Logo
এক আধ্যাত্মিক রাহবারের বিরল পাঠদান : আত্মিক উন্নয়নের ইশতেহার
ফজলুর রহমান জুয়েল
  • ১৮ জানুয়ারী, ২০২৬

মুসলিম কবি-দার্শনিক ও পীর-বুযুর্গ অনেকের কাব্য-সাহিত্য ও নানা কথায় মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের গভীর প্রেমাসক্ত নানা অভিব্যক্তি লক্ষ করা যায়,যা এসম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতাহীন লোকের কাছে সহজবোধ্য ঠেকে না। মনোযোগ আকর্ষণও করে না। কিন্তু প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ঠিকই আলোড়িত করে। ভাবাবিষ্ট করে। ইতিহাসে যার নযীর বহু।
আল্লামা ইমাদ উদ্দীন মুহতারামের সেই অপার্থিব প্রেমানুভূতির প্রতিফলন লক্ষ্য করা গিয়েছিল সেদিন তাঁর পাঠদানের পরতে পরতে। যিকর, কবিতা-আবৃত্তি আর দুআ-দুরূদে। সময় সময় হাত উঠিয়ে মুনাজাতে।
তাঁর কণ্ঠে ঝংকারময় অনুরাগে ফুটে ওঠে দিল্লীর প্রসিদ্ধ উর্দু-কবি খাজা মীর দরদ (ইন্তিকাল: ১৭৮৫ইং) এর মর্মভেদী গযলের এই চরণ দুটি,
‘নযর মেরে দিল কি ফরি দরদা কিসি পর,
জিদহর দিখতা হো ওবি রোবিরো হে।’
অর্থাৎ, আমার বেদনাহত হৃদয়ের চাহনি কার উপর পড়ে? যেদিকে তাকাই দেখি একই মুখ।
এসময় গভীর এক ভাব-উদ্রেককারী গলায় তিনি বলে ওঠেন, আল্লাহ! পর্দা উঠিয়ে দিন।
পরে যিকর করার বাস্তব নমুনা দেখিয়ে বিশেষ কিছু তালীম প্রদান করেন। তারপর বলেন, নকশবন্দিয়ার যিকর, সেটাও এক ছেমা। মুহূর্তেই ফার্সী বয়েত আবৃত্তির মনোমুগ্ধকর স্বর ধ্বণিত হয় তাঁর যবান থেকে,
‘হার রগে মান তারে গাশতা,
হাজাতে জুননারে নীস্ত।’
অর্থাৎ, আমার প্রতিটি শিরা (যন্ত্রের) তারে পরিণত হয়ে গেছে। আমার জুননার বা পরিচিতিমূলক আলামত ধারণের দরকার নেই। দিল্লীর জগদ্বিখ্যাত কবি আমীর খসরু (ইন্তেকাল: ১৩২৫ইং)-এর কবিতার স্তবক।
আবৃত্তি শেষে বলেন, ওখানে (কলবে) যে সিতার বাজবে, তার সুর ভালো করে শুনলে সেটাই ছেমায় পর্যবসিত হয়।
আবারো শিহরণমূলক কবিতা আবৃত্তি, জালালুদ্দীন রূমী (ইন্তিকাল: ১২৭৩ইং)-এর ফার্সী বয়েত। তাঁর মসনবী প্রথম খ-ের বিখ্যাত সেই প্রথম পঙক্তি,
‘বিশনু আজনে চু হেকায়েত মী কুনদ,
ওয়াজ জুদাই হা শেকায়েত মী কুনদ।’
অর্থাৎ, শোনো বাঁশির কাহিনী! সে বিরহ-বিচ্ছেদের আকুতি জ্ঞাপন করছে।
গভীর ভাব-সমৃদ্ধ ছোাট এই স্তবকটির অন্তর্নিহিত বার্তা ব্যাখ্যা-সাপেক্ষ।
প্রচ- ভাবাবেগের এ আলোচনা তিনি আর দীর্ঘ না-করে তাঁর দেখিয়ে দেওয়া যিকরের নমুনা সম্পর্কে একথা বলেই ভিন্ন প্রসঙ্গ অর্থাৎ দুরূদ ও ওয়াযীফা সম্পর্কে কথা শুরু করেন, অন্তরকে স্থির করে পাঠ করার জন্যে এভাবে পর্যায়ক্রমিক যিকর আছে।
তিনি বলেন, ছাহেব কিবলা (আল্লামা ফুলতলী র.) বাতিয়ে দিতেন যে, প্রত্যেক দিন কমপক্ষে ২০০ বার দুরূদ শরীফ পড়বেন। যাঁরা কুরআনে পাক পড়তে পারেন, তাঁরা দালাইলুল খাইরাত পড়তে চেষ্টা করবেন। ছাহেব কিবলা যাঁদের (এব্যাপারে) সনদ দিয়ে গেছেন, তাঁরা দেখিয়ে দিলে সমস্যা নেই। ওয়াযীফা হিসেবে দালাইলুল খাইরাত সর্বাধিক পঠিত। সকল মকবুল সিলসিলায় দালাইলুল খাইরাত গৃহীত। যাঁর (দালাইলুল খাইরাত-এর সংকলক) ৭৭ বছর পর লাশ স্থানান্তর করা হয়েছিল, লাশের কোনো পরিবর্তন হয়নি। দেখে মনে হচ্ছিল যেন, তখনো ইষড়ড়ফ ঈরৎপঁষধঃরড়হ (রক্ত সঞ্চালন) হচ্ছিল। তিনি সেই ওলী, (ইতিহাসে) যাঁর অনেক ঘটনা রয়েছে।
আর হিযবুল বাহার অনেক শক্ত বিষয়। অনেকে পাগলও হয়ে যায়। মতলব ঠিক থাকলে, ভালো মানুষ হলে এভাবে অনুমতি দেওয়া হয়। পড়বেন। পড়ে অন্যকে শুনাবেন। এর আলাদা মেহনত আছে। হিযবুল বাহার অনেক উপরের স্তরের ওয়াযীফা।
পাঁচ ওয়াক্ত নামায শান্তিতে পড়লে আল্লাহ জীবনকে শান্তিপূর্ণ করে দেন। হায় আল্লাহ! একাজে আমরা বড় কমজোরী হয়ে গেছি! আমাদের যতদিন হায়াত আছে, আমাদের এবং আমাদের বিবি-বাচ্চাদের শান্তিতে নামায পড়ার তাওফীক দিন।
অপরের ভালো যে দেখতে পারে না,সাহেব কিবলা বাতিয়েছেন,তাঁর দুনিয়া ও আখেরাত নষ্ট হয়ে যায়।’
গভীর এক নীরবতা বিরাজ করছিল তখন বিশাল সে-জনসমুদ্রে। দেখে মনে হচ্ছিল, সেই মুহুর্তটাতে তন্ময় হয়ে গেছে সকলের হৃদয়-মন। বলাবাহুল্য, সমাজে হিংসার ধরণ ও প্রকার বহুবিধ। তাতে আর্ত-মানবতার সেবা করলেও কিছু মানুষ যে হিংসা করে, তা দেখে কেউ যাতে নিরুৎসাহিত না হন, সে-নির্দেশনা ছিল আল্লামা ইমাদ উদ্দীন মুহতারামের কথায়। তিনি বলেন, হিংসা-বিদ্বেষের পরিবেশ থেকে আল্লাহ যেন দূরে রাখেন। এটা থেকে দূরে এমনিতে থাকতে পারবেন না। হয় কি, একজন কিছু একটা করল, আপনি তখন নেমে পড়লেন। এটা নিয়েই ব্যস্ত। এটা একটু খবভঃ ঝরফব-এ (বাম পাশে) রেখে আপনি এগিয়ে যেতে থাকুন মুসাফির। এগিয়ে যেতে থাকুন। যেখানে গ্রামের শেষ প্রান্তে বাঁশের সাঁকোর ওপারে ভিক্ষের ঝুলি কাঁধে নিয়ে দুইটি এতিম দাঁড়িয়ে আছে। সমস্ত দিন কাদা-মাখা দেহ। ওদের মাথায় হাত দিন। দেখবেন, দিল নরম হয়ে যাবে। ওয়ামসাহু রাসাল ইয়াতীম (রাসূল সা. এর হাদীস, ইন আরাদতা আইয়ালবিনা কালবিকা, ফাত্ইমিল মিসকিন, ওয়ামসাহ্ রাসাল ইয়াতীম, অর্থ: তুমি যদি তোমার অন্তরকে নরম করতে চাও, তাহলে গরিবদের খাওয়াও, এতিমের মাথা মুছে দাও/মুসনাদ আহমদ)। কিছু দূর অগ্রসর হলে দেখা যায়, ঘরে চাল-ডাল কিছু নেই। স্বামী মৃত্যুবরণ করেছে। সেখানে তুয়ামে মিসকীন (মিসকীনকে খাওয়ানো) যদি করেন, তবে দিল নরম হবে।
আধুনিক যুব সমাজে অনেকের মধ্যে মানুষের নযরকাড়া, সুনাম অর্জন ইত্যাদি লক্ষ্যে উচ্চ স্বরে বুলি আওড়ানো বক্তব্য আয়ত্তের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। যাকে সততা, নিষ্ঠা বা আমল-আখলাক মুখ্য না-হলেও আপসহীন, সোচ্চার প্রতিবাদী, নির্ভীক সংগ্রামী ইত্যাদি বিশেষণ প্রাপ্তির সম্ভাবনাময় আশা থাকে। সে-আশায় এজাতীয় বক্তব্য আয়ত্তের পেছনে অনেকে সময় ব্যয় করেন। কিন্তু এই শ্রমদান যে প্রকৃত মূল্যহীন, তা ফুটে ওঠে আল্লামা ইমাদ উদ্দীন মুহতারামের প্রাঞ্জল ও রসময় কথায় এভাবে, বজ্রকণ্ঠের ঈড়সঢ়বঃরঃরড়হ (প্রতিযোগিতা)-এ যাবেন না। ঢাকায় আমার এগারো বছর (ছাত্র-জীবনে)। অনেক সময় বজ্রকণ্ঠের ঢং দেখার জন্য যেতাম। (শুনলে মতে হত) দোহাই আল্লাহর! (বক্তৃতা দিয়ে) একেবারে ছেঁচে (পেষণ করে ) ফেলছে। আপনার যদি এটা অরস রহ ষরভব হয়ে যায়, আমি যদি এভাবে চিল্লাতে পারতাম! তবে তা কাম্য নয়। (কামনা করুন) আল্লাহ এমন নীরবতা দান করেন যেন, যার উপর হাজার (বজ্রকণ্ঠের) বক্তৃতা কুরবান হয়ে যায়। এটাই আসল জিনিস।
তিনি বলেন, চিশতিয়ার যিকর যা করা হয়েছে, সেটার রূপ বদলে ফেলুন না যেন। না-হয় ফয়েয পাবেন না। (সংযোগ) কেটে যাবে। এই যিকর একাকীও করা যায়। ছাহেব কিবলা (আল্লামা ফুলতলী র.) সফর থেকে তশরীফ আনার পর বাড়িতে কারো যাতে উরংঃঁৎন (বিরক্তি) না-হয়, এভাবে আস্তে আস্তে যিকর করতেন।
আল্লামা ফুলতলী (র.) সে- যিকর কীভাবে করতেন, সেভাবে যিকর করে দেখিয়ে দিয়ে আল্লামা ইমাদ উদ্দীন আল্লাহর দরবারে হাত তুলে মুনাজাত করেন দীর্ঘসময়। তারপর মীলাদ সম্পর্কে করেন কিছু স্মৃতিচারণ। বলেন,
‘মীলাদ তো আমরা পড়ি। একবারে সংক্ষেপে মজার মীলাদ পড়ার সুযোগ আমার অনেক জায়গায় হয়েছে। তার মধ্যে বাইতুল মুকাররম মসজিদের প্রথম খতীব সায়্যিদ আমীমুল ইহসান (র.)। ঢাকা আলীয়ায় আমাদের হাদীস শরীফের উস্তাদ। সংক্ষেপে যখন মীলাদ পড়তেন, দেখতাম তাঁর সমুদয় দাড়ি (চোখের পানিতে) ভিজে গেছে। আমাদের তো এখন দিলে এসব কোনো তাছিরই করে না।
আরেকদিন ঢাকা আলীয়া’র গেইটে আমি দাঁড়ানো। আল্লামা কাশগরী ও আল্লামা তর্কবাগিশ যাচ্ছেন মুফতি আমীমুল ইহসান (র.)-এর কাছে। কাশগরী সাহেব আমাকে ডেকে গাড়িতে তুললেন। ইন্দোনেশিয়া থেকে উবষবমধঃরড়হ (প্রতিনিধি দল) এসেছিল। সেখানে মীলাদ হলো। এভাবে আমার সৌভাগ্য হয়েছে অনেক জায়গায় আমীমুল ইহসান সাহেবের সাথে মীলাদে অংশ গ্রহণের।
আবার মুনাজাত করলেন আল্লাহর দরবারে। মুনাজাত শেষে পবিত্র মক্কা প্রসঙ্গ। বললেন, মক্কা শরীফ যাঁরা যান, মারওয়া (পবিত্র কাবা থেকে ৩০০ মিটার উত্তর-পূর্বদিকে অবস্থিত সাদা পাথরের ছোট পাহাড়) থেকে ওই দিকে (সামান্য পূর্বদিকে) গেলে মাওলিদুন্নবী (রাসূল  পবিত্র মক্কার যে স্থানে জন্মগ্রহণ করেন)। এ সম্পর্কে ইতিহাস যতই বিকৃত করা হোক, সাবিত দলীল (প্রতিষ্ঠিত প্রমাণ) আছে, ওখানেই হুযূর  এর জন্মস্থান। ভেতরে প্রবেশের নসীব যাঁদের হয়েছে, (তাঁরা বলতে পারেন) এখনও সেখানে মিশকের সুঘ্রাণ পাওয়া যায়। এই জায়গায় গিয়ে এখানে ওখানে বেআদবের মতো ঘোরাঘুরি না-করে লাল রুমাল (আইন-শৃঙ্খলা সদস্য) যেখানে বাধা না-দেয়, সেখানে ঝিম মেরে বসে স্মরণ করবেন, সেই দেড় হাজার বছর আগে এখানেই আকায়ে মাওলা তাশরীফ এনেছিলেন! তাঁর চরণ-ধুলোয় ধন্য হয়েছিল এই পৃথিবী!
আরেকটি বিষয়। সায়্যিদা আমিনা যেদিন তাঁকে নিয়ে মদীনা শরীফ রওয়ানা হলেন, কত লু-হাওয়া, কত মরুগিরি পার হয়ে তিনি মদীনা শরীফ পৌঁছলেন। পথিমধ্যে আবওয়া নামক স্থানে সায়্যিদা আমিনার ইন্তিকাল হয়ে গেল। আলাম ইয়াজিদকা ইয়াতীমান ফা আওয়া (তিনি কি আপনাকে ইয়াতীম অবস্থায় পাননি? পরে আশ্রয় দিলেন। সূরা আদ দুহা, আয়াত: ৬)। সেখানে গিয়ে অনুভূতি যদি প্রখর হয়, তাহলে একটা জিনিস নিয়ে আসবেন, (বলে রাখি) বাধা আর ঠেলাঠেলিমুক্ত একটা জায়গায় গিয়ে একটু বসবেন (তবেই বুঝতে পারবেন)।
এ পর্যন্ত বলার পর সমাপ্ত হয় পাঠদান। অনুষ্ঠিত হয় মনোমুগ্ধকর মীলাদ। আবিষ্টচিত্তে তা পরিবেশন করেন আল্লামা ইমাদ উদ্দীন। মীলাদ শেষে মুনাজাত। তারপর মঞ্চ থেকে বিদায় নেন।
পাঠক! আল্লামা ইমাদ উদ্দীন মুহতারামের দীর্ঘ আলোচনা এই নিবন্ধে উপস্থাপন সমাপ্তির পর বিজ্ঞ মহলে মূল্যায়ন ও পর্যালোচনার প্রণিধানযোগ্য বিষয় যে, প্রথমত আল্লামা ইমাদ উদ্দীন চৌধুরীর শিক্ষা-দীক্ষা ও ব্যক্তিত্ব। তিনি উচ্চশিক্ষিত বুযুর্গ আলিম। প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা মাদরাসা-ই আলীয়া-ঢাকা থেকে সেই ১৯৬৮ইং সালে প্রথমে ইলমে হাদীস ও পরবর্তীতে আরবী-সাহিত্যের উপর। উর্দু-সাহিত্যেও গ্রহণ করেন বিশেষ ডিপ্লোমা কোর্স। পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষা-ব্যবস্থায় গ্র্যাজুশেন করেন ঢাকা বুরহান উদ্দিন কলেজ থেকে। ইসলামী ঐতিহ্য অনুসারে উচ্চশিক্ষার (ইলমে হাদীস, ইলমে ফিকহসহ বিভিন্ন বিষয়) অপ্রাতিষ্ঠানিক সনদ (ইজাজত) লাভ করেন বিখ্যাত বুযুর্গ আল্লামা আমীমুল ইহসান (র.) এর নিকট থেকে।
দ্বিতীয়ত, যেহেতু ইসলামী শিক্ষার অপরিহার্য ঐতিহ্য হচ্ছে, অর্জিত জ্ঞানের যথাযথ কার্যকারিতার স্বার্থে উপযুক্ত বুযুর্গ আলেমের সুহবত বা সং¯্রব লাভ। সেটা তিনি দীর্ঘ দিন লাভ করার সুযোগ পেয়েছেন তাঁর সুযোগ্য পিতা আল্লামা ফুলতলী (র.) নিকট থেকে। এমতাবস্থায় আল্লামা ফুলতলী (র.) এর ইন্তিকাল-পরবর্তী এই সময়ে একটি প্রথিতযশা আন্দোলন কিংবা সিলসিলা’র মুখপাত্র হিসেবে আল্লামা ইমাদ উদ্দীন চৌধুরীর সকল পাঠদান ও আলোচনা আলাদা তাৎপর্য বহন করে। ইসলাম-প্রচার-ইতিহাসের শিক্ষা ও দর্শন আর আধুনিক গবেষণা সেটাই নির্দেশ করে।
পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাঁর আলোচনায় আল্লাহর মুখাপেক্ষী হয়ে প্রয়োজনীয় দুআ পাঠ, দুরূদ ও ওয়াযীফা পাঠ, নকশবন্দিয়া ও চিশতিয়া তরীকার যিকর ও প্রাসঙ্গিক তথ্যাবলিসহ ইত্যকার বিষয়গুলোতে মানুষের অন্তর্জগতের স্বভাবজাত চাহিদা পূরণে যে উপাদান পাওয়া যায়, তা হাতে গোনা দুয়েকজন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ব্যতীত আজকাল ইসলামী শিক্ষা প্রচারে নিয়োজিত অনেক দায়িত্বশীল মহল থেকেও পাওয়া যায় না। যাঁরা এব্যাপারে একআধটু তৎপরতা প্রদর্শন করেন, তাঁদের বেশিরভাগ প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা সুহবত ও ইজাজত প্রাপ্তির শিক্ষায় অনুপযুক্ত। স্বল্প-শিক্ষিত ও জাহিল সূফী (এই পরিভাষাটি হযরত আলী হুজবেরী (র.) (ইন্তিকাল: ১৯৭২/৭৭ইং)-এর), না-হয় অশিক্ষিত-ইলম আমলহীন জটাধারী ভন্ড-ভবঘোরে। অনেকে নামকরা সিলসিলা’র প্রতিনিধিত্বকারী হওয়ার পরও ধান্ধা ও বৈষয়িক স্বার্থপাগলের ভূমিকায়। এক্ষেত্রে উপযুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কার্যকর ভূমিকা অতীতের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে। ফলে ইলমে তাসাওউফের আলোচ্যভুক্ত সামগ্রিক বিষয় এখন বিস্মৃতির আড়ালে পতিত। আধুনিক শিক্ষিত মুসলমানদের বিরাট অংশের তো মনে বদ্ধমূল এক ধারণাই তৈরি হয়ে আছে যে, যিকর, তরীকা, তাসবীহ-তাহলীল, দুরূদ ইত্যাদি কেবলই জটাধারী ভন্ড আর ধান্ধাবাজ পীর-ফকীরদের বিষয়। নেহাতই জীবিকা-নির্বাহের কসরত। কিংবা পশ্চাৎপদ সমাজের রীতি-রেওয়াজ। ইসলামের অনুশাসনভুক্ত কিছু না। আর পশ্চিমা প্রচারণানির্ভর ইসলামী জ্ঞানচর্চায় উচ্চ সদনধারীগণ বেমালুম উপেক্ষা করছেন ইলমে তাসাওউফের আলোচ্য সকল বিষয়। এমনকি ওয়ায-নসীহতে রাসূল  ও সাহাবী কিংবা বুযুর্গদের অলৌকিক ও আত্মিক শিক্ষামূলক ইতিহাসের প্রামাণ্য নযীরসমূহ বিলকুল এড়িয়ে যেতে তাঁরা আগ্রহ লালন করছেন। আর ইলমে তাসাওউফের আলোচ্য বিষয়সমূহের সরাসরি বিরোধিতার মাত্রাও যে বেড়ে চলেছে অনেক দ্রুত, তা তো বলারই অপেক্ষা রাখে না। তা-ও কিনা সহীহ ইসলাম চর্চার তাগিদে! আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার এই যুগে এই অদ্ভুত বাস্তবতা সত্যি বিষ্ময়কর বটে! যা বিশ্বায়ন ও তথ্য-যোগাযোগ-প্রযুক্তির বর্তমান উৎকর্ষের দৌলতে আগের যে-কোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেক সুগঠিত ও অধিক পরিমাণে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে চলেছে। সমাজে যার ফলাফল বা প্রতিক্রিয়ার চালচিত্র বড়ই মর্মন্তুদ।
লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এসব বহুমুখী বিরূপতার মুখে ইলমে তাসাওউফের সঠিক শিক্ষা সমাজে হয়ে পড়েছে কোণঠাসা। তাতে করে মুসলমানদের কেউ অন্তর্জগতের স্বভাবসুলভ চাহিদা পূরণে ভ- ফকীর না-হয় বেশধারী প্রতারকের কবলে ঈমান-আমল বিনষ্ট করছেন। আধুনিক শিক্ষিতদের অনেকে শরণাপন্ন হচ্ছেন কোয়ান্টাম মেথডসহ নানা নব উদ্ভাবিত মতাদর্শের। আর অনেকে নামায-রোযাসহ কেবল বহির্জগতের অনুশাসন পুঙ্খানুপঙ্খ প্রতিপালন করলেও অন্তর্জগতের অনুশাসন ও তার সুফল থেকে রয়েছেন বঞ্চিত। এক্ষেত্রে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও বুযুর্গ আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী (র.) (১৮৯৬-১৯৬৯ইং) ভাষ্য মনে পড়ল। তিনি লিখেছেন, সহীহ (বিশুদ্ধ) তাসাওউফ যাহা ইলমে তাসাওউফের ইমামগণ (যেমন হাসান বসরী, হারিস মুহাসিবী, জুনায়েদ বোগদাদী, মারুফ কারখী, ফুযাইল ইবনে আয়ায, ইমাম গায্যালী, আব্দুল কাদির জিলানী, খাযা মইনুদ্দীন চিশতী, খাযা বাহাউদ্দীন নকশেবন্দ, খাযা শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী, আহমদ সিরহিন্দী মুজাদ্দিদে আলফে সানী, শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী, সায়্যিদ আহমদ বেরেলভী র. প্রমুখ বুযুর্গানে দ্বীন) কর্তৃক প্রচারিত হইয়াছে।
আরেক হইল গলত ও কৃত্রিম তাসাওউফ। ইংরেজ অরিয়েন্টালিস্টগণ গলত তাসাওউফকে ঝঁভরংস বলিয়া ঝঁভরংস ভারতীয় যোগীদের নিকট হইতে ধার করা বলিয়া শত শত বই লিখিয়া সহীহ তাসাওউফের অফুরন্ত বরকত ও ফয়েয হইতে মানুষকে মাহরূম করিয়া রাখিয়াছে। (সূত্র: মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী র. এর লেখা তাসাওউফ তত্ত্ব, পৃষ্ঠা: ১৮, বিশ্বকল্যাণ পাবলিকেশন্স, ঢাকা, ২০০১ইং)
এমনই যেখানে অবস্থা, সেখানে আল্লামা ইমাদ উদ্দীন মুহতারামের মতো যথোপযুক্ত ও প্রসিদ্ধ সিলসিলা’র দায়িত্বশীল মুখপাত্রের এজাতীয় জ্ঞানগর্ভ আলোচনা, পাঠদান ও নির্দেশনা জীবনচলার পথে সম্বিত ফিরে পাওয়ার মতো।
সেদিনকার সে-পাঠদানের আলোচনায় উদ্ভাসিত আরো যে একটি বিষয় না-বললেই নয়, তা হলো ইয়াতীম-অসহায়ের সেবা।
ভুলে যাওয়ার অবকাশ নেই, রাসূল  ও সাহাবায়ে কিরাম থেকে শুরু করে পরবর্তী বুযুর্গ-আউলিয়াগণের ইতিহাসে বিরাট অংশজুড়ে দেখতে পাওয়া যায় আর্ত-মানবতার সেবা, ইয়াতীম-মিসকীন খুঁজে খুঁজে নীরব সহায়তার অনুপম যত নযীর। বর্তমান সমাজের বাস্তবতায় মুসলমানদের জীবনাচার থেকে অনেক ক্ষেত্রে হারিয়ে যাওয়া যত ঐতিহ্য-অনুশাসন আছে, তার মধ্যে সম্ভবত এটা অন্যতম। স্বল্প সংখ্যক আলিম-পীর-বুযুর্গই আছেন বর্তমানে একাজে সক্রিয়।
কিন্তু এক্ষেত্রে আল্লামা বড় ছাহেব-এর দৃষ্টান্ত বিরল। জানা যায়, কেবল হৃদয়গ্রাহী উদ্ভুদ্ধকরণই নয়, তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদ তথা আয়-উপার্জনের একাংশ নিয়মিত তিনি নীরবে ব্যয় করে থাকেন ইয়াতীমদের সহায়তায়। আজকের বাস্তবতায় ভাবতে অবাকই লাগে। কে আছেন এমন নিভৃতচারী হয়ে ইয়াতীম-মিসকীন খুঁজতে আর সহায়তার ঝুলি নিয়ে ইয়াতীমের দ্বারে দ্বারে নিরন্তর হাযিরা দিতে! অসহায় মায়ের জীর্ণ কুটিরে তাঁর ইয়াতীমদের সাথে মাটিতে বসে দুর্দশার কাহিনী শুনে অশ্রু ঝরাতে! মাথায় ¯েœহের পরশে হাত বুলিয়ে দিতে! সেখানকার মানবীয় শৈল্পিক অনুভূতি প্রকাশ করে অন্যকে উদ্বুদ্ধ করতে! কে আছেন ইয়াতীমের সহায়তায় অন্তর্জগৎ আলোকিত করার কথা শোনাতে! অভিভূত না-হয়ে উপায় নেই আল্লামা ইমাদ উদ্দীন মুহতারামের এ সংক্রান্ত এই বিরল আলোচনা আর কর্মকা-ের ফিরিস্তি শুনলে। তাঁর অনুকরণে নাকি বিপুল সংখ্যক ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গ ইসলামের এই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য পূনরুজ্জীবনে সচেষ্ট রয়েছেন।
সেদিনকার বিশাল সে-জমায়েতে স্বনামধন্য ও বৃহৎ সিলসিলা’র মুখপাত্র হিসেবে বড়-ছাহেব-এর এই পাঠদান-সংশ্লিষ্ট প্রগাঢ় জ্ঞানগর্ভ ও তথ্যবহুল আলোচনা বলা যায় ঘোষণাপত্র বা ইশতেহারমাত্র। তাতে অনেক প্রয়োজনীয় বিষয়ে যে সম্যক ধারণা ও পথনির্দেশ নিহিত আছে, তা ব্যাপক। আতিœক উন্নয়ন ও দরদী সমাজ গঠনের স্বার্থে তা বাস্তবায়নে এগিয়ে আসা, নিজেকে শামিল রাখার স্বার্থকতা দুনিয়ার প্রকৃত প্রশান্তি, সমৃদ্ধি, নিরাপত্তা আর আখিরাতের মুক্তি পর্যন্ত ব্যাপৃত। সে-কথা ভাবতে গেলে মাহফিলে এত মানুষ কেন যায়, স্বভাব সুলভ মনোজিজ্ঞাসার সে-জবাব সহজে অনুধাবন করা যায়।
পরিশেষে আল্লামা ইমাদ উদ্দীন চৌধুরীর পাঠদান-সংশ্লিষ্ট আলোচনার বিশেষ কিছু অংশ (তরীকতের দর্শন-আশ্রিত) আলাদাভাবে পুনরুল্লেখ করে এই লেখাটির ইতি টানতে চাই।
ক্স পাঁচ ওয়াক্ত নামায শান্তিতে পড়লে আল্লাহ জীবনকে শান্তিপূর্ণ করে দেন। হায়! আল্লাহ! এ কাজে আমরা বড় কমজোরী হয়ে গেছি! আমাদের যতদিন হায়াত আছে, আমাদের এবং আমাদের বিবি-বাচ্চাদের শান্তিতে নামায পড়ার তাওফীক দিন।
ক্স সিলসিলা যত সম্ভব স্টাডি করবেন।
ক্স (কামনা করুন) আল্লাহ এমন নীরবতা দান করেন যেন, যার উপর হাজার (বজ্রকণ্ঠের) বক্তৃতা কুরবান হয়ে যায়। এটাই আসল জিনিস।
ক্স যেখানে করুণ অনুভূতি জাগে, সেটা ধরে রাখবেন।

ফেইসবুকে আমরা...