল্লাহর সন্তুষ্টিপ্রাপ্তদের তালিকাভূক্ত হয়েছে কিনা। প্রতিটি ইবাদত শেষে নিজের এমন হাল থাকা ভাল। ইমাম হাসান বসরী রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে, ‘একবার তিনি ঈদের দিন কিছু লোকের কাছ দিয়ে গমন করতে দেখলেন, তারা বেশ ফুর্তি করছে। তিনি বললেন, আল্লাহ মাহে রামাদানকে দৌড়ের মাঠস্বরূপ করেছেন, যেখানে সকল মানুষ তাঁর আনুগত্যের দিকে দৌড় দেয়। একদল যেতে যেতে অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌছে যায়। আর কিছু লোক পেছনে রয়েছে হতাশ হয়ে। এদিন এমন, যেদিন সতকর্মশীলরা তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌছেছে এবং পথবিচ্যুতরা বঞ্চিত রয়েছেÑএমন অজানা ফলাফলের দিন যারা হাসি-তামাশা করে, তাদের দেখে আশ্চার্যান্বিত হই। শপথ আল্লাহর, আসল অবস্থা উপস্থাপন করা হলে, উত্তম ব্যক্তিরা নেক কর্মে মজে থাকবে এবং প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তিরা দুঃখের আতিশয্যে হাস্য, রসিকতা থেকে বিরত থাকবে।’ আহনাফ ইবন কাইস রাহিমাহুল্লাহকে একজন বলল: ‘আপনি বয়োবৃদ্ধ মানুষ, রোযায় দীর্ঘ পানাহার ত্যাগ আপনাকে দুর্বল করে দেয়। এ জন্যে বিকল্প কোনো পন্থা অবলম্বন আপনার জন্যে কল্যাণজনক।’ তিনি বললেন: ‘আমি আমার অনন্ত সফরের জন্য রোযাকে প্রস্তুত করছি। আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের মাধ্যমে সবর করা তাঁর দেওয়া শাস্তির ভয়ে সবর করার তুলনায় অনেক সহজ।’
এ দিকগুলো হলো রোযার আভ্যন্তরীণ শর্ত।
এখন তুমি যদি বল, যে ব্যক্তি কেবল পানাহার ত্যাগ ও লজ্জাস্থানের কামনা-বাসনা থেকে বিরত থাকে এবং এইসব আভ্যন্তরীন দিকগুলো রোযার ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করে নাÑফকীহগণ তাদের রোযা জায়েয বলে থাকেন। এখন প্রশ্ন হল, ফকীহগণ যে রোযাকে বৈধতা দেন, আপনি তা অশুদ্ধ বলেন কেন? তবে আমার পক্ষ থেকে এর জওয়াব হচ্ছে, ফকীহগণ বাহ্যদর্শী হয়েই রায় দিয়ে থাকেন। তাঁরা দূর্বল ও দীনী ক্ষেত্রে গাফিল ব্যক্তিদের বিবেচনায় বাহ্যিকতার উপর হুকুম দেন, যা ইবাদতের মূল মাকসাদের দিকে দৃষ্টিপাতের আলোকে নেহায়েত দূর্বলই। বিশেষত, পরনিন্দা, কলহ-বিবাদ থেকে বেচে থাকা ইত্যাদি বিষয়ের ক্ষেত্রে। বাহ্যিকতার উপর খেয়াল রেখে এমন বিধান দিতে হয়, যাতে গাফেল ও পার্থিবতায় আসক্ত ব্যক্তিরাও দাখিল থাকতে পারে। তাই জাহেরী তথা আদায় মাত্রই পালনকারীর হিসাবের অন্তর্ভূক্তির বিবেচনায় অনেক বিষয়কে তাদের পক্ষ থেকে শুদ্ধতার কাতারভূক্ত বলতে হয়। কিন্তু সূফী-বুযুর্গদের মতে শুদ্ধ হওয়ার অর্থ হচ্ছে কবুল হওয়া। আর কবূল হওয়ার মানে চুড়ান্ত লক্ষ্যে পৌছা। তাঁরা বলে থাকেন, রোযার উদ্দেশ্য আল্লাহ তাআলার একটি গুণ ‘সামাদ’, যার এক অর্থ ক্ষুধা পিপাসা থেকে মুক্ত থাকাÑ মানুষ রোযার ক্ষেত্রে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর এই গুণের মর্যাদার কিছু লাভের সুযোগ পায় এবং কামনা-বাসনা ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারে যথাসাধ্য ফেরেশতাগণের অনুসরণ করার সুযোগ পায়।
মানুষের মর্যাদার স্থান চতুষ্পদ জন্তুর থেকে ঊর্ধ্বে, কারণ মানুষ আল্লাহর পক্ষ থেকে আকলের নূর লাভ করেছে, যার মাধ্যমে সে তার কামনা-বাসনা চূর্ণ করতে সক্ষম। কিন্তু চেষ্টার মাধ্যমে কামনা বাসনা নিয়ন্ত্রণ করতে হয় বলে মানুষের মর্যাদা কামনা বাসনার দৃষ্টিতে ফেরেশতাগণের নিচে। এ কারণেই মানুষ যখন কামনা-বাসনায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ে, তখন সেÑ
اَسْفَلَ سَافِلِين
Ñতথা, নি¤œ শ্রেণিতে নেমে যায় এবং চতুষ্পদ জন্তুর কাতারে শামিল হয়ে যায়। বিপরীতে যখন মানুষ কামনা-বাসনা নির্মূল করতে সক্ষম হয়, তখন أَعْلَى عليّينَ তথা মর্যাদার উচ্চতম শিখরে আরোহণ করে ফেরেশতাগণের মত প্রবৃত্তিমুক্ততার স্তরে পৌঁছে যায়। ফেরেশতাগণ গুনাহমুক্ত হওয়ার দরুণ আল্লাহ তাআলার নিকটবর্তী। যে লোক ফিরিশতাদের গুনাহ মুক্ততার অনুসরণ করে এবং তাদের মত অভ্যাস গড়ে তোলে, সেও তখন আল্লাহ তাআলার নিকটবর্তী হয়ে যায়। এই নৈকট্য স্থান ও দূরত্বের দিক দিয়ে নয়; বরং গুণের দিক দিয়ে। আত্মশুদ্ধিসম্পন্ন সুফিদের মতে রোযার মূল উদ্দেশ্য যখন এই, তখন দিনের খাদ্য দেরি করে সন্ধ্যার খাদ্যের সাথে একেবারে মনমতো খেয়ে নিলে এবং সারাদিন কামনা বাসনায় নিমজ্জিত থাকলে কি উপকার হবে? এই বৈশিষ্ট্যের রোযায় উপকার হলে এই হাদীসের অর্থ কি হবে,
كَمْ مِنْ صَائِمٍ لَيْسَ لَهُ مِنْ صَوْمِهِ إِلَّا الْجُوعُ وَالْعَطَشُ
অনেক রোযাদারের রোযায় ক্ষুধা ও তৃষ্ণা বৃদ্ধি ছাড়া কিছুই লাভ হয় না।
এ কারণেই কতিপয় আলিম বলেন, অনেক রোযাদার রোযাখোর হয় আবার অনেক রোযাখোরই কেমন জানি রোযাদার হয়ে থাকে। অর্থাৎ, রোযাখোর হয়েও সেসব লোক রোযাদার, যারা আপন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গুনাহ থেকে মুক্ত রেখে পানাহার করে এবং রোযাদার হয়েও রোযাখোর তারা, যারা ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত থাকে; কিন্তু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গুনাহ থেকে বিরত রাখে না। রোযার অর্থ ও মূল লক্ষ্য অবগত হওয়ার পর জানা গেল, যে ব্যক্তি পানাহার ও স্ত্রী সহবাস থেকে বেঁচে থাকে; কিন্তু গুনাহের কাজ করে রোযা নষ্ট করে দেয়, সে সেই ব্যক্তির মত, যে ওযুর মধ্যে ওযুর অঙ্গকে ধৌত না করে তিন বার মাসেহ করে নেয়। এখানে কেবল বাহ্যত তিন বার মাসেহ করল; কিন্তু ধৌত করার যে আসল উদ্দেশ্য, তা বাস্তবায়ন করল না। এরূপ ব্যক্তির নামায মূল মাকসাদহীন মূর্খতাপূর্ণ হওয়ার কারণে তার উপর ছুড়ে ফেলা হবে। যে ব্যক্তি পানাহারে রোযা নষ্ট করে এবং আপন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গুনাহের কাজ থেকে বিরত রাখে, সে সেই ব্যক্তির মত, যে ওযুর মধ্যে এক একবার অঙ্গ ধৌত করে। তার নামায ইনশাআল্লাহ মকবুল। কেননা, সে আসল ফরয আদায় করেছে, যদিও ফদীলত বর্জন করেছে। আর যেব্যক্তি পানাহার বর্জন করে এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারাও রোযা রাখে অর্থাৎ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গুনাহের কাজ থেকে বিরত রাখে, সে সেই ব্যক্তির মত, যে উযূর মধ্যে প্রত্যেক অঙ্গ তিন বার ধৌত করে। সে আসল ও ফযীলত উভয়টি অর্জন করেছে, যা হচ্ছে পূর্ণতার মাকাম।
রাসূলে করীম  বলেন,
إِنَّ الصَّوْمَ أَمَانَةٌ فَلْيَحْفَظْ أَحَدُكُمْ أَمَانَتَهُ
-নিশ্চয় রোযা একটি আমানত। তোমাদের প্রত্যেকের উচিত এই আমানতের হিফাযত করা।
অতঃপর তিনি এই আয়াত পাঠ করলেন,
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا
আল্লাহ আদেশ করেন, তোমরা আমানত হকদারের কাছে পৌঁছে দাও। আয়াত পাঠ শেষে তিনি আপন কান ও চোখের উপর হাত রেখে বললেন: ‘কানে শুনা এবং চোখে দেখা আমানত।’ যদি শুনা ও দেখা রোযার অন্যতম আমানত না হত, তবে তিনি কখনও বলতেন না যে, কেউ বিবাদ করতে চাইলে বলেবে- ‘আমি রোযাদার।’ অর্থাৎ, আমি আমার জিহ্বা আমানত রেখেছি। আমি তা সংযত রাখব। তোমাকে তোমার মন্দ কাজের জওয়াব দিয়ে এই আামানত কিরূপে নষ্ট করতে পারি?

সূত্র: প্রবন্ধটি ইমাম আবূ হামিদ আল গাযালী রাহিমাহুল্লাহের কালজয়ী গ্রন্থ ‘ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন’ এর সাউম অধ্যায়ের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ থেকে নেয়া। মাসিক পরওয়ানার পাঠকদের জন্য অনুবাদ ও তাখরীজ করেছেন মো. ইমাদ উদ্দীন তালুকদার।

তথ্যসূত্র:

সুরা আনআম: ৯১
ইমাম তাবারানী রাহিমাহুল্লাহ (৩৬০ হিজরী), আল মুজামুল কাবীর, হাদীস- ১০৩৬২; ইমাম নুরুদ্দীন হাইসামী রাহিমাহুল্লাহ (৮০৭ হি.), মাজমাউয যাওয়াইদ ওয়া মাম্বাউল ফাওয়াইদ, হাদীস- ১২৯৪৬
ইমাম দাইলামী রাহিমাহুল্লাহ (৫৫৮ হি.), মুসনাদুল ফিরদাউস, হাদীস- ২৯৭৯
ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ (২৫৬ হি.), সহীহ বুখারী, হাদীস- ১৭৯৫; ইমাম মুসলিম (২৬১ হি.), সহীহ মুসলিম, হাদীস- ১৯৪১
ইমাম আবু তালিব মাক্কী ইবন আতিয়্যা (৩৮৬ হি.), কূতল কুলূব ১/১৩৫
সূরা মায়িদা: ৪২
সূরা নিসা: ১৪০
ইমাম তাবারানী (৩৬০ হি.), আল মুজামুল আওসাত, বাবুল আলিফ, হাদীস- ২৪১৪
ইমাম ইবন মাজাহ (২৭৩ হি.), সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস- ১৬৯০; ইমাম নাসাঈ (৩০৩ হি.), সুনান আল কুবরা, হাদীস- ৩২৪৯; ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (২৪১ হি.), আল মুসনাদ, হাদীস- ৯৬৮৫
ইমাম ইবন মাজাহ (২৭৩ হি.), সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস-১৬৯০; ইমাম নাসাঈ (৩০৩ হি.), সুনান আল কুবরা, হাদীস- ৩২৪৯; ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (২৪১ হি.), আল মুসনাদ, হাদীস- ৯৬৮৫
আল্লামা খারাইতি রাহিমাহুল্লাহ, মাকারিমুল আখলাক, রাভী সাহাবী আবুল্লাহ ইবন মাসউদ
সূরা নিসা: ৫৮

ফেইসবুকে আমরা...