1. redwan.iub@gmail.com : admin2021 :
  2. admin@parwana.net : Parwana Net : Parwana Net
  3. editor@parwana.net : Parwana Net : Parwana Net
Logo
কবি ফররুখ আহমদের ‘সাত সাগরের মাঝি’
মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম
  • ১ জানুয়ারী, ২০২১

ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৪) বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত কবি। বিংশ শতাব্দীর এই কবি ইসলামী ভাবধারার বাহক। এজন্য তিনি ‘মুসলিম রেনেসাঁর কবি’ হিসেবেও পরিচিত। তাঁর কবিতায় বাংলার অধঃপতিত মুসলিম সমাজের পুনর্জাগরণের অনুপ্রেরণা প্রকাশ পেয়েছে।
‘সাত সাগরের মাঝি’ কবি ফররুখ আহমদের প্রথম কাব্যগ্রন্থ। কবি বেনজীর আহমদের অর্থানুকূল্যে ১৯টি কবিতা সম্বলিত কাব্যগ্রন্থটি ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কবিতা- পাঞ্জেরী, সিন্দাবাদ, আকাশ-নাবিক, ডাহুক, এই সব রাত্রি ইত্যাদি। অশিক্ষিত, অবহেলিত ও দুর্দশায় নিমজ্জিত বাঙালি মুসলমানদেরকে উজ্জীবিত করার মানসেই রচিত হয়েছে ‘সাত সাগরের মাঝি’। মুসলিম সম্প্রদায়ের জীবন ও জীবনের অনুষঙ্গগুলি স্বপ্নালোকে ও আদর্শকে রোমান্টিকতা ও আদর্শিকতার সমন্বয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন কবি তাঁর সাত সাগরের মাঝিতে। বাংলা কবিতায় রেনেসাঁর যে সুরটি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সৃষ্টি করেছিলেন কবি ফররুখের ‘সাত সাগরের মাঝি’ তারই পরিপূরক। এ কাব্যে আরবের মরুময়তা ও বিখ্যাত আরব্য উপন্যাস ‘আলফা ওয়া লায়লা’র প্রাণস্পর্শী চিত্র ফুটে ওঠেছে মনোহরী রূপ নিয়ে। ঐতিহ্য ও আদর্শিকতার এমন সফল সমন্বয় কাব্যজগতে সত্যিই বিরল।
এ কাব্যের একটি বিখ্যাত কবিতার নামও ‘সাত সাগরের মাঝি’। অনন্য সাধারণ এ কবিতার কাহিনী নেয়া হয়েছে আরব্য উপন্যাসের সিন্দাবাদের কাহিনী থেকে। এটি মুসলিম জাগরণ ও ইসলামী রেনেসাঁর প্রতীক। এ কাব্যে সমুদ্র যাত্রাপথে যে বিভিন্ন অনুষঙ্গ উপস্থিত হয়েছে তাদের সৌন্দর্য অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। নাবিক সিন্দাবাদ ফেনোত্তল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে নানা ঝড়-ঝঞ্ঝা অতিক্রম করে লক্ষ্যে পৌঁছাবে অর্থাৎ তার উদ্দিষ্ট স্থানে তথা ‘হেরার রাজতোরণে’ সমবেত হবে। নাবিক সিন্দাবাদের স্বপ্ন ও অভিজ্ঞতা তাঁর বিভিন্ন কবিতায় নানারূপে প্রকাশিত হয়ে শেষে মিলিত হয়েছে এক কেন্দ্রবিন্দুতে। এখানে সিন্দাবাদ হলো প্রতীকী নাবিক। যিনি সঠিক পথের দিশা দিবেন। তাই সিন্দাবাদকে সম্বোধন করে কবি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন-
ছিঁড়ে ফেল আজ আয়েশি রাতের মখমল অবসাদ
নতুন পানিতে হাল খুলে দাও, হে মাঝি সিন্দাবাদ (সিন্দাবাদ)

মানবতাবাদী কবি আলোচ্য কবিতায় সরাসরি ইসলামের কথা বলেননি। প্রতীকের মাধ্যমে ইসলামী আদর্শের এবং লক্ষ্যের কথা বলেছেন। ‘হেরার রাজতোরণ’ দিয়ে ইসলামের কথাই বলা হয়েছে। যেমন-
এখানে এখন রাত্রি এসেছে নেমে
তবু দেখা যায় দূরে বহু দূরে হেরার রাজতোরণ
এখানে এখন অজ¯্রধারা উঠেছে দু’চোখ ছেপে
তবু দেখা যায় দূরে বহু দূরে হেরার রাজতোরণ
কবি ফররুখ আহমদের ‘সাত সাগরের মাঝি’ শুধু ভাব ও ভাষাতেই নয়, দৃষ্টি এবং শিল্প-নৈপুণ্যেও এর নতুনত্ব আকর্ষণীয়। প্রতিভার ছাপ ফুটে উঠেছে কাব্যটির আগাগোড়ায়। এর সিন্দাবাদ, দরিয়ার শেষ রাত্রি, পাঞ্জেরী প্রভৃতি কবিতায় তিনি বাঙালি মুসলমানদের নবজাগরণের আকাক্সক্ষা পোষণ করেছেন। ‘লাশ’ ও ‘আউলাদ’ কবিতায় যেন দুর্ভিক্ষের বিভীষিকাময় দৃশ্য অমর হয়ে আছে। কবিতা দুটির ভেতর দিয়ে কবি বর্তমান সভ্যতার মুখোশ উন্মোচন করেছেন।
‘সাত সাগরের মাঝি’ কাব্যগ্রন্থের অধিকাংশ কবিতা রচিত হয়েছে চল্লিশের দশকের প্রারম্ভে। কবি তখন টগবগে তরুণ। চারিদিকে ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলন চলছে। স্বাধীনতার সূর্যোদয়ের খুব বেশি বাকি নেই। এমন আভাসই যেন পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু মুসলিম জাতির জেগে ওঠা নেতৃত্ব যেন সঠিক পথে এগুচ্ছে না। তাই তিনি জাতির কর্ণধারকে ‘পাঞ্জেরি’ প্রতীকে তুলে ধরেছেন। বার বার প্রশ্ন করছেন- রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরী।’
সমুদ্রযাত্রার প্রতিকূল পরিস্থিতি এবং তা থেকে উত্তরণের আকাক্সক্ষার ভেতরে কবি জাতীয় জীবনে বিরাজমান সংকট থেকে উত্তরণে জাতীয় নেতৃত্বের সচেতনতা প্রত্যাশা করেছেন। মূলত রূপকের আড়ালে কবি উক্ত ভাববস্তুই ব্যক্ত করেছেন-
পাঞ্জেরি!
জাগো বন্দরে কৈফিয়তের তীব্র ভ্রুকুটি হেরি
জাগো অগণন ক্ষুধার্ত মুখের নীরব ভ্রুকুটি হেরি
দেখ চেয়ে দেখ সূর্য ওঠার কত দেরি কত দেরি
এ কাব্যের একটি বিখ্যাত রূপক কবিতা ‘ডাহুক’। এটিকে ইংরেজ কবি শেলীর ‘স্কাইলার্ক’ এর সাথে তুলনা করা যায়। কবি শেলী স্কাইলার্কের ডানায় ভর করে আত্মমুক্তির সন্ধান পেয়েছিলেন। কবি ফররুখ আহমদও ‘ডাহুক’ পাখির মাধ্যমে আত্মমুক্তির সন্ধান পেয়েছেন। কবির রোমান্টিক চেতনায় ডাহুক হলো চির জাগ্রত বিবেক ও পবিত্র আত্মার প্রতীক যা মরমী সাধকের চেতনার সাথে তুলনীয়। কবির ভাষায়-
ঘুমের নিবিড় বনে সেই শুধু সজাগ প্রহরী
চেতনার পথ ধরি চলিয়াছে তার স্বপ্নপরি
মন্থর হাওয়ায়
‘সাত সাগরের মাঝি’ কাব্যে কবি অনেক রূপক-প্রতীক ব্যবহার করেছেন। কবি ফররুখ আহমদের রূপক-প্রতীক ব্যবহার প্রসঙ্গে বিশিষ্ট গবেষক রফিকুল ইসলাম বলেছেন- “ফররুখ আহমদ তাঁর অভিজ্ঞতা ও আকাক্সক্ষাকে প্রকাশ করেছেন কয়েকটি প্রতীকের সাহায্যে। ‘সিন্দাবাদ’ ফররুখ আহমদের একটি বহুল ব্যবহৃত প্রতীক, যে নাবিক নিত্য-নতুন দরিয়ায় তরী ভাসায়, সে নতুন জীবনের তাজা ঘ্রাণের প্রতীক।” ‘সাত সাগরের মাঝি’ কাব্যে কবি প্রচুর পরিমাণে আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছেন। নজরুলের পর ফররুখ আহমদের মতো আর কোনো কবি সম্ভবত আরবি-ফারসি শব্দ এমন দক্ষতার সাথে ব্যবহার করেননি। তবে ফররুখের আরবি-ফারসি শব্দের নজরুলের ব্যবহারের চেয়ে ভিন্নধর্মী। যেমন-
কেটেছে রঙিন মখমল দিন, নতুন সফর আজ
শুনছি আবার নোনা দরিয়ার ডাক
ভাসে জোরওয়ার মউজের শিরে সফেদ চাঁদির
তাজ, (সিন্দাবাদ)
কবি ফররুখ আহমদের এ কাব্যের প্রকরণকৌশল, শব্দচয়ন এবং বাকপ্রতিমার অনন্য বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ¦ল। আধুনিকতার সকল লক্ষণ তাঁর কবিতায় পরিব্যাপ্ত। তাঁর কবিতায় রোমান্টিকতা থেকে আধুনিকতায় উত্তরণের ধারাবাহিকতা পরিস্ফুট। কাব্যটি বিখ্যাত উর্দু কবি আল্লামা ইকবালকে উৎসর্গ করা হয়।

লেখক: প্রভাষক, সরকারি তোলারাম কলেজ, নারায়ণগঞ্জ

ফেইসবুকে আমরা...