Logo
এক আধ্যাত্মিক রাহবারের বিরল পাঠদান : আত্মিক উন্নয়নের ইশতেহার
ফজলুর রহমান জুয়েল
  • ১৮ জানুয়ারী, ২০২৬

(পর্ব-০৪)

সেদিনকার সে-পাঠদানে সাহিত্যানুরাগ বিশেষ করে আধুনিক বাংলা-সাহিত্যের দুই প্রথিতযশা কবি ও বিভিন্ন মনীষীদের আত্মজীবনী সম্পর্কে অনুপম অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন আল্লামা ইমাদ উদ্দীন। তাতে ফুটে ওঠে রসাত্মক নানা কথকতাও।
পল্লী-কবি জসীম উদ্দীন (ইন্তিকাল: ১৯৭৬ইং)-এর আতœজীবনীমূলক গ্রন্থ জীবনকথায় উল্লেখ আছে কবির বাল্যজীবনের নানা স্মৃতি। ১৯৭৪ইং সালে প্রথম প্রকাশিত সে-গ্রন্থটিতে যার প্রাণবন্ত আলোকপাত রয়েছে। কবির বাড়ি থেকে নানাবাড়ি ছিল আট মাইল দূরে তাম্বুলখানা গ্রামে। বাল্যকালে কবি মায়ের সাথে সোয়ারী চড়ে নানাবাড়ি যেতেন। রাতের বেলা কবির মা ও নানি গল্প করতেন। বালক জসীম উদ্দীন বিছানায় নীরব শুয়ে শুয়ে মা-নানির সে-গল্প শুনতেন। নানি ব্যাকুল হয়ে জানতে চাইতেন, স্বামীবাড়িতে তাঁর মেয়ের খাওয়া-দাওয়া ঠিকমতো হয় কি না। কিন্তু জসীম উদ্দীনের মা তাঁর স্বামীবাড়ির দুর্নাম হয়, এমন কথা চেপে যেতেন। উলটো প্রশংসা করতেন এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে আছেন মর্মে জানাতেন। বিষয়টা বালক জসীম উদ্দীনের পছন্দ ছিল না।
পল্লী-কবির বাল্যস্মৃতির সে-কাহিনী সাহিত্যের রসবোধ সহকারে বিবৃত করেন আল্লামা ইমাদ উদ্দিন তাঁর পাঠদানে। বাদ পড়েনি কবি ফররুখ আহমদের স্মৃতিও। তাঁর সাহিত্য-আসরেও যেতেন বলে জানান। তাঁর ভাষায়, আত্মজীবনী পড়লে বড় একটা ফায়দা হয়। ছোট ছোট কথা পাওয়া যায় লেখকের জীবন সম্পর্কে। যেমন কবি জসীম উদ্দীন। তাঁকে দেখেছি। তাঁর আসরে যেতাম। পল্লী-কবি হিসেবে তাঁর প্রতি বেশ শ্রদ্ধা ছিল। পরে অবশ্য তিনি অন্য পথ ধরেছিলেন। কবি ফররুখ আহমদের ওখানেও যেতাম।
উল্লেখ্য, পল্লী-কবি জসীম উদ্দীন ও কবি ফররুখ আহমদ (ইন্তিকাল: ১৯৭৪ইং)-এর সাথে আল্লামা ইমাদ উদ্দীন-এর বিশেষ অনুরাগের সম্পর্ক ছিল। যা অনেকেরই জানা নেই। ইসলামী রেনেসাঁ’র কবি খ্যাত ফররুখ আহমদ ইসলামী অঙ্গনের আধুনিক বিবাদ-বিভ্রান্তির ঊর্ধ্বে ছিলেন। তিনি ইসলামী জাগরণ ও ইসলামী শাসনে মানবতার মুক্তিতে বিশ্বাসী ছিলেন।
যাক, উপরোক্ত দুই কবি-প্রসঙ্গের পর পাঠদানে এবার আল্লামা ইমাদ উদ্দিন তাঁর আদর্শিক অবস্থানের দৃঢ়তা ব্যাখ্যা করেন। বলেন, ‘আমাদের যে পথ-প্রক্রিয়া পীর-মুরশিদ আর উস্তাদগণ দেখিয়ে গেছেন, তা অনেক শক্ত। যেমন আমি ফকীরের কাছে হাদীস শরীফের সনদ আমার পিতা (আল্লামা ফুলতলী র.)-এর কাছ থেকে এসেছে।
যতদূর সম্ভব কিছু জীবনী আমি লিখেছি। যে পথ এসেছে যুগের শ্রেষ্ঠ ও মকবূল (আল্লাহপাকের নিকট গৃহীত) আল্লাহর ওলীগণ-মুহাদ্দিসীনে কিরাম থেকে, সে-পথে কোনো আপত্তি নেই।
এখন (তাঁদের প্রতি) আকীদা বিগড়ে যায় যদি, (যেকোনো) একজনের উপরও, যেমন ধরুন শাহওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (র.) বা যে কারো উপরে, তাহলে কাঁচি দিয়ে রশি কেটে ফেলার মতো (বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন) ফয়েয আর আসবে না। একদম আসবে না।
আল্লাহ! আমাদের মকবূল উস্তাদগণ আর মুরশিদ (আল্লামা ফুলতলী র.) যে-পথ-প্রক্রিয়া দেখিয়ে গেছেন, তাঁর আকীদা-বিশ্বাস নিয়ে যেন মরণের খেয়া পাড়ি দিতে পারি। আর হাশরের ময়দানে যেন সফলতা নসীব হয়।
অনেক বই আছে অশ্লীল। এসব পড়ে সময় নষ্ট করেন না যেন। এতে মাথা চক্কর কাটবে। পড়তে গেলে বুঝে পড়বেন। তসলিমাও পড়–ন বাধা নেই। বেচারি পরিচিতি লাভ করে গেছে। অশ্লীল বই পড়ে সময় নষ্ট করবেন না। সঠিক বই পড়বেন। আল্লাহ ফায়দা দেবেন।
নকশবন্দিয়া তরীকায় এক তরজি (রীতি-পদ্ধতি) দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানের প্রসিদ্ধ এক পীর সাহেব, খুব সম্ভবত তিনি আইউব খান সাহেবের পীর ছিলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনি নকশবন্দিয়া সম্পর্কে কী উপদেশ দেবেন? জবাবে তিনি বললেন, নকশবন্দিয়াতে যিকরের চেয়ে ফিকিরের প্রাধান্য বেশি।
নকশবন্দিয়ার যিকর-আযকার যা আছে, তা করবেন। আর রিয়া (আত্ম-জাহির-প্রয়াস) থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করবেন।
আমার পিতা মুহতারাম যে খিদমত রেখে গেছেন, তাতে সবচেয়ে বড় খিদমত হচ্ছে বিপন্ন মানুষের সেবা। আমি সুখী মানুষের সাথে বসলে আনন্দিত হই না, কোনো অনুভূতি পাই না। কিন্তু যখন নদী-খাল আর বাঁশের সাঁকো’র খাল-নালা পার হয়ে গিয়ে দেখি মাত্র একসপ্তাহ আগে মৃত্যুবরণ করেছে একন এক দীন-দুখী মানুষ। তাঁর কবর ওখানে। তাঁর ঘরের বারান্দায় যখন (বসার জন্যে) পাটি বিছাই, তখন তাতে যে শান্তি পাই, ফাইভ-স্টার হোটেলের বিছানাতেও সে-শান্তি নেই।
সেখানে (ইয়াতীমদের বাড়িতে) পাঁচ বছর-সাত বছরের ইয়াতীমরা আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি যখন জিজ্ঞেস করি, তাঁদের বাবার ইন্তিকালের সময় তারা কোথায় ছিল, তারা জবাব দেয়। আরও বলে যে, বাবার ইন্তিকালের সময় মাকে বলে গিয়েছেন যে, তাঁর বাচ্চাদের তিনি আল্লাহর হাওলা করে যাচ্ছেন।
তখন (তাঁদের কাছ থেকে) যে অনুভূতি নিয়ে আসি, তা লক্ষ টাকা দিয়েও ক্রয় করা সম্ভব না। এরকম অগণিত মানুষের কান্নার রোল আমি শুনেছি। তাঁদের নয়নের জল ঝরতে দেখেছি। স্বার্থকভাবে মুছে দিতে পারিনি, যেভাবে আমার পিতা (আল্লামা ফুলতলী র.) পেরেছিলেন।
সিলসিলা সম্পর্কে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছোট একটি কথা বলেন আল্লামা ইমাদ উদ্দিন। যা আজকাল অনেকেই বলেন না। তাঁর ভাষ্যে, সিলসিলা যত সম্ভব স্টাডি করবেন।
সম্পদের মোহ-মায়া থেকে সতর্ক করতে গিয়ে আল্লামা ইমাদ উদ্দিন উদাহরণ পেশ করেন, গাউসে পাক মহিউদ্দিন জিলানী (র.) বলেছেন, আমি পছন্দ করি না যে, আমার মুসাল্লার নিচে স্বর্ণ ভর্তি থাকুক আর (এমতাবস্থায়) সকাল হোক। তিনি তাঁর সবকিছু বিলিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর এক ফাতওয়া আছে, একজন ভুখা মানুষ খাওয়ানো একহাজার মসজিদ নির্মাণের চেয়ে উত্তম।
এই যে এক সাবজেক্ট, প্রত্যেকে খেয়াল করবেন। এই খিদমত (ইয়াতীম-মিসকীনদের সহায়তা) একবার করলে পরবর্তী বার করার তাওফীক আল্লাহ দেবেন। দিলকে শক্ত করুন না যেন। মান সাআহু রাসাল ইয়াতীম, ওয়া আতিমুল মিসকীন… (ইয়াতীমের মাথায় সহায়তার হাত বুলানো এবং মিসকীনকে খাবার দান) এই কাজের জন্য ব্যস্ত থাকবেন। আমরা খধঃরভর ঐধহফং-এর মাধ্যমে কিছু কাজ করছি। যে-কাজই করুন, দিলের মধ্যে এই বার্তা যদি এসে যায়, দয়াময়! এই বিশাল সিন্ধুর বুকে আমি কী দেবো! তখন আল্লাহ আপনাকে কবূল করে নেবেন।
আমি রোহিঙ্গাদের সহায়তার জন্য কাজের ফাঁকে কক্সবাজার সী-বীচে যিকর-আযকার করতাম। এখন কিছুদিন ধরে যেতে পারছি না। যিকরের মজা একটা পাওয়া যায় ওখানে। আরেক মজা ইয়াতীম নিয়ে যিকর করলে। মাহফিলে এত মজা পাই না।
আল্লামা ইমাদ উদ্দিন মুহতারামের কথায় গভীর ভাবানুভূতির অনুরণন প্রতিভাত হচ্ছিল। এসময় তাঁর যবান থেকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সিন্ধু-হিন্দোল কাব্যের সিন্ধু (দ্বিতীয় তরঙ্গ) কবিতা থেকে আবৃত্তি বেরিয়ে আসে,
‘হে সিন্ধু, হে বন্ধু মোর
হে মোর বিদ্রোহী!
রহি’ রহি’
কোন বেদনায় …
আহ! বড় অনুভূতি জাগে! যেখানে করুন অনুভূতি জাগে, সেটাকে ধরে রাখবেন। আমার মতো যাঁদের মা-বাবা কবরবাসী, আমরা যেন তাঁদের ভুলে না-যাই। যাঁদের মা-বাবা জীবিত আছেন, তাঁদের খিদমত করবেন। ছোট শিশুটির মতো মায়ের সামনে বিনীতভাবে বসবেন। আপনার আবদার আল্লাহ পূরণ করে দেবেন ইনশাআল্লাহ।
এ পর্যন্ত বলার পর আল্লাহর কাছে হাত তোলেন। করেন দীর্ঘ মুনাজাত। তারপর আবার পাঠদান। বলেন, মা’সুর দুআগুলো শিখবেন। রহমতে আলম (সা.) তাঁর যবান থেকে যে দুআ সাহাবীদের শিখিয়েছেন, একশতভাগ ইয়াকীন (থাকতে হবে) যে, এটা পড়লে এই-এই হবে।
দুপুরে আলোচনা করেছি আনাস (রা.)-এর দুআ। যেভাবে তাঁর ইয়াকীন ছিল, (সেই মুতাবিক) হাজ্জাজ তাঁকে কিছু করতে পারেনি।
কিছু দুআ আছে বুযুর্গানে কিরাম বাতিয়েছেন। সেটা ইশারা পেয়ে। যেমন হার্টের প্রবলেমের জন্যে হুওয়াল্লাযি আনযালাস সাকিনাতা ফী কুলূবিল মুমিনীনা লি ইয়াযদাদো ঈমানাম মাআ ঈমানিহিম। ওয়া লিল্লাহি জুনুদুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদি ওয়া কানাল্লাহু আলীমান হাকীমা (সূরা আল ফাতহ, আয়াত: ৪) পড়ে হার্টের উপর ফুঁ দিলে ফায়দা হয়। ব্যথা-বেদনার জন্য সরাসরি হাদীস (ইবনে মাজাহ)-এ আছে, (ব্যথার স্থানে) হাত রেখে বিসমিল্লাহ তিনবার আর পড়বেন আউযু বিইজ্জাতিল্লাহ ওয়া কুদরাতিহি মিন শার্রি মা আজিদু ওয়া উহাজিরু। ঋণ থেকে মুক্তির দুআ আছে। এভাবে যা আছে, পড়বেন।
দীর্ঘ পাঠদানের পর আগ্রহী মুসল্লীগণের বাইআত গ্রহণ করান। প্রাসঙ্গিক আলোকপাতে বলেন, যাঁরা আমাদের ছাহেব কিবলাহ (আল্লামা ফুলতলী র.)-এর কাছে ইতিপূর্বে বাইআত হয়েছেন, তাঁদের অনেকে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন। আপনারা (পূর্বের বাইআতকৃত) শরীক হতে পারবেন। নতুন হলেও পারবেন। আর আপনার সহীহ পথের পীর ও মুরশিদ (অন্য কোনো পীর) জীবিত থাকেন যদি, তিনি অনুমতি দিলে বাইআত গ্রহণ করবেন। আল্লাহর দিকে অন্তর হাযির করে আমি যা পড়ি, তা পড়বেন।

বাইআাত গ্রহণ করানো শেষে মুনাজাত হয়। তারপর আবার পাঠদান, একটু নীরবে শুনুন। ছাহেব কিবলাহ (আল্লামা ফুলতলী র.) তাওবা ও বাইআত শেষে এক সবক বাতিয়ে দিতেন। এটা অনেক উপকারী সবক। (বর্তমানে) মাসিক খানেকাহতে এই সবক আলোচিত হয়। প্রথম সবক হলো মুখ-জিহবা বন্ধ রেখে দম টান দিতে লা-ইলাহা। আর দম ছাড়তে ইল্লাল্লাহ। এটা কার্যকরী সবক। আল্লাহর এক বান্দা জানিয়েছেন, কিছু সময় পর ধ্যান করলে দেখা যায়, তোমার সাথে সবকিছু লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ জপছে। কুরআনে আছে, যমীন ও আসমানে সবকিছু আল্লাহর তাসবীহ পড়ে। তোমার মেশিন যদি ফিট করতে পারো, তবেই দেখবে সবকিছইু লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ জপছে। এটা শ্বাসের সাথে যে পড়বেন, তাতে ইয়াকীন রাখতে হবে যে, এটাও আল্লাহর যিকর। এটা আমি আদ দুররুস সামীন বের করে দেখিয়েছি, শাহ আব্দুর রহীম মুহাদ্দিসে দেহলভী (র.) বলেছেন, (এই আমল করলে) স্বপ্নে রাসূল (সা.) এর দীদার নসীব হবে।
আমাকে তালকীন করা হয়েছে নকশবন্দী মাশায়িখগণ যেভাবে পড়ে থাকেন, সেভাবে। এই জিনিস মকবূল (আল্লাহর কাছে গৃহীত)। এভাবে এই যিকর করবেন গুরুত্ব সহকারে। যাঁরা সবক অনুযায়ী কয়েকদিন এই যিকর করে শান্তি পান, তাঁরা গাফিল না-হয়ে কিছু সময় করলে ভালো। কলবের লতীফা খেয়াল করবেন। বাম দিকের স্তনের দুই আঙুল নিচে ভেতরে একটু বামে কলব বা ঐবধৎঃ যেখানে, সেখানে খেয়াল রেখে আল্লাহ, আল্লাহ বলবেন। (চলবে)

ফেইসবুকে আমরা...