Logo
এক আধ্যাত্মিক রাহবারের বিরল পাঠদান : আত্মিক উন্নয়নের ইশতেহার
ফজলুর রহমান জুয়েল
  • ১৮ জানুয়ারী, ২০২৬

(পর্ব-০৩)

ফুলতলী-মাহফিলে রাতের পর্বে আল্লামা ইমাদ উদ্দিন চৌধুরী’র আলোচনায় দুআ ও যিকরের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি উদার জ্ঞানচর্চার কথা ছিল। যাতে খুঁজে পাওয়া যায় নিজেকে গঠনে মনোযোগী হতে আর ধারণাকে প্রসারিত ও সমৃদ্ধ করতে যথাযথ পড়াশোনার তাগিদ। সেই সাথে অনুসন্ধান-পর্যবেক্ষণের সুসংহত নির্দেশনা। ছিল আজকালকার প্রয়োজনীয় জ্ঞানচর্চাহীনতার আড়ালে বিভ্রান্তি-কবলিত অনেক বিষয়ে সঠিক ও সুস্পষ্ট আলোকপাতও। যা সত্যি আলোড়িত হওয়ার মতো। যেমন যিকর, নারী-পুরুষের একত্রে জলসা-আয়োজন, বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার ইত্যাদি। আল্লামা ইমাদ উদ্দিন ফুলতলী বলেন, চিশতিয়া বা কাদিরিয়া (তরীকা)-এর যিকরের ইজাযত আমাদের মুরশিদ মুহতারাম (আল্লামা ফুলতলী র.) দিয়েছেন। খাস মাহফিল হয় যদি, তবে ইজাযত আছে।
একথা থেকে পরিষ্কার যে বার্তাটি পাওয়া যায়, তরীকাভিত্তিক যিকর অনুশীলনের আশানুরূপ সাফল্য পেতে প্রয়োজনীয় অনুমতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর জন্যে বিশেষ পরিবেশ-আয়োজনও বাঞ্ছনীয়।
আল্লামা ইমাদ উদ্দিন চৌধুরী আরও বলেন, নারী-পুরুষ একত্র হয়ে যিকরের অনুমতি সিলসিলাতে নেই। (নারীদের) পর্দার আড়ালে রেখে খতমে খাযেগান পড়ালে বা এজাতীয় অনুষ্ঠানে তাঁদের রাখতে পারেন। দুআতে শরীক করতে পারেন। কিন্তু একত্রে বসে (একই মজলিসে, যদিও তা পর্দার আড়ালে হয়) যিকর ঠিক নয়।
ইসলামী সংগীত বা সেমা-মাহফিলে বাদ্যযন্ত্র বাজানোর বিষয়ে বলেন, বাদ্যযন্ত্র মাহবূব-ই ইলাহী খাযা নিযামুদ্দীন (র.)-এর নসীহতের উপর আমাদের বুযুর্গদের আমল হচ্ছে, সেমার সময় বাদ্যযন্ত্র বাজাবেন না। সেমা ঠিক আছে। সেমার মধ্যে (ভাবানুভূতির) আগুন জ্বালানো আছে। খাস মাহফিল হলে সেমা গাইতে পারেন। বাধা নেই।
উপরোক্ত কথার পর বিশেষ আরেকটি বিষয় ছিল ইবাদতে নির্জনতা অবলম্বন-প্রসঙ্গ। ইসলামে যার ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধ। বৈষয়িক একটানা কর্মব্যস্ততার সাময়িক বিরতি মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বেজায় সহায়ক মর্মে আধুনিক স্বাস্থ্য-বিজ্ঞানেও বিষয়টি গুরুত্বের সহিত বিবেচিত হচ্ছে। আর বুযুর্গদের মতে, তাতে কেবল মানসিকই নয় বরং আত্মিক বা রূহানী উন্নতির মাধ্যমে আল্লাহপাকের সাথে সম্পর্ক অধিকতর নিবিড় হয়। এ বিষয়ে আল্লামা ইমাদ উদ্দিন ফুলতলী-এর সেদিনকার বক্তব্য, খিলওয়াত যাঁরা করেন (তাঁরা শুনুন), খিলওয়াত মানে নির্জনবাস। সকল বুযুর্গই দীর্ঘ জীবন নীরব-নিস্তব্ধ কাটিয়েছেন খিলওয়াত করে। কেউ পাহাড়-পর্বতে, কেউ অন্য কোনো (নির্জন) জায়গায়। এটা করতে গেলে ভয় আছে বিভ্রান্তির। ধরুন সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে আপনি খিলওয়াতে বসলেন। তখন শয়তান দেখে যে, একটা মানুষ উচ্চমার্গে উঠে যাচ্ছে। তখন সে ধোঁকা কীভাবে দেওয়া যায়, ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাই খুব সাবধান! সাবধানতার জন্যে খিলওয়াতের সময় যাঁদের হিযবুল বাহার পাঠের অনুমতি আছে তা পাঠ করবেন, রোজ দু-তিনবার ৩৩ আয়াত পড়বেন। হিসাব ঠিক রাখবেন। নীরব বসবেন। বসে সিলসিলা-নির্দেশিত যিকর করবেন। কুরআন তিলাওয়াত করবেন। দালাইলুল খাইরাত পড়বেন। এসবের মাধ্যমে দেখবেন, দিনটা কেমন করে কেটে যায়, বোঝাই যায় না। তিনদিন, সাতদিন অনেকে নির্জনবাস বা চিল্লা করেন।
ইসলামী অঙ্গনে অনেকে তরীকত বা ইলমে তাসাওউফ-নির্দেশিত কর্মকা-ের নানা ছুতোয় শরীআহ-আইন উপেক্ষা করেন। নিজের খেয়ালখুশিমতো চলে। সে-কসরত নাকচ করে আল্লামা ইমাদ উদ্দিন নিজ সিলসিলা’র রেফারেন্স উল্লেখ করে বলেন, আরেকটি বিষয় হলো, ছাহেব কিবলাহ (আল্লামা ফুলতলী র.)-এর মুরশিদ, (আমার) নানা ছাহেব বদরপুরী (র.) তাঁর মলফুযাত-এর মধ্যে লিখেছেন, শরীআতের প্রয়োজনে, রূহানীয়তের প্রয়োজনে, তাযকিয়ায়ে নাফস-এর প্রয়োজনে তরীকত এসেছে। তা শরীআতের খিলাফ করার জন্যে নয়। হঠাৎ আপনার অন্তরে এসে গেলেও শরীআতের খিলাফ কিছু করা যাবে না। সিলসিলার কাজে এ ব্যাপারে সাবধান!
হিযবুল বাহার যাঁরা পড়েন, তাঁদের এই খোলা মাহফিলে বলি, কিছু রিয়াযত আছে, যা খাসভাবে করা লাগে। তা করা ভালো।
এবার পূর্বসূরী বুযুর্গদের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, আজমীর বহুত দূর হ্যায়, লেকিন দিলকে করীব হ্যায় (খাযা মইনুদ্দীন চিশতী (র.) এর দরগাহ, আজমীর বহু দূরে অবস্থিত হলেও অনুভূতিতে হৃদয়ের কাছে)। আমার নসীব হয়েছে দুয়েকবার (আজমীর) যিয়ারতের। সেখানকার মাযার-শরীফ ভুলতে পারি না। তাঁর হাতে কত লক্ষ মানুষ মুসলমান হয়েছেন, তার ইতিহাস দেখুন। কোনো বর্ণনায় আছে, গরীব নেওয়াযের হাতে নব্বই লক্ষ মানুষ মুসলমান হয়েছেন।
হযরত শাহজালাল (র.) এর হাতে কত মানুষ ইসলাম কবূল করেছেন, তার ইতিহাস খুঁজলে সংখ্যা পাওয়া মুশকিল। মুসল্লী সমাজে হিংসা-বিদ্বেষের বিস্তারের প্রেক্ষিতে আল্লামা ইমাদ উদ্দীন ছাহেব পর্যাপ্ত পড়াশোনার তাগিদ দেন। বলেন, অন্য মুমিন ভাইকে মুশরিক বানানো, বিদআতী বানানোÑএসব থেকে দূরে থাকুন। তার চেয়ে আপনি নিজে স্টাডি করুন শিরক কী, বিদআত কী। পড়াশোনা করতে কোনো বাধা নেই। আপনি সকল ইযম (মতবাদ) সম্পর্কে পড়–ন। তাতে ঈমানের বাতি যদি সিলসিলার সাথে সম্পৃক্ত থাকে, তবে সেখান থেকে বাধা আসবে। আপনি বিভ্রান্ত হবেন না। যেমন আপনি ডারউইনের থিওরি পড়লেন। আমরাও পড়েছি। পড়ে সিজদায় গিয়ে বলেছি, আল্লাহ! আমাদের দ্বীনই সঠিক। ন্যাচার (ঘধঃঁৎব, কথিত প্রকৃতি) নয়, তুমিই সব।
আমার এক শিখ-বন্ধু আমাকে গুরুনানক সম্পর্কে জানার জন্যে জনম-সাকি বইটি দিয়েছিলেন। পড়ার পর দেখলাম কিছু তথ্য আছে মনের মধ্যে প্রভাব সৃষ্টি করে।
এভাবে আপনি ত্রিপিটক পড়তে পারেন বৌদ্ধদের সম্পর্কে জানার জন্যে। অ্যামেরিকার ইষধপশ ঝঃৎঁমমষব (কৃষ্ণাঙ্গদের সংগ্রাম) সম্পর্কে জানতে ঞযবৎব রং ধ জরাবৎ বই পড়তে পারেন। নেলসন ম্যান্ডেলা যে ঝঁভভবৎরহম (কষ্টভোগ) করেছেন, কি ঋরমযঃ (লড়াই) করেছেন, তা পড়তে পারেন। ইষধপশ ধহফ ডযরঃব এর ঝঃৎঁমমষব সম্পর্কে যতই পড়–ন, সব শেষে সমাধান রাসূল (সা.) এর কাছে। একজন আরেকজনকে (অ্যামেরিকায়) কালো বেটির ছেলে বলে গালি দেয়।
ইসলামে মানুষকে শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ অর্থাৎ গায়ের রঙ দেখে বিচার কিংবা বিভাজন-বৈষম্য করা হয় না। আল্লামা ইমাদ উদ্দিন ফুলতলী এক্ষেত্রে স্মরণ করেন রাসূল (সা.)কে লালন-পালনকারীদের কথা। বাল্যকালে তাঁকে দেখাশোনার দায়িত্ব পালনকারী হযরত উম্মে আইমান (রা.) আফ্রিকান বংশোদ্ভূত কৃষ্ণাঙ্গ নারী ছিলেন। মুহাম্মদ (সা.) যাঁকে আপন মায়ের মতো শ্রদ্ধা করতেন। আল্লামা ইমাদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, আমার এক মা সাদা। আরেক মা কালো। উম্মে আইমান (রা.) আর সায়্যিদুনা আমিনা (রা.)। তাঁর (আমিনা রা.) নাম নিতে অনেকের মুখ কালো হয়ে যায়! না, ঈমান সংশোধন করুন। হুযুর (সা.) এর আম্মাজান (আমিনা রা.) যে নাজি (নাজাতপ্রাপ্ত) তা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (র.) লিখেছেন। তা পড়ে উপযুক্ত লোকের সাথে আমিনা (রা.) এর দাফনের স্থান (কবর/মাযার)-এর পাশ দিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে গেলে রূহ তাজা হয়ে যায়।
এ পর্যন্ত বলে আল্লামা ইমাদ উদ্দিন ছাহেব পূর্ব-প্রসঙ্গ উদার জ্ঞানাহরণের কথায় ফিরে যান। বলেন, আমাদের নিকট প্রতিবেশী হিন্দু ভাইদের সম্পর্কে জানতে চাইলে বাধা নেই। ব্রাহ্ম-সমাজ সম্পর্কে জানতে রাজা রামমোহন রায়ের আতœজীবনী পড়লে তাঁর সম্পর্কে বেশ ধারণা হবে। তিনি পৌত্তলিকতা-বিরোধী ছিলেন। তাঁর লেখা আত-তাওহীদ নামে আরবী কিতাব আছে। ব্রিস্টল (ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় একটি প্রসিদ্ধ শহর)-এ তাঁর সমাধি। অনুকুল ঠাকুর সম্পর্কে জানতে নয়টি বইয়ের সিরিজ আছে। এভাবে ত্রিত্ববাদ বা ঞৎরহরঃু সম্পর্কে জানতে ওল্ড টেস্টামেন্ট, নিউ টেস্টামেন্ট একবার পড়ে নিন। ইনযীল বারনাবাস একটা আছে এবং সেটা অক্ষত আছে। তা পড়তে পারেন। পড়লে একটা আরেকটাকে কেটে দেবে।
বিভিন্ন ইযম (মতবাদ) যেমন কমিউনিজম সম্পর্কে জানার জন্যে আপনি পড়তে পারেন লেনিন, স্ট্যালিন, কার্লমার্কস ও এঙ্গেলস। এসব আমরা পড়েছি। পড়লে ঘুরেফিরে হুযুর (সা.) এর কদম মুবারকে ঠাঁই নিতে ইচ্ছে হয়। মনে হয়, ইয়া রাসুলাল্লাহ (সা.)! আপনার কদমের কিছু ধুলো আমাকে দিন। আমার বুকটা পরিষ্কার হোক। যত মতবাদ আছে, সব রেখে আল্লাহর কাছে মাথা রেখে আমরা শুকরিয়া আদায় করতে হয় যে, আল্লাহ আমাদের দ্বীন ইসলাম দিয়েছেন।
হিন্দুইজম সম্পর্কে জানতে আছে গীতা। আমার কাছে আছে রামায়ণ, মহাভারত, পদ্মপুরাণ ও ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ। পড়তে বাধা নেই। সব আপনি পড়–ন। তাতে আপনার দ্বীনকে সাবিত-কদম রাখুন। কোনো অসুবিধে নেই। এভাবে আপনি পড়–ন। আপনার মুতালাআহ (অধ্যয়ন) কে সীমিত রাখুন না যেন।
কেউ আমার সমালোচনা করুন না যেন, তাফহিমুল কুরআন যে মওদুদী সাহেবের, সেটা আমি পড়েছি। আমি যখন আলিম-ক্লাসের ছাত্র, তখন তাফহিমুল কুরআন, ইসলাম আওর জাদীদ মাআশী নযরিয়াত (ইসলাম ও আধুনিক অর্থনৈতিক মতবাদ) হকূকুজ যাওজাইন (স্বামী-স্ত্রীর অধিকার), সফরনামায়ে আরদুল কুরআন (কুরআনের ভূমি-ভ্রমণকাহিনি) সব আল্লাহর মর্জি আমি পড়েছি। পড়ে দেখলাম মাথা ঘুরে যাবে। আমি হযরত মুফতী আমীমুল ইহসান (র.) এর কাছে গেলাম। গিয়ে দেখি, (এ বিষয়ে উনার) কাশফ হয়ে গেছে। (কিছু না-বলতেই) উনি বললেন, আযীযম! সুনো, ইয়েহ দিল সে নিকালো। (¯েœহাস্পদ! শোনো, এসব অন্তর থেকে ঝেরে ফেলো।) পরে দুই মিনিটের কথাবার্তাতেই মন থেকে মুছে গেল সব।
এবার তিনি আল্লামা ইকবাল-এর দার্শনিক কাব্য নামে খ্যাত বাঙ্গ-ই দারা’র তুলো-ই ইসলাম কবিতা থেকে উচ্ছ্বাসিত কণ্ঠে বার বার আবৃত্তি করেন একটি বিখ্যাত পঙক্তি ‘নিগাহে মরদে মুমিন সে বদল জাতি হ্যায় তাকদীরী’ (অর্থাৎ মুমিন পারে একনযরে বদলাতে তাঁর তাকদীরে। কবি গোলাম মোস্তফা’র কাব্যনুবাদ)। আবৃত্তির পর আবার পূর্ব-প্রসঙ্গ, আপনি তাফহীমুল কুরআন পড়–ন, এর বাইরেও পড়াশোনা করুন। শামসুল হক ফরিদপুরী এবং মুহাদ্দিসে সাহারানপুরীর লেখা বই আছে। (তারপর) ফুলবাড়ির আব্দুল মতিন চৌধুরী। আরো অনেকের আছে। তাঁদের লেখা পড়–ন। সাথে তাফহীমুল কুরআন পড়–ন, বাধা নেই। কিন্তু মুতালাআহকে সীমাবদ্ধ রাখুন না যেন। বিস্তৃত করবেন।
আল্লামা ইমাদ উদ্দিন চৌধুরীর রাতের পর্বে আলোচনা ছিল দীর্ঘ। তাই এই লেখায় তা উপস্থাপন ও পর্যালোচনার সুবিধার্তে তিন অংশে ভাগ করে প্রথমাংশ এখানে সমাপ্ত দেওয়া হলো। পরবর্তী আলোচনা আলাদা দু’অংশে পরিবেশিত হবে ইনশাআল্লাহ।

ফেইসবুকে আমরা...